৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ১৫২০১৬
 
 ১৫/১১/২০১৬  Posted by
কবি জিললুর রহমান

কবি জিললুর রহমান

জিললুর রহমান -এর ৩০ কবিতা


আমারও রয়েছে নারী

আমারও রয়েছে নারী
তবু আমি
পুরুষতো নই
প্রতিবাদে প্রতিরোধে
ভীষণ ক্লীবতা

কি লাভ
আকাশের দিকে চেয়ে
আমার আর পিপীলিকার আকাশে
কতোটা তফাত
আমার মায়াবী চাঁদ
তার কাছে তুচ্ছ বিন্দু

তবু আমি
স্বপ্ন দেখি
পাখা গজানোর
স্বপ্ন
একদিন
পুরুষ হবার


একমুঠো সোনালী বিদ্যুৎ

আমরা পঙ্গপালের মতো বেড়েছি ভাটি বাংলায়। রামপাল লক্ষণপালে বলো আমাদের কিইবা আসে যায় । রেলগাড়ির মাথা থেকে ধোঁয়া উঠলে বিষম খেয়েছি ভেবে পায়ুপথের গ্যাসালু দুয়ার মাথায় গেলো কীভাবে!
সে আমাকে বিদ্যুৎ দেখাবে বলে একদিন চমকে দিয়ে ভাসিয়েছে রাঙ্গা মাটি – সবুজ আঁচল – সাজানো বাসর ;আমরা চুলকে মাথা কতোবার বলি – বাঁধখানা বেজায় খাঁটি। নিচে ডুবে যাওয়া জনপদ ভুলে প্রমোদ তরণী চড়ি – ঢেউ গুনি।
আমাদের আম গেল, ছালা গেল – গোলা গেল, ধান গেল – তোমাদের শহরের ঘরে আহা – কী সুন্দর ঝলমলে আলো! জ্বালো, যতো পারো জ্বালো।
গোলপাতা হোগলার বনে মরার ক’টা লাকরি আর কুঁড়ে – প্রতিটা বছর বানে ভাসে রোদে শুকায়, এসব পুড়িয়ে ফেলো – জ্বেলে দাও একমুঠো সোনালী বিদ্যুৎ…


ডিসেকশন

ফরমালিন ঝাঁঝ থেকে চোখ মেলে দেখি
কাষ্ঠতুল্য শুয়ে আছে ক্যাডাভার বুক-উঁচু টুলের উপরে
মেডিকেল ছাত্রগণ ফরসেপে চামড়া টেনে ধরে, স্ক্যা
ল্পেলে পোঁচ দেয়, সে তবু অনড়…
চোখের কর্ণিয়া দুটি নিষ্পলক নিরবে শাঁসায়


সিক্ততা

আমাকে ভিজিয়ে দিলো
ধানকুটার কালো মেঘ
পরম মমতা ভরে
জড়িয়েছে
নরম তোমার মতো
হা খোলা বুকের গাঢ্
গোপন আরামে

আমাকে ভিজিয়ে দিলো
নমস্তে ঝর্ণার প্রপাতের জল
মা কালীর জিহ্বার মতো
নেমে এসে
পর্বতের চূড়া থেকে
ধারানের চপল বৃষ্টি
ঢুকেছে তো রন্ধ্রে রন্ধ্রে
চুলের আঁধারে
জামার চিপাতে

সকলেই জড়িয়েছে স্নেহে
তবে
আমার সিক্ততা
বুঝে নেবে
তেমন মমতা
কোথায় সে
মেঘ কী বৃষ্টির বুকে
প্রপাতের জলে


জন্মদিন
(প্রিয় শ্যামলী মোস্তফা আপা)

জন্মদিনে
অনেকেই ঘটা করে
কতো ব্যস্ত দিন
ব্যস্ত মধ্যযাম
কেকের ক্রিম বেয়ে বেয়ে
বয়স গড়াতে থাকে
মোমবাতি ফুৎকারে
নিভে আয়ুর পিদিম

অনেকে পীর স্বভাব
মেহফিলে মেজবানে
ভক্ত প্রাণপাত
জুলুসের মিছিল কাফেলা
বয়স ছাপিয়ে চলে
দূরে
মহাকাল গ্রামে

পৃথিবী কি জন্মদিন বোঝে
গ্রহরা কি জন্মদিনে
ফিরেছে পুরনো ঘরে

সামনে শুধু ধেয়ে চলে
মৃত্যু শকট
যে ক’দিন পার পাই
চলো
উৎসবের
বিজুলী চমকাই


খেলা

মালাপাতি খেলা
মিথ্যে উনোনের ভাত
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল
বেয়াই পাতানো শেষ

তবু রেশ
থেকে গেল যুগ যুগান্তরে
রয়ে যায় ঘামগন্ধ ইথারের শব্দকণা
উচ্চারণহীন প্রেম

দেখো
এখনো শিশির জমে ঘাসে
জমে নাকে
মাতাল বিছানা জুড়ে বুকের বকুল গন্ধ…


বৃহন্নলা

শহরে গড়ায় জল
পাখি ওড়ে
গাড়ি চরে  
অহর্নিশ
স্রোতোন্মত্ত মেলার মানুষ
কোথাও বটের গাছ – বৃহন্নলা!
নোটবুকে ডায়েরি সংবাদে
পাপপুণ্য নিরাবেগ  

কে মরে কে রিপুর শিকার  
হন্তারিত প্রাণবায়ু, নিঃসাড় তনু
রক্তাক্ত অধর গলা
প্রান্তরের পড়ে থাকা হিম দেহ
মর্গে না শূন্যে উড়াল…



পিতা

কোনোদিন ভাবিনি বাজার মাছ মাংস শাক সব্জি দই
পেটের খোরাক, মনের নিমিত্তে বই, কিনে লই
ইচ্ছে মতো, যখন যা খুশি মিটেছে আবদার
ইচ্ছে হলে সারাটা দুপুর হল্লা করেছি আর
পুকুরে সাঁতার, ঘাটে আড্ডা, কবিতা কবিতা
দুশ্চিন্তাহীন মানব জীবন আহা, মাথার উপরে ছাতা
পরম নির্ভরতার। শ্বাস নিই অনিবার বুক ভরে
কখনো ফিরেছি ঘরে কখনোবা সিনেমা হলের দিকে ছুটেছি দুপুরে

কিভাবে জুটেছে অন্ন পড়ার খরচ কিসে কড়ি আসে দু’টো
কোথায় রয়েছে জল কিবা অশ্রুজল সংসারের ফুটো
নিয়ত বেড়েছে তবু যতো না উটকো চাহিদা
নির্লিপ্ত পর্বতের বেশে মুচকি হেসে দিয়েছো প্রশ্রয়
এখনো মাথায় হাত আছে জেনে সখ জাগে নক্ষত্র ছোঁয়ার
গাম্ভীর্যের গভীর আড়ালে জানতে চাইনি কি দু:খ তোমার


মুখ

মুখ দেখাতে সকলেরই ভাল লাগে।
ক্যামেরা পেলেই ঈষৎ ঝিলিক মারে একচিলতে হাসি।
কিন্তু কিছু মুখ থাকে
যাকে পেলে ক্যামেরাই ঘুরে যায়,
ফিক করে হেসে ওঠে।
তোমাকে ভীষণ ঈর্ষা…

১০
চলো হাওয়া খাই

চলো হাওয়া খাই আজ
এখনো লাগে নি
ট্যাক্স
ভ্যাট
হাওয়ার উপর

নেই তাই
বখশিশ বখশিশ খেলা
অলস দুপুর থেকে নুন ঝরে
ঘাম ঝরে
হাওয়া বয়

অলস দুপুর
ছাই রঙা ঘুঘু চরে গাছ ওড়ে
বাড়ির উঠোনে

হাওয়া ওড়ে চৌরাস্তার মোড়ে
প্রজাপতি উড়েছে আকাশে
ভালবাসা ঝরে
মোম ঝরে
হাওয়া দিলে প্রেমাংশু বাতাসে

অবেলায়
চলো যাই
হাওয়া খাই ঘরের দাওয়ায় …

১১
কথা থেমে গেলে

কথা থেমে গেলে নি:শ্বাসের চলা ফেরাগুলো
দীর্ঘ দীর্ঘতর কথা হয়ে যায়।
না বলা কথার অশান্ত শ্বাসের ভেতর কতো কবিতার
ডালপালা আর দেখে না সবুজ রোদ্দুর।
মনের আঙুল শুধু জানে নি:শব্দ বর্ণমালার প্রাণ।
আঙুলের কতো প্রাণ, কতো মনোরম ভাষা,
আঙুল হৃদয় নিয়ে খেলে মহাভারতের পাশা কুরুক্ষেত্রে।

১২
ঘর

ঘর –
তোমার উষ্ণতা
কলহাস্য
শোরগোল

তোমার বিষণ্নতা –
ঘরের অসুখ
বিপন্ন সংসারজীবন
চন্দ্রগ্রহণ
রডোডেনড্রনে ঝড়

তোমার
চোখের ভাষা
পড়ে পড়ে যাপন
আজীবন রহস্যমন্থন

ঈষৎ উঠলে হেসে
আমি চন্দ্রগ্রস্থ
অস্থির দোয়েল যেন
নেচে উঠি নদীর মোহনায়
তোমার চুলে
জলে জঙ্গলে
ডুবি
ঠোঁটের গহীনে ঠোঁট

১৩
সব নদী গঙ্গা নয়

সব নদী গঙ্গা নয় শিবের সান্নিধ্য পাবে
আমারও সান্নিধ্যে এসে ধন্য ছিল হালদা কর্ণফুলী

নদীরা সংকীর্ণ হলে চর জাগে, দেবতারা দূরে সরে যায়
নদীর বালুর চরে মাছের পিপাসা মিছে মরে

নদীর ঢেউয়ের কাছে আর কোনো প্রশ্ন রেখো না
সে কেবল ছলকে ছলকে যাবে
নদীকে দু’হাত তুলে ডাকো, ফিরেও সে তাকাবে না
সে তার আপন গতিতে ছোটে।
নদীকে মাছের গল্প বলি
মুখ বাঁকিয়ে বলে এ তো সেই মাসীর গল্প মায়েরই নিকট
নদীকে বুকের কাছে ডাকো
হৃদয়ের শব্দ শোনাবে সে ধুকপুক ধুকপুক

সব নদী গঙ্গা নয় হৃদয়ে বন্যা বইয়ে দেবে…

১৪
কেন?

সুধাংশু চলে গেছে, সাথে নিয়েছে বঞ্চনা গঞ্জনার স্মৃতি
মশালের লাল শিখা ধরিয়েছে প্রিয় সিঁথিতে আগুন
ঘরের দো’চালা পুড়ে ফ্যানাটিক সুরমা চোখে ঘুরছে আজরাইল

সুধাংশু চলে গেছে, নলিনী যাবে না ভেবে একমনে ধরেছে লাঙ্গল
সুশোভন চেম্বারের শাদা পর্দার পেছনে চিকিৎসার আয়োজন করে
সুশোভন চাকমা বুঝে না, সুশোভন বাঙালি বুঝে না
চিকিৎসার কোনো সম্প্রদায় নেই

কেন তবে লৌহ শিক গেলেছে সুশোভনের চোখ?
শাদা পর্দার রক্তের দাগ আর শুকাবে না
সুশোভন চোখে দেখবে না
প্রেসার মাপবে না, লিখবে না নতুন প্রেসক্রিপশন

কেন বা ভান্তের ঘরে পবিত্র মন্দিরে হু হু জ্বলে ভূতুরে আগুন?
কেন নলিনীর শস্যক্ষেত্র, ধানের গোলায় ছাই, আর
শিশুটির বুকের আগুনে ভস্ম হলো ভালোবাসা …

১৫
ট্যুর গাইড

আমার ধারণা ট্যুর গাইড হওয়ার সহজ গুন হচ্ছে অফুরন্ত কথা বলা, কারণে অকারণে কথা বলা, নিজে হাসা আর সবাইকে হাসানোর চেষ্টা করা। বয়সে প্রৌঢ় আর লিঙ্গে নারী হলে আমার মনে হয় এই গুনটা স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে। আমাদের গাইড এই গোত্রেরই একজন।
আমাকে বাসে তুলতে তুলতে জানতে চাইলো আমি কোন দেশ থেকে এসেছি। আর আমার উত্তর পেয়ে সে বিস্মিত, জীবনে বাংলাদেশের কাউকে এই রকি পর্বতের ট্যুর-এ সে গাইড করে নি। পুরো বাস-ভর্তি ট্যুরিস্টকে চিনিয়ে দিলো, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।
আমি দেখলাম, সুদূর জাপান থেকে শুরু করে পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকেই ট্যুরিস্ট এসেছে। যাই হোক, হাজার বছরের পুরণো স্নো-স্যু এর গল্প শুনাতে শুনাতে আমাদের গাইড আমদেরকে হাজির করলো বরফ ঢাকা রকি পর্বতের একট ভ্যালি-তে।
অবিশ্রাম কলকল কথায় ট্যুর গাইডের কন্ঠ বরফের খরস্রোতা নদী হয়ে যায় …

১৬
লাশ-৫

আমার এখন লাশের ঋতু লাশের বারোমাস –
ডুব সাঁতারে বাঁচার ইচ্ছে প্রাণান্ত হাঁসফাঁস,
ছায়ার বেশে আসছে ধেয়ে মৃত্যু পরোয়ানা,
শিশির ভেজা ঘাসের রৌদ্র মিথ্যে ষোল আনা।

শিউলি তলায় মিলবে দেখা অশোকতলার প্রেম
বাদ সেধেছে জঙ্গীনামা –  ফুটন্ত প্রবলেম।
বাঁতাক্ল-এর গ্র্যান্ড হলে লাশ, মালি’র রেডিসনও;
নিমতলা কী কলাতলী, পথ বাকি নেই কোনো।

সিরিয়া কী জেরুজালেম – কে থাকে কার মনে?
বাদামতলীর ব্যস্ত মোড়ে প্রতীক্ষা ঋণ গোনে।
লাশের দেখা বৃন্দাবনে, দিনাজপুরের রাস্তায় –
প্রেম যদি দুষ্প্রাপ্য তবে, মৃত্যু মেলে সস্তায়।

স্বপ্ন জুড়েই বিভীষিকা, সবকিছুতে বিন্দাস –
আমার এখন লাশের ঋতু লাশের বারোমাস।

১৭
ধবল পর্বত

ধবল পর্বতেরও আকর্ষণ আছে, মোহ আছে, তোমার মতোই
তাইতো এগিয়ে চলি – আরো আরো গভীরে – না জানি কী পাবো!
এইভাবে পর্বতের আরও আরও গভীরে ঢুকতে থাকি – এক অদম্য নেশায় পেয়েছে যেন, ঠান্ডায় নাক-মুখ মাফলার-টুপিতে ঢেকে কিম্ভুত এগিয়ে চলেছি, যেমন তোমার কাছে এগিয়ে যাই।
ঢালু জায়গায় আমাদের স্লাইড করতে হবে, সবাই এগিয়ে গেলেও আমি তোমার কথা ভেবে, বাচ্চাদের কথা ভেবে থেমে গেলাম…

১৮
জলোচ্ছ্বাস
 
বসে আছি ভিজে বিড়ালের বেশে যুবুথুবু,
পাহাড়ের সাঙ্গু নদী নেমে আসে ধেয়ে
বহদ্দারহাট সড়কে কী বাদুরতলার ফুটপাতে।
আমিতো ভিজেছি আজ ব্যাপ্টাইজ হবো নাকি …
তোমার প্রসন্ন প্রেমে বেডরুমে জলোচ্ছ্বাস নেমে আসে

১৯
শ্যামল কান্তির কান

কীভাবে অতিক্রম করি  
পৃথিবীর সব ক’টা নদী
নদীর দু’পার জুড়ে কান
কানের গৌতম

আমার শরীর জুড়ে কান
কানের বিস্তার
নীল ঘাম নাকে নাকে
অশ্রুর ফোঁটায় নীল
আমার পৃথিবী আহা
নিতান্ত বধির

দীর্ঘশ্বাস বাতাসে চৌদিকে
তৃষ্ণা জাগানিয়া
আমাদের পাঠশালার দেয়ালে দেয়ালে
পোস্টার সাঁটানো
সৌম্য
শ্যামল কান্তির কান

২০
তনু, কল্পনা, রিমা কিংবা শারমিন

তোমদের তো যেতেই হতো আজ কিংবা কাল
বরং এভাবে গিয়ে ভালোই হলো
তোমাদের চিনে গেলো দেশে দশে
মিডিয়া তোলপাড় করে তোমাদের শেষকৃত্য হলো
তোমাদের নাম জাতীয় পরিচয় পত্রের তালিকায় না থাকলেও  
তোমরা রাষ্ট্রের মাথার ভেতরে ঢুকে পেরেক ঠুকেছো

আমাদের নদীতে অনেক স্রোত; তোমাদের ইতিহাসও
ভেসে যাবে দুরন্ত ভেলা কী খড়ের মতন।

২১
শূন্য
(কবি মাসুদ খানকে নিবেদিত)

গোলাকার ছোটবৃত্ত বড়বৃত্ত শূন্য – মূল্যমান মুহ্যমান শূন্য তীব্র শূন্য
বৃত্তাকারে শূন্য থাকে ডিম্বাকারে শূন্য – মহাবিশ্বে অন্ধকার যতো করো পুণ্য
নভোচারী শূন্যে ধায় অনন্য গতিতে, সংখ্যা ডানে মূল্যবান অর্থকরী হিতে
শূন্যমান প্রেমলাভ শূন্য বিরহেও, আত্মারাম শূন্যে ছোটে শূন্য নির্বাণেও
স্বরবৃত্ত পয়ার অথবা মন্দাক্রান্তা ছন্দ, অক্ষরে কী মাত্রাবৃত্তে শূন্য নহে মন্দ  
কাব্যরাত নিদ্রাহীন শূন্য অর্থহীন, ছন্দজপে দিন কাটে বৃত্ত ঘেরা দিন
দুষ্ট গরু ভোগে যাক, গোয়াল শূন্য ভালো – কানা মামা তারপরেও আশাভঙ্গে আলো
শূন্য বাড়ি শূন্য গাড়ি সবতো মরীচিকা – শূন্য প্রতি ধাবমান প্রদীপের শিখা
নারায়ণে শূন্যযোগ, শূন্য সাধনাতে – শূন্যমাপে চন্দ্রভোগ পূর্ণিমার রাতে
আজীবন শ্রমকর্ম শূন্যে যাবে শেষে – শূন্য জেনে ওষ্ঠ ছুঁই রাঙা গণ্ডদেশে

২২
মন্ত্রপাঠ

মন্ত্র লিখি মন্ত্র লিখি তন্ত্রটুকু ভুলে
অন্ত্র নালী সুস্থ থাক শাক দুগ্ধ গিলে
মন্ত্র লিখি শান্তি হোক ব্রহ্মান্ড নিখিলে
শান্তি সুখ পরিতৃপ্তি সুনামগঞ্জ ঝিলে
বায়ু রিক্ত দুষণ দুষ্ট বায়ু শতদল
আয়ু লাভ শত বর্ষ আকাংখা চণ্চল
ধর্ষণং হন্তারক গন্তব্য অশোকে
সম্মোহন সুশাসন দৈব দুর্বিপাকে

২৩
ডায়োজিনিস
(মেহেরাব ইফতিকে)

আমাকে এমন প্রজাতন্ত্রে কি করে রাখবে প্লেটো
কবি নেই
ভাব ভালোবাসা নেই

লোফালুফি চলে আকাশ তারার হাটে
লাশের মসলাপাতি
দুরন্ত বখশিশ
বাজারে কেতা দুরস্ত
ভেতরে হিজরা প্রাণ প্রতিবাদে মূককন্ঠ

আজ আমি দিবালোকে হারিকেন জ্বালি
বাজারে বাজারে ঘুরি
কোথায় সে সক্রেটিস
গুরুর যুক্তির ধারা পালটে যায় ভুল মতবাদে

নির্বাসন দাও আমাকে এখুনি

২৪
নিদ্রা

হায়! ৩০৯ বছর, নাকি ২০টা বছর ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম গুহার ভেতরে। পরম বিশ্বাসের ঘোরে আযৌবন কেটেছে গুহায়। ফিরে দেখি বদলে গেছে চেনা পথঘাট, হিজল তমাল আর ডাহুক কী মানুষের ভাষা – তোমার শরীরটুকু হরিতে মিলায়। আমিও হয়েছি হরি; তুমি কোন অন্তরীক্ষে – মেটেনি পিপাসা। সময় পেরিয়ে গেলে বিশ্বাসে মেলে না বস্তু, হায়! কী ভাগ্য লিখন! প্রিয় সারমেয় উধাও কোথায় …

২৫
শাদা শার্ট

আমাকে যখন ওরা ক’জন ছুরি কী তলোয়ার দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে উদযাপন করলো সেবারের হোলি উৎসব, বিজয়া দশমীর দিনে বাবার কিনে দেওয়া ধবধবে শাদা বেলী-শিউলি শার্টটিকে কী সুন্দর কাইয়ুমের চিত্রকলায় লাল করে দিলো, তখন তোমরাও সে মহৎ শিল্পোৎসবে ব্রতী হয়েছিলে; হোলি হে, হরি গো!
সেদিন মেঘেরা ক্রন্দনরহিত – বজ্রধ্বনি নীমিলিত তোমাদের শঙ্খনাদে। পাশে জ্ঞানঘর, শিল্পাচার্যের তুলি, শুয়ে অপলক ত্রিশংকু জননেতৃগণ, দূরে দৃশ্যমান লেলিহান শিখা অনির্বান। দ্যুতিময় শার্টেও সে অদ্ভুত শিখার চাঞ্চল্য। আমি উড়তে থাকি; চেতনা লুপ্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত আমিও তোমাদের উল্লাসের সাথী, শিখার ঊর্ধ্ব-তানে আমিই শিব, নেচেছি প্রলয়ে।    
আমার নিভেছে আলো। যে তুমি মেতেছো তালে দর্শকের বেশে, অর্বাচিনবৎ – সত্যি কি আছো বেঁচে? নাকি প্রেতাত্মা সকলে, উর্ধ্ববাহু নৃত্যপটু ঘোলাটে আকাশে…

২৬
আতশবালিকা

মহাশূন্য উজাড় করে উচ্ছসিত অযুত কিরণ ধেয়ে আসে কালে কালান্তরে, নক্ষত্ররাজির ফেরি । সুপার মার্কেটের চাতালেও বিচ্ছুরণ অজস্র ফোয়ারায়। উৎসব লোভী মানুষীরা হুল্লোড়ে মত্ত দোকানে সেসবে নিঃসাড়। তোমার দৃষ্টি কেন বর্ণময় স্বর্ণ নয় তবে! বাহারি ফুলের গায়ে অতীন্দ্রিয় আলোকসজ্জা অমারাতের দ্বিতীয় প্রহর। কে কন্যা আতশবালিকা আসমানী রশ্মিরজ্জু বেয়ে ওঠো অনন্ত ইথারে? আমারও রোশনাই প্রিয় চোখ; ধরবে কি উর্ধমুখী হাত …     

২৭
রাণীপুর

রাণীপুরে কোনো রাণী থাকে না
এখানে সকলেই সহসা রাণী হয়ে ওঠে
আমি কোনো রাজপুত্র নই তবে তেমন ভাবতে কে বাধা দেয়

আলো আঁধারির ফাঁকে কতো রাণী অশ্রু মুছে নেয়
বিছানার চাদরের মুছে নেয়া আদরের চিহ্ন বাণিজ্যিক খুনসুঁটি
দেয়ালের টিকটিকি আলমিরার তেলেপোকা তার খবর রেখেছে
অপরাজিতার খোঁজে আমার অন্বেষণে যতি নেই

সূর্যও রাণীপুরের অন্ধকার ঘোচাতে জানে না  

২৮
কালপুরুষ

সপ্তর্ষি বললো:
বৈমাত্রেয় আকাশে কার জন্য আলো দিচ্ছো বলো?
দুর্বাদল অন্ধকারে ঢেকে রাখছে মুখ
অন্ধকারে কতো কিছু ভালো, কতো বখখিলার দল
অন্ধকার ভালোবাসে প্রেম,
অন্ধকারে নিহত সন্ত্রাসও প্রাণের উন্মাদনা পায়
রাত্রিভুক যুবকের প্রশ্ন:
দেখোতো ঈশান কতো আগেই অন্ধকারে চলে গেলো, আমরা বুঝিনি
আমাদের রাত্রিগুলো প্রহরায় কী দরকার তোমার
তুমি জেগে থাকো হাস্নুহানার ঘ্রাণের আনমনা রাতে
শুকতারার সাথে কী এতো খুনসুঁটি
মান্দার গাছও আজ কন্টকহীন দেহ, প্রিয় সারমেয় নিদন্ত
আমার অন্ত্যজ সাপ নিফনা নির্বিষ
আমি আলোতেও তৈরি করি ঘুটঘুটে আলকাতরার স্মৃতি
চিত্রলেখ ঊষা দেখো চারদিকে গোক্ষুরের পদচ্ছাপ
কার জন্য তবে এই সপ্তর্ষি, কার ধ্যানে কাটে রাত
আদমসুরত বলে:
পূর্ণিমার আলোতো আজ আর প্রেম ডেকে আনছে না ঘরে
বাঁশিটি কোথায় হারালো বলো নিধুবনে
নিদাঘ অমারাত্রে আমাদের যতো প্রেম, যতো ভালোবাসা
তারো বেশি ধ্যানস্থ কী তোমাদের রূপালী দ্যোতনা
আমাদের কালো পিঁপড়ে, লাল পিঁপড়ে, ডেঁয়ো পিঁপড়ে
সারিবদ্ধ সকলে চলেছে দূরে
নগরের ঝিঁঝিঁগণ নিরুদ্দিষ্ট কোথাও অরণ্যে বুঝি
আহা, দেখোতো নৈঋত, সে কোন মর্ম যাতনা বুকে তার
গিলোটিনে পেতেছে প্রাণ বটের ছায়ায়
সে কোন সমুদ্র মন্থনে প্রভু, এতো বিষ তুলে এনে
ঢেলেছো যৌবনের বুকে
কার জন্য হিমালয় উজাড় করেছো তুমি
কোন সে সুপ্ত সৃজন?
আমাদের আয়ুবৃক্ষ ফলবতী হবে কী কখনো
কীসের দৃষ্টি তুমি ধরে রাখো রাত্রিভর
আজ আর আলো নয় স্বচ্ছতা নয় শুভ নয়
অজস্র গরল ঢালো অমা ঢালো অন্ধকার বিষাক্ত নিঃশ্বাস
সমূদ্র মন্থনে যতো বিষ তুলে জমিয়েছো বিষন্ন বটের ছায়ায়
সকলই উজাড় করে আমরা সকলে নীলকন্ঠ
নিষিক্ত অপচ্ছায়া প্রেতচ্ছায়া জীবন্ত মুশকিল
আমাদের দেহে আজ দ্রোহ নেই প্রেম নেই সকলি কর্পূর
মায়া মোহমায়া মহামায়া লক্ষী স্বরস্বতী
নেই কোনো শুভগন্ধা ভোরের শিউলি
বাগান বিলাস জুড়ে বারুদের পোড়া দীর্ঘশ্বাস
জোনাকের প্রশ্ন শুধু:
দুর্বাদলে রক্তছাপ লোহুগন্ধ হাহতাশ
তুমি তবু নিষ্পলক আলো দিচ্ছো পৃথিবীর বুকের ভিতরে
কীসের মায়ায় বলো সুবাতাস তোমার চিবুকে…

২৯
ভেসে যায়

ঘৃণার গঙ্গায় আমি আর কতো ভাসাবো নিজেকে
শীতের খরায় খাঁ খাঁ খটখটে তৃষ্ণার্ত ঠোঁট
শ্রাবণে আবক্ষ জলে ডুবুডুবু থৈ থৈ
কী মর্জি তোমার বলো
তারপরও ভালোবাসা কীর্তিনাশা বুকে
দূর দ্বীপের ছায়ায় কাঁপা অবয়ব
জলরঙে কদম গাছের ছায়া কেঁপে ওঠে প্রেতের মতোন
স্মৃতিঘর হালের লাঙল ঈশানের বড়ই গাছ
আর নিকোনো উঠোন
ভালোবাসা  ভাসে
ভেসে যায়…

৩০
প্রোবলেমমান

হঠাৎ আকাশ কেন এমন হলুদ? ছোপ ছোপ লালের জাজিম লেগে আছে গায়ে। বৃক্ষদের দোষ আর কেন দেবে বলো, আপেলেরা ঊর্ধমুখী আজ। যারা অন্যরকম পারে তাদের জন্য নিউটনের সূত্র পালটে যায়। আপেল কাটার ছুরি, কেটে যাচ্ছে প্রেয়সীর বুক, নিটোল চিবুক, কোন সুখে?  এমন জগত নেই এলিসের, এমন পৃথিবী নেই কোনো ধর্মগ্রন্থে! এ তবে নিখিল স্বর্গ! নাকি কোনো পাপস্য নরক, নিয়ত গুলজার।   
তোমার কন্ঠার হাঁড়ে উৎকন্ঠা ভেসে ওঠে প্রিয়, আমারও তো ঠোঁটের প্রোবলেম!

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E