৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ২৮২০১৭
 
 ২৮/০৭/২০১৭  Posted by

জাহিদ সোহাগ-এর কবিতা ভাবনা
আগুনে ঝাঁপ দিতাম

কবিতা লেখার পেছনে আমার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। হয়তো আমার আখ্যান লেখার কথা ছিল, প্রথম পড়া বইটি তাই ছিল, অনেকটা রগরগে, ওর মাধ্যমেই বুঝতে পারি ভাষার সে কী শক্তি! কিন্তু ওই বয়সে কেনোই বা লিখলাম কবিতা? আমি জানি না।
কখনো মনে হয়, আখ্যান লিখলেই ভালো হতো; এতটা গ্লানির কাছে সমর্পিত হতে হতো না। আমি কয়েকবার চেষ্টাও করেছি। লিখেছিও সামান্য। মনে হয়েছে বৃথা। বৃথাই তার এত বিস্তার। আখ্যানে যা লিখতে চাই তা কবিতায় খুব অল্প পরিশ্রমেই লিখতে পারি। ব্যাক পেইনও পেয়ে বসে না- তাহলে কেনো গদ্যের এই করণিক প্রচেষ্টা! তাই সংক্ষিপ্তকরণের জন্যই হয়ত লিখি, কবিতা।
সত্যি বলতে, আমি গল্প-উপন্যাস পড়ে আলোড়িত হইনি। যেটুকু পড়েছি বা পড়ছি সেটুকু না পড়লে বিদ্বৎ সমাজে কথা চালানো যায় না। তাই বলে কি কবিতা তুলে দিয়েছে ঠোঁটে অমেয় জল? ফলেছে জ্ঞান নামক ঝুলন্ত দুটি অণ্ডকোষ? নাকি পেয়েছি প্রথম সঙ্গমের মতো বিদ্যুতায়িত স্থায়িত্ব? -আমি জানি না। আমি যা বুঝতে চেয়েছি তা আমি আমার জীবন দিয়েই বুঝেছি। বুঝছি। বই একটা সামান্য আয়না ছাড়া কিছু নয়। মাঝেমধ্যে মুখ দেখেটেখে নেই আরকি! জীবনই আমাকে প্ররোচিত করছে।
হয়তো এই গল্প-কবিতা-নাটক-নভেল আপনারা যাকে শিল্প-সাহিত্য বলেন, এসব আমাকে সঙ্গ দিয়েছে কোনো সঙ্গ নেই বলে, বা দীর্ঘক্ষণ মানুষের সঙ্গ ক্লান্ত করে বলে। নইলে আমি বাতাসে ছিঁড়ে যেতাম। ধুলোয় মিশে যেতাম। আগুনে ঝাঁপ দিতাম।
লেখার মধ্যে একটু আনন্দও আছে। যন্ত্রণাও আছে তারও বেশি। জানি না মুচি জুতা বানিয়ে আনন্দ পায় কিনা। লাটিম বানিয়ে ছুতোর আনন্দ পায় কিনা। আমার মনে হয়, সৃষ্টির মধ্যে প্রতিঘাত আছে, যা ব্রহ্মাণ্ডের বিরুদ্ধে, নশ্বরতার বিরুদ্ধে।
তবু এই নশ্বরতা! শিল্প-শিল্পী সবাই। চিরায়ত বলে কিছু নেই। যার যা খুশি তাই করতে পারে। এই হলো মানুষের সংবিধান। আমি কোনো নিয়ন্ত্রণ স্বীকার করি না।
সমাজে খুনি হওয়ার প্ররোচনা থাকলে কেউ খুনি হতে পারে। তেমনি যে কেউ লিখতে পারে কবিতা। খুন করা আর কবিতা লেখা এর মধ্যে খুব বেশি কি প্রভেদ আছে? হয়ত হঠাৎ কোনোদিন খুন করে পেয়ে যাবো কবিতা লেখার মতো আনন্দ, বা তারচেয়েও বেশি কিছু। তখন রাশি রাশি খুনের মধ্য থেকে গড়ে উঠবে খুনসংগ্রহ বা নির্বাচিত খুন বা শ্রেষ্ঠখুন। তখন কবিতাকেই মনে হবে পাপ, ধর্ষণ।
জৈবিক কাজের বাইরে সব কাজই সুনির্দিষ্ট কারণনির্ভর। বাকি সব অনির্দিষ্ট কারণে জর্জরিত। প্রেমে প্রতারণায় সংগ্রামে সংঘাতে লোভে হিংসায় কামনায় যেমন বেঁচে থাকি। তেমনি কবিতায়ও বেঁচে থাকি। এই হোক আপাত-সুনির্দিষ্ট কারণ।

দুই.

‘কবিতা ভাবনা’ প্রকাশে কোন কোন বিষয়ের সুরাহা হওয়া প্রয়োজন তা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই। যদি বলা হয় নিজের কবিতা বিষয়ে নিজের মতামত কি? তাহলে দু’পা পিছিয়ে আলোচনা শুরু করতে হয়, যেমন- কবিতা কি? এর উৎসারণ কি করে হয়? অথবা আরো সংক্ষেপে সে কথাটারও জবাব জানা চাই- বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির মধ্যে এর প্রকাশ কেনো? -এ বিষয়ে কবিদের যত না মত রয়েছে, তারচেয়ে বেশি কথা খরচ করেছে নন্দনতাত্ত্বিকেরা। আমি আজও নিজের কাছে এসবের কোনো উত্তর পাইনি। বা প্রশ্নও আমাকে অতখানি বিব্রত করেনি।
দেখা যায়, যে কথাটা মনে ধরেছে ভাবছি, তার রূপ দেখে নমিত হয় কামনাস্ত্র।
সহজ করে বললে, পথের ধারণা আছে, কিন্তু পথ জানা নেই। আর সেই পথে কত কী দেখার থাকতে পারে, যা পূর্ব ধারণাকে অনুমোদনও করে না।
তারপর আসে ভাবনার কথা। কত কী ভাবি, তা কি লেখা সম্ভব? লিখতে লিখতে একটা সূত্রানুসন্ধান করি কিন্তু, আবার তাকেই করে তুলি অপ্রয়োজনীয়।
আমি বিশ্বাস করি, লেখকের কাজ ক্রমাগত লিখে যাওয়া। লিখতে লিখতেই গড়ে ওঠে, আবার ভেঙেও পড়ে। তার শিক্ষা নিয়েই আবার প্রস্তুত হওয়া। শেষ বলে কিছু নেই, সমাপ্তি বলে কিছু নেই, নিজের নশ্বরতা উদযাপন ছাড়া।
আর আমি চেয়েছি নিজের চিন্তার সাথে যাপনের দ্বৈরথ মেটাতে। দেখি, দ্বৈরথটাই বেড়ে চলছে কলেবড়ে।

তিন

ক’দিন থেকে মনে হচ্ছে ভাবনার ভেতর কোথাও সাত-পাঁচটি চড়–ইপাখি আটকে আছে। আমি উপর থেকে তাদের দেখি, তারা নির্জনতায় এমন ডুবে আছে যেনো তারা ধূসর হতে হতে একদিন শূন্যে মিলিয়ে যাবে। আমি মুঠোয় একমুঠো শূন্য ধরে বলবো, ‘এই তো চড়ুই।’ অনেকেই হাসবে। আমি সে হাসির ধ্বনি বা দাঁত কিছুই দেখবো না চোখে। ততদিনে আমার চোখ ভ্রু’র নিচে জ্বলন্ত দুটি টর্চলাইট নয়।
আমি যেমন করে চড়ুই বা ধরো শূন্যতা দেখি, তাদের চোখ বা লিঙ্গ কোনোটাই আমি খুঁজতে যাই না। আমি তাদের ভেতর অবিরাম ইঞ্জিনের কম্পন টের পাই। সেই কম্পন আমি চোখ দিয়ে দেখি।
আমার জগত এমনই। আমার আঙুল থেকে যা বেরোয়, তা চড়ুই, জড়ো হতে হতে মাছ-তরকারির হাটবাজার হতে হতে, ধূসর নির্জনতার কবলে তারা মিলিয়ে যায়। আমি তাদের আর খুঁজে দেখি না।
এই শরীর আমি ভুলে থাকতে চাই। কামনা বা ক্ষুধার নিবৃত্তি আমার কাছে অজগরের মতো অলস পড়ে থাকা অভ্যাস মাত্র। আমাকে উদ্দিপ্ত করে এই শূন্য বানানোর খেলা।
একে কবিতা বলো তো, বলো।

 


জাহিদ সোহাগ

জাহিদ সোহাগ

জাহিদ সোহাগ। জন্ম: ১০ মার্চ ১৯৮৩, মাদারীপুর জেলা সদরের কুলপদ্বী গ্রামে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: আর্তনাদও এক বায়বীয় ঘোড়া, অসুখের শিরোনাম, ব্যক্তিগত পরিখা, ব্যাটারি-চালিত ইচ্ছা। সম্পাদনা: তিন বাঙলার শূন্যের কবিতা।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E