৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ০৮২০১৭
 
 ০৮/০৭/২০১৭  Posted by

জাকির জাফরান-এর কবি পরিচিতি, কবিতাভাবনা ও একগুচ্ছ কবিতা


দেহ
……

কোমরের নিচে গান
ঘুঘুডাক
ভাসমান মেঘ
সংখ্যাপতনের আর্তরবে
আমি মীন এঁকে যাই দেহে


একটি সবুজ পাতা
…………………

ছায়াপথ পেরিয়ে
গ্রহ নক্ষত্র পেরিয়ে
পৃথিবীতে এসে থমকে দাঁড়ালো আলো—
একটি সবুজ পাতা ফ্রক বদলাচ্ছে।


অস্তিত্ব বিষয়ক
……………..

এসেছি শিরস্ত্রাণ পরে, দুটি চোখে পাখি,
চেনা যায়?
— কে গো তুমি?
আমি জাফরান, তোমার পশ্চাদভূমি,
— কেন এলে?
আয়ুর কৌটায় দাঁত বসাতে এসেছি,
— কিন্তু দাঁত তো ফেলে এসেছ বেদেনীর ঘরে।


আমি
……

আমার এ জীবন-নকশা
বৃথা যায় প্রভু,
শুকনো পাতার নিচে আজ
চাপা পড়ে গেছি
আমি আগুন আগুন।


আফিম
………

আফিম মেশানো চোখ—
তোমার দৃষ্টির পথ মাস্তুলে ভরা।
এসো বসি, গান করি, শুই,
শুঁকে দেখি, কে আগে?
তুমি নাকি আমি আজ ডাকহরকরা?


নিরুদ্দেশ
……….

কমলালেবুর মতো গোল এ-পৃথিবী।
হৃৎপিণ্ডের আকার পানপাতার মতোই।
আর হৃদয়?
— খাদ্যচক্রের মতো চিরন্তন গোল,
— অর্ধচন্দ্রের মতো দ্বিখণ্ডিত,
— রহস্যের মতো নিদ্রাহীন,
— অশ্বক্ষুরের মতোই নিরুদ্দেশ,


স্মৃতি
……

হৃৎপিণ্ডে লুকিয়ে রেখেছি
বাসর রাতের হাওয়া।
মাঝে মাঝে ঘ্রাণ নিই,
মাঝে মাঝে মাতালের মতো বেরিয়ে আসে সেই হাওয়া,
টলতে টলতে বলে, মামা, ভালোবাসা কোন দিকে?


খেলা
……

সকলেই বল মারে গোলপোস্টে।
আমি দেয়ালের দিকে বল ছুঁড়ে দিয়ে
তার ফিরে আসবার দিকে চেয়ে থাকি,

এই বেদনালুপ্তির খেলায় কোনও হর্ষধ্বনি নেই।


বিয়ে, প্রীতিধারা
……………….

মেঘে মেঘে সংঘর্ষের কালে, কোথা ছিলে?
কোথা ছিলে! সব ধান খেয়ে গেল বরিষণ।
দুরের মহিলা এসে দেখে গেছে—
ছেলে ভালো, প্রভাষক,
মনে শুধু ব্যথার কঙ্কন।

১০
জন্ম
…..

জন্মের পর থেকেই দেখছি বাবার চোখ লাল
জন্মের পর থেকেই দেখছি মায়ের হাড় কালো
লাল চোখ, কালো হাড়, জন্মেছি এ নিয়ে, বিশ্বাস করো।

১১
অর্ধেক ঘুমাবো
……………..

বুঝতে পারি না আমি আজও
খামখেয়ালিতে ভরা কেন দেহ
অথচ পানির নিচে, সমর্থনে, চাঁদ হাসে।

রক্তের ভেতরে আজ জেগেছে বিরহ,
সুখ আছে, তবু ব্যথা জাগে
দেহে দেহে অনুপ্রাসে।

এই রাতে
চাঁদের কলঙ্কটুকু কোথায় লুকাবো?
ওহো শীত, কুয়াশা-পতন,
এ-আমি ঘুমাই যদি, অর্ধেক ঘুমাবো।

১২
ধানের প্রাচীর
…………….

একটি ধানের শীষে
মূর্ছা যায়
ভোরের শিশির।

কৃষক ঘুমায়
কিষাণিও ঘুমায়
মাঝখানে ধানের প্রাচীর।

১৩
গভীর
……

হাঁটতে হাঁটতে, বনপথে,
তোমায় নিয়ে ভাবতে ভাবতে,
কাল এক পিঁপড়ের বিশ্রামের মধ্যে
পা দিয়ে দিলাম।
এই অনুতাপ নিয়েও কাল
তোমার নিকটে যেতে যেতে মনে এলো,
তোমাকে ঘুমন্ত দেখা—
বহুদিন না দেখার মতোই গভীর।

১৪
বোধন
…….

শিশু—
পাশবিক শক্তি নেই যার

যুবা—
অন্ধকারে হাঁটে অনুরাগে

দেশ—
ডুবে আছে কুয়াশার মাঝে

নারী—
তোমার বনানী কেন তবে
ভিজে গেছে আগে?

১৫
আকাশ
………

মাথার ওপর থেকে ঠিক
শুরু হয় আকাশের ঠিকানা।

যে-মানুষ যত বেশি বড়
তাঁর আকাশ ততোটা ছোট।

মৃত মানুষরা থাকে পৃথিবীর নিচে
সবচেয়ে বড় আকাশ কেবলি মৃত মানুষের।

 

কবিতা ভাবনা
………………..
জীবনানন্দ দাশ বিশ্বাস করতেন কবিতা বিভিন্ন রকমের হয়। আমিও তা-ই বিশ্বাস করি। একেক ধরণের কবিতায় একেক ধরণের ঘোর, আনন্দ এবং মোহপাশ বিদ্যমান থাকে। আমরা এই সময়ের কবিরা তো শ্লোগানধর্মী কবিতা লিখি না বললেই চলে। কিন্তু ‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ এই পঙক্তির আবেদন কি মগ্নচৈতন্যের কবিতায় পাওয়া সম্ভব? আবার ‘মানুষ নিকটে এলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়’ এর মজা কি বিবরণর্ধমী কবিতায় পাওয়া যাবে? যাবে না। আমি তাই কাব্যরসের জন্য সব ধরণের কবিতার কাছেই ছুটে যাই।

আমরা যখন একটি কবিতা লিখতে শুরু করি, আমার বিশ্বাস, তখন এর উপাদানগুলো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, জড়াজড়ি করে থাকে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে। সেখান থেকে কবিতাটিকে বের করে এনে সফল সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাওয়াটাই কবির কাজ। এই বের করে আনাটা কবিতার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা এ কাজটি করতে পারেন তারা বড় কবি। একটি ভালো কবিতার গন্তব্য হলো কাঙ্ক্ষিত নৈঃশব্দে উপনীত হওয়া। সেই নৈঃশব্দে পৌঁছুতে হলে কবিতার শব্দ, ভাষা, বিষয়, উপলব্ধি, ছন্দ, প্রকরণ— সবকিছুর মধ্যেই একটা হারমনি বা সিমেট্রি থাকতে হয়। অনেক সময় আমরা খুব ভালোভাবে একটি কবিতা শুরু করেও শেষ পর্যন্ত গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলি। আমার মনে হয় এর কারণ হলো ঐ কবিতাটিকে তার সহবস্তু/ভাষা/ভাবনা থেকে কিংবা কবিতাটিকে ঘিরে পেচিয়ে থাকা নানান রকমের কবিতাহীনতা থেকে পৃথক করতে না পারা।

 

পরিচিতি
……………

জাকির জাফরান

জাকির জাফরান

জাকির জাফরান
জন্মঃ সিলেটে, ৪ আগস্ট ১৯৭৫
শিক্ষাঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর
পেশাঃ বিসিএস (প্রশাসন)
প্রকাশিত গ্রন্থঃ
সমুদ্রপৃষ্ঠা (কবিতা, ২০০৭)
নদী এক জন্মান্ধ আয়না (কবিতা, ২০১৪)
অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলী (কবিতা, ২০১৫)
আকরায় পাওয়া পাণ্ডুলিপি (অনুবাদ, ২০১৭)

 

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E