৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ১৮২০১৭
 
 ১৮/০৭/২০১৭  Posted by
জিরো বাউন্ডারি কনসেপ্ট (Zero Boundary Concept)

জিরো বাউন্ডারি কনসেপ্ট (Zero Boundary Concept)

জিরো বাউন্ডারি কনসেপ্ট (Zero Boundary Concept)
– আফজল আলি

পৃথিবীর মধ্যে যে সব ভেদরেখাগুলি আছে যা মানুষে মানুষে অস্থিরতা এবং বিরুপতা সৃষ্টি করে, তৈরি করে আরোপিত এবং কৃত্রিম বৈরিতা ও হানাহানি সেই সব ভেদরেখাকে অতিক্রম তথা উপেক্ষা করার জন্য এবং শিল্প সাহিত্যে পরিসর উন্মুক্তের এক দিশা ও অভিমুখ নিয়ে নতুন চিন্তনের প্রকাশ zero boundary concept. সাহিত্য এবং কবিতার ক্ষেত্রে পরিসর উন্মুক্ত করা হয়েছে কারণ এই মতবাদ elimination -এর পক্ষে নয়, inclusion এর পক্ষে।


পৃথিবী দু দুটো বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতেও পারে নাও পারে। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যেভাবে অশান্তির বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তা সে ধর্ম নিয়েই হোক বা রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রতাপ দেখানোই হোক বা উগ্র জাতীয়তাবাদীই হোক, খুব স্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে তা একেবারেই নয়। আই এস আই এস এর জঙ্গিপনা, আমেরিকার বিশ্ব শাসন করার মানসিকতা, আবার কোথাও উগ্র জাতীয়তাবাদ ধর্মকে সামনে রেখে। সমস্ত ক্ষেত্রেই যা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গজিয়ে উঠছে ব্যাপারেটা এক্কেবারেই মানবতাবিরোধী।

ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব ও ফ্রান্সের বিপ্লবের পর বিভিন্ন মতবাদ বা উদ্ভূত দর্শনের প্রেক্ষিতে আধুনিক যুগের সূচনা হয়েছিল এবং সমগ্র বিশ্বব্যাপী আছড়ে পড়েছিল সেই আধুনিকের ঢেউ। জীবন সাহিত্য ও শিল্পকলাতে যা রূপ দিয়ে ছিল পরিবর্তনের। সেই পরিবর্তনের লক্ষণ বৈশিষ্ট্য এবং গুণাবলি আমরা দেখেছি এবং জানি। এরই মধ্যে ঘটেছিল একটি বিশ্বযুদ্ধ ।

পরবর্তী সময়ে মাত্র ২৫ বছরের ব্যবধানে আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আধুনিকতার প্রাসঙ্গিকতাগুলো বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়তে লাগলো। আর এক নতুন যুগ বাস্তবিক ক্ষেত্রে দরজায় খটখট করছিল। শিল্প সাহিত্যে এই ঘূর্ণি এসে স্থির সবকিছুকে ভাঙতে আরম্ভ করল। আধুনিকতার সময়ে গজিয়ে ওঠা ধ্যানধারণা যার মধ্যে সাধারণ অর্থের সমন্বয় বা অর্থ খুঁজে বের করার প্রবণতা ছিল তা সরে গিয়ে অর্থহীনতার দিকে ঝুঁকে গেল। নতুন নতুন device এবং technology মানুষের প্রযুক্তি নির্ভরতা বাড়িয়ে তুলল। computer এর উন্মেষ এবং পরবর্তীকালে ইন্টারনেট পরিষেবা জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত করে তুলল, পৃথিবীকে এনে দিল খুব কাছে।

শিল্প সাহিত্যের গতিপ্রকৃতিও পাল্টে গেল তার বিন্যাসে।জীবন থেকে উঠে আসা চিন্তাভাবনা, চিন্তারস্তর, গতিবেগ অভিমুখ, তীব্রতা – এ সব পরিবর্তিত হয় খুব স্বাভাবিক নিয়মে, তা মানুষ যেভাবে জীবন ও পরিবেশকে দেখে এবং চিহ্নিত ও রূপায়িত করে। বাস্তবের ঢেউ গতি পায় কল্পনায়। উঠে এল উত্তর আধুনিক কালখন্ড। সারা পৃথিবীর মধ্যে পরিবর্তনের এই ধারা ইউরোপ আমেরিকা ধেয়ে আমাদের ভারতে তথা বাংলায় ঢুকে পড়ল। রবীন্দ্র যুগের পর আধুনিকতার বাতাবরণে নতুন করে শিল্পধারার সংযোগ নতুন উন্মেষ ও বহমানতা পেয়ে ছিল এবং তা রবীন্দ্রনাথের প্রভাব মুক্ত হওয়ার মধ্যে দিয়ে এবং শেষমেশ আস্তে আস্তে তা হয়েই গিয়ে ছিল।


উত্তর আধুনিক কালখন্ড শেষ হয়েছে বা হবে কিনা তা আমার দেখার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এক নতুন trend এর দিকে এগোচ্ছে। এই সময়ের রৃপরেখা লক্ষণ বৈশিষ্ট্য চরিত্র গুণাবলি ব্যবস্থাপনা এবং এসব থেকে উত্তরণ ও দিশা পাওয়ার জন্য এই সময়টাকে অন্য ধারায় বাঁধতে চাইছে তা হল নিশ্চিতভাবেই এমন এক ধারা যেখানে বাঁধ, boundary, limitation, নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য, স্হানিকতা এবং গন্ডীবদ্ধ হবার বা খন্ডিত হওয়ার ঝোঁক থেকে মুক্ত হওয়া যায়। এবং সময় সেই দিকে প্রবাহিত হতে চাইছে যা অন্য প্রকার দিশা দেখাতে পারবে। আনবে মুক্তি। চিন্তা এবং চিন্তন এবং জ্ঞান বরাবরই তা স্থান কালকে অতিক্রম করতে চায় যেখানে মানুষ মুক্ত এবং সমাজব্যবস্থা সমস্ত রকম শ্বাসরোদ থেকে উন্নত হতে চায়। এই উন্নত হওয়ার পথে মনে হয় চিন্তার ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করা বা অন্য রূপ দেওয়া দরকার।

এই চিন্তনে পৃথিবীকে মনে করা হচ্ছে a state of liberty. অবশ্য ইন্টারনেট, ফেসবুক ইত্যাদির দৌলতে পৃথিবী হাতের মুঠোয়। হাতের মুঠোয় হলেও আমরা বাস্তবে ভাবনার ক্ষেত্রে সে বিস্তার রাখতে সক্ষম হইনি। অথচ মানুষের বুদ্ধিমত্তার চিন্তা চেতনায় এক অখণ্ড মুক্তরূপ, মুক্ত পৃথিবী ঘোরাঘুরি করে, কারণ মানুষ জন্মায় মুক্ত হয়ে। সভ্যতার প্রতিটি স্তরে, বিজ্ঞানীর প্রতিটি চিন্তায় মানুষের চিন্তনের স্বাধীনতা এবং বস্তুগুণের মুক্তি নিহিত ছিল এবং মানুষ তা অজান্তের মধ্যে দিয়ে যুগের পর যুগ পার হয়ে এসেছে। মুক্ত চিন্তনের ভাববোধ না থাকলে সৃষ্টির এত রূপ, শিল্পের এত রূপ প্রকাশ পেত না; আসলে আসলে মানুষ সমাজের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মধ্যে থাকতে ভালোবাসে। অভ্যন্তরীণ কাঠামো মানুষকে শৃঙ্খল এনে দেয়। তবে এ শৃঙ্খলের মধ্যে সামাজিক সুস্থিতি বজায় থাকে। এবং তা প্রযোজন, কারণ নিজস্ব পরিধিতে একা থাকতে পারে না এবং সমাজ, সংসার, গণ এ সব প্রসঙ্গ বজায় থাকে। কিন্তু মানুষের বা সৃষ্টিশীল মানুষের চিন্তন তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রে খুবই স্বাধীন থাকতে চায়। বস্তুবাদের নিহিত সত্য প্রতিটা মানুষের স্ব স্ব মুক্তি। কার্য কারণ সময় আনুষঙ্গিকতা এ সবের মধ্যে খুব সুক্ষভাবে liberty বা মুক্তকভাব থাকে। যদিও মনে করা হয় প্রকৃতির বাঁধন মুক্তির বিরুদ্ধে কারণ পৃথিবী সহ ব্রহ্মান্ডে আকর্ষণ বিকর্ষণ জনিত ক্ষমতা ক্ষেত্রে এক বন্ধনে আবদ্ধ। সেটা একপ্রকার কাঠামোগত কারণে। রূপ আঙ্গিকের কারণে। কিন্তু ব্রহ্মান্ডের মধ্যে যা space থাকে তা মুক্ত গমনের জন্য।


মানুষের মন সাধারণত কোনো প্রকার ঘেরাটোপ সহ্য করতে পারে না। পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতায় তাকে তা না করতে বাধ্য করে। সমস্ত ক্ষেত্রেই মানুষের মন বন্ধনমুক্ত প্রারম্ভিক দশা adopt করতে চায়। শিল্পের উন্মেষের প্রাথমিক ভাবে থাকে শিল্পীর মন এবং বাস্তবের ঘাত প্রতিঘাত, দ্বন্দ্ব ও সক্রিয়তার মধ্যে বন্ধনহীন অবস্থা তৈরি করতে ইচ্ছুক। তাই স্বাধীন। এ স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচারীতার উল্টোপথ নয়। শিল্পের মধ্যে নিহিত দায় থাকে স্বাধীনতার। পৃথিবীকে একটি বৃহত্তম গোলাকার বল ভাবা হলে এবং তা প্রকৃতিগত ভাবে সুসজ্জিত এবং রূপমন্ডিত এবং মানুষ প্রকৃতির মধ্যে adopted বুদ্ধিমস্তিষ্কের অধিকারী; তাই পৃথিবী, প্রকৃতি, মানুষ এবং সমস্ত সৃষ্টি একটি একক বা unit হিসেবে কাজ করছে সেই আদিকাল থেকে। মানুষকে প্রকৃতির বিরুদ্ধ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে, কারণ মানুষ মুক্ত হতে চেয়েছে তার খাদ্য, বাস,স্থান, ধারণ ইত্যাদির প্রেক্ষিতে। এবং তার রক্তে জেনেটিক কোডে নিশ্চয় থাকে free thoughts এর রসায়ন। অর্থাৎ বক্তব্য হচ্ছে মানুষের চিন্তনের মধ্যে প্রথিত বীজটিতে একপ্রকার স্বাধীনতার মোহধন থাকে এবং তা প্রকৃতিগত। তাই শিল্পী কবি সাহিত্যকরা তাঁদের কর্মকাণ্ডে মুক্ত স্রোতের অধিকার গাঁথতে গাঁথতে এসেছেন ধারাবাহিক ভাবে খুব দ্রুত না হলেও ধীরে। এই মুক্ত চিন্তনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শক্তি কাজ করে চলেছে। খুব সৃষ্টিশীল মানুষ তাঁদের চিন্তন রেখে গেছেন যুগে যুগে।

যদি ধরে নেওয়া যায় পৃথিবী তার মধ্যে সমস্ত সত্ত্বা নিয়ে এক ইউনিট তা সে বাস্তবে যতটা কল্পনার বাইরে তা হোক, এবং খুব সঙ্গতভাবে ধরে নেওয়া যেতেই পারে মানুষ পৃথিবী সৃষ্টি করেনি, তাহলে এটা পরিষ্কার, পৃথিবী এবং মানুষ পরস্পর compactness এর মধ্যে গঠিত। এবং মানুষ পৃথিবীর মধ্যে বিভিন্ন ভাবে নিহিত দেশ জাত ভেদে। কিন্তু তা আমাদের তৈরি করা।বর্তমানে জ্ঞাত পরিস্থিতির মধ্যে এই ধারণা কি নিবন্ধক হতে পারে না যে মানুষ, পৃথিবীর নিরিখে সমস্ত পৃথিবীতে বিচরণযোগ্য এবং কোনো প্রকার বাধা বাধ্যবাধকতা ছাড়া। কারণ সৃষ্টিগত ভাবে পৃথিবী প্রকৃতি মানুষ জীবজন্তু হল একটি ইউনিট। এই ইউনিটের মধ্যেই নিহিত আছে মুক্ত চিন্তার basic content. সেক্ষেত্রে দেশ একটি কৃত্রিম বন্ধন বা ঘেরাটোপ। এবং মানুষ একটি জাতি। স্থান কাল পাত্র ভেদে হয়তো মানুষের বর্ণ গঠন কাঠামো নিজস্বতা এবং ধারণ পাল্টে পাল্টে যায় বা গেছে; কিন্তু মূল ধরনটি আলাদা নয়। As a human being it narrates as unit & oneness. এই দেশ সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার জন্যই বিজ্ঞান তার device দিয়ে sparking করেছে। বিজ্ঞানের, দর্শনের সমস্ত সুফল পৃথিবীব্যাপি মানুষ ভোগ করে। জ্ঞানের অধিসীমা তা নিরূপণ করার জন্য যথেষ্ট। তাই দেশকে, দেশ-ধারণার মধ্যে রেখেও আমরা তা অতিক্রম করতে পারি যদি চিন্তনের মধ্যে, চেতনার মধ্যে একপ্রকার ভ্রম সংশোধন করা যায়। আমরা মানে মানবকুল না গড়েছি মাটি, না প্রাকৃতিক সম্পদ; তাই না-তৈরি করা নিয়ে আমাদের খন্ডভাব কীভাবে জাহির করা। আসলে জ্ঞান সীমারেখা ভাঙতে চায়, বিজ্ঞান সীমারেখা ভাঙতে চায়, তা মুক্ত চিন্তনের, মুক্ত যাপনের পক্ষে যুক্তিযুক্ত। তাই পৃথিবী একটি দেশ হলে মানুষ হল তার জ্ঞানদৃপ্ত জাতি। অখণ্ড পৃথিবী এক এবং অখণ্ড মানবজাতি এক। তাই মানুষ ও পৃথিবী এক জাতি এক দেশ।


স্থানীয় পর্যায়ে থেকে রাজ্য বা প্রদেশ পর্যায় হয়ে যদি দেশ পর্যায়ে উন্নত হতে পারে এবং আমরা তা গ্রহণ করি বা মেনে চলতে পারি তাহলে কেন সেই দেশ পর্যায় থেকে মহাদেশ এবং বিশ্ব পর্যায়ে উন্নত হতে পারব না। শুধু জনগণ বা মানুষের এবং রাষ্ট্রনায়কদের মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তা উন্নত করা সম্ভব। এবং এর সপক্ষে বিজ্ঞান আমাদের সমস্ত উপকরণ হাজির করে দিয়েছে হাতের মধ্যে। শুধু application এর ক্ষেত্রে খন্ডতার ভাব কেন বজায় রাখা হচ্ছে। এ প্রশ্ন আজ হোক বা কাল উঠতে বাধ্য। শুধু দরকার মানুষেকে ভাববার সুযোগ করে দেওয়া এবং রাষ্ট্রনায়কদের সদিচ্ছা।

যদি ধরে নেওয়া হয় পৃথিবী এক দেশ এবং সেই সুবাদে কোনো দেশকেই শক্তিধর অন্য দেশ কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ না থাকে তাহলে দেশরক্ষার নামে মিলিটারি খাতে যে অর্থ ও system ব্যয় করা হয় তা বন্ধ হলে পৃথিবী এবং পৃথিবীর সমস্ত মানুষ পর্যাপ্ত সম্পদের অধিকারী হবে। অনাহার, উৎপীড়ন (বহির্দেশীয়), আশঙ্কা, ক্ষয়ক্ষতি সমস্ত এক্কেবারেই মিনিমাম লেভেলে নেমে আসবে এবং পৃথিবী হবে একটি মৃগয়াক্ষেত্র, উন্মুক্ত বিচরণভূমি। দেশের কাঠামো যেমন আছে তেমন রইল, শুধু থাকল না জাতীয়তাবাদের ভাবনা যা উদ্বেগ আশঙ্কা কেবল বৃদ্ধিই করে যা negative nationality হিসেবে কাজ করছে এখন। সেক্ষেত্রে মানুষে মানুষে সংঘাত বিবাদ সংঘর্ষ থাকতে পারে, তা কেবল স্থানীয় ভিত্তিক। এবং তা আন্তর্জাতিক পুলিশ বা ওই জাতীয় কিছু দ্বারা প্রতিহত করা যাবে, কিন্তু কোনোভাবেই বৃহত্তর আগ্রাসন হবে না

তাই মুক্ত চিন্তনের প্রথম ধাপ হচ্ছে সমস্ত boundary বিলোপ।

যান্ত্রিকতার উন্মেষের মধ্য দিয়ে আধুনিক যুগের সূচনা হয়েছিল স্টিমইন্জিন তৈরির মাধ্যমে। আধুনিকতায় যেহেতু বিজ্ঞান চিন্তার উন্নতির মধ্য দিয়ে কার্যরূপ শুরু করেছিল এবং পৃথিবীব্যাপি আধিপত্যবাদের শক্তি কায়েম ছিল তাই শিল্পক্ষেত্রে বা সাহিত্যক্ষেত্রে তা বন্ধনমুক্তি ঘটাতে পারেনি। সমস্ত শিল্পের ক্ষেত্রে অচেতনভাবে চলে এসেছিল একপ্রকার বন্ধন। শিল্প সাহিত্যে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে বিভিন্ন আন্দোলন তার ফসল কিন্তু মুক্ত চিন্তনের মধ্যে ছিল না। কাব্য এবং সাহিত্যজগতে বিভিন্ন ঘেরাটোপ ছিল – – কখনো ছন্দের শৃঙ্খল, কখনও ভাবনার শৃঙ্খল, কখনও যৌনতার শৃঙ্খল, কখনও মুক্ত হতে চাওয়ার মুক্তগামী শৃঙ্খল – এরকম নানান শৃঙ্খলে আবদ্ধ ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে এ সব শৃঙ্খল থেকে মুক্তির উপায় খোঁজা চলতে লাগদো। এবং পরপর দুটো বিশ্বযুদ্ধের ফলে conceptual revolution আরম্ভ হতে লাগলো। এবং আধুনিকতা ভেঙে দেখা দিল উত্তর আধুনিকতাবাদ। এরই মধ্যে computer আবিষ্কার এবং পরবর্তীকালে ইন্টারনেট এই সব বিজ্ঞানের সুফল নিয়ে উত্তর আধুনিকতা concept, আধুনিকের শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টায় তার বৈশিষ্ট্য, গুণ উত্থাপন করতে লাগলো। মূলত শিল্প সাহিত্যের মধ্যে এর প্রভাব। উত্তর আধুনিকতা ট্রেন্ড হল আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য মুক্ত হওয়া। উত্তর আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য characteristics, গুণাবলি আমরা কমবেশি সকলেই জানি এবং তা ক্রমশ উন্মুক্ত হতে লাগলো যখন শিল্প সাহিত্যে বিশেষ করে কবিতায়; বিভিন্ন ধরনের লেখালেখির মাধ্যমে চলল বিভিন্ন ধরন, নির্মাণ হয়ে উঠল বিনির্মাণ (deconstruction ), আধুনিকতার কেন্দ্রীকতার ধারণা হটিয়ে, প্রান্তিকে পৌঁছে গিয়ে প্রায় সমস্ত ভেদরেখা বিলোপ করতে হয়ে উঠল horizontal বা parallel তার রকমারি শৈলী নিয়ে।

কিন্তু বাস্তবে ভেদরেখাকে অতিক্রম করতে গিয়ে উত্তর আধুনিক অন্য একপ্রকার রেখা টানতে লাগলো বহিঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে। ধ্বনি মাধূর্য, লিরিকস, হৃদয়, প্রান্তিকের মর্মের কথা ও ভাব, রূপময়তা, প্রচলিত ছন্দের সম্ভাবনার restructure বা reform, সহজতা এবং সরলতা – এসব থেকে ছিটকে অন্য একপ্রকার সীমারেখা ও আবদ্ধতাকে প্রশয় দিতে লাগলো। ফলে শিল্প বা কবিতা তার নতুন রূপ নিয়েও বৃহত্তর অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে রইল উদ্ধত। আধুনিকতা সর্বস্তরে গ্রাহ্যতা ও মান্যতা পেলেও, উত্তর আধুনিকতা যেন কিছুটা ফিকে বা অচ্ছুৎ। যদিও সব আন্দোলন বা লেবেলযুক্ত যুগের গ্রহণযোগ্যতা 100% হতে পারে না। তবু কাঠামো পরিকাঠামো ভেঙে উত্তর আধুনিকতা রয়ে গেল নির্ভরযোগ্য এক ভিত হিসেবে।


সময় তার রূপরেখা নতুন করে বিন্যাস করতে পছন্দ করে। এটা আবেগ নয়। ইতিহাস সিদ্ধ। এখন রূপরেখা কীভাবে হবে, কেমনভাবে হবে, কোন পথে এগোবে তা যেমন নির্দিষ্ট নাই, তেমনই কে বা কাহার দ্বারা হবে তেমনও নির্ধারিত নয়। প্রযোজন এবং সময়ের চাহিদা সক্রিয়ভাবে কাজ করে এখানে। Space তার মধ্যের ঘটনাগুলো অতিক্রম করতে চায় এবং এই অতিক্রম করার মধ্যে পরবর্তী পর্বের কিছু কিছু কোড থাকে, সেই কোড এর দিশাচিহ্ন ব্যবহার করে পরের দশা সংজ্ঞায়িত হয়। সর্বক্ষেত্রে যে এটা ঘটবে তা নয়, তবে প্রক্রিয়াটি জোরদার হওয়ার দিকে।

বর্তমান সময় যে অবস্থায় পৌঁছেছে সেখানে দাঁড়িয়ে সার্বিক ভাবে এবং শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে delimitation শব্দটি খুব প্রযোজ্য। কারণ, সমস্ত রকম ঘেরাটোপের বিরুদ্ধে যেতে পারলে তবেই এক বৃহত্তম গঠন ও তার পরিক্রমা সম্ভব। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এবং সাহিত্য শিল্প বিশেষ করে কবিতার ধারা থেকে এটা ক্রমশি স্পষ্ট হচ্ছে যে সমস্ত রকম boundary-র বিরুদ্ধে গিয়ে এবং বিলোপের মধ্যে দিয়েই সেই বৃহত্তম structure কে ধরতে পারা যাবে। মনের যেমন কোনও boundary বা চিন্তার যেমন কোনো line of control থাকে না, মন যে কোনো সময় যে কোনো প্রান্তে, যে কোনো ভাব ও ভাবনার রূপ ধরতে সক্ষম; ঠিক সেভাবেই মন-নির্গত শিল্প ভাবনা কোনো রকম boundary রেখার বিরুদ্ধে। সে যে কোনো প্রকল্পের মধ্যে যে ভাবে খুশি কাজ করতে পারে এবং শিল্প সাহিত্যের তথা শব্দের ঘেরাটোপকে উড়িয়ে দেওয়া যার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে হয়ে ওঠা থাকে। তাই এই কল্পনার রূপ দিতে zero boundary concept হল একপ্রকার উত্তীর্ণ ও সময়োপযোগী ভাবনা যার মাধ্যমে আমরা achieve করতে পারি বিশ্ব শান্তি থেকে প্রকৃত শিল্পের সুন্দর ভবন। কবিতার ক্ষেত্রে তা হল zero boundary poetry.

এটা সময়ের দাবি; যেভাবে সময়ের দাবি ও চাহিদাতে পূর্বের অনেক ইজম গড়ে উঠেছিল এবং তাদের মধ্যে নিহিত ছিল অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বর্তমান সময়ের মধ্যে এবং সময়ের থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য এই concept. এই concept কার্যকরী হওয়া দরকার এবং প্রযোজন।

এখন দেখা যেতে পারে এই concept এর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি:

১ : এক পৃথিবী এক দেশ এবং মানুষ হল একটি নিজস্ব অস্তিত্বের জাতি :- উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং উগ্র আগ্রাসন এটা co-related. ইতিহাস এরকমই সাক্ষ্য দেয়। কাজেই zero boundary র ক্ষেত্রে এক পৃথিবী এক দেশ এবং মানব এক জাতি হলে সম্ভব্য সকল বিবাদের অবসান হবে, যা প্রতিনিয়ত আমাদের সংকুচিত করে রাখছে বৃহত্ শক্তির আগ্রাসন থেকে । বিষয়টি বাস্তবে এক্কেবারে অসম্ভব এমনটা নয়।

২ : শিল্প সাহিত্য বা কবিতার ক্ষেত্রে – কবি বা শিল্পির ভাবনা সাধারণত কোনো বিরিয়ারে আটকে থাকে না, তাই কবিতা যেদিকে ইচ্ছা গমন করতে পারে। ছন্দের হাত ধরে নাচতে পারে, ছন্দকে নিয়ে শব্দ প্রযোগে নতুনত্বের ছোঁয়া দিতে পারে। ইহা আধুনিক বা প্রাক-আধুনিক যুগের চর্চা বলে অচ্ছুত নয়; তবে অবশ্যই নতুনত্ব দাবি করে। আমাদের ভারতীয় তথা বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির মূলে ছন্দ রয়ে গেছে। কাজেই ছন্দকে বাদ দিয়ে রাখা একপ্রকার বন্ধন বা ঘেরাটোপ।

৩ : আবার উল্টো দিকে কবিতার মধ্যে শব্দকে নিয়ে নিরন্তর খেলা করা যেতে পারে। যেহেতু কোনো ঘেরাটোপ নাই, তাই এক্কেবারে খোলা মনে, শব্দের মধ্যবর্তী জাড্যধর্মকে ভেঙে যে কোনো দিকে যে কোনো ভাবে ব্যবহার করা যাবে। structure আঙ্গিক এ সবে খোলামেলা।

৪ : কবিতার মধ্যে পাঠকের অংশগ্রহণ বা involvement যার মাধ্যমে কবিতাকে অংশীদারিত্বের শরিক করা যাবে এবং পাঠকের জন্য space রাখা বা তৈরি করা।

৫ : হৃদয় ব্যাপারটি কবিতার মধ্যে হারিয়ে যেতে বসেছে। বড়ো বেশি মস্তিষ্ক নির্ভরতা হয়ে উঠছে কবিতা। যদিও zero boundary, তাই আবেগকে মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের যথাযথ প্রকাশ মাধ্যম করা যাবে।

৬ : কবিতার মধ্যে বলা না-বলার আরোহণ, অবরোহণ থাকতে পারে; এক কথন থেকে অন্য এক কথনে গড়িয়ে যাওয়া। shift from one angle to another, one aspect to another, অনির্দিষ্ট পরিকল্পনায়।

৭ : শব্দকে নিয়ে যেভাবে ইচ্ছা খেলা বা উত্তীর্ণ করা যাবে, যাতে শব্দের মধ্যের নিহিত শক্তির বহিঃপ্রকাশ তার dimension change করতে পারে, প্রতিরোধহীন।

৮ : কবিতা হয়ে ওঠা একটি আপেক্ষিক ধারণা। তার নির্দিষ্ট কোনো অবয়ব নেই বা কাঠামো। তাই কবিতা হয়ে ওঠার মাপকাঠি কবির উপরেই বর্তায়। নিশ্চয় মুন্সিয়ানাহীন ছেলে খেলা পর্যায় কোনও কবিতার উত্তরণ হতে পারে না।

৯ : পূর্বের কোনো ইজম বা কালখন্ড বাতিল না করে zero boundary adopt করতে চায় এক উন্মুক্ত পরিসর; যেখানে সৃষ্টা, শিল্পী বা কবি স্ব-ইচ্ছায় স্বাধীন, তাঁর সৃষ্টি যেকোনো দিকেই বাঁক নিতে পারে, যে কোনো অবস্থানে। জিরো বাউন্ডারি জোর দিতে চায় সৃষ্টার ভিতরের শক্তির বহিঃপ্রকাশে এবং শৈল্পিক চেতনার মধ্য দিয়ে পূর্বের জ্ঞাত বা অজ্ঞাত বিষয় যুক্ত বা মুক্ত রেখে।

১০ : শিল্প বা কবিতার সাধারণ স্বতঃস্ফূর্ত স্ফূরণ। পরে সেটি পরিশীলিত করা হয়। এটাই সাধারণ নিয়ম। তবে unedited বা অপরিশীলিত রূপটিও zero boundary তে সংযুক্ত করা হচ্ছে তাহলে বোঝা যাবে সৃষ্টার বা সৃজন শিল্পীর ক্ষমতা জনিত বহিঃপ্রকাশ। ইদানীং অনেকের কবিতায় এরকম version দেখা যাচ্ছে। যাকে বলে unedited poetry.

১১ : আরো বেশি মানুষকে কবিতার বা শিল্পের process এর মধ্যে যুক্ত করার জন্য জিরো বাউন্ডারি। কারণ এখানে elimination কম, inclusion বেশি। কারণ কবিতার সর্বস্তরে, বিভাগে পৌঁছানোর নামই সীমানা ভাঙা।

১২ : কবিতার অঞ্চল এক্কেবারে উন্মুক্ত – জীবন থেকে শূন্যে, আবার শূন্য থেকে সর্বক্ষেত্রে – জ্ঞান সচেতনের সমগ্র শাখায়। তাই কবিতার পরিধি বা গমন-অঞ্চল বাড়ানো বা বাড়িয়ে চলা zero concept এর কাজ। গড্ডালিকা প্রবাহের অঞ্চল থেকে বেরিয়ে ভাবনার স্তর অতিক্রম করা এবং উন্মুক্ত অঞ্চল গড়ে তোলা।

১৩ : মেধার সাথে কবিতার যোগসূত্র সমানুপাতিক। মেধা না থাকলে অগ্রসর হওয়া যায় না কোনো বিশেষ ভাবনা, চিন্তা বা ধারায়, তেমনই কবিতার স্ফূরণের ক্ষেত্রে মেধা একটি অন্যতম factor বা কার্যকরী অংশগ্রহণ। zero boundary poetry তে মেধার স্ফূরণকে কাজে লাগলো প্রযোজন যাতে কবিতা রূপান্তরকামী শিল্পে উত্তীর্ণ হতে পারে।

১৪ : কবিতা, অ-কবিতার ফারাক বা identity বিলোপ করে পছন্দ অপছন্দের ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা। যেহেতু কবিতা অ-কবিতার বিভাজন রেখা কোনো নির্দিষ্ট নাই, সবটাই অনুভব এবং অনুভূতির মানদণ্ডে; কাজেই তার সঠিক মাপকাঠি নাই। সেক্ষেত্রে পছন্দ অপছন্দের ব্যবস্থাপনা অনেকটা পরিষ্কার ধারণা দিয়ে দেয় কবিতা সম্পর্কে। এই পছন্দ অপছন্দের মানদণ্ডে কবিতা গৃহীত, অগৃহীত হয়।

১৫ : কবিরা ভাষা ইঞ্জিনিয়ারও বটে। কাজেই কবিদের লেখার মধ্যে এমন ভাষা ব্যবহার থাকবে যা আগামী দিনের নতুন চর্চার দলিলরূপে কাজ করবে। এটা অবশ্যই খুব কঠিন কিন্তু এই পরিসরটিকে উন্মুক্ত রাখা থাকছে এই concept এ

১৬ : আধুনিকের vertical thinking অথবা উত্তর আধুনিকের lateral বা horizontal thinking এর পরিবর্তে zero boundary তে LIBERAL THINKING এর প্রাধান্য এবং গুরুত্ব; ফলে কবি তাঁর সৃজনীর ইচ্ছা স্বাধীন ভাবে চালিত করতে পারবেন। পূর্ব আরোপিত তাঁকে কিছু বহন করতে হবে না।

১৭ : হাইব্রিডিটি বা স্যান্ডউইচ সিস্টেম গ্রহণ – একই কবিতার মধ্যে দুটি ভিন্ন ঘরানার কবিতা – অংশ মিশিয়ে দিয়ে, উদ্ভূত কবিতাটিকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেওয়া বা পরপর দুটি ভিন্ন ধারাকে গেঁথে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে কবিতার অন্তর্গত বিষয় ও ভাবনা প্রচলনের ঊর্ধ্বে গিয়ে, অপ্রচলনকে তুলে ধরা।

১৮ : কবিতায় শব্দির বা শব্দসমূহের অর্থহীনতার ঝোঁকের পরিবর্তে অর্থময়তা এবং অর্থময়তার পরিধি এবং কোণ বিস্তারের প্রাধান্য। একটি শব্দ নির্দিষ্টভাবে এক বা একাধিক বস্তু বা ভাবকে represent করে। সেক্ষেত্রে শব্দ নিশ্চই চিহ্নিতকারী কিছু ভাব বা কল্পনা বা বস্তুর দ্যোতনা থাকে। তাই কবিতায় অর্থহীনতা বলে সেভাবে কিছু হয় না; হতে পারে তা বাস্তবের কাছাকাছি নয়, কিন্তু কল্পনার পরিমেয় জগতের মধ্যে নিশ্চয়। ‘আম’ শব্দ দ্বারা আমরা আম সম্পর্কিত যেকোনো ভাব বা ব্যঞ্জনাকেই ইঙ্গিত করি। অথবা কোনো রূপক কিছু। এইভাবে অন্য যে কোনো শব্দ। তাই সামগ্রিক ভাবে কবিতায় অর্থহীনতা বা ‘কবিতা কোনো অর্থ বাতলাবে না’ -এ যুক্তি zero boundary তে প্রাধান্য পায় না ।

২০ : উপরিউক্ত যে কোনো একটি বা দুটি বা একাধিক বিষয় কোনও কবিতাতে উঠে এলে তা zero boundary poetry হিসেবে গণ্য হবে। একসঙ্গে একই কবিতার মধ্যে সমস্ত গুণাবলি থাকার প্রযোজন নেই।

আমার বিশ্বাস নিশ্চিতভাবেই এই সময়ের বা আগামী দিনের কবিতার মধ্যে এই সব চিহ্ন লক্ষণ প্রকট হবে বা নতুন প্রজন্ম এইভাবেই কবিতা যাপন করবে। এবং zero boundary concept শিল্প বা কবিতার পরিসরে নতুন নতুন দিশা দেখাতে সক্ষম হবে এবং এটা অনিবার্য।

  • চলবে…
Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E