৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
আগ ৩১২০১৭
 
 ৩১/০৮/২০১৭  Posted by
তারিফ হোসেন

তারিফ হোসেন

ভাষিক ভঙ্গিমায় বঙ্গীয় স্বচ্ছন্দ – তারিফ হোসেন

আভাষে মূলাভাস

বাংলা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা। ভাষা–সরণির শুলুকসন্ধানী রাজপথিকদের কারো কারো মন্তব্য—পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দুটি ভাষার একটি বাংলা যদি না ইংরেজি প্রথম হয়। আমাদের মতে যদি শব্দটি বাদ দিয়ে নিঃশর্তে বলা যেতে পারে বাংলাই পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষামেলায় ভাষার শ্রেষ্ঠতম প্রদর্শনী। কথাটি মোটেই আবেগতাড়িত নয় বরং যুক্তিশাসিত। যুগল দৃষ্টান্তে উপর্যুক্ত সিদ্ধান্ত অনুভব্য। আকাশ শব্দটির ‘কাশ’ অংশটুকুই ঐ শব্দের সারাংশ; বৈয়াকরণ পরিভাষায় যাকে ক্রিয়ামূল বা ধাতু বলা হয়। আমরা জানি ধাত বা ধাতু যেমন মানবদেহ সচল রাখে তেমনি শব্দাবলীর ধাতুও ভাষাশরীরকে দারুণভাবে জীবন্ত রাখে। অন্য ভাষাগুলো যেখানে ধাতুখরায় ভুগছে সেখানে বঙ্গভাষায় ধাতুসুধা উপচে পড়ছে। বঙ্গমৃত্তিকা, বঙ্গমাতা, বঙ্গভাষা — সবই উর্বরও প্রজননশীল। ‘আকাশ’–কে সহজবোধ্য ভূমিতে আনার জন্যই এই ভূমিকা। এখন দেখা যাক ‘আকাশ’–এর ‘কাশ’ ধাতু থেকে নিষ্পাদিত অতিপ্রচল কিছু শব্দ—আকাশ, অবকাশ, অনবকাশ, নিরবকাশ, প্রকাশ, বিকাশ, সকাশ, নিকাশ, কাষ্ঠ, কাশি ইত্যাদি।

উল্লিখিত শব্দাবলীর প্রতিটিতেই ‘কাশ’ বিদ্যমান যেখানে কাশের অর্থ দীপ্তি, প্রকাশ,আবির্ভাব। আচ্ছা বলুন তো কাশি কি আমরা নিঃশব্দে করতে পারি? পারি না। কারণ ‘কাশি’–তে কাশ আছে। তাই সে অপ্রকাশ থাকতে পারে না। প্রকাশিত হতেই হয়। এখানেই বাংলাভাষার মাহাত্ম্য, শব্দবিজ্ঞানমনস্কতা, অনন্যতা। এবার ইংরেজির নিরিখে ‘কাশ’ ধাতু নিষ্পন্ন শব্দগুলো অনুবাদ করতে চেষ্টা করুন। আকাশ, প্রকাশ, বিকাশ, নিকাশ–এর জন্য আপনাকে আলাদা আলাদা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে হবে। অথচ বাংলায় একটি ‘কাশ’ ধাতু সহযোগে আপনি আকাশ–প্রকাশ– বিকাশে বিহার করছেন। সুতরাং এটা স্পষ্ট — রমণের জোর দেহধাতু, মননের জোর শব্দধাতু।

বাংলাভাষাকে রক্তমাংসের স্তর থেকেই আমরা ব্যবহার করে থাকি; এতে কাজ চলে যায় বটে; কিন্তু কাজটা হয় গোঁজামিল। যথার্থ কাজ হতে পারে বাংলাকে হাড়েহাড়ে চিনে নেওয়া; অর্থাৎ ধাতুবলে চিনে নেওয়া। বাঙালি তথা বাংলাভাষার ধাতুদৌর্বল্য ঘটে চলেছে। ক্ষমতা বলতে আধুনিক বাঙালি শক্তি, প্রতাপ, দাপট এমন কিছু বুঝে থাকে অথচ পূর্ণাঙ্গ ধাতুবোধে ক্ষমতার অর্থ দাঁড়ায় ক্ষমা-করার-শক্তি। আমরা আশা করব বাঙালি ধাতুদুর্বলতা কাটিয়ে একদিন ধাতুপ্রবলতা অর্জন করবে। বাংলাশব্দের ধাতুতে বিদ্যমান শুক্র বাংলামানসকে কৃষ্ণপক্ষ থেকে শুক্লপক্ষে নিয়ে যাবে। লালন সাঁইজির পদপূর্ণিমায় তা জ্বলজ্বলে।

শুক্লপক্ষে ব্রহ্মাণ্ডে গমন
কৃষ্ণপক্ষে যায় নিজ ভুবন।

 

কবি মস্ত কবিতা সমস্ত

কবিতা কী? এভাবে না দেখে বরং উল্টোভাবে দেখি — কী নয় কবিতা। সর্বসত্তায় কবিতা নিরন্তর প্রবহমাণ। কবি যখন গেয়ে ওঠে — চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাঁজায় বাঁশি — তখন জাতীয় কাব্যগীতির মহাজাতিক স্বরূপ উন্মোচিত হয়। চিরন্তনী আদ্যরূপের নূতন সংস্করণে চিরন্তন -বর্তমান – সঙ্গীত শুনতে নিছক বাঁচার চেয়ে বেঁচেবর্তে থাকাটা জরুরি। বর্তমানে বাঁচাটাই মূলত বেঁচেবর্তে থাকা; তাহলে আমরা বর্তে যেতে পারি। বর্তমানে থাকার মস্ত সুবিধা হল মহাজাগতিক ঘটনার অনন্তলীলার সঙ্গে নিজেকে সহজেই যুক্ত করা যায়।

পুরাতনের বর্ণনা নবতনে প্রকাশিত হয়। সত্তাময় হৃদয়তন্ত্রী হয় টানটান; সেখানে টোকা পড়ে ওঠে ঝঙ্কার। নূতন গায় পুরাতনী গান। চৈতনিক বা বর্তমান স্তর থেকে গেয়ে যাওয়াটাই স্বরূপত কবিতা।

আমার ক্ষণ যদি হয় প্রতিক্ষণ, দর্শন যদি হয় পরিদর্শন; শ্রুতি হয় সুশ্রুত, নয়ন হলে বিনয়ন — তবেই আমি কবি। সত্তার ধারণায় যা বরণ করে নেওয়া হয় সেটার নাম বর্ণ। বর্ণ চালু (অন) হলে তা বর্ণন তারই জের ধরে আসে অনুরাগ, সংরাগ, বিরাগের পালা।

জগৎ তার রহস্য কু শব্দে ফুঁকে দেয় যাকে, অজস্র কিরণমালার উদ্ভাসন যে মননে, অণিমার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন যে বোধিতে, মহাবিশ্বের সতত সম্প্রসারণশীল মানচিত্র অঙ্কিত করে যে আধার তা মুখ্যত ব্রহ্ম-শিব – বিষ্ণুর নিশ্চায়ক। সেজন্য সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টা, শুক্রাচার্য অভিধা পায় কবি।

ঊষর ভূমিতে এক পশলা বৃষ্টি — মরুতে কবিতা
উদরে ভ্রূণের বিকাশ — গর্ভে কবিতা
কৃষ্ণগহ্বরের গ্রাসে কোটিকোটি ছায়াপথ — ব্রহ্মাণ্ডে কবিতা
সর্বনামীয় কবি ধারণ করে বিশেষ্যরূপ; এ সত্তা পূরিত হয় অগণন বিশেষণে যার অনিবার্য পরিণতি ক্রিয়া। অব্যয় অহঙ্কার নিত্যকারক। সর্বকালের কবি রচনা করে প্রকার, খর্বকালের দ্বারা রচিত বিকার।

পদার্থের এই দুনিয়ায়
আমরা সবাই পদ পাই;
কেউবা দমি জড়তায়
কেউ বা ভ্রমি কবিতায়।

 

গদগদ গদ্য

শারদসত্তায় যারা জাগ্রত কোজাগরে তারা পৌর্ণমাসী। কাশ, বকুল প্রকৃতির প্রকাশ –অনন্ত, অসীম মহাকাশের লক্ষ্মী। পরমাত্মিক অবস্হানের পর্যায়ক্রমিক কোষ্ঠ অতিক্রম করে লক্ষ্মী হয়েছে লক্ষণাত্মক। তখন চিন্ময়রূপ তাকে লক্ষ করেছে। আন্তর অবয়ব পেয়েছে বাহ্যকাঠামো।জন ও গণের মানুষ গৌণিক স্তর ডিঙিয়ে মৌখিকে উত্তীর্ণ হতে পেরেছে। বদনপ্রাপ্তিতে জীবকুল বদান্য; বদনে ছন্দের বসত গেড়ে নির্মাণ করেছে চাঁদবদন। সোনার চাঁদবদনের সহজাত প্রবৃত্তি নেচেগেয়ে ওঠা।মনোরঞ্জনের পরাকাষ্ঠায় রাগের বর্ণিল প্রকাশ ধ্বনিবহতা ও ধ্বনিময়তায়। অস্ফুট , অব্যক্ত ভাষ্য যজ্ঞকাষ্ঠের ন্যায় জ্বলে উঠতে চায়। চন্দন, ঘৃতের আহুতি বদন আরতির হোমানলে ছিটিয়ে দেয় সোহাগার সোহাগ। অন্তর হয় ব্যাকুল, কলভাষণ কলকলিয়ে ওঠে, হৃদয়ের প্লাবণ ভাসিয়ে দেয় কণ্ঠদেশ। বেশুমার অকথ্য জমে; তৈরি হয় অনুক্ত গাদ। গাদের প্রাবল্যে ঘটে শব্দব্রহ্মের বিস্ফারণ। নন্দিত গদগদ সত্তা থেকে বেরিয়ে আসে গদ; সৃজিত হয় গদ্য।

গদের গদনে গদ্য, বদের বদনে বদ্য, কথের কথনে কথ্য –এসবই গদভাষ্যের বাকশৈলী মাত্র। গদ্যের কাজ বাণীপ্রতিমার কুশপুত্তুলিকা নির্মাণ। রসিক মৃত্তিকার সেখানে হাজিরা নেই। কারের বিকারে অঙ্গ রীতিমত ব্যঙ্গ। এই কাঁচামশলার বানে সরস্বতী থাকে নির্বাসনে। শ্লীলতাহানির জন্য গদ্য যুতসই। গদভাণ্ডের গদা ঘুরিয়ে উপহাস, ঠাট্টা, ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ চলে সমান তালে। গদবাক্যের বকাবকিতে শীল থাকে না; বাণীশিল্প শীলস্হ হলে গদ পদের মর্যাদা পায়। খড়কুটোর আদলে ঘটে বদল। গদপ্রতিমা পদপ্রতিমায় উন্নীত হয়। ব্যঙ্গ ফিরে পায় অঙ্গ, বিকারে আসে আকার। উঁচুমার্গে তাই পদের এত কদর। এতকিছু সত্ত্বেও পদের পদস্হতা কিন্তু গদভিত্তিক। এই যামে বলা যায় —–

জলের থৈ নদে
সৎ -এর ঠাঁই সদে
পদের ভিত গদে।

 

চন্দ-ছন্দ-নন্দ

চনমন, উন্মন, আনমন, সুমন –অনুভূতির রকমফের। সত্তায় দোলায়িত উৎপল পলেপলে খোঁজে কলাশ্রয়। কাল পেরিয়ে কলিতে এসে চিরন্তন ফুলকলির কালোয়াতি চলে চন্দ্রকলার ষষ্ঠী, নবমী, একাদশী তিথিতে। তিথির অতিথি হরি, হরণ-আহরণের কার্যালয় গড়ে হরিবাসরে। কৃষেকৃষে কর্ষণের কৃষ্ণ খ্রিস্টের রতিক্রিয়ায় রত হয় অবিরত। জাত হয় বৃন্দ-বৃন্দাবন-বৃন্দকানন। রাধার যৌতুক কৃষ্ণ; কৃষ্ণের যৌতুক রাধা। যমক অলঙ্কার পণ করে পাণিগ্রহণের; পণ্য হয়ে যায় জগৎবিপণীর। ত্রিলোকের সন্তান ক্রেতাবিক্রেতা–বিকিয়ে দেওয়ার জন্যই তাদের আবির্ভাব। বিকিকিনির মেলায় টিকতে পরিশোধ করতে হয় নগদমূল্য। সে জন্য মূলের সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রয়োজন।

আরাধনার দ্বিপাক্ষিক কক্ষপথে পক্ষগুলোর আপেক্ষিক আচরণ অগুরু হলে লঘুপক্ষ কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়ে – নিরপেক্ষতায় থমকে যায়, সাপেক্ষে থাকে গতিময়। সর্বসত্তায় চঞ্চলতা দান করে চন্দ; চন্দের গতিশীলতা চন্দি। চন্দ বাস করে চন্দে–চন্দ্র প্রসূতি হলে আহ্লাদ। নিয়ত জননে (নিজ) হ্লাদজনন স্বরূপশক্তির রূপভেদ।

জাড্য কেটে যায় বসন্তে; ঋতুরাজ রাজঋতু হতে পারে ব্যক্তিসত্তার বিরাজে। সত্তায় স্ফুরণ (spring) শক্তির নিত্যবাসের নাম বসন্ত। বিবর্ণ নিসর্গের শ্যামলিমায় উত্তরণ–বসন্ত। জলরাশির কূলছাপানো প্লাবণ–বসন্ত; এমনকি আসনে সঞ্চিত শক্তি যা উপবেশনকে সহনীয় করে–তাও বসন্ত। নিয়ত জননের হ্লাদিত চন্দের মহাপ্রাণিক ভাষ্য ছন্দ। ছন্দের সহচর নন্দ। চন্দ-ছন্দ-নন্দ -এর বিদ্যমান বেষ্টনী রচনা করে বৃত্ত। ওরা কখনো শাশ্বতস্বননে আশ্রয় খুঁজে পায় স্বরে, আঙ্গিক ঘোষণায় বর্ণে, অবিনশ্বরতায় অক্ষরে। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত–মানবিক স্ফূর্তি প্রকাশের বিলগ্ন মানমন্দির। একক নান্দিক-ছান্দিক ভগবানের ভাজক রূপের দেখা মেলে স্বর-মাত্রা-অক্ষর-বর্ণে। সম্ভোগ করতে হলে ভাগ ভাগ করে এগোতে হয়। রুটিকে খাদ করে খাদ্য বানিয়ে গিলতে হয়। গানের আভোগ উপভোগ করতে হলে পাড়ি দিতে হয় স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী। জপমালার গুটি দিয়েও মন্ত্রোচ্চারিত হয় এক একটি করে। এভাবে ভজতে ভজতে স্বরভক্তি, কন্যা-জায়া-মাতৃরূপে মাত্রাভক্তি। অব্যয়-অক্ষয়রূপে ত্রিলোক সন্তানের তন্তুজ অক্ষরভক্তি।

চান্দের কলাবৃত্তে কলার পূর্ণ আবর্তনই সকল। সকলের শিকল ছিঁড়ে গেলে বিকলতা। এটাই হল চন্দ্র থেকে পতন অর্থাৎ ছন্দপতন। স্ব তার ছন্দ থেকে সরে যায়; স্বাচ্ছন্দ্য হারায়। রাজার ধন রাজস্ব, পরের ধন পরস্ব, নিজের ধন নিজস্ব। নিজস্ব মূলত স্বচ্ছন্দ; নিজস্বতা স্বাচ্ছন্দ্য। তাই নিজের ধন বাড়াতে পরের পনেরো আনা কাজ বাদ দিয়ে নিজের ষোল আনা কাজে অগ্রসর হওয়া দরকার। এতে সুখ না মিললেও অন্তত স্বস্তি পাওয়া যায়। স্ব -অস্তি অর্জনই অস্বস্তি থেকে মুক্তির উপায়।

স্ব -বিদ্যমানে স্বস্তি
স্ব -বরণে স্বচ্ছন্দ;
সহ -কলায় সাকল্য
বি-কলায় বৈকল্য।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E