৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ১৫২০১৭
 
 ১৫/০৭/২০১৭  Posted by
উদয় শংকর দুর্জয়

উদয় শংকর দুর্জয়

উদয় শংকর দুর্জয়ের একগুচ্ছ কবিতা


আনমনা রোদ্দুর ভেজায় হৃতমহল

বাদামী এনভেলাপ খুলতেই উড়ে যায় গুচ্ছ গোলাপ; টুপটাপ
লাজুক শব্দগুলো লুকোতেই পশ্চিমে ওঠে মেঘের দেয়াল। তখন
জানালায় নেমেছে ঘনঘটা, আঁচলের আড়ালে রোদনসূত্র গুছিয়ে নিয়ে
এক ঝাঁক বিহগ ঠিকানা ভুলে উড়ে যায়। মোহনচূড়ার পিঞ্জরে লেখা গিরিখাদের
পাণ্ডুলিপি পড়তে পড়তে অশ্রুপাতের রং বদলায়। বালিকা তখনো খণ্ড খণ্ড মেঘপুঞ্জের
মাঝে দৃষ্টি ফ্যালে; প্রত্যাশিত আলোক বিন্দু দেখাবে বৈকুণ্ঠের দুয়োর।

সব ভাঙা স্যুটকেস, জামার বোতাম, স্কুল ইউনিফর্মের ছেঁড়া হাতা, পিতলের মেডেল
গোছাতে গোছাতে অভাগিনী, শুকিয়ে ফ্যালে অদৃশ্য সজল প্রপাত। ফিরে যায়
লিখিত দলিলে, যেখানে কালির স্বাক্ষরে ঘটেছিল শুধুই দেহ বদল। তবু বদলে যায়নি
মনের অভিধানে লেখা যত সুখ-যাতনার ত্রিলিপি। পুরুষতান্ত্রিক নীতির কাছে হেরেছে
মূল্যবোধের সবক’টি অনুরাগ; চুর চুর হয়ে গ্যাছে ছান্দসিক ইচ্ছে যত।

একদিন দখিন হাওয়ায় সরে যায় বুকের কাপড়; হু হু করে ঢুকে পড়ে কোনো ইংলিশ
হ্রদের বৈকালিক ঐকতান। উদ্বেলিত ঢেউ, আঁধার চৌচির ক’রে এসে দাঁড়ায় অন্দরচিত্তে। কবিয়াল যেন
ঠিক ঠিক অস্পৃশ্য অবয়ব। যেদিন বেডরুমের সব ধুলো সরিয়ে একদল প্রজাপতি ঘরময় ওড়ে, সেই থেকে
রুপুর সব অজানা সৈকত হঠাৎ শ্রাবেন ড্যাফোডিল আর পুরুষ জিনিয়ার বাগান হয়ে ওঠে।
আনমনা রোদ্দুর ভিজিয়ে দিয়ে যায়, পড়ে থাকা হৃতমহলের ঝিমানো বাতিগুলো।


নিমগ্নতায় ইস্টিমারের অন্তরিপা গীত

তোমাকে দেখার পর এক অবিরাম সোনালি মেঘ নেমেছে সমুদ্রালয়ে।
তামাটে তানপুরায় বেজেছে হাওয়াই বাঁশি। ভেজাভোর আলোকরাশি ছড়িয়ে দাঁড়িয়েছে
গৃহমন্দিরে। তারপর থেকে দিকভোলা হরিণ বালক ইচ্ছে করেই ভুলে যায় ফেরার ঠিকানা।

তোমাকে দেখার পর ক্লাক্টন সীর সব মধ্যরাতের বাতিরা নেমেছে
বালুর সংসারে। আঁজলা ভরা এক শীতল-শুভ্রতা পান করতেই
কলরোল বেজে উঠেছে নির্জন রথে। সেই দেখার পর চৈতন্যের ভেতর
আলোর জোনাক ছুটছে গ্রহপুঞ্জের মতো।

বিষাদসূত্রে বাঁধা যত দগ্ধ ঋতুর গান, সব যেন মুছে ফেলেছে উইলোদের বেলান্তের ছায়া।
উড়াল পর্বত থেকে কাস্পিয়ান সমুদ্রে ঝরে পড়া নিশ্চুপ বিরহ থেকে রাগিণী শিখেছে
উন্মাদনার স্বরলিপি। অম্বলা নদীর বুকে দাঁড়িয়ে ওয়াটারমিল খুঁজেছে
রুপুর হাতে জড়ানো অদৃশ্য মায়ার প্রপাত।

তোমাকে দেখার পর থেকে তুষার ওমে মুছে গ্যাছে
ডী-নদীর নিঃসঙ্গ অস্থিরতা। সোয়ানের ডানায় জলবায়ু ফেলেছে
সবুজ চিহ্ন; শিমুল তুলর মতো উড়ছে সফেদ ঢেউ শৈতিকা ভূ-গ্রহে।

তোমাকে দেখার পর
লণ্ডভণ্ড করা টিসুনামি, ক্ষমা প্রার্থনা পূর্বক ফিরে গ্যাছে, ব্যাকওয়ার্ড দৃশ্যের মতো।
ঠিকঠাক পত্রারাণ্যে নেমেছে আনন্দআলো। কার্জন পার্ক গাইছে নিমগ্নতায় ডুবে থাকা
ইস্টিমারের অন্তরিপা গীত।


উড়ছে মেঘের পালক শ্রাবণের মাঠে

উড়ছে মেঘের পালক শ্রাবণের মাঠে, আঁধারে পুড়ছে আলো বৈকালিক প্রিয়টানে
সবকটি জানালা খুলে গেলে রোষাবেশে, মুঠো ভরা আর্তি ঢুকে পড়ে কঙ্কণ সুরতানে
ঝরে গেলে দগ্ধ অশ্রু বিষাদ অনুরণনে, ঝাঁক সাজবাতি জোনাক কুড়িয়ে আনে
অমন করে ফেলে গেলে চিহ্ন হৃত-পাথরে, শুধু ছুঁয়ে দ্যাখ রক্ত-রঙ দীপ্ত অভিমানে

ও চোখের উদ্যানে সবুজ গাছালি মৃদুমন্দ পায়ে, বহুকাল পরে সে খুলেছে মন বিচরণে
একদল হরিণ শাবক দাঁড়ায় সচকিত চোখে, ভোরের ভেজা তৃণ মেখে খোঁজে সমীরণে
রুপোলি মাছ শিকারের কৌশল রেখে গেলে, স্রোত এসে খুঁজে যায় তিথির অবলম্বনে
এক মাঘী পূর্ণিমায় আকাশ পাশে হাঁটলে, পাল তুলে হৃতমনা নৌকা বয়ে যায় উজানে

এক মধ্য দুপুরের ছাই উড়িয়ে নিলে আঁচলে, একাকী মাঠ পেরুবার কালে আনমনে
শৈশবের সব ফুল স্মৃতির পৃষ্ঠা ভুলে গেলে, শুকনো পাতায় লেগে থাকে ধুপ সন্ধ্যা নভমনে
কুয়াশা কাল পেরুলে হঠাৎ উজ্জ্বল আঁধারে, জপে যাবে এক শুক্লপক্ষ সে নাম প্রাণমনে
এক মরু মিছিল রেখে মৃদু সুবেহসাদিকে, এক ভীরু খরগোশের মতো লুকিয়ে যাবে সন্তর্পণে


ছেড়া ছেড়া মেঘপুঞ্জ

১।
প্রাচীনা রূপবতী বন্দরে ভিড়েছিল সাইরেন পেরিয়ে আসা আলবার্টাস,
ঘুম চোখে মানচিত্র দেখতে দেখতে জেনেছিল, কাঁটাতারহীন ভূগোলকের কথা। একদিন প্রত্যাশার দেয়ালে ফুটবে জোস্নার ফুল, তাইতো তামাটে ডানায় জমে থাকা ওম, ভুলে গ্যাছে ফেরার ঠিকানা।

২।
দক্ষিণ পাঁজরে জমে থাকা একশ’টি প্রপাত, বিস্ময়বোধক চিহ্ন ঢেকে দিতে
কিছু সোনালি মাছ বদলে ছিল গতি। তবু সে প্রপাত এখনো বহমান

৩।
যুদ্ধাহত জাহাজ সব বিষাদ কুড়িয়ে এনে দাঁড়াত উঠোনঘাটে, এক মৃত্যুজাত ট্রাক
দিব্য ফেলে যেত খবরের কাগজ। মৃতের নামের জায়গায় লিখত ফুলের নাম,
আমরা সেসব ফুলের নাম জেনে নতুন অবলম্বন খুঁজতাম পারা ঝরা আয়নায়…

৪।
সূর্যের নষ্ট আলোয় ভোরগুলো রোজ রোজ পুড়ে যায়, স্ট্রবেরির শরীর থেকে খসে পড়ে
শিশুদের রক্তের হিমোগ্লোবিন, তবু লেন্সের পর লেন্স লাগিয়ে ঘাতক খুঁজে পাই না।

৫।
ভোর হতেই ক্ষয়ে যাওয়া জীবনের নামগুলো কুয়াশার মত ঝরে কফি কাপের বারান্দায়
এত অন্ধকার এত বিভেদের দেয়াল তবু স্বপ্নের সোনালি মেঘ নামে আকাঙ্ক্ষার দরজায়


সোনালি মেঘের দল

একদিন লিখতে লিখতে সোনালি খণ্ড-মেঘেরা বাজালো নূপুর
তরঙ্গ পায়ে উচ্ছল নদী উঠলো সেজে, খুন করে মধ্য দুপুর
যাতনার শহর পার হয়ে, শঙ্খচূড়া পেলো সুদূর আলোর দেখা
আকাশ বাতাস পিছনে ফেলে, কপালের টিপ ছুঁয়ে দেখল একা

একদিন গাইতে গাইতে হরিণীর সুরে, হেঁটে গেলে জুনিপার দেশে
হাতে বকুল সৌরভ, পলাশ আর রক্ত জবার ছোঁয়া নিয়ে বাঙালি বেশে
সিঁথিতে সূর্যের গুড়ো, হাতে রুপোলী বীণা, ধীরে ধীরে নামলে কিনারায়
ম্যাপল পাতা স্বাগত জানিয়ে, রেখে গেলো মুকুট এক শুভ্র বিছানায়


সেই সব রাত্রিদিন

নদী-প্রবাহের বিবর্তন স্মৃতিতে, ফেলে যাওয়া পায়ের চিহ্ন ধরে হেঁটে গেলে গিরি খাদের
অধিবিহ্বল শোক সংসার। পত্রচ্যুত ধ্বনি অবলম্বন করে একদল অতিথি জিরাফ হরিদ্রাভ আলোয়
দ্যাখে রঙের সমীকরণ। কোমল শিলাচূর্ণের ধ্রুপদী লহরী, ছুঁতে গিয়ে জলের দেহ, ফিরে যায় সজ্জায়।
ফেলে আসা সেইসব মৃত্যুসংগীত, সেইসব ক্রন্দিত দুপুর গ্রহণকালে পাঠ করে অনিঃশেষ সংজ্ঞা বিভেদের

এক বিসুখের মহাকাল পেরিয়ে আসতে চাওয়া; তবু মৃত্যুমিছিল কিছুতেই ফুরোতে চায় না। ধূসর গৃহনদী
স্নেহবিয়োগের আচ্ছন্নতা কাটিয়ে হতে চায় শ্যামল সন্ন্যাস। রাশি রাশি পরাজিত ছায়ারা মুছে ফেলে ঘাত,
তুমুল পায়ে দাঁড়ায় আরেকবার। এই অরণ্য, এই অনিরুদ্ধ বিকেলের মায়াময় স্নান জোছনা ফেলে যদি
একবার শিখে ন্যায় ধনুর্বাণ-উপপাদ্য। সব ক্রুদ্ধস্রোত শপথের পালে রোষ-নিঃশ্বাস রেখে জন্ম নেবে যুবতীনদী

অগ্নিগর্ভের বুকে জেগে ওঠা চিত্রকল্প থেকে, পাললিক-নদী ফের ছবি আঁকে সংবেদন নিরালার। অপ্রকাশিত
সে আত্মজীবনীর পত্র-পল্লব-মুকুলে, গভীর সমুদ্রদেশের সাঁজোয়া যান লিখে রাখে বাঁচবার উপকরণ।
পুনর্জন্ম পর্ব শেষ হলে সন্ন্যাসদশা পূর্ণ করে ফিরে আসে লোকারণ্যে। অরুণরাঙা দিন আসে উড়ে, বিভাজিত
চুক্তির জ্যোতির্বলয় থেকে ভেসে আসে মন্ত্রমুগ্ধ ঐকতান। এক সোনালি কেতন ছোঁয় উচ্ছল সমীরণ


সিক্ত বেহালার ভৈরবী সাজ

তুমি চাইলে কতটা মেঘ পথিক হয়ে ওঠে
এক বৃষ্টি-বারান্দা হঠাৎ নদী হয়ে বইলে
অমন সিক্ত বেহালা উজানেতে বাইলে
সব অভিমান শীতের পেয়ালা ভ’রে ওঠে

তুমি গাইলেই বাদল, রাগিণীর সুরে বাজে
উদ্যান; পাইনের বাকল আঁচল হয়ে উঠলে
জল কল্লোল সোনালি বৈভব মুছে ফেললে
নকশি হাতে আলোরা ছোটে ভৈরবী সাজে

তুমি ভেড়ালে ঢেউ, যাতনা নদী হয়ে নাচে
পাথর জল হরিৎ শরতের কোনো মহাকালে
বৃষ্টি মাখা সফেদ পারাবাত সামনে দাঁড়ালে
আরেকবার অনঘ পরান পাগল হয়ে বাঁচে


রংতুলির জলসায় আনন্দ মহল

হেমেন মজুমদারের ক্যানভাসেই এমন সিক্ত বসনারা ঝরিয়ে যায় বহুমাত্রিক
রামধনু। সমুদ্র শরীরে জড়িয়ে অঙ্গনা কখনও হয়ে ওঠে অবিরাম ইরোটিক
প্লাবিত ঝর্ণারাশি গতিপথ বদলে ন্যায়, রুপালি লিরিল বালিকাদের সৌম্য
দেখে। ঝুলন্ত মেঘ সলিটারি রিপারের গুঞ্জন শুনে আরও কাছাকাছি ভৌম
নেমে এলে, অন্তর্বাসের গোপন চৌকাঠে ছাপ ফেলে যায় বয়ঃসন্ধি বালিকা

জিবনানন্দীয় পুকুর ঘাট এখন শোবার ঘরেই। কৃত্রিম জলজ ধারায়
শুধু সিক্ত এখন ত্রিমাত্রিক তনু। ভ্যানগগ পিকাসো; চকচকে রং মেখে
হয়েছিল পশ্চিমের। রূপের বাঙলায় সুলতান দেখেছিলেন বিশালকায়
রংসিক্ত রমণী। অঙ্গে জমে ছিল হিম পুলক। উন্মাদনা ফুটেছিল চিবুকে

এখন নগ্ন পুকুর-জল আর সিক্ত আঁচলে সাজবে কোন সে পোড়ামুখি
কোন বেহায়াপানা এখন দুরন্ত পায়ে; ঝংকার মনে রাখবে জল দাপানি

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E