৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ০৫২০১৭
 
 ০৫/০১/২০১৭  Posted by

উদয় শংকর দুর্জয় -এর কবিতা-ভাবনাঃ কবিতার ভ্যাজানো দুয়োর খুলে যাক  

উদয় শংকর দুর্জয়

উদয় শংকর দুর্জয়

রোমানিয়ান কবি পল সেলান বলেছেন “আমার কবিতা বার্তা লিখে বোতলে ঢুকিয়ে সমুদ্রে ছেড়ে দেয়ার মতো। আমি জানি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে বার্তা কারো কাছে পৌছবে না। কিন্তু সৌভাগ্যবশত যদি কেউ সে বার্তা পেয়ে যায়, সে আশায়ই লিখি”।

বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা সম্পর্কে বলেছেন “a European writing in Bengali”। অর্থাৎ বাঙলা কবিতায় যে তারা আজ জ্বল জ্বল করছে তাতে পাশ্চাত্যের ঋণ অস্বীকার করা যায় না। তার আগে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কবিতা জীবন শুরু করেছিলেন ইংরেজি কবিতা দিয়ে। লিখে ফেললেন ‘ক্যাপটিভ লেডি’। পাড়ি জমালেন বিলেত তারপর ভারসাইতে বসে লিখলেন বাঙলা সনেট। সেখানেওতো ছিল ইউরোপিয়ান শিল্প সংস্কৃতির নির্যাস। ইংলিশ রোমান্টিক কবি লর্ড বায়রন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। কবি ভাস্কর চক্রবর্তী কবিতা সম্বন্ধে বলেছেন “যে মানুষ একজন মানুষের পাশ থেকে মসৃণভাবে সরে যায়, পারমাণবিক পৃথিবীর বিরুদ্ধে তার কোনো কোথা বলার অধিকার নেই। যেন সাধারণ মানুষের দুঃখের সাথে সারাজীবন জড়িয়ে থাকতে পারি। যেন কাজে আসতে পারি তাদের’’। কবি যতীন সরকার বলেছেন “কবিকে জাতিস্মরের মগ্নতায় অবতীর্ণ হতে হবে। এখন কবি যদি জাতির আয়নাটা না লিখতে পারেন তবে সে অক্ষরমালা মৃত”।

কেউ কেউ বলছেন কবিতা আসলে বোঝার কিছু না, কবিতা শুধু পড়ে যেতে হবে; ঠিক গোলাপ-বাগানের পাশ দিয়ে হেটে গেলে যে কারুকাজ আর সৌরভ উপলব্ধি করা যায় ঠিক তেমনি কবিতার বাগানের পাশ দিয়ে বিচরণ করে যাওয়া। এখন কথা হচ্ছে কবিতার ভেতরে রূপ-রস-সৌরভের যদি উপস্থিতি না থাকে সে ক্ষেত্রে পাঠকের বদ হজম হতে পারে।

মনের গহনে ভেজানো থাকা আবেগ ও অনুভূতির দুয়োর খুলে দাঁড়ালে যে ফল্গু ধারার প্রবাহ ঘটে, আর সে প্রবহমান ধারায় যে সব শব্দপুঞ্জ মূর্ত হয়ে ওঠে তাই কবিতা। জীবনের সব সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে শুদ্ধ অবগাহন শেষে যখন আকুতিগুলো নান্দনিক হয়ে ওঠে। কবিতা যেন হয় আনন্দপাঠ; উপলব্ধির রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন পৌঁছে যায় ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া। প্রভাতের তির তির হাওয়া যেমন পাতাকে দোলা দিয়ে যায় ঠিক তেমনি কোনো পঙক্তি প্রাণে দোলা দিয়ে গেলে হয়ে ওঠে কবিতা। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত; নগরায়নের পর নগরায়ন যেন ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে বন বনাঞ্চলের ছায়া-মাখা মায়া মমতা। মানুষের কোমল হৃদয়গুলো এখন কংক্রিট বোঝাই জাহাজ হয়ে উঠেছে। জীবন জীবীকার এই ব্যাস্ত জীবন নিয়ে কবিতা-খণ্ডে পাঠক কিছুতেই মুখ লুকোতে চাইছে না। কবিতার গতিপথ বদলে গেছে, বদলে গেছে অন্তর্নিহিত শব্দকল্প। এখন অভিধান খুলে কেউ পাতা উলটাতে চায় না বরং বোঝার ভান করেই পাঠটি শেষ করতে চায়। এখন বেশিরভাগ কবিতাই মানুষের কথা বলে না, প্রকৃতির মমতা থেকে যোজন যোজন পথ দূর দিয়ে হেটে যায় কবিতা। কবিতা এখন ভেজা চুল শুকোতে দাঁড়ায় না রোদ্দুরের বারান্দায়। কবিতা এখন শুধু কবির আত্মকথনে ভরপুর; নিজের বিরহী বেদনা প্রেম ভালোবাসায় ভোরে তোলা নৌকা যেন নিরুদ্দেশে মেলেছে ডানা। তাহলে কবিতার ভবিষ্যৎ! কবিতা বেঁচে থাকবে কবির বইয়ের প্রাসাদে আর দোকানের ধুলো পড়া তাকে নয়তো গুদমে। তবু কবিতা বেঁচে থাকবে কারন কবিতার মতো বিদ্রোহ আর শক্তিশালী অনাচারের বিরুদ্ধে আর কিছুই হতে পারে না। কবিতাই করে দিতে পারে বিদ্রোহী ঠিক নজরুলের মতো। কবিতাই চিনিয়ে দিতে পারে গ্রাম আর বন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসা যেমন জসীম উদ্দীনের কবিতা। প্রকৃতির নির্যাসে হৃদয় হয়ে উঠতে পারে প্লাবিত ধানসিঁড়ি নদী। রূপসী বাঙলা বললেই জীবনের আনন্দ আছড়ে পড়ে দাশের কবিতার খাতায় যেখানে সরোজিনী শুয়ে আছে।

কবিতা আসলে হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া বৈঠা কোনো মাঝ নদীতে। কবিতা বুঝে উঠবার আগেই তৃপ্তির মধ্যে এক জাদুকরী দ্যোতনা সৃষ্টি করা। আবার কবিতা না বুঝেও যেন এক ধরনের অব্যাক্ত ভালোলাগা অনুভব করা। আবার কবিতা জাদুবাস্তবতা নয়তো পরাবাস্তবতা হয়তো পুনরাধুনিকতা।  কবিতা হল বালিকার শর্ট স্কার্টের ন্যায় ছান্দসিক।

জীবনানন্দ দাশ তাঁর রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাঙলা কবিতা প্রবন্ধে এক জায়গায় লিখেছেন- “এ কবিতা আধুনিক কি না — এ কবিতা কি না — এ কাব্যে কোনো স্বকীয়তা আছে কি না— এ কবিতার বক্তব্য কী— আধুনিক কবিদের বারবার এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে’’। কবি আরও বলেছেন- “সকলে কবি নয়, কেউ কেউ কবি’’। কবিতা হয়ে ওঠা বা কবি বনে যাওয়া কিন্তু তখনকার সমাজে ততটা সহজ ছিল না যতটা আজ।

উদয় শংকর দুর্জয় -এর কবিতা

সমুদ্র এবং শহরিকা  -১

এ শহর কবিতাহীন ইস্পাত আর কাঁচের। হিম আর বরফের। ভীষণ একলা টেমসের ঢেউয়ে ঢেউয়ে হারায়ে কুল। বার্চ-পাইন-উইলোদের সংসার। এবেলা কেড়ে নিয়েছে ঘুম বারটেন্ডারের। অস্তরাগের কোলাহল ডুবতেই, ঝাঁক সীগাল ভুলে গিয়ে তুষার-ওম, দীঘল গ্রহপথ পাড়ি দিতে দিতে পৌছে যায় ক্রান্তিকাল তবু কবিতার উপাদান নাগরিক হাওয়ায় ওড়ে অনিঃশেষ। সে যে বালিকার শর্ট স্কাটের ন্যায় ছান্দসিক, পালকবিহীন ইষ্টিমারের খুলে দেয়া বোতাম। লুটপাট

সমুদ্র এবং শহরিকা  -২

উড়ছে মেঘ-ধূলি, মুঠো মুঠো; লেপ্টে যাচ্ছে শরীর। অনিরুদ্ধ মেঘের ঠাস ছায়া মেখে নেমেছে সমুদ্রবতী। ডানায় ছড়িয়ে বালি, রোদ্দুর ছোঁবে বলে তুমুল মায়া ফেলে বৃক্ষবিভাস থেকে উড়ছে ধোয়া। রুপোলি বন্যায় আরো কিছু ধুলিজাল সাইরেনে যাচ্ছে বেজে। সমুদ্র-ফেনায় নিশিকালের সঙ্গমে পড়ে থাকা অনাদিকাল শঙ্খের গহবরে আদীম চুম্বন খুঁজতে। অজাত অশ্রুপাত। অঙ্গার ও আগুণের আত্মিক ঘ্রাণ ভুলে জলজ ভ্রমণে তুলে নিয়ে যাচ্ছে গুহ্যসূত্র নিষ্প্রভ ঢেউয়ের

সমুদ্র এবং শহরিকা -৩

নিসর্গের ডানা বেয়ে কুয়াশা নামলে, লিরিল বালিকা ড্যাফোডিল পেরুতে পেরুতে ফেলে যায় তারাগুচ্ছ। বিনির্মিত পথ রেখে শিলাখণ্ডের জমানো খনিজ পেয়ালাতে পান করে সবুজ আপেলের জন্মান্তরবাদ। দূরে। বহুদূরে ঘাসের সমুদ্রে বেড়ে ওঠা বাকলহীন বৃক্ষ ঠিক যেন প্রতীক্ষিত যুবক। খুলে যায় গিট। জটিল সমাধানের রিমোট শহরের আন্তর্জালিক চিঠির বলাকা ফেলে গেলে দীর্ঘশ্বাস, দাঁড়িয়ে ল্যাম্পপোস্ট ঠিক এক শতাব্দীর পর সমুদ্রের কংক্রিট ঢেউ উড়বে অরন্যার ঝুল বারান্দায়

সমুদ্র এবং শহরিকা  -৪

ক্ল্যাকটন সৈকতের গ্রীবা থেকে মুছে যায় ধুলোপাহাড় বালির প্রাসাদ; বেলাশেষে। আলোছায়া নেমে যায় উজ্জ্বল নীল গহনে। বৃষ্টি হ্রদ পেরিয়ে যেতে, থোকা থোকা ঝুমকো আলোর ফুল অন্ধকার গ্রহণকালে মুছে ফ্যালে তীব্র দহন। ব্যথিত প্রতিধ্বনি খুঁজতে আজো কলরবের দুকুল অপেক্ষায়, স্থির জলরাশির কাছে। হ্যারিস পাখির বাদামী চোখেই বিষাদ কলতান; মোহমায়া এক শুক্লপক্ষের কাছে গুহ্য চিত্রলিপি জমা রেখে অন্য দিগন্তে লেখাতে চায় নাম। এরপর রাত্রিদেবীর সব বাতি ঝলসে উঠলে মায়া ভুলে যায় সব ফিনিক্সরা। নিস্তব্ধতা অতঃপর

সমুদ্র এবং শহরিকা  -৫

আরও একটি অগ্নি তুষার অপেক্ষার কাল। এ শহর ভিজবে বলে আড়িপাতা গুহাতেই বুনেছিল প্রার্থনার নকশি করা শিশির। রিজেন্ট লেকের শীতল জলগুচ্ছ প্রত্যাশারই শেকল বেয়ে উড়োহাওয়ায় ছড়িয়েছে ডানা। সমুদ্র-পথ জেগে ওঠে। বিরাম চিহ্ন এঁকে স্টারলিংক উষ্ণ-গিরি-পর্বত পেরিয়ে দাঁড়িয়েছে নগর কার্নিভালে। ধুলোস্নাত এ শহর ভিজবে বলে ডুবসাঁতার উঠিছে পথে। পাললিক তটে রকবাঁধা সমুদ্র কল্লোল সন্তর্পণে সয়ে যাচ্ছে অগ্নিরথের বিরহ বেহালা; কান পেতে শুনছে জলমহল

সমুদ্র এবং শহরিকা  – ৬

জাগ্রত রক যেন শৈবালিক পাহাড়, অনাবৃত জলসমগ্র আহ্লাদে আচ্ছাদিত শঙ্খ-গহ্বরে কান পাতলেই সমুদ্র গর্জন উঠে আসে; স্বাপ্নিক নিরবধিত ঢেউয়ের প্রপাত তাড়িয়ে দিয়ে যায়, নুড়ি পাথরের মৃত আকাঙ্ক্ষাগুলো আর কিছু ক্লান্ত আকাশ একে একে পেরিয়ে যায় ফেরার গুঞ্জন শুনে। আলো-আন্ধকারে এ নগর গুছিয়ে নেয় গণিতের পৃষ্ঠাশীল্প। আর আমরাও বিদায়ীপাঠ লিখতে লিখতে মায়ার লবণাক্ত ক্লেদ লুকিয়ে রাখি দ্বিপ্রহরে। ফেলে যাই হারভেস্টার-মাঠ

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E