২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ১৬২০১৭
 
 ১৬/১১/২০১৭  Posted by

কবিতার অন্য মন্ত্র

জফির সেতু

জিললুর রহমান

জিললুর রহমান

নয়া যুগের নয়া কবিতার কবি জিললুর রহমান। তখন দশকব্যাপী সামরিক শাসনের পর স্বদেশে স্বৈরাচারের পতন হয়েছে, আর বিদেশে ঠান্ডা যুদ্ধের সমাপ্তি হয়েছে সোভিয়েট ইউনিয়নকে উনিশ টুকরো করে। বাজার অর্থনীতি আর এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা হাঙররূপে ধেয়ে আসছে, আসছে বিশ্বায়ন। শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিকতার মোহমুগ্ধতা। একদল তরুণ সাগর পাড়ের শহরে উত্তরআধুনিক কবিতা চর্চায় মাতোয়ারা, সে যুগের কবি জিললুর। কবি ও তাত্ত্বিক বন্ধুদের সহযাত্রী তিনিও। চট্টগ্রাম তখন কবিতার শহর।

লিরিক বেরুচ্ছে এজাজ ইউসুফীর সম্পাদনায়। লিরিক কেন পুষ্পকরথ, আড্ডারু, সমুজ্জ্বল সুবাতাস, মধ্যাহ্ন প্রভৃতি ছোটকাগজের দিকে চোখ সারাদেশের তরুণ কবিদের। লিরিক নিজেকে ঘোষণা করেছে উত্তরাধুনিক চেতনা ও দর্শনধারী হিসেবে। ডিমের ভেতর থেকে একে এক বেরিয়ে আসছেন বাংলাদেশের উত্তর আধুনিক কবিরা। তাদের মন্ত্র দিচ্ছেন তপোধীর ভট্টাচার্য, অঞ্জন সেন, উদয়নারায়ণ সিংহ, অমিতাভ গুপ্ত প্রমুখ তাত্ত্বিককরা। উত্তর আধুনিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের শিল্পসাহিত্য।

আমি তখন কবিতার সাঁতারু। কবিতা পড়ি, আমার সারা সত্তায় কবিতা। পড়াশোনা করতে এসেছি চট্টগ্রামে। কবিদের থেকে দূরে থাকি। সবুজ রেঁস্তরায় যাই। দূর থেকে কবিদের দেখি। হাফজ রশিদ খানের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। প্রিয় মানুষ তিনি, নিরীহ মানুষ, শক্তিমান কবি। পরিচিত হচ্ছি অন্যঅনেকের সঙ্গেও। আমার হাতের তালু ঘামছে।

উত্তর আধুনিকদের কথা অনেক শুনেছি; তাদের কবিতা পড়ি, তত্ত্বকথা পড়ি। কিন্তু আমার মনভরা সংশয়। উত্তর আধুনিকতা? কিন্তু আমাদের কবিতা কতটা আধুনিক? আমরাই-বা সত্যি আধুনিক? আর, যে-আধুনিকতা তিরিশে এসে ঢুকেছিল বাংলা কবিতায় বুদ্ধদেবদের হাত ধরে তা কি ইউরোপীয় আধুনিকতা? নাকি ইউরোপের বিশেষ দ্বীপের আধুনিকতা কিংবা আধুনিকতাবাদ? আর, আধুনিকতা পেরিয়ে আমরা সত্যি কি আধুনিক-উত্তর মানুষ? অন্তত ‘এই সবুজ করুণ ডাঙায়?’ অর্থাৎ আমি সংশয়ীই ছিলাম। কিন্তু তত্ত্বটা যা-ই হোক, তত্ত্ব পেরিয়ে কেউ কেউ কবিতাই লিখতে চেয়েছিলেন, লিখেছেন। প্রকৃত অর্থেই তা ছিল নতুন কবিতা, অন্তত বাংলাদেশের কবিতার অভিজ্ঞতায়। জিললুর ছিলেন সে-নতুন কবিদের একজন।

লিরিক কিংবা অন্যান্য ছোটোকাগজে তার কবিতা আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। অন্য অনেকের মতো পড়ে মুগ্ধও হয়েছি। কিন্তু কবিতা তার কতটা তত্ত্বনির্ভর আমি ভাবিনি। কখনো ভাবিও না। কবিতায় তত্ত্ব থাকলে কবিতাকে পরচুলা মানুষটির মতো খেলো দেখায়, ভেতরে করুণা জাগে। তার কবিতা পড়ে আমার মনে করুণা জাগেনি। যেমন রোজ যখন কবিতা পড়ি, কারো কারো কবিতা পড়ে, সত্যি কবিটির জন্য মায়া জাগে, এটাকে করুণাও বলা যেতে পারে। কেননা কবিকর্মটিকে শেষ পর্যন্ত কবিতাই হয়ে উঠতে হয়। প্রেম কিংবা কবিতার সঙ্গে তো আর ধস্তাধ্বস্তি চলে না, যেটা অনেকেই করেছেন, করছেন আজ অবধি। হয়ত ভবিষ্যতেও করবেন অনেক কবিযশপ্রার্থী। জিললুর আর যা-ই হোক ধস্তাধস্তি করেননি কবিতার সঙ্গে। তিনি সহজ মাটিতে সহজিয়া ফুল ফুটাতে চেয়েছেন। বাংলামাটিতে বিশ্ববোধের অনন্যরঙিন ফুল। প্রতিভাবানরা এমনই হন যুগে যুগে।

১৯৯৫ সালেই জিললুর রাহমানের প্রথম কাব্য প্রকাশিত হয়। অন্য মন্ত্র নামের বইটি তার কবিকর্ম ও নন্দনভাবনার প্রথম স্মারকও। যে-পাঠক পূর্বে জিললুরের কবিতা পড়েননি, অন্য মন্ত্র পড়ে তিনি ভাবিত হবেনই, হোঁচটও খাবেন নিঃসন্দেহে। একটা ভিন্ন ও অনায়াস অভিজ্ঞতার সম্মুখীন তাকে হতেই হবে, এবং এটা এ-কারণে যে, কবিতা তার পরিকল্পিত ও নতুন মেজাজের। যেহেতু তার কবিতা আমি আগে থেকেই পড়ে আসছি, আমার কাছে স্বাভাবিকই মনে হয়েছে নয়া কবিতার আস্বাদে। কিন্তু একটি কবিতার বই যেহেতু একজন কবির টোটালিটিকেই প্রকাশ করে আপাতত, সে কারণে বইটি আমার কাছে ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কবির কাছেও নিশ্চয় তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে এটা ঠিক তরুণ কবিদের প্রথম কাব্যে যেমন একটা তাড়াহুড়া থাকে, জিললুরেরও ছিল। সেক্ষেত্রে বইটাকে আমার সম্পন্ন কবিতার বই মনে হয়নি। হয়ত, সেটা কবির ভেতরেও তৃষ্ণাবোধ কাজ করেছিল, একটা অতৃপ্তিও ছিল। তাই, দীর্ঘ বিরতি দিয়ে, ১৫ বছর পর প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কবিতার বই, শাদা অন্ধকার, ২০১০ সালে। প্রথম বইয়ের টিপ্পনীর মতোই। আসলে দ্বিতীয় বইটি বের না হলে জিললুরের গোটা কবিমানসটা অনাবিষ্কৃতই রয়ে যেত, অন্তত যেটা তার কবিপরিকল্পনা বলে অভিপ্রেত হয়েছিল। বইটির ফ্ল্যাপেও লেখা আছে, এতে ‘আছে পরিকল্পিত মেজাজের বোধন’। আমারও তা-ই মনে হয়েছে। অন্তত প্রথম ও দ্বিতীয় বইয়ের কবিতাগুলোর ভাব, ভাষা, প্রকরণ-শৈলী ও উপস্থাপনা কৌশল দেখে। সবচেয়ে বড়ো বিষয় কবিতার প্রতি লালিত্যবোধ তথা টেকনিকের যে-মিথষ্ক্রিয়া তা আমাকে সবচেয়ে বেশি টেনেছে, ভালো লাগা ও ভাবিত করার বিষয় কথিত উত্তর আধুনিক অনুষঙ্গও।

অন্তত প্রথম বইয়ের প্রথম কবিতায় আমরা জীবনানন্দের অনুপ্রেরণার সন্ধান পেয়ে থাকি জিললুরে, এটা অননিবার্য ও স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক নয় শামসুর রাহমানের প্রেরণাপুষ্টতাও, ওই একই কবিতায়। কেননা, ‘জলপতন’ যেমন জীবনানন্দীয় চিত্রকল্প, তেমনি ‘চেঙমুড়িকানি’ও রাহমানীয় চিহ্নায়ক। আমি বলব, এতে করে জিললুর রহমানের পথ চিনতে আমাদের সুবিধাই হয়। আধুনিক বা আধুনিকতাবাদী বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ এক ফলবান ভূমি, শামসুর রাহমান বাংলাদেশের কবিতার। তাই জিললুর জানেন কোন ভূমির জলদ বাতাস গায়ে মাখতে হবে, কর্ষণ করতে হবে পললবেষ্টিত কোন সুফলা ভূমি। মাঝখানে তিনি থামেননি, এদিক-ওদিক না-তাকিয়ে সোজা তার সময়কে নির্মাণ করেছেন ‘সীমাবদ্ধ আধুনিকতার বিপরীত মননে’। যে-সীমাবদ্ধ বোধ, মনন ও আরোপিত অনুসিদ্ধান্তে বাংলা কবিতা টবের ফুলে রূপান্তরিত হচ্ছিল, তাকে তিনি পাশ কাটিয়ে লতা-পাতা ও পাঁপড়িতে নিজভূমের এক স্বকৃত পুষ্পই ফোটাতে তৎপর হন। সন্ধান করেন এমন এক বিকল্প আধুনিকতা, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সহস্র বছরের বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও গৌরব।

তিরিশি আধুনিকতাবাদ ধারণ করেও জীবনানন্দ এক বিকল্প আধুনিকতা সৃষ্টিতে প্রয়াসী ছিলেন, শামসুর ছিলেন তার নাগরিকমনস্ক উত্তরসাধক, মাহমুদ ছিলেন লোকজঘেঁষা। বলাবাহুল্য দুজনই সমান জীবনানন্দীয় ঘরানার। অবশ্যই ঐতিহ্য, মিথ-পুরাণ, লোকমানস ও সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ-জাত। জিললুরের যাত্রাপথের ইশারা সেখান থেকেই। ষাটের কবিতায় যে-বৈশ্বিক নন্দনতত্ত্ব, অনেকটাই তার কবিতায় উপেক্ষিত হয়। যদিও ষাটের জাতীয়তাবাদী চেতনা তার কবিতার মূল অনুষঙ্গ। বাংলাদেশের অভ্যুদয় বাঙালজীবনের সবচেয়ে বড়ো ঘটনা ও জীবনপথের ইশারাবাহীও। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মানুষের সকলপ্রকার চিন্তা-চেতনার সঙ্গে নন্দনভাবনারও পরিবর্তন ঘটে। কবিকুল উৎসুক হয় কবিতার নিজস্ব নন্দন আবিষ্কারে। কিন্তু সত্তর দশকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের কবিরা যেমন একটু থিতু হতে চেয়েছিল, আশিতে তেমনি সামরিক শাসন নব্যরাষ্ট্রটির কাঁধে চেপে বসে। নব্বইয়ে এসে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বড়ো ধরনের পটপরিবর্তন ঘটে। তখন সারাপৃথিবীতে ঘটে গেছে নানা নন্দনতাত্ত্বিক ঘটনা ও পরিস্থিতি। ইউরোপ ও আমেরিকায় এসেছে বিভিন্ন তাত্ত্বিক বয়ান ও শিল্পসৃষ্টি। লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকায় তো রীতিমতো ঘটে গেছে শিল্প-সাহিত্যের বিপ্লব। উত্তর আধুনিকতার হাওয়া তখন বাংলা কবিতার পালে লাগে।

জিললুরের কবিতার পাঠ আবহমান বাংলা কবিতা থেকেই নিতে হয়। তার কবিতার উৎস চর্যা থেকেই। কিন্তু ডাল বিস্তার করেছে জার্মানির আউশ্উইৎ্স নরমেধযজ্ঞ পর্যন্ত। কবিতার স্মৃতি ‘উঁচা উঁচা পাবত তহী’র শবরী বালিকা থেকে ‘ঝিনুকের খোলের আসনে বসা’ আফ্রোদিতি পর্যন্ত। দর্শনের দিক থেকে চর্যার মরমি সহজিয়া থেকে সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ পর্যন্ত। আর মিথের কথা যদি বলি, বাংলার লোকপুরাণের বেহুলার ভাসান থেকে ভারতীয় কুরু-পাণ্ডবের রাজপাশাখেলা পর্যন্ত, এমনকি সেমিটিক মিথ অতিক্রম করে গ্রিক-রোমান মিথের চিহ্নায়ক সন্ধানীও।

বাংলা কবিতার নিজস্ব প্রকরণের দিকে তার ঘূর্ণন যাত্রা পরিলক্ষিত হতে দেখি। চর্যার গানে যে-একটা ঠাট আছে, কিংবা পদাবলি সাহিত্যের নম্র মেজাজ সেটা তার কবিতায় ঘুরে ফিরে আসে। কিন্তু বাংলা কবিতা যে-অতি আবেগ বা ব্যক্তির আত্মপ্রক্ষেপের বাড়াবাড়িরকম উপস্থিতি তা তিনি স্বজ্ঞানে পরিহার করে আমাদের কবিতাকে বৈশ্বিক মন্ত্র দিতে চান। ফলে মঙ্গলকাব্যের কাছে তিনি বারবার ছুটে গেছেন, হাত পেতেছেন বিস্তর মৈমনসিংহ গীতিকার অপারসম্পদেও। শুধু তাই নয়, ফারসি সাহিত্যের মধুকর যে মধ্যযুগের বাংলার মুসলমান কবিরা, তাদের সাহিত্যের উপাদানও এসেছে নতুনভাবে নতুন প্রতীকে।  অন্যদিকে বাংলার চিরাগত মরমি ভাব দুটো কাব্যের সর্বত্র সোঁদাগন্ধের মতো লেগে আছে।

জিললুর আত্মস্থ করেছেন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও তার সমকালকে। এটা করতে পেরেছেন বলে তার চেতনা অবিভাজ্য। ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের, মিথের সঙ্গে প্রাত্যহিকতার, আর রূপকথার সঙ্গে বাস্তবতার। এখানেই তার বিনির্মাণের খেলা। তার বিনির্মাণ ইতিহাস, মিথ-পুরাণ বা রূপকথার নয় শুধু, সমকালীন বা অগ্রজ কবিদের অনুষঙ্গ-উপাদানকেও নিনির্মিত করেন অনায়াসে কবিতায়। আমরা দেখতে পাই কালিদাসের ‘মেঘদূত’, আবুল হাসানের ‘ঝিনুক নীরবে সহো’, জীবনানন্দের ‘হায় চিল’ কিংবা শহীদ কাদরীর ‘সংগতি’ কবিতা কীই-না অসাধারণভাবে বিনির্মাণ লাভ করেছে নতুন চেতনা ও প্রকরণে।

অন্য মন্ত্র ও শাদা অন্ধকার থেকে এবার কিছু উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে, যাতে পাঠক আমার ভাবনার সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারেন।

১.

এ বেলা হবে না নাওয়া

জলপতনের শব্দে মূর্চ্ছা যাই

সাজানো বাসরে কাল নাগিনীর ফণা

তবু এসো ভাত খেয়ে নিই ভাত

খিড়তি দুয়ারে নড়বড়ে ঝড়ে কাঁপা ও শিথিল

চেঙমুড়কানি অট্টহাস্যরত

ডিঙা ডুবে যাক মান যেন থাকে জিতে

যে ফণা নামে তাকে বড় ভয়

কালবৈশাখী তেড়ে আসে বন্দরে

ষড়সন্তান মৃত্যুর কবলে ডিঙা বাও মাঝি ডিঙা

এ বেলা হবে না নাওয়া

 জলপতন, অন্যমন্ত্র

২.

অন্য স্মৃতির কথা ভাবতে ভাবতে আমি

অন্য মন্ত্র করি পাঠ

রামরাজ্যের গায়ে টোকা দিয়ে শুনতে শুনতে চলি

সংস্কারের ঘূণ খুঁড়ে যাচ্ছে নিদেন শরীর

ভুল রোমে নাড়া দেয় বাতাসের গোপন খেয়াল

            মহাপুরুষের গা থেকে চাদরের মতো

                             একে একে

                     খসে পড়ছে মাথা-ধড়-পা

                              কিংবা বিশ্বাস!

কালের মন্দিরা, অন্যমন্ত্র

৩.

 …

অবোধ শিশু পুনঃ ক্রীড়ামত্ত আগামী সকালে এবঙ ইতিহাস

পুস্তকের পৃষ্ঠায় জোর শোরগোল

           ‘হাঁউ মাঁউ খাঁউ  মানুষের গন্ধ পাঁউ’

প্রাণভোমরা লুকিয়ে কোন ডোবায়, জলাশয়ে?

প্রাণভোমরা, অন্যমন্ত্র

৪.

মৌমাছি ওড়ে, ঘুরে ফিরে তোমার চৌদিক

                   একিয়ান প্রণয় পিপাসু

আফ্রোদিতি, নগ্নিকা, ছড়াবে শিল্প কতো আর?

প্রায়ান্ধ আকাশে কাঁপে হেফাস্টুস

             আর তুমি অ্যারাসের অঙ্কশায়িনী

ফিরোজা পাথরে বসে নিজেই পাথর তুমি

ঝলমল পান্না সবিশেষ।

ট্রাইটন বাজিয়েছে শাঁখ তার

গিরিবাজ কবুতর বিকেলী আকাশে ওড়ে

                                 ডিগবাজি খায়।

সিথেরায় সুবর্ণ মেয়ে, অন্য মন্ত্র

৫.

চন্দনপুরা মসজিদের সুউচ্চ মিনার থেকে লাল কবুতর

                                      উড়ছে পশ্চিমে

গোধূলি আকাশ তাকে শাদা শুভ্র মেঘে দেবে

মরুর রুমাল শাদা কাফন পরাবে গায়

লাল কবুতর শান্তি পতাকা ওড়াবে দিকবিদিক

ফোটে বোমা সড়কে সমরে ফোটে বাজি বাকবাকুম

উত্তুরে বাতাস জুড়ে গন্ধকের তীব্র ঝাঁঝ

কাঁদনে গ্যাসের অশ্রু শিশির প্লাবন

মসজিদ হতে লাল কবুতর ওড় পতপত

শাদা পতাকার

সমস্ত অস্তিত্বে আজ অতঙ্কের লাল কবুতর

লাল কবুতর, অন্য মন্ত্র

৬.

দরবারে সকলেই ধৃতরাষ্ট্র আর গান্ধারী। নির্বাক অমাত্য মাঝে শকুনির কী

অদ্ভুত চোখের বিদ্রুপ। স্তব্ধতার অবসরে শুধুমাত্র দ্রোপদীর স্বর :

                        ‘কোথা কৃষ্ণ, রক্ষো আব্রু’

বিশতি শতকে বুঝি কৃষ্ণ বাড়ায় দয়ার্দ্র সাহায্যের হাত।

আমাদের কৃষ্ণ হোক আপন সন্তান, সকালে সন্ধ্যায় যারা মাটিকে নির্ভর

করে। ধান ও জলের ধ্বনি যাদের হৃদয়ে তোলে দোতারার সুর। পরশপাথর

খুঁজতে দাও খ্যাপর মতোন।

আব্রু, অন্য মন্ত্র

৭.

ঝিনুক সইতে পারে আমি তো সইবো না।

মনসা ছোবল তুমি দিওনা এ দুর্দৈব দেশে

আমি তো বেহুলা নই, ভেলা ভাসিয়ে গাঙ পাড়ি দেবো

সাবিত্রী নই আমি, হানা দেবো যমপুরী।

সফেন ভাতের গন্ধে আমি তো আকুল

পাখির কাকলি শুনে দিনের দু-বেলা করি পার।

ঝিনুক সইতে পারে আমি তো সইবো না।

বুকের ভেতরে মুক্তা বেড়ে ওঠা জটিল ক্যান্সার

দেবে না দু-দণ্ড শান্তি দারুণ বর্ষায়।

ঝিনুক সইতে পারে, শাদা অন্ধকার

বহুবিধ রূপকের আমি এক ঝাপসা একক

আমাকে ঘিরেছে নীল ক্যামোফ্লেজ, নিজেকে দেখি না নিজে…

চারপাশে নিতান্ত ইমেজ শুধু আমাকে জড়িয়ে ডাকে

                    ‘কেবলি প্লাস্টিক হও, ফ্যান্টাস্টিক হও’

মুখোশে শ্রমণ ঢাকা, হৃদয় মন্দির জুড়ে সিডরিক ভরত ককটেল তৃপ্তি…

বোধের বিকল্প বুঝি কৌশল-চাতুরি-রোডম্যাপ

হৃদয়ের উষ্ণতা না, মাপকাঠি আজ সারফেস-টেকশ্চার-মুখোশ-মুখোশ

বহুবিধ রূপকের আমি এক ঝাপসা একক

বোধহীন আধা জাগরুক স্বপ্নভুক, জীবনের জালে মোড়া…

আহ্! আমাকে বেরুতে দাও কুহকের জটাজাল থেকে।

জালে জটাজালে, শাদা অন্ধকার

লালনের ডেরা থেকে নদীতে ভাসে নৌকা-শিলাইদহ ঘাটে আমাদের প্রথম

পদচ্ছাপ। ভ্যান গাড়িতে পা দুলিয়ে দু-বন্ধুর নিরব আলাপ-মেঠোপথ-

লাল মরিচের গালিচা বিছানো আবাহন! পৌছে দিলো শানবাঁধানো পুকুর

ঘাটে-দূরে লাল কুঠিবাড়ি-ধীরে অতি ফেলেছি তো পা-পাতার শব্দের

ফাঁকে বেজে ওঠে চেয়ারের পায়া…

শিলাইদহের যাত্রী, শাদা অন্ধকার

১০

আমাকে আল্লার রঙে কতোকাল রাঙিয়েছে পবিত্র কোরান

স্বপ্নজালে বাঁধা হুর-বেহেস্তী উদ্যান জুড়ে অনন্ত যৌবন

সাগর গর্জন কানে ভোলে না পাহাড় সানু সময়ের প্রতিটা আঘাত।

স্বপ্নযুদ্ধ কোনোকালে টেনেছে বিপ্লবে

কেবলি ত্যাগের শিক্ষা কেবলি আত্মপীড়ন

বহুকাল বহুযুগ শ্রমণে হৃদয় বন্দী

যুগোত্তীর্ণ ভান্তে দিন স্বপ্নহীন শূন্যদিন।…

স্বপ্নদিন, শাদা অন্ধকার

১১.

আশঙ্কায় ঠোঁটের কাঁপুনি তবু স্বপ্নালু দু’চোখ

জুম চাষে নিবিষ্টতা হালখাতা রাজদরবারে

ব্যঞ্জনের নানান ব্যঞ্জনা

হৃদয়ে অনন্ত স্বাদ মহুয়ার

হী-দল রাঙ্গামাইট্যা…

               আমি এই মাটির যুবক।

বিজু বন্দনা, শাদা অন্ধকার

এভাবেই জিললুর রহমান তার কবিতার পরিমণ্ডল তৈরি করেন অসাধারণ কবিভাষায়। তার নতুনত্ব বা অভিনবত্ব এখানেই। রামায়াণ-মহাভারত-কোরান-ইলিয়াড-অডিসি প্রভৃতি উৎস থেকে তিনি নানা প্রতীক ও চিহ্নায়কগুলো কবিতায় নিয়ে এসেছেন স্বতঃস্ফুর্তভাবে, স্বাভাবিকতা দিয়েছেন ভাষা ও বিষয়ের প্রয়োগে এবং সমকালীন অনুষঙ্গে। কবিতায় তার অবস্থান সুষ্পষ্ট ও বহুমাত্রিক। সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার মধ্যবিত্ত জীবন পেরিয়ে তার কবিতা জায়গা করে নিয়েছে ঘামেঝরা মানুষের লৌকিক জীবন। ফলে নিম্নবর্গীয় চেতনার সঙ্গে মাটির সোঁদাঘ্রাণ একাকার হয়ে কবিতার বিষয়ীকেও করেছে লৌকিক। এ-প্রসঙ্গে তপোধীর ভট্টাচার্যর মন্তব্য হচ্ছে, জিললুরের ‘কবিতা ঐতিহ্যের চিরায়তনকে মিলিয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক ব্রাত্য জীবনের অনুষঙ্গে। নতুন চিহ্নায়ন প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্মৃতি ও সত্তার দ্বিবাচনিকতা উত্তীর্ণ হয়েছে পুনর্জীবিত ও পুনঃরূপায়িত পাঠ-সংহতিতে।’ সুতরাং, জিললুরে এসে, বাংলা কবিতার এই বিবর্তন আধুনিক না উত্তর আধুনিক-তার বিচার করবে সময়ই। তবে সিদ্ধান্ত এই যে, জিললুর রহমানের কবিতার মাটি, গাছ, পাতা ও ফুল দেশীয়; কিন্তু আলোক তার সৌরবিশ্বের।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E