৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ৩০২০১৭
 
 ৩০/০৭/২০১৭  Posted by
জিরো বাউন্ডারি কনসেপ্ট (Zero Boundary Concept)

জিরো বাউন্ডারি কনসেপ্ট (Zero Boundary Concept)

কবিতা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে time (সমসাময়িক এবং অনাগত) এবং force apply হল factor. বর্তমান সময়কে কেন্দ্রীয় ভাবে রেখে শব্দের সাথে শব্দের বন্ধন বা involvement এমন হবে যা মুক্ত ভাবে কেবল আগত এবং অনাগত ভাবনাকে সামনে রাখবে এবং শব্দ গাঁথার ক্ষেত্রে কবি কতটা force apply করছেন তা নির্ভর করেই গড়ে উঠবে একটি কবিতা কতটা উত্তীর্ণ হল। ফলে পুরনো সময়ের বা খুব কাঁচা লেখাকে পরিসীমার মধ্যে রাখবে না এবং নিশ্চিত ভাবেই অনুভব ও দৃষ্টিতে ধরা পড়বে কবিতাটি হয়ে উঠল কিনা। ফলে লেখার ক্ষেত্রে advancement-এর tendency-কেই মান্যতা দেওয়া হবে। Force apply-এর ক্ষেত্রে কবির অভিজ্ঞতা, প্রতিভা, চিন্তার তীব্রতা এবং মেলবন্ধন যুক্তিগ্রাহ্য হিসেবে বিবেচিত থাকবে; তাই, কাঁচা লেখা eliminate হতে থাকবে automatic process-এ; এবং উত্তীর্ণ লেখা প্রাধান্য পাবে time force frequency ধরে। লেখা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কাব্যধর্মীতা একটি অবশ্য factor যার মধ্যে থাকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কবিতা ভাবনার observation. শব্দের বাঁধন কবিকে রপ্ত করতেই হবে যা detect করতে পারে সমসাময়িক ও ভবিষ্যৎ মুখী আভ্যন্তরীণ process বা ব্যবস্থা।

এই নিরিখে ফিরে আসা যাক কবিতার কাছে যেখানে দেখাতে পারা যাবে কীভাবে জিরো বাউন্ডারি চিহ্নের কবিতা পরিসরকে অতিক্রম করতে চাইছে আগত এক মুক্তির সন্ধানে।

এক্কেবারে শুরুর থেকে শুরু করা হল। একটি উদাহরণ যদি দেওয়া যায়-

“বেহাল মনটা ছিঁড়ে খুঁড়ে
দুনিয়া মাঝে জ্বলে পুড়ে
আসতে যখন আমার ঘরে
আমার প্রেমের শীতল পানি
দিতাম তোমায় উজাড় করে”

প্রথম দুটো লাইন পড়লেই বোঝা যাবে এই যুবক নতুন লিখতে এসেছেন কিংবা লেখা এখনো রপ্ত করে উঠতে পারেনি। কারণ শব্দ প্রয়োগের ঘাত এবং মাত্রা কবিতাটিকে ছাড়পত্র দিতে পারেনি। সময় বা অনাগত সময়ের ইঙ্গিতবাহী এবং কবিতা পরিশীলিত হওয়ার ক্ষেত্রে। practice অনুশীলন এই শব্দগুলো একটি কবিতার হয়ে ওঠার সাথে যুক্ত থাকে তা নিশ্চিত।

আর একটি কবিতা-

“নক্ষত্রহীন ফাগুনের রাত
রাত বিন্দু বিন্দু কুয়াশা আমার শহরের বুকে
একটা গুলির শব্দ
হতাশা নেমে এলো দূর থেকে
স্রোতের মতো ”
– পাপাই সেন

কবিতাটির মধ্যে কোথাও কবিতা না হয়ে ওঠার ইঙ্গিত নেই; শব্দ থেকে আর একটি শব্দে চলে যাওয়ার সময়, কিছু চিত্রকল্প ও জমাটি বুনন সেভাবেই বিস্তার রাখছে যেন কবিতাটি সময়কে ধরেছে। কিন্তু এই ভাষা নিশ্চয় অনাগত সময়ের ভাষা হবে না; নিশ্চিত ভাবেই এর ব্যবহার এবং সামগ্রিক reflection আমরা আগে দেখেছি, বহু ক্ষেত্রেই। তাই কবিতাটি হয়ে উঠেছে বর্তমান সময়ের অংশ হিসেবে।

অনাগত কাব্যময় নতুন ভুবনকে স্বাগত জানানোই কাজ। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি না, কীভাবে সেই নতুনত্ব জেগে উঠতে পারে। দুই শব্দের বিপরীতমুখী ব্যবহার, কোনো বিরাট পরিসরের অভিব্যক্তি খুব কম, দু-একটি কথায় প্রকাশ, কিন্তু সেই অর্থে রূপক নয়, শব্দের মধ্যে মোচড় সৃষ্টি করা এবং একই ধরনের কবিতা বা কবিতার জেরক্স কপি হয়ে না যাওয়ার বিরুদ্ধে এবং কবিতার নতুন অঞ্চল সৃষ্টি করা – – এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের কবিতার গতি-প্রকৃতি।

মহাদেব নাথ নতুন প্রজেন্মর কবি, এক্কেবারে নতুন লিখতে আসা। তাঁর কবিতার মধ্যে পাওয়া যায় অদ্ভুত কাব্যময়তার সাথে নতুনত্বের স্বাদ।

“এখনো বাতাস বইছে
তুমিও ঝড় লিখলে
আমার জলের ভিতর ফড়িং
তুষ নিয়ে তুমি তুষার
আসলে এগুলো একমাত্র
পাওয়া যাবে বিকলাঙ্গ দুপুরে”

একটা শব্দ থেকে অন্য শব্দে যাওয়ার সময়, কিছু বাঁক, কিছু hurdles অতিক্রম করতে হচ্ছে এবং খুব সামান্য কিছুর অনুভব, পূর্বপরিকল্পিতবিহীন এবং বিপরীত গুণের দুটি শব্দ বসে কবিতাকে করে তুলছে আগামী দিনের কবিতা ভাবনার সংকেত। বাস্তবের বাইরে নিজেকে মেলে ধরার মধ্যে প্রতিটা আনন্দই শব্দের ঘনত্ব বাড়িয়ে তোলে। হয়ে ওঠে উত্তীর্ণ কবিতার নমুনা। অর্থময়তার নির্দিষ্ট কেন্দ্র বিন্দু বা অভিমুখ বা নির্দেশ থাকে না, তা হয়ে ওঠে অর্থ বা নির্দেশ ছড়িয়ে দেবার প্রবণতা যা উত্তর আধুনিকৈর অর্থ থাকবে না; -এই ধারণাকে নস্যাৎ করছে। অর্থ মানে কিছু নির্দেশ বা চিহ্নিতকরণ।

আর একটি কবিতা-

“ভরা যৌবন দাগা দিলে প্রযোজন পড়ে
কিছু অনুচক্রিকা
ঝড় তুলে মার্সিডিজ অবশেষে পড়ে থাকে
পাঁজর আর আঁশটে গন্ধ
ক্যালাইড্যাসকোপিক প্রেম খোঁজে
ওয়ার্মহোলের গর্ত”
– প্রদীপ কুমার ঘোষ

যা অনেকটা দূরের কাব্যকে ধরতে চায়, যেখানে শব্দের কচকচানি হটিয়ে অতিক্রম করে গেছে, নতুন শব্দ স্বাভাবিক ভাবেই ঢুকে গেছে কবিতায় এবং কবিতার সাথে আত্তীকরণ হয়েছে – এমনই অনুঘটক সমন্বিত একটি কবিতা। এরা সবই নতুন প্রজেন্মর লিখতে আসা যুবক।বর্তমান সময়কে ধরে ভবিষ্যত্ ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই কবিতা হয়ে ওটা দেখতে হবে। এই সময়ে কোনো কবিতা হয়ে উঠল কিনা তার মাপকাঠি ১০-২০ বছর পিছিয়ে গিয়ে কবিতার ভাষা নয়।প্রদীপের কবিতা যেন তারই ইঙ্গিত স্পষ্ট।

আর এক তরুণ কবি দীপ রায়-এর একটি কবিতা-

“ছেঁড়া চপ্পল থেকে ব্রান্ডেড স্নিকার্স
খালি পা অথবা ফ্ল্যাট হিল
কাঁটা ঝোঁপ পেরিয়ে, প্রিয় ফুল বাঁচিয়ে
প্রতিটা পারাপারই কয়েকটি বিস্তীর্ণ হার্ডেলসের
মুখোমুখি একটি ভিন্ন ম্যারাথন
যা থেকে গেছে লাগলেও আসলে থামে না”

এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করার মতো কবিতা, কোথাও থামার নেই, সম্পূর্ণ কবিতাটিই হল একটি লাইন। কবিতাটি এক্কেবারে liberal thinking এর উপর লেখা, কিন্তু shift হয়েছে, শব্দের দৈনদশাকে ভেঙে চুরমার করেছে, শব্দে গতিবেগ দিয়েছৈ। এবং কবিতাটি সময় ব্যারিকেড সরিয়ে উত্তীর্ণ এক অনাগত বস্তুকে ডাকছে। কাব্যময়তার কোথাও খামতি নেই। হৃদয়ে মর্মরধ্বণি তোলে বিস্তীর্ণ হার্ডেলসের মুখোমুখি একটি ভিন্ন ম্যারাথন যা থেমে গেছে লাগলেও আসলে থামে না। এই না থেমে যাওয়ার মধ্যে লুকিয়ে থাকে কবিতার প্রবলভাবে হয়ে ওটা যা আগামীর চিহ্ন বহন করা। জিরো বাউন্ডারির ক্ষেত্রে খুব কাঁচা লেখা স্বাভাবিক নিয়মেই বাতিল হয়ে যাবে কারণ জিরো বাউন্ডারি শব্দের পরিসর ভেঙে, বিভিন্ন অভিমুখে গড়িয়ে যায়, শব্দের অন্তর্গত force বার করে আনে যেন খোসা ছাড়িয়ে শব্দ হয়ে ওঠে, পাঠককে বিদ্ধ করবে অভিনব নির্দেশ।
দীপ রায়ের কবিতা পড়ে এ সব কিছু পাওয়া যাবে যা খুব স্পষ্ট নির্দেশ দিতে পারে কবিতা হয়ে ওঠার ব্যঞ্জনা।
এই প্রজন্মের আর এক কবি জ্যোতির্ময় মুখার্জি’র একটি কবিতার অংশ :

“চোরাবালি, আস্টেপিষ্ঠৈ জড়িয়ে আছে শরীর
উপত্যকার ঢাল বেয়ে গড়িয়ে গেলে চাঁদ বাথটাবের গলন্ত শরীরে নুন
খুঁজতে আসে সমুদ্রে,
উষ্ণতায় পারদ আর ডিক্রি খোঁজে না চুম্বন নয়, চুম্বনের ইচ্ছাতেই ওম হয়ে থাকি আমি
খাছিমের ডিমে ভেজা বালিয়াড়িতে গন্ধ শোঁকে শরীরী ক্যালকুলাস
রিংটোনে কেউ ডাকে
আয় আয় চলে আয়
আয় হামারি গেহ
উড়ে যায় যায় যায়
মন পাখি মথুরায়”

কবিতার একটি শরীরে একই সঙ্গে গদ্য ভাব এবং একই সঙ্গে ছন্দের বিভাব। এরকম কবিতাকে এতদিন প্রায় অচ্ছুত করে রাখা হয়েছিল বিভিন্ন ফাঁদের দোহাই দিয়ে। জিরো বাউন্ডারি এই বিভেদ ভেঙেছে এবং ঘোষণা করতে চায় কবিতাটি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোনো ছুৎমার্গ নেই। এক শব্দ থেকে আর এক শব্দের যে বাঁধন, সেই বাঁধনের মধ্যে তারতম্যের ভিত্তিতে কবিতার পার্থক্য গড়ে ওঠে। একটি কবিতায় যদি শব্দগুলোকে নাড়াচাড়া করে দেখা যায় তাহলে বোঝা যাবে শব্দের বিনুনি বা বুনন বা গাঁথার মধ্যে কতটা পারদর্শিতা বা নিপুণতা জড়িয়ে থাকে। এই নিপুণতার জন্য একটি কবিতাকে ফেললে বোঝা যায় কবিতাটি কতটা এবং কত মাত্রায় উত্তীর্ণ। “উপত্যকার ঢাল বেয়ে গড়িয়ে গেলে ছাঁদ, বাথটাবের গলন্ত শরীরে নুন খুঁজতে আসে সমুদ্র” – এই লাইনটার মধ্যে জ্যোতির্ময় সেরকম মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন এবং শব্দকে কবিতার বহির্ভূত মুক্ত বিভঙ্গে distortion করে দিয়েছে। কবিতার দেহের ভিতরে কাব্য মিশে থাকে তা একজন প্রকৃত কবি অথবা রস আস্বাদনকারী পাঠক ঠিক বুঝে নেয়। কবিতার মধ্যের ছন্দের প্যাটার্ন কখন পরিবর্তন হয়ে কবিতাটি নিঃশব্দে শেষ হয়েছে, বিরূপতা সৃষ্টি না করে, তাও বেশ মুন্সিয়ানার। একে বলা হয় assimilation of two different rhythms. জিরো বাউন্ডারি কবিতা, কবিতা হয়ে ওঠার ছাড়পত্রের ক্ষেত্রে একটি শব্দের চারপাশে ঘিরে থাকা মুক্তভাব ও রসায়নের সঠিক ব্যবহার দেখতে চায়। বেঁধে রাখতে চায় না, খুব হালকা, অপটু শব্দ-ব্যবহার গ্রহণ করবে না।

কবি অনিন্দ্য রায় পরীক্ষা নিরীক্ষার এক মুখ। তাঁর কবিতা :

“ব্যঙ্গমা জেগেছে আর শরীরে বিদ্যুত্
জ্বালা সহজিয়া হয়ে হাওয়ার ব্লুটুথ
জোর লাগে, ঘোর লাগে, নিদ্রায় কেটে যায়
নাও ডুবে স্বর্গে ওঠে কালো যমুনায়”

“দন্তের বোতাম ঠুকি, খোলে মহাকাশ
আঁধারে ছেটাচ্ছে থুতু, নক্ষত্রের লাশ
জ্বলে ওঠে, চমত্কার, মাথা ঘোরে
ধরি
তোমার ওষ্ঠের দাগে পরাগ মঞ্জরী”

সমস্ত কবিতায় শব্দ crystal form এ থাকে না, সেই crystal form এ রাখতে গেলে কবির চিন্তার তীব্র সুক্ষতা প্রযোজন। অনিন্দ্য রায়ের ভাবনার মধ্যে মুক্ত চিন্তার স্বয়ম্বর থাকে ।
“দন্তের বোতাম ঠুকি, খোলে মহাকাশ / আঁধারে ছেটাচ্ছে থুতু, নক্ষত্রের লাশ ” – এই কবিতাটি লেখার অনেক পরে জিরো বাউন্ডারি কনসেপ্ট এসেছে ; কিন্তু কবি এবং কবিরা বহু পূর্বে এ সব চিন্তন গেঁথে গেছেন। এটিই তো এগিয়ে থাকার কবিতা। যে কবিতা সময়ের expansion restore করতে করতে চলে তাকেই জিরো বাউন্ডারি হয়ে ওঠার ছাড়পত্র দেয়। এই কবিতা দুটিতে ছন্দের নতুনত্রের ছোঁয়া ও শৈলী আর একধাপ এগিয়ে রেখেছে এবং অনেকটা বড়ো spectrum এবং দৃশ্যপট খুব কম শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ, যাকে বলা হতে পারে tablet form কবিতা। ছোট্ট একটু tablet এর মধ্যে যেভাবে medicine এর ক্ষমতার বিন্দু লুকিয়ে থাকে তা এক্কেবারে শক্তির রূপান্তর ধারণার মতো। এই শৈলী জিরো বাউন্ডারির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
ভাষা তার কাঠামোগত পরিবর্তন যে কোনো সময় করতেই পারে, কোন আধারে একটি লেখা সমাপতিত হবে তা কবির একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও শব্দ – ব্যঞ্জনায় তার গতিপথ। কিন্তু কবি তাঁর চিন্তার extract কীভাবে সাজাবেন তা তাঁর নিজের, তবে জিরো বাউন্ডারি নির্দিষ্ট করে যে সামগ্রিক structure এ এলোমেলো ভাব নিহিত থাকলেও, তা কাব্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোথাও obstruction সৃষ্টি করে না।

নজর রাখি কুমারেশ তেওয়ারি’র একটি কবিতা :

“পোশাক বদল নিয়ে কত কবিতা লেখা হয়
কত খোলনলচে বদলে ফেলা সুর শোনানো হয়
সুরেলা বাঁশিতে, কোনো মনস্টির কাছে গিয়ে
ছেড়ে আসা হয় খসখস শব্দ ও পুরনো টোটেম

কত মুখোশের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে
মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে চুনাপাথরের বোল্ডারের কাছে

তবু আর্কাইভের সঙ্গে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে
আর্কিমিডিসের ইউরেকার
আর সুন্দরী কমলা নাচতে নাচতে ছড়িয়েই যায়
ডাউনলোড করে রাখা জ্যোৎস্নার রসায়ন

পোশাক পাল্টাতে পাল্টাতে একটি বেড়াল ও পাখি
শুধু ভাবতে থাকে এককোষী এমিবার ক্ষণপদ”
– সাঁতার

একটি কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল হয়ে ওঠা। কবিতাটিকে কাটাছেঁড়া করলে হয়ে ওঠার সাথে সাথে সহজতা ও free thoughts এর বিভিন্ন অভিমুখ আমরা দেখতে পাবো যেখানে কোনো কেন্দ্র বা প্রান্তিকতা নেই। কবিতা কিছু বলতে চায়, কিছু information দেওয়ার বদলে, কাব্যের ঘনত্ব সম্পর্কে নিঃসন্দিহান।কুমারেশ তেওয়ারিকে উত্তর আধুনিক মানচিত্রে দেখা হয়নি। কবিতায় আর্কিমিডিস, এমিবা, পোশাক বদল, জ্যোৎস্নার রসায়ন, বোল্ডার, চুনাপাথর ইত্যাদি শব্দ প্রযোগ দেখিয়েছে কবিতাটিতে কেন্দ্রিকতা বা প্রান্তিকতা নেই, যা আছে তা হল মুক্ততা এবং মুগ্ধতা। মুগ্ধতা হল জিরো বাউন্ডারির আর আর একটি অন্যতম চিহ্ন। যে কবিতা তার বাক্য ও শব্দ বিন্যাসে এবং ভাবে পাঠক বা কবিকে মুগ্ধ করে রাখে সেই কবিতাকে জিরো বাউন্ডারি appreciate করে কারণ কবিতার মধ্যে নির্জনতম মুগ্ধতা লুকিয়ে থাকে, এতদিন যা কেন্দ্রিকতা এবং প্রান্তিকতা নিয়ে আবদ্ধ থাকত, এখন তা free thoughts বা মুক্ত চিন্তায় উন্মুক্ত হয়েছে। কবির হৃদয় হাঁসফাঁস মুক্ত, উন্মুক্ত হওয়ায় প্রাণের আরাম। জিরো বাউন্ডারি কবিকে কষ্ট দিতে চায় না, তিনি মনের আনন্দে সৃষ্টি করুন।
কবিতাটির নাম সাঁতার” – কিন্তু কবিতা-র কোথাও সাঁতার শব্দ নেই – যা দিশা দিচ্ছে মুক্ত হবার অভিপ্রায়, কবিতার সাথে কবিতার নামের।

তরুণ কবি সুকান্ত ঘোষাল এর একটি কবিতা : নাম “ভদ্রলোক”

“বৃষ্টির নীচের দিকেই ঝরছে
যেন সুখের উপর নড়ে বেড়ানো পোকা
ঘনিষ্ঠ ভেবেছি তবু পুরনোটি
গভীর
বিনিময়ে সহজ কিছুটা
সোজাসুজি সহজ হয়েছো

টেনে ধরলে দুপুর অবধি খোলা
জিভে ঠেকিয়ে উঁচুভাগ গলে যাচ্ছে
চড়ুই পাখি এখান থেকে ওড়ে
যখন মুখের ভিতর বাতাস ভরে
ভদ্রলোক ফোলায়”

কবিতাটিকে ভালোভাবে লক্ষ্র করলে দেখা যাবে একটি বিশেষ লক্ষণ তা হল বাক্যের এবং ভাবের অসমাপ্ততা। কোনো কোনো বাক্য অসমাপ্ত থেকে এবং শব্দের সাথে শব্দের যোগ এমনভাবে আসছে যা দেখলে মনে হবে নির্দিষ্ট অভিমুখ নাই এবং ভাবের বা ইঙ্গিতের কোথায় সম্পূর্ণতা নেই। এটি ঠিক কোলাজ নয়, বরং অসমাপ্ত ভাব ও ভাবনার মিশ্রণ। খুব ভালো ভাবে মিশে আছে কবিতার মধ্যে। এই কবিতাটি জিরো বাউন্ডারির একটি বিশেষ দিকের উদাহরণ। “টেনে ধরলে দুপুর অবধি খোলা” – এ এক অদ্ভুত লাইন। কিছু একটা টানতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে দুপুর অবধি খোলা। ভাবের কোলাজ সৃষ্টি। সাধারণত কোনো কিছু টেনে খোলা মানে ভিতরের পরিসর উন্মুক্ত হওয়া কিন্তু এখানে টানার পর দেখা গেল – দুপুর পর্যন্ত খোলা। ঠিক কী নির্দেশ করছে তা স্পষ্ট নয়, অর্থাৎ উন্মুক্ত। উপরন্তু কবিতাটিতে কোথাও কাব্যময়তার এতটুকু ঘাটতি দেখা যায়নি। অসমাপ্ত ভাব ও ভাবনার কোলাজ সৃষ্টির একটি অপূর্ব নিদর্শন এই কবিতাটি।

ফিরে আসি বাংলাদেশের কবি অরবিন্দ চক্রবতী’র কবিতায়।

“শরীর থেকে চিকিত্সা পৃথক হবার পর
সাত রামদার কোপ নিয়ে একজন দুর্ধর্ষ সার্কাস পায়ে দৌড়াচ্ছে
উত্তর গোলার্ধ ছুঁড়ে দিচ্ছে চাঁদে
দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের মতো তাগড়া বর্ম নিয়ে
রসাতলবাসীদের উড়িয়ে নিচ্ছে পাতালে।

পিঁপড়ের পায়ে আহত হচ্ছে সুখ সম্পাদিত একদল স্পাই।

জেদি গোঁয়ার যুবকের বুক ও পিঠে অহেতুক ঝরে পড়ছে
রক্ত নয় বিষাদের তরল পূর্ণিমা

মিসেস অরবিন্দ হয়তো জানেন না, আমার বাবার মায়ের বিশ্বনাথ হাসি
মাটিতে তিনি এঁকে চলেছেন পানবুক ত্রিভুজ রঙের চারুকলা

আর আমি লালঝরা দিনে দেখছি, ঠাকুমা লেপে দিচ্ছেন আকাশ আকাশ আলকাতরা”

দেখে মনে হবে কবিতাটি উত্তর আধুনিকতার সাথে খুব ফারাক নাই। কিন্তু কবিতাটি যে range, দাপট, অভিব্যক্তিকে ধরেছে তা এক্কেবারে liberal thinking এর সাথে যুক্ত হয়েছে । ভাবের সহজতা, বোধের দিগন্ত ছোঁয়া এবং সময় থেকে অনেক এগিয়ে এবং অদ্ভুত হৃদয়মুখী ও কাব্যিক। কবিতা মস্তিষ্ক ও হৃদয় থেকে নির্গত হয়েও, মস্তিষ্কের উপর দিয়ে চলে গেলে কচকচানি ও জটিলতা নির্ভর হয়ে – তা জিরো বাউন্ডারির মধ্যে থাকবে না। এই কবিতাটিতে কবির ভাব ও ভাষা যে কোনো দিকে, যে কোনো space ধরতে চাইছে। একটি লাইন থেকে অন্য একটি লাইনে যখন shift হচ্ছে, যেন শব্দগুলো অত্যন্ত ঘনত্ব নিয়ে পরস্পরকে হস্তান্তর করছে না -ছোঁয়া উদ্যান এবং দাপট। “জেদি গোঁয়ার যুবকের বুক ও পিঠে অহেতুক ঝরে পড়ছে রক্ত নয় বিষাদের তরল পূর্ণিমা”।

একটা শব্দের সাথে আর একটা শব্দ যেভাবে বসানো হয়েছে যেন কোনো দামি কোম্পানির সিমেন্ট দিয়ে প্রচন্ড ঘনত্বের এবং টাইট বাঁধনের যা বাইরে থেকে দেখলে মনেই হবে না, যাকে বলা হয় শব্দের দাপট, কাব্যশব্দের দাপট এবং শেষে” বিষাদের তরল পূর্ণিমা” এই তিনটে শব্দ ওই লাইন এবং কবিতাটিকে এতটাই উন্মুক্ত করে দিয়েছে যে পাঠক এবং কবি- পাঠককে অসাধারণত্ব দেবে এই কারণে বিরাট একটা open space এবং শক্তি খুব ছোট form (tablet )-এ কবিতায় বিরাজমান। এরকম কবিতা না ছিল আধুনিকে, এবং খুব কমই উত্তর আধুনিকে এবং কবিতার বিবর্তনের এক উচ্চ ধাপে অবস্থান করেছে। উচ্চ ধাপ মানে আগের সমস্ত কবিতা তুলনায় খারাপ তা নয়, তা হল কথন বলন চলনে বিবর্তন। সময়ের নিরিখে কবিতার যে অতুলনীয় advancement – – এর প্রেক্ষিতে কবিতাটি জিরো বাউন্ডারির মধ্যে খুব উজ্জ্বল। এই কবিতার পরতে পরতে কাব্য এবং সেই open space থেকে গুটিয়ে এনে হঠাৎ-ই “মিসেস অরবিন্দ হয়তো জানেন না, আমার মায়ের বিশ্বনাথ হাসি / মাটিতে তিনি এঁকে চলেছেন পানবুক ত্রিভুজ রঙের চারুকলা” -এই বাক্যবন্ধে এক্কেবারে একটি জায়গায় specific করে রাখলেন, pin point করে দিলেন পানবুক ত্রিভুজ রঙের চারুকলায়। এই যাতায়াত হল জিরো বাউন্ডারির উন্মুক্ত ঘোরাফেরা, এক্কেবারে বিরাট এক space থেকে ফিরে এসে ছোট্ট একটি pin point এ ঘনীভূত হওয়া – – এই অবাধ এবং মুক্ত যাতায়াত – বাক্যের, বোধের, চিন্তা ও ছিন্তনের – – এটাই তো জিরো বাউন্ডারির মুক্ত ভাব যা আগে খুব কমই পরিলিক্ষত ছিল। ভাবনার এই তীব্র অথচ সুন্দর বিস্তার আগের কবিতায় দেখা যেত না যা এই নতুন সময়ের তরুণ কবিরা গাঁথছেন সেই জন্যই তো জিরো বাউন্ডারি যুগ এবং জিরো বাউন্ডারি কবিতা।
এখানে “আকাশ আকাশ আলকাতরা” – শব্দ তিনটি কতটা dimension এবং ঘাত, মাত্রা ধরতে পারে তা বোধের এবং মস্তিষ্কের এবং হৃদয়ের সমাপতনেই সম্ভব।

বাংলাদেশের আর এক কবি পরিতোষ হালদারের কবিতায় যেতে পারি :

“পতন পর্যন্ত প্রতিটি দাঁড়িকমাই প্রশ্নবোধক।
কোনো কোনো বিজ্ঞান তাই চাপকলের মতো একা,
সুযোগ পেলে ভাসিয়ে দেয় বসন্ত।
একবার রাত শব্দের সপক্ষে ফেটে যায়।
সেই কবে থেকে তুমি একা, সকল স্পন্দন তোমার অপেক্ষা করে।
তুমি ঘুম ও মৃত্যুর মতো আবির্ভূত হও।
আর তোমার তৃষ্ণায় অবগাহন করার প্রতিঈর্ষা দান খরো।
তবুও একদল মেষপালক কীসের আনন্দ নিয়ে ফুল চাষ করে,
জন্মদিন সাজায়
তারা জানে, মাংসের বাজার পড়ে গেলে দামি হয়ে ওঠে দোকানের রজনীগন্ধা”
– দাঁড়িকমা

এক্কেবারে নতুন ভাবে বাঁক নিয়েছেন পরিতোষ হালদার। কবির একটা দায় থাকে কবিতার কাছে উত্তরণের দায়। কোথাও ছেদ পড়েনি কাব্যময়তার। একটা open space এ যতটা খেলা যায়, ঠিক সেভাবেই শব্দ নিয়ে প্রমত্ত থেকেছেন।
“পতন পর্যন্ত প্রতিটি দাঁড়িকমাই প্রশ্নবোধক
কোনো কোনো বিজ্ঞান তাই চাপকলের মতো একা”

অদ্ভুত সমাবেশ শব্দ এবং তার ব্যবহারের। জিরো বাউন্ডারি শব্দ ব্যবহার ও প্রযোগে মুন্সিয়ানা প্রশ্রয় দেয় যাতে কবি মোচড় এনে বিস্ময়বোধ আঁকতে পারেন পাঠকের কাছে এবং কবিতায়। প্রথম দুটো লাইন অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার কাব্যভাষা এবং ভাবের ভিতর একপ্রকার শিরশির তৈরি করেন। অর্থ খোঁজার ব্যাপারে কবিতাটিতে কোথাও জবরদস্তি নেই; কবিতার অন্তরে অন্তরে যে ভাবের ব্যাপকতা সৃষ্টি হয়েছে, তা পাঠককে আনন্দ আছে উপভোগ করার পরিসর দিয়েছে। কবিতাটিতে “তৃষ্ণায় অবগাহন” – এই দুই শব্দ ভিন্ন version এ লেখা কবিতার বাকি অংশের সাথে দারুণ match করে গেছে। জিরো বাউন্ডারি শব্দ প্রযোগের ব্যাপারেও মুক্ত। কবি কোন শব্দ ব্যবহার করবেন তা একান্ত কবির ইচ্ছা; কিন্তু দেখা দরকার সেই শব্দ ব্যবহার যেন কোনো ভাবেই সমগ্র কবিতাকে গ্রাহ্য সময়ের চেয়ে পিছিয়ে না দেয়, কারণ জিরো বাউন্ডারি উন্মুক্ততার মধ্যে advancement এর মান্যতা দেয়। কবি শব্দকে যে দিকে ইচ্ছা প্রয়োগ করতে পারেন, কিন্তু শব্দের যে ব্যবহার অনেক আগে হয়ে গেছে তা মান্যতা নয়। কবি পরিতোষ হালদারের কবিতায় তা দেখতে পাই আগামী দিনের কবিতার সংকেত।

আর এক বাংলাদেশের কবি কামরুল ইসলাম, তাঁর “শ্রাবণের পদাবলি” কবিতায় যেতে পারি।

“কখনো মনও ডুবে যায় শ্রাবণের সমস্ত জলে
তখন তালগাছের মাথা বেয়ে নেমে আসে সন্ধ্যা
নির্জন আঁধারে ডুবে যায় পাঠশালা
আর
কাঁঠালপাতারা রাতভর পড়তে থাকে জলের নামতা
এ সময়ে কোনো কোনো ব্যাঙের জলকেলির দিকে
মুখস্থ ফুলেরা ফুটতেই পারে।”

হৃদয় সহজতা আবেগ মর্মস্পর্শীতা, শব্দের পেলব ভাব যা এতদিন আমরা অচ্ছুত বলে উড়িয়ে দিয়েছি, সেই অনুভবী কথন নিয়ে সুন্দর কবিতা হয় এবং তা জিরো বাউন্ডারি মান্যতা দেয়, কামরুল ইসলাম এর এই কবিতাটি সেই রূপবাহী। খুব সহজ সুন্দর কথার মধ্যে দিয়ে গাঁথা কবিতাতেও দর্শন লুকিয়ে থাকে। এখানে তালগাছ কাঁঠালপাতা শ্রাবণ সন্ধ্যা নির্জন আঁধারে জলের নামতা ব্যাঙ পাঠশালা – এই সব শব্দের নির্বাচন বাংলার রূপময় ঘরানার প্রতিচ্ছবি এবং শব্দগুলোর মধ্যে একপ্রকার nostalgia কাজ করে। এই nostalgia, বাংলার ঘরানা এইসব আপাত নিরীহ শব্দ দিয়ে যে ভালো কবিতা হয় এখানে দেখানো হয়েছে।
“এ সময়ে কোনো সোনা ব্যাঙের জলকেলির দিকে মুখস্থ ফুলেরা ফুটতেই পারে” – দারুণ ব্যঞ্জনা। শ্রাবণের ঝমঝম বৃষ্টির সাথে সোনা ব্যাঙের জলকেলির আওয়াজ – এ সব মিলিয়ে “মুখস্থ ফুলের” abstract form হৃদয়ের দিকে ধাওয়া করেছে যেন মাথায় অনেক অনেক ফুলের অনন্য গাথা মুখস্থ আছে, যেন সেই মুখস্থ ফুলেরা ফুটে উঠতে চায় স্মৃতির স্তূতি বেয়ে। এই ভাবে কামরুল ইসলাম হৃদয়ের কোমল ভুবনে ঝাঁকিয়ে দিয়েছেন, যা জিরো বাউন্ডারি মান্যতা দেয় – যে কবিতা হৃদয়ে টোকা দেয়, তৈরি করে অনুভব, আবেগ এবং মুগ্ধতা এবং তা নীরস খটখটে শব্দের পর শব্দ বসিয়ে কাব্যদৈনতার উন্মোচন করার বিরুদ্ধে। নীরস খটখটে কাব্যদৈনতাকে জিরো বাউন্ডারি মান্যতা ও প্রাধান্য দেয় না।

উপরের কবিতা সমন্বিত আলোচনা ও বিস্তার থেকে জিরো বাউন্ডারি কনসেপ্টে কবিতা হয়ে ওঠা সম্পর্কে প্রায় সম্পূর্ণ ধারণা নির্ধারিত হল। একজন কবির মধ্যে যে কবিত্ব শক্তি থাকে তার মাত্রা, frequency, density, power – এ সমস্ত কিছুর সমন্বয়ী বহিঃপ্রকাশ হল কবিতা। কবি তাঁর চিন্তাকে মুক্ত রাখবেন, কিন্তু আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে কাব্যিক maturity নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। এই কাব্যিক maturity কবিতাকে দূরে নিয়ে যায়, তার অন্তর্গত উত্তাপ, radiation হয়ে বেরিয়ে আসে, কবিতা স্থির বিন্দু থেকে উৎসারিত হয়, অনির্দিষ্টে ছড়ায়। তাই প্রভেদ খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কাঁচা লেখা, না হয়ে ওটা কবিতা, immature কবি যা উল্লেখ করে শব্দ- গঠন বা বন্ধনের সমস্ত উদ্যোগই কবিতা নয়, কবিতার দিকে মাঝামাঝি অবস্থান আমরা প্রায়ই ভুল করে বসি এই জায়গাটা। কবিতার দিকে যাওয়ার মাঝামাঝি অবস্থানকে প্রায় কবিতা বলে ধরে নিই, ফলে মূল scale cover up না করা লেখা কৈ কবিতা আখ্যায়িত করি। Domination of free power – এ ক্ষেত্রে কার্যকরী হয় না এবং আমরাও বুঝতে পারি না নির্মাণ কৌশলের কোন পর্যায়টি কবিতা। zero boundary-র অবস্থান খুব স্পষ্ট তা হল নির্মাণ কৌশলের মাঝামাঝি অবস্থান, বা তার নীচে, বা কবিতা হয়ে ওঠার মাঝামাঝি অবস্থান বা তার নীচে কবিতা হিসেবে বিবেচিত হবে না। পুরো scale cover করলেই তবে কবিতা। অর্থাৎ কাব্যকে মূল factor ধরে এগিয়ে যাওয়াই শ্রেয়। কবিতা শব্দের সহজ রূপ বা জটিলরূপ ধারণ করতেই পারে, চিত্রকল্প ব্যবহার করতে পারে, না ও পারে, এ সব অনির্ভরশীল। কবিতার ক্ষেত্রে শব্দের ব্যবহার ও প্রযোগ (নির্দিষ্ট বা অনির্দিষ্ট যাত্রা), খুবই মুখ্য। তাই কবি তাঁর নির্মাণে হয়ে উঠুক আনন্দঘন, মুক্ত, অসীম দর্শনে আদিষ্ট, আলো থেকে অন্ধকার, অন্ধকার থেকে আলোয়, দিক নির্দিষ্টহীন।

এ পর্যন্ত সমস্ত ইজমের মধ্যে প্রায় খন্ডিত ভাব ছিল, কোথাও না কোথাও শব্দকৈ, ভাবকে, নির্দেশকে চিহ্নিত রেখার বাইরে পাঠাতে সক্ষম ছিল না সম্পূর্ণরূপে জ্ঞাত বা অজ্ঞাত সারে। জিরো বাউন্ডারি সেই খন্ডতা ভেঙে উড়িয়ে পথ দেখাচ্ছে মুক্তমুখী যাত্রায়। তাই কবিতা মুক্ত।

কবিতা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে force apply এর কথা এখানে আগে বলা হয়েছে। এখন দেখা যাক force কীভাবে apply হয় এবং বিজ্ঞানে প্রযোগের মতোই শব্দের মধ্যে জাড্যধর্ম থাকে। সেই জাড্যধর্ম অতিক্রম করা গেলে কবিতা হয়ে ওঠে একটি দীর্ঘমেয়াদি স্ফূরণ।

কবিতার নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা না থাকলেও আমরা জানি কবিতা হল একপ্রকার reflection যেখানে শব্দ সমাহৃত হয় বিভিন্ন tuning এ, বিভিন্ন frequency-তে। Reflection বলতে যা বোঝায় তা হল কিছু ভাব বা কথন, কবিতার দ্বারা reflect হতে থাকে। আমরা বাইরে থেকে tuning বা frequency দেখতে পাই না, বুঝতে পারি না, কিন্তু একজন নিবিষ্ট বা দীক্ষিত পাঠক বা কবি-পাঠক ঠিক ধরতে পারেন সেই reflection এর তীব্রতা। ঠিক এই জায়গাটিতেই বাইরে থেকে শক্তি প্রযোগ প্রযোজ্য হয় এবং শব্দের মধ্যে বস্তুগুণ আরোপিত হয়। বাতাসে শব্দ ওড়াউড়ি করে; কবি তাঁর কল্পনা এবং মানসিক শক্তি দিয়ে সেই শব্দকে ধরে এবং শব্দ – সজ্জা করে রূপ দেন কবিতার। সেই শক্তি প্রযোগ করে শব্দকে কতটা সচল বা কার্যকরী বা শক্তিশালী করতে পারা যাবে সেটা নির্ভর করছে কবিকৃত শব্দের উপর তাঁর মধ্যস্থ শক্তি কতটা কার্যকর হচ্ছে। এই কার্যকরীতার উপরেই একটি কবিতা থেকে আর একটি কবিতার ফারাক হতে আরম্ভ করে। এখানে শব্দের সচল হওয়াটা বাইরে থেকে বুঝতে পারা যায় না, কিন্তু তৈরি হওয়া reflection বা কম্পনের তীব্রতা থেকে কবিতার গভীরতা ও মান নির্ণয় করা যায়। এই জায়গাটাতেই কবিতার ক্ষেত্রে শব্দের জাড্যধর্ম কার্যকর হয়।

এই বাহ্যিক শক্তি আবার অনেকগুলো শক্তির সমাহারে নিবিষ্ট। যেমন কবির জন্মগত প্রতিভা, কল্পনাশক্তি, আহরিত অভিজ্ঞতা, ভাবদর্শন, মেধা, পরিবেশ -এত সব একত্রিত হয়ে সৃষ্টি হয় বাহ্যিক শক্তি বা কবিত্ব শক্তি। এই বাহ্যিক শক্তির দ্বারা কবিকৃত কবিতার তীব্রতা, ভাবের প্রকাশ এবং কবিতার হয়ে ওঠার ডিগ্রি বা ঘাত নির্ভর করে।

একজন নতুন লিখতে আসা যে কেউ কবিতাকে কীভাবে দাঁড় করাবেন তা নির্ভর করে তার ভিতরের তৈরি হওয়া শক্তি দিয়ে শব্দকৈ কতটা তীব্রতায় সচল করতে পারলেন বা কম্পন সৃষ্টি করতে পারবেন। এই তীব্রতা বা কম্পন তৈরি হয় শব্দ প্রযোগ ও ব্যবহারের মাধ্যমে। কীভাবে প্রযোগ করছেন, কীভাবে ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ বাহ্যিক শক্তি দ্বারা কবি কতটা বল প্রযোগ করতে পারলেন শব্দের উপর, এখানেই তার লেখনী শক্তির স্বার্থখতা। এর উপরেই কবিতা হয়ে ওঠে কাঁচা, দুর্বল, radiation হীন। একটি শক্তিশালী কবিতা তার উপর আরোপিত শক্তির গুণে তীব্র হয়ে ওঠে, তৈরি করে communications power এবং তা আলাদা হতে আরম্ভ করে এবং সেই তীব্রতা এসে পৌঁছায় পাঠকের কাছে, পাঠককে ধাক্কা দেয়, আন্দোলিত করে এবং যাকে আমরা বলি পাঠক তৈরি হওয়া। একটি কবিতা সময় উত্তীর্ণ হবে কিনা তা নির্ভর করে কবিতার মধ্যে নিহিত শক্তির উপর।

অভিজ্ঞতা শব্দটি কবিতার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রযোজ্য । দর্শনে অভিজ্ঞতা বলতে শুধু বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার কথা বলা নেই, বরং বলা আছে পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভবের মধ্যে দিয়ে এক বয়ে চলা। চোখে দেখা, কানে শোনা, পারিপার্শিক পরিবেশের ক্রিয়াশীলতা মন ও মননের উপর। কাজেই কবিত্ব শক্তির মধ্যে যে অভিজ্ঞতার কথা বলা হচ্ছে তা শুধু কবির পড়াশোনার উপর নির্ভরশীল নয়।
আমরা বাংলা ভাষার মধ্যে দেখতে পাই আমাদের হাজার বছরের কাব্যভাষা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বিবর্তনের মাধ্যমে।

ইতিমধ্যেই জিরো বাউন্ডারি কনসেপ্ট তরুণ প্রজেন্মর মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে এবং তরুণ প্রজন্ম গ্রহণ করতে চাইছে। সেরকমই সৌমদীপ দাস, এই প্রজেন্মর এক তরুণ কবি জিরো বাউন্ডারি পড়ার পর তাঁর অভিব্যক্তি তথা মতামত নিজস্ব ভাবে ব্যক্ত করেছেন যেখানে দেখা যাবে বেশ কয়েকটি unedited style of poetry যা জিরো বাউন্ডারি দিশা দিয়েছে। এবং এই কবিতাগুলি রাখলাম উদাহরণ হিসেবে কবির নিজস্ব বোধ তথা উপলব্ধি জিরো বাউন্ডারি সম্পর্কে। এই কবিতাগুলো সম্পর্কে আমি আর কিছু বললাম না সমর্থনে কারণ লেখাটি নিজস্বতায় ভাস্বর।

 

চলবে…

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E