৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ০৮২০১৭
 
 ০৮/০৫/২০১৭  Posted by

তানিয়া চক্রবর্তী’র একগুচ্ছ কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

তানিয়া চক্রবর্তী

তানিয়া চক্রবর্তী

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দূর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতা’র বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

আমার খুব একটা মনে হয় না কবিতা ছোট হয়ে আসছে, কারণ আমি দীর্ঘ কবিতা পড়ি আর নিজেও লিখি।
তাও যদি ধরে নি কমছে তার একটা ফরমায়েশি উত্তর হবে মানুষের সময় কোথাও মানে মানুষ সময় দেয় কোথাও আর সাহিত্যে সেভাবে তাই হয়ত কম লিখে মানুষকে কম পরিশ্রমে বোঝানোর তাগিদে লেখা হচ্ছে কিম্বা ছোট কবিতা পড়ার ইচ্ছেও বাড়ছে। তবে সবটাই লঘুকরণ তা নয়।
শক্তির প্রসঙ্গে লেখার বড় বা ছোট হওয়ার কথায় আমি বিশ্বাসী নয় তা এ বিষয়ে আমার তেমন মত নেই।

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী?

হ্যাঁ আকার প্রসঙ্গে কথা বললে তো যার আকার ছোট সে ছোট আর যার আকার বড় সে বড়। এক্ষণে ভাবের বিষয়টা লেখার ওপর নির্ভর করে। দু’লাইন লিখেও গাঢ় অর্থ বোঝানো যায়, একশ লাইন লিখেও তা না বোঝানো যেতে পারে আবার অনেকসময় কিছু ছোট কবিতা পড়ে এরম বোধও হয় আরো কিছু লেখা যেত আবার দীর্ঘ কবিতা পড়ে মনে হয় এত না লিখলেও হত।অতএব বিষয়টি সম্পূর্ণ ভাবের গভীরতা ভিত্তিক বিষয়।
কবিতার বিশেষত্ব একমাত্র কবিতা। তার আকারের পরিমাণ আমায় তেমনভাবে ভাবায় না, তার ভাবের বিষয়  ভাবায়।তবে একথা অবশ্য করে সত্যি, যেমন দীর্ঘ কবিতায় লেখকের ব্যক্ত করার পরিসর অনেকটা থাকে, ছোট কবিতায় সেটা থাকে না। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এটা তুলনামূলক চ্যালেঞ্জিং বিষয়। কারণ একটি ছোট কবিতার মাধ্যমে বৃহৎ গভীরতা তুলে আনতে হলে শব্দ, ভাষা এবং ভাবের ব্যবহার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।আর পাঠকের স্বার্থে তা কম সময়ে একঘেয়ে না করে পঠনযোগ্য হওয়ারও দাবি রাখে। কারণ হতেই পারে সকলেই কবিতার জন্য কবিতা পড়েন না, অনেকেই তার রসদ –এ জীবনের মিল পেয়ে আনন্দিত হওয়ার জন্য পড়ে এখন এহেন পাঠকের কাছে স্নায়ু খুব তাড়াতাড়ি ক্রিয়া করাটাই স্বাভাবিক তাই সে ছোট কবিতাই আশা করবে।
এবার আসি দীর্ঘকবিতায়, এটি একটি ক্রিয়াশীল জায়মান প্রক্রিয়া, কবির ঘোর যদি একাত্ম হয়ে ওঠে তখন তাকে সহযে ছিন্ন করা না উচিত আর না সে পারে, এই ঘোরের গতি তাকে দীর্ঘ লেখায় আর আমার মনে হয় দীর্ঘ কবিতা একটি দীর্ঘ রাজপথ এবং যদি তা প্রকৃত কবিতা হয়ে ওঠে তা নেশাতুর করে তুলতে পারে। আবার তা না হলে তা একঘেয়ে হয়ে গেলে দীর্ঘ কবিতাকে ভার মনে হয়। আর অনেকসময় পাঠক এর আকার দেখেই দূরে সরে যান এমনও হয় সেদিক থেকে ছোট কবিতারা জিতে যায়।

৩। ক) ছোট কবিতা’র গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন?

লাইন বা পংক্তি বলে অবশ্যি এর আকার ঠিক করাই যায়। তবে আমি যেহেতু পরিকল্পিত কবিতাকে প্রশ্রয় দিই না , তাই ওই ধারণা রেখে যা তাড়িত হয়ে আসবে তা রাখাই ঠিক।

খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?  

অবশ্যি ছোট কবিতা পাঠে তৃপ্তি পাওয়া যায়।

গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?

সম্ভব, আমার তা মনে হয়!

৪। ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে?

কবিতার আকার ভেবে কবিতা কখনো পড়িনি,লেখার ক্ষেত্রেও এক। লেখার ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ত যা এসেছে তাই কবিতার মূলধর্ম হিসেবে রেখেছি, সে ছোট বা বড় যাই হোক। তবে একথা সত্যি আমি বহু ছোট কবিতা পড়ে যারপরনাই আনন্দ পেয়েছি। আর কখনো কখনো মন শুধু ভাবতে চেয়েছে ক্ষুদ্র সূত্রকে ধরে তখন ছোট কবিতা একরকম আরাম দিয়েছে প্রাণে। তবে কবিতা তার ভাবে সবচেয়ে ক্রিয়াশীল তাই আকার নিয়ে খুব চিন্তিত নয়।

খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।

১০ টি ছোট কবিতা—

গলে গলে পড়ছে মাটি

১ মাটি

শাণিত গর্ত থেকে তুলে আনো
কিম্বা চাপা দিয়ে রক্ত মোছাও
অথবা দাহ্য করো ঋতুতে
এ অপরূপা দেহ
মাটির প্রেমিকা হয়ে  মরে যাক

২ উৎপাটন

খুলে দাও, ছিঁড়ে নাও
সতর্কতায় বাঁচো
ক্রমশ মহৌষধি খাও
তবু যা হবার তা হবে

৩ বিসর্গ

শূন্য পিঠ, অজস্র দ্রবীভূত জীবন
তোমার শতাব্দী ধরে হামায়
অথচ তুমি বিসর্গের সন্তান
সংখ্যার জন্য এতো কাঁদো কেন?

৪ উদার

আমাকে উদার করো
নিভৃতে লেহন করো না কখনো
আমাকে যোদ্ধা বানাও
নিভৃতে কামনা করো এবার
পৃথিবীর পাপের জন্য
ঈশ্বর উদার হতে বলেছেন…

৫ পিচ্ছিল

ধ্বনিত হচ্ছে সুর, আজান
ধ্বনিত হচ্ছে সুর, কৃষ্ণনাম
পৃথিবীর মা এক পেট
পৃথিবীর বাবা এক কোল
তবু কলপাড় রক্তে ভরে যায়
আমরা ভয়ঙ্কর পিচ্ছিল বলে
তন্ত্র শিখে নিতে হয় রোজ

৬ ধার

তুমি কিছু নাও
আমি কিছু দেব
তুমি সব নাও
আমি মুক্ত হব
শুধু দানের পর
মাথার চুল টেনে টেনে
আমাকে খুন করো না
কেউ আর কাউকে  
কখনো বাসবে না ভালো

৭ বেড়া

নৃশংস প্রাণীর কাছে
আমাদের কর বাকি ছিল
আমাদের মনুষ্যজীবনের মৃত্যুর পর
আমরা গাছ হয়ে জন্মালাম!
বেড়ার বাইরে ও মধ্যে
ভয় ও ভয়ের তাড়না
আমাদের স্থির করে রেখেছে…

৮ ঋষি

ওটা সূর্যের আলো
ওটা নির্বাণের পর
ধরিত্রীহীন এক কল্পনার ঘুম
যেখানে খোলস খসে যায়

৯ মশাল

আগুন জ্বলছে
মাছ খাবি খাচ্ছে
পেট থেকে উগরে আসছে যা
তা সম্মোহনের জন্য ধ্বংসের ডাক
তাকে পুষে রাখছি
আমরা আদর্শ খাদক

১০ রং

উজ্জ্বল জলবায়ু
গাঙ্গেয় অভিশাপ
পদ্মার অভিমান
সূর্য খেলছে, মৃত্যুহীন যাত্রা
রঙিন হয়ে গেছি
আর গলে গলে পড়ছে কষ্টজল

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E