৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
আগ ৩১২০১৭
 
 ৩১/০৮/২০১৭  Posted by

লিটল ম্যাগাজিন : সমস্যার নানা প্রেক্ষিত
– জিললুর রহমান

‘লিটল হলেও পরিসরে এবং বিষয় ভাবনার যা ছোট নয়, অর ম্যাগাজিন হলেও যা সাধারণ পাঁচমিশালী নয়- তা-ই লিটল ম্যাগাজিন। লিটন ম্যাগাজিন প্রতিনিয়ত নতুন চিন্তা-চেতনা সাহিত্য-শিল্পের অপ্রতিষ্ঠিত অথচ বলিষ্ট ও বিপ্রতীপ অংশের নিরাপস সংগ্রামের মুখপত্র হিসাবেই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির জগতে অবস্থান করে। বস্তুতঃ লিটন ম্যাগাজিন ‘কী’ তা জানার চাইতে লিটল ম্যাগাজিন ‘কেন’-তা সংজ্ঞা এবং বিষয়-বিন্যাস বোধের রাজ্যে পরিষ্কার ফুঠে ওঠে।

সাহিত্য সৃষ্টির সূচনা এবং তার নানা ব্যাখ্যার কাসুন্দি এই ছোট্ট পরিসরে ঘাটাতে চাই না। তবে এ কথা তো বলতেই হয়, সাহিত্য সৃষ্টির আদি-তে তো কোন লিটল ম্যাগাজিন জাতীয় ধারণা কিংবা প্রকাশনার ব্যাপার ছিলো না, তবে আজ কেন এই শিরোনাম অনেক মহান লেখকের অবলম্বন হয়ে দেখা দিলো ? আদি-তে শিল্পী-সাহিত্যিক মনের তাগিদে যা কিছু সৃষ্টি করছেন পাঠক সমাজের মনে তার অবস্থান ছিলো অকুন্ঠ, এর মধ্যে শিল্প এবং জীবন উভয়ই নির্মলতার প্রস্ফুটিত হয়ে আমাদের নান্দনিক বোধে অবারিতভাবে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু সময় অর্থাৎ কাল এক অমোঘ অশনি হয়ে দেখা দিলো। জীবন যাপনে যেমন, শিল্প সাহিত্যেও পুঁজিবাদের প্রশস্ত হাত নির্দ্বিধায় অনুপ্রবেশ করলো। আর আমরা কি দেখতে পেলাম না কী দুরন্ত তার গতি, কী মোহিনী তার রূপ, কী বিশাল তার ছায়া? সমস্তই কী নির্বিকার পণ্যে পরিণত! হয়! সাহিত্য শিল্প সব নানা প্রতিষ্ঠানের করাল খপ্পরে পড়ে প্রতিষ্ঠানেরই প্রয়োজনমাফিক-বাণিজ্য-বিনোদনের কিংবা বলা চলে বিনোদন-বাণিজ্যের নির্ভরতায় নিদারূণ গতানুগতিকতায় নিপতিত। শুধু তাই নয়, এর মধ্য দিয়ে শিল্প সাহিত্য মানুষের বোধের জগতে যে সুবিশাল সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে তা পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষাকারী দার্শনিকতার এবং অর্থনীতির চলতি ধারণাকেই পোষণ এবং তোষণ করার কাজে সহায়ক শক্তি হয়ে দাঁড়ালো। আর তখন বিশ্বময় শিল্প সাহিত্য হলো শাসনকীর্তি অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিকতার দর্শন-রাজনীতি-অর্থনীতি ইত্যাদির পৃষ্ঠপোষক। আমরা কি দেখতে পাইনি অনেক শক্তিমান লেখককে প্রতিষ্ঠানের অন্তর্গত হয়ে নিয়মিত সৃষ্টিকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ভালমন্দ মত ও পথের নানা স্বার্থ সংরক্ষণের কি অদ্ভুত ব্যস্ততায় তারা নিমগ্ন? হ্যাঁ, আর তাই যখন এই গতিধারার বিপরীত স্রোতে দাঁড়িয়ে বিপ্রতীপ চিন্তাচেজতনার বিকাশ চেয়েছেন, তাদের গড়তে হয়েছে ভিন্ন ব্যবস্থা। নতুন চিন্তা, নতুন চেতনা, অপ্রতিষ্ঠিত বিপ্রতীপ দর্শন এবং নতুন ধারার শিল্প সাহিত্যকে যখন এসব প্রতিষ্ঠান কিংবা এই প্রাতিষ্ঠানিকতার ভাবমূর্তির প্রাসাদোপম স্তরগুলো বিকাশে ও প্রকাশে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয়ভাবে নিরস্ত করায় নিয়ত উদ্যোগী, তখন এই প্রতিষ্ঠান-বিরোধীতার ধারণা থেকেই একদিন জন্ম নেয় লিটল ম্যাগাজিন।

লিটল ম্যাগাজিনে কী এমন থাকে, যা এত বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক মতের সাথে সংগ্রামে সাহসী, হ্যাঁ, সাহসটাই আসল। বিরুদ্ধ-স্রোতে থেকে নিজেকে দাঁড় করানো অথবা আপন-দর্শন চিন্তা-সাহিত্যকে দাঁড় করানো কোনো বালখিল্যতার ব্যাপার নয়। বস্তুতঃ যে লেখক নতুন কিছু লিখবে- তা হোক না বিষয়বস্তুতে কিংবা গঠন-বিন্যাসে অথবা দার্শনিকতায়- তখন সে স্বভাবতই স্থান পায় না বাজারজাত কাগজে। কেননা, বাজারজাত কাগজ বাজারের প্রয়োজন মেটায় আপন স্বার্থের সুরে সুর মিলিয়ে। কিন্তু নতুন সৃষ্টি তো নতুন পাঠক তৈরি নতুন চিন্তা তৈরির কাজে লাগবে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠান সবসময় সে লেখাই চাইবে- যা পাঠকের স্বাভাবগত অভ্যস্ততায় গ্রহণযোগ্য, মূলতঃ বিনোদনমূখী এবং সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রথাগত দর্শনের অনুগামী। এই জায়গাটাতে প্রতিষ্ঠান নতুন দর্শন-নতুন চিন্তা-নতুন সাহিত্য ইত্যাদিকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী হিসাবেই ধরে নেবে। সে কারণেই তারা এই বটচ্ছায়ায় আশ্রয় পাবে না। অ পেলেও তুল্য মূল্য বিচারে হবে অবেহেলিত এবং ভিন্ন সুরে উপস্থাপিত। তাই প্রয়োজন হয়ে দেখা দিলো নিরাপস সংগ্রামী বাণিজ্য-নির্ভরতাহীন মুখপত্রের-আর তাকেই আমরা ছোট কাগজ কিংবা ওই লিটল ম্যাগাজিন বলে ডাকি। পুঁজিবাদের বিকাশ প্রথম ইউরোপে ঘটলেও অর্থনীতির দারুণ দরুন্তপনায় তা যেম বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে-প্রতিষ্ঠানও তারই হাত ধরে একই ভাবধারায় সারা বিশ্বে তার সিংহাসন তৈরি করে নেয়। আর তাই ‘লিটল ম্যাগাজিন’ ধারণাটাও ইউরোপবাহিত হলেও আমাদের মতো পোস্ট-কলোনিয়াল সমাজেও এর প্রয়োজন অনস্বীকার্য।

বড় অদ্ভূত ব্যাপার হচ্ছে, আজ যা নতুন-বিদ্রোহী-বিপ্রতীপ চেতনা, প্রতিষ্ঠিত সামাজিক আচার যাকে সহজে মেনে নিতে নারাজ-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আগামী দিনেই তা সামাজিক স্থিতাবস্থার প্রতীকে পরিণত হয়। আর তখন এইসব প্রতিষ্ঠান তার বাণিজ্যবুদ্ধির ধারালোপনায় এই বিপ্রতীপ ধারণাকে আপন অঙ্গে জড়িয়ে নিতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠাবোধ করে না; বরং এই মত-ই তখন আরাধ্য হয় এবং পরবর্তী নতুন চিন্তাকে নতুন পদ্ধতিতে কন্টকিত করায় সচেষ্ট হয়। ফলে তা এক সময়ের নতুন চিন্তা পরবতী সময়ে প্রতিক্রিয়াশীলতায় পর্যবসিত হয় এবং তা কেবল এই প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিকতার কারণেই হচ্ছে। এবং আমাদের অনেক নমস্য বিপ্রতীপ লেখকও এই খেলায় নিজেদের অজ্ঞাতে বা জ্ঞাতে কখনো সখনো তাদের লেখার গুটিতে পরিণত করেন। আর প্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিণতিটা যাতে সঠিকভাবে সুসম্পন্ন হয় তার তদারকি করে বৈকি! কেবলমাত্র লিটল ম্যাগাজিনের পক্ষেই সম্ভব ক্রমশঃ নতুন থাকা, ক্রমশঃ নতুনকে স্থান দেওয়া।

কিন্তু এই ‘নতুন’ শব্দটাও এখানে নানা জটিলতায় ভুগছে। যেম আজকের কোনো তরুণ নেহাৎ মনের তাগিদে দু’চার ছত্র লেখা শুরু করলেই তাকে নতুন বলে চালিয়ে একটা কাগজে ছাপতে গেলেই কি আমি সেই প্রকাশনাকে লিটল ম্যাগাজিন বলবো? যদি সাহিত্যের বিচারে তার কোনো নান্দনিক অবস্থান-ই না থাকে? আর এই সমস্যাই এখন লিটল ম্যাগাজিনের একটা বড় ঝামেলা হিসাবে ধরা যায়। আসলে লিটল ম্যাগাজিনের কাজ কি নতুন লেখককে সুযোগ করে দেয়া, নাকি নতুন লেখাকে প্রকাশ করা? তবে নতুন লেখা কি? নতুন লেখা হচ্ছে তা’-যার মধ্যে নতুন দর্শন, আঙ্গিক ও প্রকরণের অগতানুগতিকতা ইত্যাদির প্রকাশ রয়েছে। নতুন লেখা না নতুন লেখক- এই নিয়ে বিস্তর দ্বন্ধ। এমন কি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক কর্মীদের অনেকেই এই ব্যাপারে সিদ্ধান্তে স্থির হতে পারেন না। যা শিল্প নয়, যা সাহিত্য নয়, বা যা হয়ে ওঠেনি, তাকে স্থান দেওয়া লিটল ম্যাগাজিনের দায়িত্ব হতে পারে না। লিটল ম্যাগাজিন স্থান দেবে নতুন লেখাকে অর্থাৎ নতুন দর্শনের নতুন চিন্তার নতুন প্রকরণের সাহিত্যকে; নতুন লেখককে নয়। আর এই কারণে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে-নতুন লেখক তৈরি না করলে নতুন লেখা কিভাবে আসবে? আর নতুন লেখক যে সুযোগ পেলে নতুন বিপ্রতীপ সাহিত্য হয়তো বা লিখতে পারে-তাকে কে সুযোগ দেবে? প্রতিষ্ঠান তো তাকে স্থান দেবে না? আসলে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার অপেক্ষায় সমস্যাটা বসে নেই। সমাজের ধারাবাহিকতা স্বাভাবিক নিয়মেই এই সমস্যারও একটা পথ খুঁজে দেয় এবং দিয়েছেও। নতুন লেখকের তাদের স্কুলে পাড়ায় কিংবা যে কোন পরিমন্ডলে সংকলন প্রকাশের মাধ্যমে নিজেদের প্রকাশ করছে। যারা এর ভেতর থেকে নিজেকে সম্ভাবনাময় করে গড়ে তুলতে পেরেছে, লেখার নতুনত্বে উজ্জ্বলতা দিতে পেরেছে বা পারছে, তারা কোনো এক সময ঢুকে পড়ছে লিটল ম্যাগাজিনের দোচালায়।

সমস্যাটা এখন তাই নতুন লেখককে জায়গা দেওয়া নয়। সমস্যা হচ্ছে-কিছু অতি-বুদ্ধিমান নতুন লেখক অর্থ ও টেকনোলজির সুবিধার কারণে প্রতিষ্ঠিত কিছু লেখকের লেখা সংগ্রহ করে নিজেদের লেখাকে তার সাথে সংযোজিত করে সংকলন বের করছে এবং অনেকেই তাকে লিটল ম্যাগাজিন ভেবে ভুল করছে। এই ভুল করাটাই ভুল হচ্ছে। বস্তুতঃ নতুন লেখক যখন নতুন চিন্তাকে ধারণ করে না, নতুন দর্শন বা প্রকরণের লেখা যখন তার কলমে আসে না তখন তাকে নিয়ে মাথা-ঘামানোর অবকাশ লিটল ম্যাগাজিনের নেই। সাহিত্যপত্রিকা জাতীয় নানা সংকলনে তারা তো আপন উদ্যোগেই প্রকাশিত হচ্ছে। তবে লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক ও কর্মীদের এসব কাগজও পড়তে হবে এবং সম্ভাবনাময় লেখককে বেছে নিয়ে তার নতুন লেখাকে প্রকাশের সুযোগ করে দিতে হবে বৈকি।

আরও এক ধরনের সাহিত্য পত্রিকা চোখে পড়ে যা সবচেয়ে বেশি বিভ্রম সৃষ্টি করে। এসব পত্রিকার কান্ডারীরা ভালো লেখক অর্থাৎ মানসম্পন্ন লেখক। কিন্তু সাহিত্যের সংগ্রামী পথ নতুন নতুন স্বপ্নিল চেতনা-ভাষা-প্রকরণের পথ তাদের আরাধ্য নয়। এদের আরাধ্য হচ্ছে নাম-যশ। কোনো বিপ্রতীপ দর্শন নয়, কোনো নতুন শিল্পভাবনা নয়, নেহাৎ সুনামের জন্য এরা লেখার গঠন-বিন্যাসে কিছু নতুনত্ব আনায় সচেষ্ট এবং নিজের নাম-যশের প্রয়োজনে সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করতে গিয়ে বিভিন্ন লব্ধ-প্রতিষ্ঠ লেখক ও পাশাপাশি তরুণ লেখকদের নতুন লেখাকে একত্রে সংকলিত করে নিজেকে প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। এবং সত্যিকার অর্থে একটি পাঁচমিশালী ম্যাগাজিন আমাদের দৃষ্টিগোচর হলেও এর বহুমাত্রিকতা আমাদের চমকিতও করে। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের যে সংগ্রামী চরিত্র, তা এইসব প্রকাশনার থাকে না। অথচ আমরা কি প্রায়ই এ ধরনের কাগজকে লিটল ম্যাগাজিন বলে ভুল করে থাকি না?

যা-ই হোক নানা সমস্যার মধ্য দিয়েই বিশ্বময় লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন বহুদূর বিস্তৃত হয়েছে। এমনকি এখন অনেক সুযোগ্য লিটল ম্যাগাজিন নিজেই এক একটা প্রতিষ্ঠানে পরিণত। আজ অনেক তাই এসব লব্ধপ্রতিষ্ঠিত লিটল ম্যাগাজিনকে আর লিটল ম্যাগাজিন বলবে কিনা ভাবছে।

লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করতে গিয় যে সমস্যা খুব বেশি প্রকট হয়ে দেখা দেয় তা উল্লেখ না করলেই নয়। তা হচ্ছে-অর্থ, যা কিনা সকল অনর্থের মূল। টাকার জন্য লিটল ম্যাগাজিনগুলো মূলত: বিজ্ঞাপন-নির্ভর। এবং এই কারণে লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদেরকে প্রতিনিয়ত ধর্ণা দিতে হয় বিভিন্ন ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠান কর্ণধার এবং নানাস্তরের দাতাদের দ্বারে দ্বারে। লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা এটাকে অনৈতিকি ভাবতে পারে না। এমনকি যাদের সাথে নীতিগত মতবিরোধ রয়েছে তাদের বিজ্ঞাপন প্রকাশেও অনেক লিটল ম্যাগাজিন অকুন্ঠ। কিন্তু কথা হচ্ছে, এর মধ্যে কি লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদের নৈতিকতায় কিছু ঊনিশ বিশ হচ্ছে না ? হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতি নাচার। আবার এমনও লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক দেখা গেছে যে, অজস্র বিজ্ঞাপন যোগাড় করে পত্রিকা প্রকাশ করতে গিয়ে এটাকেই একটা ভালো হিসাবে দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন। আর তার ফলে পত্রিকার গুণগত মান যে কমেছে বা কমে যাচ্ছে তা কিন্তু বলার অপেক্ষা রাখে না। এসব বিষয় ভেবে লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদের অর্থ যোগাড়ের বিকল্প পথ বের করার প্রয়োজন নেই কি ? সংগ্রামের রাস্তায় যখন হাঁটতে এসেছি, আপসের মালা কেন গলায় পরবো বলুন?

এসব বাহ্যিক সমস্যার সমাধান করতে পারলেও মূলগত কিছু সমস্যা আমার মনে হয় লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের থেকেই যায়। তা হচ্ছে লেখা যোগাড়। কেমন লেখা, কার লেখা এবং কিভাবে লেখা-এইসব পত্রিকায় ছাপানো হবে। যেহেতু নতুন ভাবনা নতুন দর্শন খোঁজার প্রশ্ন রয়েছে, এক এক পত্রিকা এক এক মতের লেখা ছাপবে। এর জন্য এত লেখা কোথা থেকে আসবে? আর নির্দেশমত লেখা দিতে হলে লেখকের স্বতঃস্ফূর্ততার প্রশ্ন এসে মাথাচাড়া দেবে না কি? এই জন্যই দেখা যাচ্ছে, কিছু লেখকের দার্শনিক সাদৃশ্যের নূন্যতম ঐক্যের উপর গড়ে ওঠে বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং তার মুখপত্র হয়ে দেখা দেয় এক একটি লিটল ম্যাগাজিন। কিন্তু এর ব্যাপ্তি? ক’জন পাঠকের কাছে পৌঁছায় এক একটা লিটল ম্যাগাজিন? এতে সীমিত পাঠকের জন্য লিখে কতটুকু সন্তুষ্ট থাকা যায়? কিভাবে বাড়ানো যায় এর পাঠক সংখ্যা? এসব নানা সমস্যার কারণেই আমরা দেখতে পাই অনেক লেখকই লিটল ম্যাগাজিনের চত্বরে লিটল থাকার যন্ত্রণা এড়াতে না পেরে সড়ে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর পরিসরে। কিন্তু সেখানেও কি তাদের স্বস্তি আছে? থাকছে তাদের মনোজগতের নিষ্কলুষতা? এসব প্রশ্নের উত্তর আজ খোঁজার প্রয়োজন রয়েছে। এবং প্রয়োজন হলে, নানা মতের লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদের এক সূত্রে গাঁথা এবং সম্মেলনের মাধ্যমে সার্বিক সমস্যার বস্তুনিষ্ঠ সমাধানের চেষ্টাও করা যেতে পারে।
লিটল ম্যাগাজিনের সুন্দর নিষ্কন্টক অগ্রযাত্রাই আমাদের কাম্য। এর বিকাশ হোক নিরন্তর ও নিস্কলুষ। নিরাপস চরিত্র টিকিয়ে রেখে শিল্প সাহিত্য দর্শনের নতুন সম্ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এবং মানুষের মনোজগতে বোধের রাজ্যে প্রগতির আলোক ছড়ানোর এখনো পর্যন্ত অগ্রণী মাধ্যম এই লিটল ম্যাগাজিন যেন সুস্থ সবল থাকে তার চেষ্ঠা চলুক বিশ্বজুড়ে।

(প্রথম প্রকাশঃ নিসর্গ, ১৯৯৭। সম্পাদকঃ সরকার আশরাফ)

 


জিললুর রহমান

জিললুর রহমান

জিললুর রহমান। চট্টগ্রামে জন্ম, নিবাস, কর্ম। পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষক। আশির দশকের শেষ দিকে থেকে লিখালিখি। লিটল ম্যাগাজিন ‘লিরিক’ এর সম্পাদনা পরিষদ সদস্য। উত্তর আধুনিক কাব্য চর্চার পথিকৃৎদের একজন। মূলত লিরিক, নিসর্গ সহ বিভিন্ন ছোট কাগজে লিখে আসছেন দীর্ঘদিন। গ্রন্থ সংখ্যা-৫ঃ- অন্য মন্ত্র (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৯৫), উত্তর আধুনিকতাঃ এ সবুজ করুণ ডাঙায় (প্রবন্ধ সংকলন, ২০০৩), শাদা অন্ধকার (কাব্যগ্রন্থ, ২০১০), অমৃত কথা (প্রবন্ধ সংকলন, ২০১০), আধুনিকোত্তরবাদের নন্দনতত্ত্বঃ কয়েকটি অনুবাদ (২০১০)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E