৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ২২২০১৬
 
 ২২/১২/২০১৬  Posted by

গৌরাঙ্গ মোহান্তের ‘জলকথা’: পাঠে পাঠান্তরে
– জিললুর রহমান

�      জলকথা
কিছু জল কখনো শুকোয় না।  কিছু কথা কখনো হয় না অস্পষ্ট। একটি বা দুটি মৃত্যুর সাথে হয়তো সেগুলোর অবসান ঘটে। জল, কথা কিংবা দৃশ্য জীবনকে দুর্বহ করে তোলে। জলসূত্র শাশ্বত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের পরিপন্থী হলে তা নিয়ে আলোচনা করা যায় না। যে কথা আমি শুনি, আত্মজন শোনে না, তা নিয়ে নিশ্চুপ থাকতে হয়। যে দৃশ্য আমি দেখি, কেউ চাক্ষুষ করে না, তা নিয়ে মুখর হওয়া যায় না। ব্যক্তিগত জলে যখন জলোচ্ছ্বাস ঘটে তখন ত্রাণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। অবিনাশী কথা যখন বজ্রের শক্তি ধারণ করে তখন পৃথিবীতে কোনো নি:শব্দ গুহার অস্তিত্ব থাকে না। দৃশ্যপট যখন উত্তাল তরঙ্গে ভেসে যেতে থাকে তখন রাতের প্রভাব থেকে নিদ্রা মুক্ত হয়ে ওঠে। গহন জীবন ক্রমাগত বাহিত হয় অনির্দেশ্য ভবিষ্যতের দিকে।

নিরন্তর পথে পথে ঘুরে ফিরছি সেই গিলগামেশ কী হোমার, কিংবা বাল্মিকী কী কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস এর এপিক যুগ থেকে কেবলি কবিতা কবিতা বলে। এর মধ্যে আমাদের করায়ত্ত হয়েছে ভাগ্য, অদৃষ্ট। কবিতা দেবতা-তোষণের পরাকাষ্ঠা শেষ করে সে-ই কবে পৌঁছে গেছে মানবগাঁথা সৃজনে। তবে রেনেসাঁ যুগে পদার্পনের আগে পর্যন্ত আমরা রাজন্য বন্দনায় নিমগ্ন ছিলাম। রোমান্টিসিজমের বন্যায়ও একদিন ভেসে যাই। তা-ও শেষ হয় বিশ্বযুদ্ধের দামামায়। এতোদিনে আমরা জেনে গেলাম “ট্রয় ধ্বংস করবে, প্রেম আজ আর অতো শক্তিমান নয়”। আমাদের ইট সুরকির নাগরিক জীবন বিচ্ছিন্নতার ভেতরে বিবমিষা তাড়িত কবিতার জালিকা বুনন করে ফেরে। আমরা চেতন কী অবচেতন সকল জগত থেকে ঝেডে ফেলে দিই যতো অতীন্দ্রীয় ভৌতিক-আধিভৌতিক দেব-দৈব ধর্মাচার। একটা সময়ে এসে সকল দৃশ্য কী অদৃশ্যের প্রতাপের দিকে আমরা আঙুল তুলতে শিখে নিই। এই এনার্কিজমের জয়জয়কারের কালেও কোনো বটবৃক্ষের নিচে মধ্যরাতে একাকী দাঁড়াতে মন কেঁপে উঠে। এখনো আমরা উদ্দীপিত হই ওডিসিয়ুস এর প্রাণবন্ত সংগ্রামে, তাড়িত হই পেনিলোপির প্রণয় নিষ্ঠায়। যদিও জয়েস এর যুগে পেনিলোপি রূপান্তরিত হয় ভ্রষ্টা নারীতে। সেই নিবিষ্টতাও নেই ইউলিসিস এর। তবু ট্রয়ের পাশে বয়ে যাওয়া সমূদ্রের জলরাশি এখনো বয়ে চলেছে কালে কালান্তরে। এখনো ধ্বনিত হয় যেন একিলিসের বীরত্বের বাণী। কিংবা কোনো ঊজ্জয়িনী নদীর ধারে কুলুকুলু বহমান প্রেমধারা আমাদের কালতরীতে ঢেউয়ের দোলায় মেতে ওঠে। তাই তো আমাদের এই উত্তর আধুনিক স্বরায়ন, গৌরাঙ্গ মোহান্তের লেখনীতে-

“কিছু জল কখনো শুকোয় না।  কিছু কথা কখনো হয় না অস্পষ্ট।”

উত্তর আধুনিক মন জানে, ইট পাথরের খোপে থেকেও মাঝে মধ্যে মন কোনো দূর অতীন্দ্রীয়ের কাছে উড়ে যায়। কানে কানে শ্রুত হয় পেনিলোপির প্রেমের সংলাপ, অথবা কোনো আটপৌরে শাড়ির আড়ালে ঝলসে ওঠা বিস্ফারিত প্রেম। শুরু হয়ে যায় না দেখাকে দেখা, না শোনাকে শোনার এক অপার্থিব অনুভূতি। না, তা কেবল নিজের ভেতরেই বেডে ওঠে, বেজে চলে পিয়ানোর মতো টুংটাং। একে না অস্বীকার করা যায়, না যায় কারো সামনে উম্মোচন করা। জলকথা তাই নির্ঘোষে –

“যে কথা আমি শুনি, আত্মজন শোনে না, তা নিয়ে নিশ্চুপ থাকতে হয়। যে দৃশ্য আমি দেখি, কেউ চাক্ষুষ করে না, তা নিয়ে মুখর হওয়া যায় না।”

সমাজ তো আর সেই আদিম ব্যবস্থাপনায় নেই। সমাজ এখন একটা জটিল কাঠামো ধারণ করেছে। মানুষের জন্য একদিন তৈরি হওয়া কানুনগুলো দিনে দিনে মানুষের শাসকে পরিণত হয়ে গেলো। এই লৌহাবৃত ব্যবস্থার ভেতরে প্রেম আসে টিভি স্ক্রিন বৃষ্টির আনন্দের মতো। এখানে ব্যক্তিগত জলকথা, জলোচ্ছ্বাস, জলের অভ্যন্তরীণ উত্তাপ কিছুই স্পর্শ করে না। আমাদের উত্তর আধুনিক মন যেন বিবর্ণতায় ভোগে, আধুনিকতার কডিকাঠে কার্যকারিতা হারায়। কবি যেমন চিহ্ণিত করেন – “ব্যক্তিগত জলে যখন জলোচ্ছ্বাস ঘটে তখন ত্রাণ অকার্যকর হয়ে পড়ে। “

কিন্তু এসবই বাহ্যিক বিষয়। ভেতরে ভেতরে শক্তিমান হয়ে ফুঁসতে থাকে প্রাণের আকুতি, সে-ই জলকথা – সে যেন এক দুর্দমনীয় শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ঘোষণা করে-
“অবিনাশী কথা যখন বজ্রের শক্তি ধারণ করে তখন পৃথিবীতে কোনো নি:শব্দ গুহার অস্তিত্ব থাকে না”।

সত্যিই তো, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মৃদু বর্ষণের জল ঝিরি বেয়ে গড়াতে গড়াতে ঝর্ণার চূড়া থেকে যে বজ্র নিনাদে নেমে এসে আমাদের ভিজিয়ে দেয়, ভাসিয়ে নেয়, তখন তার এই স্রোতধারায় বাধ সাধবে কে?

আর এভাবেই কী প্রেম, কী মুক্তিকামী মানুষ, সুপ্তাবস্থার বিলোপ ঘটিয়ে বিপ্লবাত্মক জাগরণে উদ্ভাসিত হয়। যেমন শুনতে পাই – “দৃশ্যপট যখন উত্তাল তরঙ্গে ভেসে যেতে থাকে তখন রাতের প্রভাব থেকে নিদ্রা মুক্ত হয়ে ওঠে।”

সে আমরা নিরন্তর প্রেমই বলি, আর অনন্ত জীবনই বলি – সব যেন মহাকাল সমূদ্রের অনি:শেষ পথ চলার চেতন ও অবচেতন রূপবিভ্রম। আর সে মহাজাগতিক জীবনবীক্ষায় অবচেতনে অন্ত:সলিল বেদনার ধারাপাত ধীরে বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে তার উচ্চারণে, অবস্থান ঘোষণায়। জীবনের জয়গান এভাবেই সূচিত হয় কালে কালান্তরে ভবিতব্যের পথে। “গহন জীবন ক্রমাগত বাহিত হয় অনির্দেশ্য ভবিষ্যতের দিকে।”

………………………………….

জিললুর রহমান

জিললুর রহমান

লেখক পরিচিতিঃ
জিললুর রহমান। চট্টগ্রামে জন্ম, নিবাস, কর্ম। পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষক। আশির দশকের শেষ দিকে থেকে লিখালিখি। লিটল ম্যাগাজিন ‘লিরিক’ এর সম্পাদনা পরিষদ সদস্য। উত্তর আধুনিক কাব্য চর্চার পথিকৃৎদের একজন। মূলত লিরিক, নিসর্গ সহ বিভিন্ন ছোট কাগজে লিখে আসছেন দীর্ঘদিন। গ্রন্থ সংখ্যা-৫ঃ- অন্য মন্ত্র (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৯৫), উত্তর আধুনিকতাঃ এ সবুজ করুণ ডাঙায় (প্রবন্ধ সংকলন, ২০০৩), শাদা অন্ধকার (কাব্যগ্রন্থ, ২০১০), অমৃত কথা (প্রবন্ধ সংকলন, ২০১০), আধুনিকোত্তরবাদের নন্দনতত্ত্বঃ কয়েকটি অনুবাদ (২০১০)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E