৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
আগ ০৫২০১৭
 
 ০৫/০৮/২০১৭  Posted by

ইবরাহিমের মোকাম ও কুরবানির কবিতা সমাচার
– জিললুর রহমান

প্রিয় কবি খালেদ হামিদীর সাথে দীর্ঘদিন সবুজ আড্ডায় আমরা একটা সময় কাটিয়েছি। আমার খুব আনন্দ লেগেছে যখন তিনি আমার বিস্মৃতপ্রায় কবিতার দুটো শব্দমনে রেখে তার সৃজনচিন্তা জানতে চেয়েছেন। সত্যিই এটা আমার নিজের ভাল লাগাকবিতার একটি। কবিতাটি লিখেছিলাম ১৯৮৯ সালে। সে সময়ে আমার খুব কাছের কেউ একজনের কোনো এক গাঢ় বেদনা আমার মনে হয়েছিলো যেন তার বুকে পাথর সদৃশ হয়ে জমে আছে, আটকে আছে, মাঝ পথে। তার হতবিহবল চেহারাকে চিত্রিত করার একটা প্রয়াস ছিলো এই কবিতা।

কবিতাটি প্রথম ছাপা হয় আমাদের উভয়েরই প্রিয় বন্ধু কবি আহমেদ রায়হান এর হৃদপিণ্ড নামের ছোট কাগজে। যমুনার সাথে তখনও আমার দেখা হয়নি, তাই কবিতায় বাস্তবিকভাবেই যমুনা আসার কথা নয়। আমার প্রাথমিক লেখাতেও যমুনা ছিলো না। ছিলো “কর্ণফুলীর ঘোলা জলে”। কিন্তু পরবর্তীতে কবিতার স্বতঃস্ফূর্ততার স্বার্থে “কর্ণফুলীর” স্থলে যমুনার” শব্দটি প্রতিস্থাপিত হয়। এক্ষেত্রে বিশেষত হৃদপিণ্ড সম্পাদক আহমেদ রায়হান এর অনুচ্চ প্রশ্রয়ও ছিলো। তখন বয়স মাত্র ২৩ বছর, আড্ডায় কতো আলোচনা হতো কবিতার ভাংচুর ইত্যাদি নিয়ে, বিভিন্নজন ভিন্ন ভিন্ন কথা বলতেন, কিছু মেনে নিতাম পছন্দ হলে, কিছু হাওয়ায় উড়িয়ে দিতাম দৃঢ়তার সাথে। সেভাবেই আমারপ্রিয় কর্ণফুলীর স্থান দখল করে নেয় যমুনা। তবে, যমুনা হওয়াতে লেখার ক্যানভাস আরো বড় হয়ে যায় বোধ করি। যমুনা তো কেবল এই ভাটি বাংলার দূঃখের পাথরই ধারণকরে না, সেখানে তো জমা আছে শতবর্ষ পুরনো মুঘল দুঃখেরও দীর্ঘশ্বাস। যাই হোকনদী, তার প্রবহমানতা, তার বুকে গজিয়ে ওঠা চর, পাথর সব একাকার, সে কর্ণফুলীকী যমুনা বা পদ্মা, নামেই বা কী আসে যায়!

আমি বলতে চেয়েছি, দুঃখের এই পাথর এতো বিশাল আকৃতির যে, তা মাঝগাঙ্গে দ্বীপেরমতো ভাসমান। তার সাথে মনে পড়ে গেলো, মক্কীয় মিথের পাথর ‘ইবরাহিমের মোকাম’ বা মোকামে ইব্রাহিম, যার গায়ে কাবার স্থপতি ইব্রাহিমের পদচ্ছাপ লেগে আছে।এ কী কোনো বেদনার মতো!

ইব্রাহিমের মোকাম এসেছে ভাসমান পাথর হিসেবে। বেদনার পাথরও বুকের মাঝখানে চাপা ভাসমান।তখন সেরকমই তো ভেবেছিলাম মনে হয়। দীর্ঘ কাল যে পাথর ধারণ করেছে ইব্রাহিমকে। উঠেছে নেমেছে। ভেসে আছে। ইব্রাহিম এই পাথরে দাঁড়িয়েই মারা যান। নিজেই যেন পাথরে রূপ লাভ করেন। এসবের ভেতরে কি কেবলি ইতিহাস? কোনো বেদনা কিসুপ্ত নেই? তবে আমি কখনোই এই জলহাওয়ার বাস্তবতার বাইরে তো লিখিনি।

এরপরের অংশে তাই একজন উদভ্রান্ত এলোকেশির বেদনার্ত রূপ ফুটে ওঠা চেষ্টা দেখা যায়, যার প্রিয়জন নিকটে নেই। জলের মায়াবী আরশিতে হয়তো আরো বহুরঙ এর দুঃখের ছায়া কাঁপে। আর নদীতে ভাসমান এই পাথর দুঃখের প্রতীক কুমারীর বুকে গিয়ে ঠেকেছে। এরপরের দৃশ্যে মাঝি রূপকায়িত হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কুবের মাঝির সাথে, যে কিনা মাছের বদলে কেবল যন্ত্রণার পাথরই তুলে আনে তার জালে। “মাছের নিশানানেই / পাথর পাথরি শুধু উঠে আসে হাভাতের জালে”। জালেযে যন্ত্রণার পাথর উঠে আসে, আমারা সে পাথরেরও যত্ন নিই। কেউ হয়তো বা বেদনাবিলাস ভাবে, কিন্তু এই ভাটি বাংলায় এই বেদনার লালনই তো আমাদের জীবন। তাই, “দুঃখী ও সন্তাপী এ পাথর বুকে ধরে”। নবী মুহাম্মদ এর দুধ-মা, যে মমতায় শিশুপুত্রের যত্ন নেন, আমাদের এইসব নারীরাও এই পাথর সদৃশ বেদনাকে আগলে রাখে, লালন করে। কিন্তু হায়, “এ পাথরে সুখনেই, এ পাথরে শোক আরও বাড়ে”।

প্রায় ২৭ বছর পরে একটা কবিতা লেখার শানে নযুল ও ব্যাখ্যা করা কিছুটা কঠিন বৈকি! হয়তো, সে সময়ের চিন্তার সাথে মিশ খেয়ে গেছে এত বছরের অর্জিত অভিজ্ঞতাও।তবে, কথা হলো, কি আসে যায়, লেখার সময়ের চিন্তা ভুলে গেলে। কবিতা তো প্রতিপাঠকের কাছেই নতুন নতুন রূপে ধরা দেয়। তাঁর কাছেও হয়তো অন্য কোনো অর্থনিয়ে এই সন্তাপী পাথর বেদনা জাগাবে।

যাই হোক, পরে এই কবিতাটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত উত্তরাধিকার-এ ছাপা হয়। তখন রশীদ হায়দার উত্তরাধিকার দেখার দায়িত্বে ছিলেন। মনে আছে, উত্তরাধিকার-এর কপি আনতে যখন যাই, রশীদ হায়দার ও আসাদ চৌধুরী আমাকে লেখার খুব প্রশংসা করেছিলেন। সরকার আমিন-এর সাথেও সেখানেই প্রথম আলাপ।

এবার এক ভিন্ন অথচ মজার কথা মনে পড়লো। ৮৯ কী ৯০ সালে, তখনো এরশাদশাহী চলছে, চট্টগ্রাম বেতার থেকে কবিতা পড়ার আমন্ত্রণ পাই। গিয়ে শুনি, কুরবানি বিষয়ে কবিতা পড়তে হবে। আমার পূর্বজ ২/১ জন কবিকে সেখানে বসে বসে কবিতা বানাতে দেখলাম। আমি বললাম, আমার তো কুরবানি নিয়ে কবিতা নেই, আর লিখতেও পারব না। দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার ভদ্রলোক ভর্ৎসনা করে বললেন, তিনি চাইলেই এখনই এক-বসায় অনেক কবিতা লিখতে পারেন। আমি তাঁকেই লিখে ফেলার অনুরোধ করে, ফিরে আসতে প্রবৃত্ত হই। তখন তিনি আমার নিয়ে আসা কবিতাগুলো দেখতে চাইলেন। আর তারমধ্যে এই কবিতাও ছিলো। তিনি “ইবরাহিমের মোকাম’ দেখে তো লাফিয়ে উঠলেন। “বলেন কি? এতো সুন্দর কুরবানির কবিতা!!! ইবরাহিম আছে মোকাম আছে!! আর আপনি কিনা বলেন কবিতা নাই!” আমি এই কবিতাই পাঠ করলাম বেতারের জন্য। হাহাহা। কুরবানির কবিতা, বেদনার তো বটেই!

সন্তাপীপাথর

যমুনার ঘোলা জলে থেমে আছে এ কোন পাথর!
চরে বা কিনারে নয়
দ্বীপের অস্তিত্বে মাঝগাঙ্গে ভাসমান
ইব্রাহিমের মোকাম।
বুকে এসে বাজে
এলোকেশী দাঁড়ালে দাওয়ায়,
কালো চুলে তেলের অভাব আর চোখে কী যেন কীসের অন্বেষণ,
প্রিয়জন অনিকট হয়তোবা
আরও দুঃখ জলের আরশিতে কাঁপে,
নদীর পাথর এসে তীরে নয়
কুমারীর বুকে গিয়ে ঠেকে।
দরিয়ায় মাছ ধরা মানিকের সে কোন কুবের
বারবার জাল ফেলে
মাছের নিশানা নেই
পাথর পাথরই শুধু উঠে আসে হাভাতের জালে।

পাথরের বীণা বাজে ভাদ্রের বৃষ্টিতে,
নদীর সম্ভ্রান্ত ঢেউ
হালিমার স্নেহতায় পাথরের যত্ন নেয়,
দুঃখী ও সন্তাপী এ পাথর বুকে ধরে,
এ পাথরে সুখ নেই, এ পাথরে শোক আরও বাড়ে।

 


জিললুর রহমান

জিললুর রহমান

জিললুর রহমান। চট্টগ্রামে জন্ম, নিবাস, কর্ম। পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষক। আশির দশকের শেষ দিকে থেকে লিখালিখি। লিটল ম্যাগাজিন ‘লিরিক’ এর সম্পাদনা পরিষদ সদস্য। উত্তর আধুনিক কাব্য চর্চার পথিকৃৎদের একজন। মূলত লিরিক, নিসর্গ সহ বিভিন্ন ছোট কাগজে লিখে আসছেন দীর্ঘদিন। গ্রন্থ সংখ্যা-৫ঃ- অন্য মন্ত্র (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৯৫), উত্তর আধুনিকতাঃ এ সবুজ করুণ ডাঙায় (প্রবন্ধ সংকলন, ২০০৩), শাদা অন্ধকার (কাব্যগ্রন্থ, ২০১০), অমৃত কথা (প্রবন্ধ সংকলন, ২০১০), আধুনিকোত্তরবাদের নন্দনতত্ত্বঃ কয়েকটি অনুবাদ (২০১০)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E