৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ২১২০১৬
 
 ২১/১২/২০১৬  Posted by
চন্দন চৌধুরী

চন্দন চৌধুরী

চন্দন চৌধুরী’র কবিতা টানাগদ্যে


নতুন

দুটো বাড়িই পুরনো। তবু তোমাদের বাড়ি চিনত না আমাদের বাড়িটা। তোমাদের গাবগাছের সঙ্গে কথা হতো না আমাদের জারুলগাছের। আমাদের বাদুড়েরা জাম খেতে যেত না তোমাদের বাড়ি।

আমাদের বাড়িতে যেদিন লাটিম খেলার দিন, তোমাদের বাড়িতে হয়তো বৃষ্টি হিম হিম।
দুটো বাড়িতেই হয়তো শালিক থাকে, দুটো বাড়িতেই হয়তো চিল।
বাড়ি দুটো পুরনোই, ফুল পুরনো, হয়তোবা ফলও। হয়তো পুরনো আষাঢ়ে করা মেঘেরাও, আরও পুরনো হয়তো সুখদুঃখগুলো।

তবু একদিন তোমাদের বাড়ির ছায়া আমাদের বাড়িতে এসে পড়ে, আমাদের বাড়ির ছায়া তোমাদের বাড়িতে। হয়তো একেই নতুন বলে।


মহিষ

তুমি তো জানো না দূর্গা, আমি কতোটা মহিষ! অস্ট্রিক চামড়ার নিচে ভানা হচ্ছে প্রাচ্যের গাঙ্গেয় ধান। প্রেমে-কামে-শরীরের গন্ধে-আমুগ্ধ ছুরির মৈথুনে আমি যুদ্ধজাত পীতাভ পেখম। আমার পায়ের হাসি আজও ঘাস ও শিশিরের ঔরসে জাগে, অবৈধ তৃপ্তি আজও ইন্দ্রের অভিশাপ লাভে। তোমার সোনালি চোখে ঘাতক ডিম্বানু আমার মৃত্যুকে জন্ম দিয়ে তোমাকে তামাটে বানাবে, আর তখন সমস্ত মর্তে বেজে উঠবে তৃষ্ণার্ত সানাই মায়েদের হাহাকারে- তুমি হাততালি দিয়ে ফেটে পড়বে অট্টহাসিতে, যেন সার্কাসের ভাম- অপরূপ উন্মাদিনী। তোমার বন্ধ্যাহাতে চুমু খাবে আমার কাটা মু্ণ্ডু।

বহু বছর দূর- হয়তো খুলবে সেই সময়ের বোতামগুলো উজ্জ্বল হাসির শব্দে, পড়বে থুথু ঘৃণা; আমার কৃষ্ণঘন চুল থেকে জš§ নেয়া অরণ্য-চরাচরে তুমি অগ্নি, রক্তলাভা, পড়বে না আমার কামসূত্র। যেহেতু তখনও তুমি ডাকাত-ভোর, পূঁজির উন্মত্ত নাচ। আর আমি মাদলহাওয়া, কামার্ত জ্যোৎস্নার চুমু।

ভাবতেই ভালো লাগে আমি এক অনার্য অসুর।


জন্ম

শব্দ আমার কাছে শৈশবের লাটিম, হাতের তালুতে রেখে অবাক বোলাতে পারি।

দেখো ঐ যে হিজলবন, যার গোপন করোটি খুলে যারা উপভোগ করেছিল বালিকার সমগ্র বেদনা; গ্রামাঞ্চলে একদিন এইসব জিরাফের মুখে কাফি পরিয়ে দিতেও আমি ব্যবহার করেছি লাটিমের রশি।

এরকম প্রতিটি ভাবনা এক-একটি আলোর চিরুনি।

নিরীহ উরুর কাছে প্রতিভা প্রার্থনা ক’রে যারা নেয় গলিত করুণা, তাদের কাছে শব্দ কপট পিপাসা। আর আমি জানি নারীর শান্ত বুকে প্রার্থিত শব্দ নাড়াচাড়া করলে জেগে ওঠে পৃথিবীর প্রাণপুঞ্জ; শ্যাম্পেনের ফেনার মতোই অলৌকিক চুম্বনচিত্র।

শোনো, প্রতিটি বাক্যই বাসন্তির গায়ে প্রথম স্পর্শ।

হরিণীর সমস্ত পেয়েও আমি সম্ভোগ শিখিনি; অথচ তার গর্ভেই জš§ নিয়েছে আমার সমস্ত কবিতা।


শুধুমাত্র সাধারণ    

শুধু সাধারণ হবার জন্য সময়কে তাড়িয়ে দিলাম নিজের ভেতর থেকে, এভাবেই তৈরি হলো গতির নিয়ম; ভেতরের অপার সৌন্দর্যকে দিলাম ছুড়ে ওই শূন্যতার দিকে, দৃশ্যে দৃশ্যে রচিত হলো জগত;
আহা, শুধু সাধারণ হবার জন্য অভ্যন্তরের সমস্ত সুধা ছড়িয়ে দিলাম বাতাসে, গন্ধে গন্ধে ভরে উঠলো পৃথিবীর কূল; আর আমার ধ্বনিপুঞ্জ ভেঙে চুরমার করতেই সশব্দে ফেটে পড়লো দুনিয়াটা;
হুম, শুধুমাত্র সাধারণ হবার লোভে আত্মাকে বের করে ছুড়ে দিতেই জন্ম হলো অবারিত প্রাণ; এবং লাবণ্যকে ঝেড়ে ফেলতেই রঙে রঙে অপূর্ব হলো চারপাশ;
হয়তো আমার সাধারণ হবার জন্যই নিজের ভেতরটা উড়ে গেল বাইরে, এবং পৃথিবীতে তৈরি হলো যাবতীয় সম্পর্ক; আর এই সাধারণ হবার আশায়ই আমি মাথা গুজলাম ঘাসের ভেতর, আমার ওপরেই পড়ুক জগতের সব পায়ের বেদনা।


অক্সিজেনের গান

কত বছর আগে চুমু খেয়েছ, আজও রক্ত ঝরছে ঠোঁটে।
স্মৃতিসংস্করণে বদলে যাচ্ছে দিগন্তের রঙ। তুমি কার কাছে শিখেছ নিত্য-অনিত্যের খেলা, কোথা থেকে পেয়েছ সময় শাসনের এমন আশ্চর্য শক্তি!

ভালোবাসতে শিখিনি আজও, অথচ ভালোবাসার অপরাধে আমিই কিনা লিটমাস মেঘ! অদৃশ্যের ভেতর দৃশ্যচরাচরে অবিরত বদলে দিচ্ছ আমায়। কেবলই হয়ে যাচ্ছি রক্তরাগের নেশা।

তোমার সঙ্গে দেখাই হলো না আহা, অথচ তোমার চুমুর দাগ বহন করতে করতে আজ এই ঠোঁট এতো সাবালক।


সন্ধ্যার স্বভাবে

মানুষ মাতাল হলে তবু ভালো, পাখিরা মাতাল হলে সন্ধ্যা হয়ে আসে। তোমরা জানো না সেই পাখিবিশ্বের খবর, এখনো যে বন্দি আছে তনুদের রাক্ষসপুরীতে। এতদিনে জানা হয়ে গেছে পৃথিবীর বয়স কত হলো, মানুষের বয়স তবু জানা হলো না। মানুষের বয়স কি তবে পাখিদের বয়সের সমান!
হায়, পৃথিবীর একটিও পাখি নেই। পাখির প্রতীক্ষায় প্রতীক্ষায় পৃথিবীর জম্মমৃত্যুরোগ। মানুষেরা পাখি হলে সেরে যেত পৃথিবীর অসুখ।


চিরপুষ্প
    
চিরপুষ্প ফুটবে এবার, ভদ্রকালীর জিহ্বা থেকে ঝরে পড়া রক্ত শুষে নেবে বৃক্ষের মূল; এবার জগতের সমস্ত পাতা ধারণ করবে রক্তবর্ণ মেঘ।
আর তুমি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে ভুলে গিয়ে থামিয়ে দেবে সময়কে; শূন্যতায় নিয়ে আসবে অবিনশ্বরতা।
এবার পৃথিবীতে বইবে অমৃতের গাঙ; এবং একজন রাত্রিহন্তারক চিৎকার করে খেয়ে ফেলবে যাবতীয় তন্দ্রামঞ্জুরী।
এবার মুছবে প্রলয়, কোথাও শোনা যাবে না রুদ্রের হাক। তবু নিরবতার প্রাচীর ছিন্ন করবে হৃদয়পাখিরা।
ফসলের মাঠে জন্মাবে নতুন নতুন ইচ্ছে আর শসার মাচার মতো ঝুলে থাকবে অনন্ত আনন্দ।
এবার তুমি মৃত্যুকে হত্যা করবে, এবং জন্ম দেবে আমায়।


কারণ

আমিই সেই রাক্ষস, যে নিজেকে খেয়ে খেয়ে বেঁচে থাকি, নিজের কবরে বসে করি গোরখোদকের গান আর হেসে ওঠি পৃথিবীর মানুষের মতো, কখনো কাঁদি ইচ্ছে করেই।
আমিই সেই ভয়াল, নিজের মধ্যেই বাস করে যার মৃত্যু, যার নিজের বিষের দংশনে নিজেই জর্জরিত হয় আর মৃত পালকের মতো উড়ে যায় অচীন এক অদৃশ্যের দিকে।
তবু আমাকেই আমি আমার সহস্র হাতে জাপটে ধরে রাখি, সময় যেভাবে নিজেই বেঁধে রাখে সময়কে।


আমার পুত্ররা

আমার পুত্রদের কথা আমি বলিনি, তারা উঠবে পৃথিবীর দুই দিক হতে। পূর্ব দিকে যখন তাকাবে দেখবে প্রখর সূর্য, পশ্চিমে যখন তাকাবে দেখবে মায়াময় চাঁদ। আমার পুত্রদের তেজেই উজ্জ্বল পৃথিবী।
আমি আমার পুত্রদের কথা বলিনি, কারণ তাদের মা এখন হলুদ শর্ষেক্ষেতে ফুল তুলতে ব্যস্ত এবং আমাকে বলছে, এই যে দেখছো পৃথিবীর যাবতীয় ফুল, আমাদের ছেলেদের হৃদয় হবে।
আর আমি সমুদ্রের সব নীল গায়ে মেখে বলেছি, এ দেহে যতটা সমুদ্র ধরে সব দেব তোমায়।
আমাদের পুত্রদের কথা আমি বলিনি, তাদের সঙ্গেই সমস্ত জন্মের সম্পর্ক; তারা উঠবে পৃথিবীর দুই দিক হতে।

১০
নদীর ভাস্কর্য

অভিশাপ দিয়েছ তাই হয়ে গেছি শামুকরঙা নদীর ভাস্কর্য; ভেতরে বাউলের মতো একতারা বাজাচ্ছে এক কালো বাউশ মাছ, সুরে কি গভীর টান!
গাঙের কান্দায় বসে মাথাপাগলা গাঙশালিক এইসব শোনে আর শোকায় লেজের পানি; শেখে জেলেদের জালবোনা।
তখন নাইল্যাকাটা শেষে ভূডি দেয় যে কৃষকের দল- চলে যেতে দেখে ইঞ্জিনচালিত নাও।
আর তুমি সান্ধ্যস্বৈরিণী, মেঘেদের কাছ থেকে কিনে খেতে শেখাও রঙিন যৈবন।
ততদিনে পাট পঁচে গেলে উন্মাদ গন্ধেরা অবিরত চিলচক্করে দু’ঠোঁটে তুলে নেয় তেলাকুচা ফল।
এই স্রেফ মাছেদের ঠোঁট লালের কারণ।
কালো বাউশ মাছও জানে এইসব পোষা পাপ আর অঙ্গার কথা। তাই কৃষ্ণাঙ্গ ঠোঁটের দায়ে গানেই চিৎকার করে, অসহ্য অরূপ সুরে ভেঙে দিতে চায় ভাস্কর্য আমার।

১১
কবিতা

এই যে আমি ঘুমোতে পারছি না, জেগেও থাকতে পারছি না এবং এই যে আমাকে কিছু একটা টানছে- এর নাম!
এটা একটা স্বরচিত মর্গ- এখানে আমি নিজেই নিজের জীবন্ত দেহ কেটে গামলাভর্তি টুকরোগুলোকে দিয়ে দিই গরুদের কাছে।

মানুষের মাংসই গরুর সবচে’ প্রিয় খাদ্য।

এই যে আমাকে ডাকছে, মাঝরাতে আমার শরীরে ব’সে আছে বিবস্ত্র সুন্দর; জব্ধ হতে হতে বলি, এসবের কোনো মানে নেই, আগেও আমি হাঙরের ঠোঁটে চুমু খেয়ে কেড়েছি অসংখ্য সুখ, ঘুমের উরুকেও কামনাসিক্ত করেছি বহুবার!
এরপর কী হয়ে তোমরা সবাই তো জানো- বোকা ছুরিটা এক পোঁচে কেটে ফেলেছে আমার কণ্ঠনালী; সম্ভবত তোমরা যার নাম দিয়েছ কবিতা।

১২
শূন্যজ্যামিতি

যতটা নিকটে এলে দূরত্ব শূন্য হয়ে যায়, ততটা নিকটে গিয়ে ফেরা যায় না, ততটা নিকটে গেলে মানুষ অন্যের হয়ে যায়। এই স্থানাঙ্কের জ্যামিতি হৃদয়সম্মত এবং স্বপরীক্ষিত।
এতটা নিকটে গিয়ে তুমি ফিরতে পেরেছ বলেই নিজেদের সূত্র ভুলে গেছে সময় ও পৃথিবী। আর আমাকে বলছে, তুমিও প্রস্থান করো; যতটা নিকটে গেলে কেউ ঈশানে থাকে না, থাকে না ঊর্ধ্বে, তার বিস্তার হয় শুধু শিশুদের বাবল-বেলুনে…তুমি যাও সেইখানে…।
তখন দূরের দিকে তাকিয়ে দেখি, আশ্চর্য, তোমার মতো।
এখনও হাঁটছি একটা শূন্যের ঘরেই, একে পেরোনো যাচ্ছে না, টপকানো যাচ্ছে না, এমনকি দূরে সরানোও! দেখতে পাচ্ছি আমি কেবল আমার মধ্যেই শূন্য হয়ে যাচ্ছি।

১৩
আমি

যতটা ভেতর খুঁড়ে নিজেকে অনুবাদ করা যায়, যতদূর সীমানা অবধি নিয়ে যাওয়া যায়, এই ভূলোক, দ্যুলোক পেরিয়ে; যেখানে কেউ একজন বাজাচ্ছে পিয়ানো; তার মুদ্রিত সুরে রচিত হওয়া দৃশ্য দিয়ে কেউ কেউ অনুধাবন করে পৃথিবীর মায়াবি বন্ধনগুলো।
এভাবে কখনো কখনো নির্বাচিত হৃদয় দিয়ে যতটা বিস্তৃত হওয়া যায়, তার প্রামাণ্য দলিল এই দেহ। ‘আমি’ সেই চর্চিত মুদ্রার নাম, কেবলই অনুসন্ধান, কেবলই চর্চা এবং নক্ষত্র ছিনিয়ে আনা বহুমূল্য আলোকের আয়ু।
নিজের ভেতর যেতে যেতে, দূরত্ব পেরোতে পেরোতে আজ মনে হলো- এই যাত্রা মায়াময়, এই পথ অনির্দিষ্ট, সেই অনাদি হতে চলছে চলছে…

১৪
পায়ের গল্প

পা থেকে যতটা দূরে সরে যাচ্ছিল পৃথিবী, এখন ততটা নিজের দিকে, এখন আমি সম্ভবত আমার চেয়ে দূরে নই; নিজের নিকটে এসে জানলাম পর হওয়া পৃথিবীর গল্প বড়ই বিষাদময়, পথের ব্যাখ্যা ভুলে যাওয়া।
অথচ পথের জন্যই জন্ম পায়ের; আর ভূগোলের সীমা ছেড়ে শূন্যের গলি ধরে এগিয়ে যাবার কালে পা শিখেছিল পর হওয়া মানে সুতোছেঁড়া মাকুর গান; যুক্ত হওয়া মানে অঢেল সময়হীনতা বা অনন্য জীবন।
এখন আমার কানে কথা বলছে নির্জনতা- জগতের সহস্র স্বরে, বাতাসের বিচিত্র হ্রেষায়…।
নিজের শরীরে নিজের পা-টা লাগিয়ে দেখলাম, আসলে হেঁটে যাচ্ছ তুমি!

১৫
প্রিয় হাহাকার

প্রিয় হাহাকার, বন্ধু বলে তোমাকে দিব্যি চালিয়ে দিয়েছি; বসতে দিয়েছি পাশে, আর দুজনে একসঙ্গে খেয়েছি জীবনের চিপস।
দিনে দিনে যতটা বেড়েছে স্বপ্নের আকাশ, মেঘ হয়ে অবিরত ছুটে গেছ তুমি; এরকম, যেভাবে জন্ম নিয়েছে পাল্টে যাওয়া দৃশ্য, সেভাবেই হয়তো হেমলক পান করেছিলেন সক্রেটিস।
আমাদের বাজারে এখন স্বপ্ন পাওয়া যায় সবচে সস্তায়; যতটা না বেদনার দরে, তারচে অধিক অবহেলায়। এখানে তরুণেরা রচিত হচ্ছে মুদ্রার নিদ্রায় আর তরুণীরা লুণ্ঠিত হচ্ছে পুঁজির আকারে।
শুনো হাহাকার, প্রিয় বন্ধু হে, এভাবে যখন আমার বুকে বসে আমাকেই চুমু খাও তুমি; সহস্র আলোকবর্ষ দূরের অসম কম্পনগুলো অবচেতনে বাজে থরে থরে।

১৬
জলের রাখাল

বাবা আমার নামে রেখে গেছেন একটা কলমিলতার ঢল। বর্ষায় বাড়ে, বোশেখেও তিরতির। নদী শান্ত হলে জলো-আয়নায় কলমিলতার ছায়া যেন ঈশ্বরের মুখ। ঠিক পাশে চোখ তুলে ঘননীল আকাশের চিতা।
আমিও কেমন, ভর্তি হয়ে গেছি জলেদের ক্লাশে, আশেপাশে সন্ধ্যার হাহাকার, কোত্থেকে কেমনে যেন খুব বাজে যাত্রীহীন হাসি। লঞ্চগুলো চলে গেলে কলমিতে কচুরিতে চলে কানামাছি চুমো। কি নির্দোষ চমৎকার, এইসব ইতিহাস লিখে রাখি জলের রাখাল।
বাবা বলতেন, কচুরিপানার ফুলে অন্ধ হয়ো না ভুলে; ভেবো না এ শোভাপুর, জয়শ্রী রেশম। মনে রেখো, হিরণ¥য় পাত্রে এ এক উচ্ছিষ্ট কষ্টের গান। বরং পান করো ক্ষণকাল মুগ্ধতার ফেনা।
বাবাকে বলিনি, এই ফুল দেখিনি কোনো নার্সের আত্মায়, এ শুধু ক্যাঙ্গারুর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে ডিউটি ডাক্তার হয়ে যায়। জানো, তুমি আমার জন্য রেখে গেছ হৃদরোগ পানকরা এক সবুজ ডায়নামো!
প্রাণেতে মুগ্ধ আমি, কলমিলতার শেকড় খেয়ে বেঁচে আছি এক নাইলোটিকা মাছ।

১৭
জন্মমাতাল

মেঘের কবি আমি, শরীরে জলের বারুদ- তোমরা বাষ্প বলো যাকে। ছুটছি ছুটছি শুধু সঙ্গে নিয়ে চলার অভিশাপ; এই দীর্ঘ যাত্রাকালে মনে নেই সেই কবে খেয়েছি আহা কালো গাইয়ের দুধ, দীঘির মেনিমাছ… নাকের ভেতর লাগছে এসে মটরশাকের ঘ্রাণ।
আমার চিবুকে গান করছে সেইসব মৌমাছি, যাদের মধু খেয়েছি মামাবাড়ি গিয়ে; আজ তীব্র বিষাদে সব বজ্র হয়ে যাচ্ছে।
মেঘ কুড়োবে বলে যারা জাল জড়িয়েছ আকাশের গাঙে, জানিয়ে রাখি, খুঁজতে গিয়েছিলাম যে-সুখ, সে এক নারীর গভীরে ছিল; যে-নারী আমাকে গোলাপচুরির কৌশল শেখাবে বলে মূলত চিনিয়ে দিয়েছিল সাতটি তারার বাড়ি।
মেঘের সন্ধানে তবে যেতে হবে সপ্তর্ষিমণ্ডল!
আজ আঁধার মেখেছি দেহে, রাতকে করেছি বন্ধু; আমার কোমল কালো আভায় লজ্জা পেল দাঁড়কাকের দল; উড়ে গেল পাথরের কুড়ি নিয়ে মাটির কলসির কাছে।
জানি, আমিই জলের বীজ, আমাকে বন্দনা করো। কিন্তু হায়, জন্মমাতাল বলে স্টেশনে থামে না মেঘেদের গাড়ি- আমিও পাই না খুঁজে মায়ের মতো গ্রাম, হরিদ্রাভ বাড়ি।

১৮
কন্যা কালীদহ

কালীদরের বিলে যে-খেলায় মত্ত কুইচ্চাসাপ আর চিলে, এ থেকে যে-জীবনের জন্ম, সেখানে উঠলো ভেসে আমার গাঁয়ের ছবি।
ওগো বিনাসুতী মেয়ে, মাটির ক্রিতদাস আমি, ক্ষুধার কাঁকর কুড়াই অগ্রহায়ণের মাঠে; প্রচণ্ড দিবসে তীব্র রোদের ভেতর পুঁতে রাখি জ্যোৎস্নাফুল আর কিছু কাঁচা অন্ধকার। এই রক্তরাগ মারীর দিবসে তবু তুমি শুনে নাও সানাইয়ের সুর; মাংসের ভেতরে নাচুক মৃত্যুর ময়ূর।

কোনো কোনো মৃত্যু এভাবেই সুন্দর হয়ে ওঠে জন্মের অধিক।

বৈভবি বিলের মাঝে নির্লিপ্ত শস্যের আভায় ঢেকে গেছে পা, সামনে বিশাল ডিবি সত্যি যেন চাঁদ সওদাগরের ডিঙা, দাঁড়টাও পড়ে আছে দূরে বিষণ্ণ স্বভাবে। যেন কোনো মেয়ের কোমরের ভাঁজে জমে আছে থৈথৈ সুখকান্নারাশি।
তোমাকে দেখছি আজ মোমের শিখায়, কামরাঙা কুয়াশায় তোমাকে ডাকাতি করছে খরদাহকাল। ওহে কন্যা কালীদহ, কোথায় ছড়াচ্ছো মেয়ে মশলার ঘ্রাণ!
বরষার ভরাবিলে সবই ঘুমিয়ে থাকে, যেমন আমার বুকে তুমিও ঘুমাও।

১৯
নদীশরীফের আয়াত

বাড়ির কাছে নদী থাকলে মাছের সঙ্গে দোস্তানি হয়ে যায়। না হলে মাছের শাপে পাড় ভাঙে, আলগা হয় মাটি মানুষের গেরো।
পাড়ভাঙার শব্দাবলি শুনে যে-শিশুর জন্ম, সে বুঝে না নদীর সঙ্গীত; মেয়ে হলে সাক্ষাৎ নদীর সতীন। এসব নির্ভুল সত্য, নদীশরীফে আছে।
যারা নদীর আত্মা নিয়ে গবেষণা করেন, রাক্ষুসী বলে সেজে বসেন গোমড়ামুখো টিকটিকি, তাদের জন্য নদী সর্বদাই অশ্রুসজল এবং নির্বোধ; ডুবিয়েও মারে না এদের।
বাড়ির পাশে নদী থাকলে জলের সুখ দিয়ে জ্যোৎস্না তৈরি হয়।

২০
মা

মা আছে তাই পুরো গ্রামটাই আমার ঘরে; উপচে পড়ছে- গাছের সমস্ত সবুজ, লতাপাতার দুরন্ত দোলা, নদীর শালুকজলের হাসি…।
বেতফুলের হাসিমাখা কুপিরঙা শৈশব কৈশোর চালাচ্ছে রিংয়ের চাকার গাড়ি। আর দুই পাটকাঠিতে বানানো মৎস্যখেলনাটা অবিরত ডাকছে আমায়-
সেই বারান্দায়, যেখানে প্রতি সকালে আসে বন্ধু চড়াই, তারও  ঠোঁটে হরিদ্রাভ গান, বহুরূপ স্মৃতিসুন্দরে কাউন ক্ষেতের গল্প।
মা আছে তাই শহরে ফুটেছে কুমড়ো ফুল, লাউশাকের জ্যোৎস্নায় গান লিখছে নীলচে ভ্রমর এবং সমন্ত সুন্দরে মুদ্রিত হচ্ছে আমার নাম।
কাল মা বাড়ি ফিরে গেলে শহরের শোকসভায় আবার নিমন্ত্রণ।

২১
পা

আমার পায়ের দিকে হেঁটে আসছে পৃথিবীর সব পথ, কুসুমের মতো টমেটোর ক্ষেত, অপার নিদ্রা নিয়ে বাঙ্গির ডেরাঘর।
তিতাসের পাড়ে বসে বাঙ্গি খাওয়া হলে শরীরের ভেতর শোনা যায় সমুদ্রগর্জন, সেখানে দিগন্তপ্রসারী জল ফুঁড়ে ওঠে টমেটো-আভার সূর্য।
বন্ধুরা বাঙ্গি খেয়ে বারবার জলে ডুব দিতে যায়- এ রহস্য অধরা। গায়ের শার্ট খুলে, লুঙ্গির গিঁট খুলে একেকটা যেন অপরূপ উন্মাদ। বলে- ওরে বাবা, জলেরও পা আছে দেখি, চল আলতা পরাই।
অনেক পথের সামনে আমার দুইখানি পা; হাঁটা দিল ক্ষীরা খেতের দিকে। যেসব ক্ষীরার ভেতরে ছিল বাতাসের গুণ, সেগুলো চুরি করতেই হয়ে গেল ঘুড়ি।
আমার পায়ে এসে লাগছে আকাশের সুড়সুড়ি।

২২
ঢাকা সিরিজ
[অপ্রাপ্তবয়স্ক কবি ও পাঠকদের জন্য নিষিদ্ধ]

১)

বেশ্যাদের ঘরে বুকের পাঁজর রেখে প্রমত্ত সকালে বুড়ো আঙুল চুষে চুষে পথে নামে শহরের তাবৎ পুরুষ। তখনও তাদের মনে স্তনের লালরঙা তীব্র আভা ক্রমশ ছড়ানো ঢেউয়ের মতো মিলাতে থাকে; যেন মাঠ থেকে পলায়নরত অসংখ্য হরিণী ঢুকে যাচ্ছে বনের গহিন পেটে।

এ শহরের পুরুষেরা বুকে স্কুটার নিয়ে চলে।
মদের গ্লাসে নিজেকে পুরোটা চুবিয়ে সঞ্জীবিত করে। তখন তাদের স্বপ্নবাদী চোখ দূর সমুদ্রের পাড়ে- ট্যুরিস্ট বন্দরে চিলের আকারে ওড়ে ঝিনুক কুড়ায়, ডিনার সারে গ্রাম্যকুমারীর মাংসে। তারা রাত্রির অন্তর্বাস খুলে শিমুল গাছের মতো লাল হয়ে দেখাতে চায় যৌন-অহংকার।

এ শহরের পুরুষ মানে অন্ধ গায়ক; কেবলই বেশ্যাদের স্বপ্নে বাস করে।

২)

থিয়েটারে সাদা আলো, অথচ সঙ্গমলোভে স্কুল-শিক্ষিকার নাভি দেখছে বারোর বালক। তার অনুভবে দীর্ঘ আলিঙ্গন, বর্ণমালার চুম্বনছবি ফুটছে অবিরত অনুপম হয়ে।

এই তো পাচ্ছে বালক রক্তের ভাষা, রঙের বুদ্বুদ।

ফুটপাতে, অফিসবাড়ির পাশে হেঁটে হেঁটে শিখে নিচ্ছে রতিপ্রস্তুতির রীতি, শরীর থেকে কিভাবে তাড়াতে হয় গর্জনের ফেনা।
এই তো শিখছে বালক- শহর মানে কেবলই পাথরের সাথে সঙ্গম।

থিয়েটারে সাদা আলো, অথচ নিষিদ্ধ দৃশ্যের ঘ্রাণে জেগে উঠছে বালক। তখন সমস্ত আকাশ কাঁপিয়ে আÍাহুতি দিচ্ছে অবৈধ উল্কার দল।

৩)

একটা বিষণ্ণ ক্যামেরা ঢুকে গেছে ব্লাউজের শহরে।
প্রথমে দেখে আপেল, পাশে মোরগের লাল ঝুঁটি নেতিয়ে পড়েছে এডেন বন্দরে।

চোখ বুজে ভাবছে ক্যামেরা- আহা, উহা আপেলই ছিল, স্বাস্থ্যবান সাহারার ঢিবি, নয়তো সরাইখানা…।
তখন ক্যামেরার ঘরে- ভয়াল বাজার বসে, কিছু আদিবাসী মেয়ে আসে উন্মাদনা নিয়ে, তাদের কোমরের ভাঁজে পাগলা পাহাড় হাসে, কিছু প্রতীকী শোক এভাবে বেদনা প্রসব করে।

এদিকে মন্ত্রীপাড়ায় যোনীবিক্রির ধুম। নিজের মৃতদেহ কাঁধে বেতনভোগী সুশ্রী নার্সের দল সেখান থেকে ফিরে- সমস্ত শহর থাকে ভাসানের গানে।

৪)

এ শহর মানুষকে অ্যাবস্টাক করে রাখে। ঝুড়িতে সময় নিয়ে মাপতে শেখায়, আর বলে- এখানে সবাই পোড়া মোম, থাকে শিকারীতাঁবুতে।
যদিও তোমার মনে ধানক্ষেতের মতো দুলে ওঠা স্তন, সবুজ গাবের কষে পাকা জালে ধরা পড়া মাছের মতো রুপালি নিতম্ব ভাসছে মেঘের আকারে।
আর এ শহরে তুমি কিনা টেলিগ্রাফ-খুঁটি, চেঁচাচ্ছো উদগ্রীব গলায়। যা দেখে-শুনে অবাক হয় মি. পারফিউম এবং দাপুটে বিদ্যুৎ।
জেনে রেখো, এখানে তারের স্যুটকেসে রাখা তুমি একটা রক্তমাংসের ছবি।

৫)

সঙ্গমের লোভে পালাতে পারিনি, তাই রতিপাথরের শোকে বিমূর্ত হয়েছি।

যদিও বাসস্টপে দাঁড়িয়ে ভিক্ষুকের গান শুনে পেয়েছি যতটা সাহস, এতটা পাইনি প্রকৃত নারীর কাছে। তারা গানের ভাষায় বলেছিল- তোমার প্রেমিকাদের আহা, ওঝা সেজে নিয়ে গেছে উন্মাদের দল; তাদের নিঃশ্বাসের ধাক্কায় ওইসব তরুণীরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

একটা কবরখানা সম্পূর্ণ আমার হবে- ভেবে বুড়োদের মতো পার্কে বসেছি- কোনো স্বপ্নটপ্ন নয়- হো হো হা হা- এ শহরে আমার স্ট্যাচু হবে…
কাউকে বলিনি শোনো- এ শহরে দৃশ্যমান হওয়ার লোভে ভিখিরিদের কাছ থেকে কিছু খুচরো বিবেক কিনে বহুদিন আগে আমি পকেটে লুকিয়ে রেখেছি।

৬)

মৃত্যুই আমার একমাত্র পাহারাদার।
অন্ধকারে তোমরা যারা কুকুর ছেড়ে রাখো- তাদের বলি, শস্যচ্ছবিরও আছে যৌন-উত্তেজনা। কাম-উদ্দীপক হলে রেজিস্ট্রিবিবাহপত্র চেনে না বেশ্যাদের বাড়ির ঠিকানা।
তাই আমি হরিবোল বলে হাঁটা দিয়েছি শ্মশানের পথে, মাথা রেখেছি গাছের গুঁড়িতে। তোমাদের হা-ডু-ডু পথে আমি এখন ডাবলডেকার।

ডমরু বাজাতে বাজাতে জিইয়ে রেখেছি ফ্রিজে হিজড়ের হাড়।

৭)

সার্কাস থেকে একটা সঙ কিনে এনেছি। দেখে বৌ রেগে বাঘ আর পড়শিরা মজায় পেট ফুলাচ্ছেন। তামাশা দেখতে বন্ধুরাও হাজির- তাদের হাড়ের মেঘ থেকে উচ্ছ্বাসবৃষ্টির শব্দ শুনতে পাচ্ছি বেশ।

সবাইকে বলি- সঙ নাচলে বাঘ নাচে, আর ফেঁসে যায় মানুষ।
তবু উৎসাহে ভাটা নেই কারো। কেউ তার লেজ ধরে টানে- গোঁফ ধরে হাঁটায়- অগোচরে সঙের গোপন জিনিসটার সাইজও মাপতে চায়।
তখন আমার ঘরময় গ্রীষ্মবাতাসের দাবাদাবি, অদৃশ্য ঘূর্ণীর জাদুতে নড়ে উঠছে সব- আমাদের শূন্যতাগুলি। আর আমি শুধু ভাবতে থাকি- সঙ কাঁদলে জানি না কী হয়!

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E