৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ২৭২০১৬
 
 ২৭/১১/২০১৬  Posted by
তৈমুর খান

তৈমুর খান

চিত্রকল্প ব্যাপ্তিময় শিল্প ও ব্যক্তির মুক্ত আশ্রয়ভূমি
– তৈমুর খান

চিত্রকল্পই কবিতার আধার। সময়ের সাথে মানবজীবনের যে রূপান্তর, যে জটিল জীবন প্রক্রিয়া তাতে স্বাভাবিকভাবেই চিত্রকল্পও ভিন্নরূপ ধারণ করেছে। চিত্রকল্প শুধু ছবি নয়, কল্পনা নয়, অলংকার নয় – ব্যক্তিজীবন ও সমাজসভ্যতার প্রগাঢ় এক বিপর্যয়ের ভাষা ও ভাষ্যরূপ, যার সঙ্গে সময়চেতনার গভীর সম্পর্ক থাকে; শূন্যতা ও হাহাকার থাকে; স্বপ্ন ও ইশারা থাকে; ধ্বংস ও বিচ্যুতির দীর্ঘশ্বাস থাকে। সুতরাং চিত্রকল্পকে কোনো সীমারেখা দিয়ে চিহ্নিত করা যায় না। জাঁ জ্যাক রুশো এই কারণেই বলেছেন –“ The world of reality has its limits; the world of imagination is boundless.” বাস্তবতাকে অতিক্রম করার ক্ষমতা, জীবনকে মুক্তি দেবার প্রক্রিয়া এবং ভাবনাকে ব্যাপ্তির পথে নিয়ে যাবার স্বয়ংক্রিয় কৌশলটির নামই চিত্রকল্প। আর এটাই বাস্তব, কারণ নিজস্ব বাস্তবতার ক্ষেত্রভূমিই নির্মিত হয়। পাবলো পিকাসো নিজের উপলব্ধিতেই তা বুঝিয়েছিলেন বলেই বলেছিলেন “ Everything you can imagine is real.”

সাম্প্রতিককালের বাংলা কবিতায় চিত্রকল্পের ভিন্ন ভিন্ন রূপ চোখে পড়ে। সাধারণত দুই ধরনের চিত্রকল্প সৃষ্টি হয় – আত্মগত এবং বস্তুগত। আত্মগত চিত্রকল্পই বেশি সমাদর পায় কবির কাছে। কারণ ব্যক্তিজীবনের ক্ষয় ও শূন্যতা, ভাঙন ও দীর্ঘশ্বাস এবং অবদমন ও আদিমতার নানা রূপ প্রতীকায়িত হয়। এখানে এক একটি শব্দও সংকেত বা চিত্রকল্পের ভাষা হয়ে ওঠে। ব্যক্তিজীবনের প্রেক্ষাপটে এইসব চিত্রকল্প আশ্রিত বলেই ব্যক্তিহৃদয়ের চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা ও স্বপ্নের মৃত্যু এবং আত্মসংকটের অভিন্ন রূপ পাওয়া যায়। কখনো আদিম অবচেতনের প্রভাব ঘটে। অধিবাস্তবের কাছেও কবিকে আশ্রয় নিতে হয়। কারণ সমাজ-নিষিদ্ধ কোনো অবদমিত ইচ্ছাকে সসরাসরি প্রকাশ করা যায় না। তখন প্রতীক ও রূপকের অন্তরালে যেসব প্রকাশ করতে হয়। আবার নাথিংনেস বা এম্পটিনেসকেও হাহাকারের অন্তরালে রেখে দিতে হয়। তবু এই জীবনযাপনের স্মৃতি, প্রেমের অমোঘ বাতাবরণ, আত্মব্যঞ্জনের দহনে সর্বদা বিপন্নতার অন্তরদর্শী এক চিত্রকল্পের পর্যায় গতিময় হয়ে ওঠে। কবি মাসুদ মুস্তাফিজ ‘পোড়োমাটির চাঁদ-সমুদ্র’ কবিতায় লেখেন –
“তোমার মেঘচোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমি প্রতিদিন ডুবে যাই ওই রোদনমনের রঙিন সমুদ্রকালের ভেতর সূর্যের শাদা হাওয়ার দিন ফিরে আসে
আর অন্যদিকে তোমার অবিরল কথা ফুরিয়ে গ্যালে অথবা না রাখা কথাগুলোর দুস্তরজনের অবাধ্য হাতে বুকের কাঁপন তোলে আর কিছু পূর্বের মেঘালু বাতাসের লুকানো আলোয় বিশ্বাস আমার দীর্ঘশ্বাসে মাটির যৌবনে সূর্যচোখ বিঁধে যায় চিনচিন করা অধরা তোয়াক্কা ছায়াগুলো দলবাঁধা ঘোলা শব্দের রাত্রিযাপনে জড়িয়ে ধরে সাহসী ভোরের বিশ্বাসী জলসত্রে”
নিজস্ব ব্যথাকে শূন্যতা ও অধরাকে, প্রেম ও প্রেমের মৃত্যুকে যখন ভাষা দেবার প্রয়োজন হয়, যখন বাইরে টেনে আনার প্রয়োজন হয় তখন তো এভাবেই লিখতে হয়। জীবন মহাজীবনের সমুদ্রে ভেসে ওঠে। প্রেমিকার চোখ আকাশ(মেঘচোখ) হয়ে যায়। মন রোদমনের রঙিন সমুদ্র যা সূর্যের শাদা হাওয়ার দিনে পরিণত হয়। কথা না রাখার দুস্তরজনের অবাধ্য হাতে বুকের কাঁপনে নৈর্ব্যক্তিক হওয়া এবং পূর্বের মেঘালু বাতাসের লুকানো আলোয় বিশ্বাস হয়ে দীর্ঘশ্বাসে রূপান্তরিত সবই চিত্রকল্পের ভাষা পায়। যার মধ্যে থাকে আত্মগত মানবীয় প্রবৃত্তিরই জাগরণ। চিনচিন করা অধরা তোয়াক্কার ছায়া, যারা ঘোলা শব্দের রাত্রি-যাপনে জড়িয়ে ধরে সাহসী ভোরের বিশ্বাসী জলসত্রে। চিত্রকল্পগুলি  মেটাফোরিক বোধের তীব্রতায় চলাফেরা করে- যা ব্যক্তিগত হয়েও অনন্তের সত্তায় মিশে যায়। মেঘচোখ, রোদনমন, সমুদ্রকাল, দুস্তরজন, মেঘালুবাতাস, অধরা তোয়াক্কা, বিশ্বাসী জলসত্র প্রভৃতি শব্দবন্ধগুলি এক-একটি রূপকাশ্রিত সংকেতের ধারক যারা চিত্রকল্পের প্রগাঢ় বিন্যাসকে অনিবার্য করে তুলেছে।

কবি অরবিন্দ চক্রবর্তী’র ‘মুখোশ নাচ’ কবিতাতেও এরকম রূপকাশ্রিত চিত্রকল্পের প্রয়োগ কবিতাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। বাহিরের ক্রিয়াসংযোগে অন্তরের প্রবাহমান ব্যাপ্তি কত তাৎপর্যপূর্ণ তা বোঝা যায় –
     “স্ট্যাচুর মাথায় টোপরপরানো সূর্যোদয়,
      তোমাকে বলা যায় – আমি আহ্লাদিত, স্বপ্নদুষ্ট নই
      এবার যেকোনো শাড়িহিন রাত্রিকে কোলবালিশের পাশে শুয়ে
      যেতে বলা যায়।

      কিছু ঘুমপোকা ছিপি খুলে ভুতুম-পায়ে এগিয়ে এসে
      আমাকে ব্র্যান্ডি ওয়াইনে বুঁদ হতে নির্দেশ করে…

      সবুজ অক্সিজেন সরবরাহকারি এক সনাতন নাচুনেকে তখনো
      দেখি
      গোপন প্রেমিজ ডোবানো ফোয়ারাতলে
      বেঁচে থাকার বাসনায় রক্ত ধুয়ে যাচ্ছে স্নানঘরের অন্যান্য
      মুদ্রামগ্নতায়।“
স্ট্যাচুর মাথায় টোপরপরানো সূর্যোদয় দেখতে দেখতে ‘আহ্লাদিত’ ভাবটির শুয়ে যেতে বলতেও এম্পটিনেস্‌ বা নাথিংনেস্‌কে মনে পড়ায়। ‘ঘুমপোকার’ বাস্তব উপস্থিতি না থাকলেও উপলব্ধির ক্ষেত্র থেকে তাকে নির্ণয় করা সম্ভব। কারণ ব্র্যান্ডি ওয়াইন যখন নেশার বস্তু তখন ঘুমপোকার ভুতুম পায়ে অগ্রসর হওয়ার চিত্রকল্পটিও জীবন্ত রূপ এনে দিতে পারে। আবার সবুজ অক্সিজেনের রঙ দেখে সনাতন নাচুনেকে কল্পনা করা যায় যা উদ্ভিজ্জ হলে হোক। গোপন প্রেমিজ ডোবানো ফোয়ারাতল অথবা রক্তধুয়ে যাওয়া স্নানঘরের মুদ্রামগ্ন রূপ সবই বেঁচে থাকার বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। আত্মক্ষরণের সীমানায় জীবনের অনন্ত প্রজ্ঞাকে স্থাপন করেছেন কবি। তাই শব্দগুলি আত্মসামীপ্য থেকে বহির্জগতের ব্যঞ্জনায় ধাবিত জীবন্ত রূপ লাভ করেছে।

          পরাবাস্তববাদী ভাবনার আলোকে কবিরা নির্জ্ঞান মনের অন্ধকারেও পথ খুঁজেছেন। তাঁদের উপলব্ধিকে সেই স্তরে নিয়ে গেছেন। সেখানে বিশেষ্য বিশেষণ একাকার হয়ে গেছে। ক্রিয়া ব্যবহারে চিরাচরিত রীতিও পালটে গেছে। যে বাস্তবের মুখোমুখি কবিরা করতে চেয়েছেন তা সম্পূর্ণই আলাদা এক জগৎ যেন। কবি গোলাম রসুল ‘খড়ের হাওয়ায় গাড়ির শব্দ’ কবিতায় লিখলেন –
           “ নিগূূূঢ় কালো
             অজস্র ঘুম
             কালোর আড়ালে চলে গেলে। স্বর্গের দুটি রঙ
             এখন ভাসছে দু চারটি গর্ভবতী নৌকা
             জানি না কে আর কারা জন্ম নিতে আসছে অদ্ভুত একা একা
             মাটির তলায় বাজনা
             কাদায় জ্বলছে আলো”
নিগৃঢ় কালো, অজস্রঘুম এবং স্বর্গের দুটি রঙ, গর্ভবতী নৌকা, মাটির তলার বাজনা, কাদায় জ্বলা আলো সবই আমাদের জানা দৃশ্য হতে পারে, তবু স্বপ্নদৃশ্যের মতো মনে হয়। মেটাফিজিক্‌সের ছায়াপাত ঘটে। ‘সূচে ভাসছে সমুদ্রের বীজ’ নামে আর একটি কবিতায় কবি লিখেছেন –
             “দীর্ঘতর চাঁদ
              সূচে ভাসছে সমুদ্রের বীজ
              মাছের পিঠে জীবন্ত ঢেউ
              মানুষের কবর আহার করছে দূরে

              পুবে সূর্য ডুবছে স্বর্গের দুটি রঙে
              জানিনা কিভাবে সন্ধ্যা নামছে আবার”
দীর্ঘতর চাঁদের ধারণা বাদ দিলেও কীভাবে সূচে সমুদ্রের বীজ ভাসে আমরা জানি না। মাছের পিঠে জীবন্ত ঢেউ জন্মালেও মানুষের কবর কীভাবে আহার করে জানি না। ‘স্বর্গের দুটি রঙ’ আমাদের জানা নেই। সমস্ত যুক্তিপরম্পরা ভেঙে দিয়ে যে অন্যতর বাস্তবের পটভূমি কবি দান করেন তা অধিবাস্তবেরই প্রয়োগ। ১৯২৪ সালে আঁন্দ্রে ব্রেঁতো যে ‘সুররিয়ালিজমম ম্যানিফেস্ট’ প্রকাশ করেন, সেখানে তিনি উল্লেখ করেন – “ A higher reality could be captured by freeing the mind from logic and rational control.” সুতরাং কবির চিত্রকল্পে কোন যুক্তিই গ্রাহ্য হতে পারে না। ইমপ্রেশানিজম্‌ মতবাদের প্রভাবে সাম্প্রতিককালের কবিরা ব্যক্তিগত আবেগ-উপলব্ধিকে মূর্তিদান করতে গিয়ে এবং সেগুলি স্বয়ংক্রিয়তা দিতে গিয়ে বর্ণ ও আলোর কারুকাজকে চিত্রে রঙে ক্রিয়ায় প্রকাশ করে থাকেন। সেই কারণেই নিঃসঙ্গতা বা Alonenesses কে আবার কবিরা ‘অদ্ভুত একা একা’ বা Mysterious Person বা বিভ্রান্তিকর ব্যক্তি হিসেবে উপলব্ধি করেন। তাঁদের কবিতায়ও সেই Mysterious বা বিভ্রান্তিকর রূপ ফুটে ওঠে। কখনো জাদুবাস্তবের চিত্রকল্প হয়ে যায়। যেমন –
১)   নাসির আহমেদ –
     “আয়নায় তাকাতেও ভয়ে জড়োসড়ো হই অকস্মাৎ
     আশ্চর্য ঘোরের মত আমার মুখের মধ্যে অন্য কারও মুখ!
     এ কোন্‌ বিভ্রম তবে, শব্দ করে আয়না ফেটে যায়
      দেখি সেই বিচূর্ণ আয়নায় গল্প বলে যায় আমারই নানীর মুখ”।
                             ( আয়নার ভেতরে বিবর্তন)

২)  ওয়ালী কিরণ –
    “আমার ঘরের আয়না জাদুর আয়না এক –
     তার সামনে গিয়ে যেই দাঁড়ালাম, দেখি –
আমি এক হিজড়ে বা মেয়ে মানুষের রূপ ধারণ করেছি”।
                            (জাদুর আয়না)

আত্মগতবোধের চিত্রকল্পই আজকের কবিতায় বিশিষ্ট স্থান করে নিয়েছে, কারণ বস্তু-পৃথিবীর objective দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় নেই বললেই চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ একসময় বস্তুগত চিত্রকল্পের প্রভাব ফেলেছিল।  সেইসময় ‘এযুগের চাঁদ হল কাস্তে’ বলে দীনেশ দাসের কিংবা ‘আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাত্রির আকাশে’ বলে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় লেখা হয়েছিল। শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখলেন ‘অন্তরে মেঘ করে/ ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে’ থেকে শুরু হল কবির অন্তর্মুখী বোধের যাত্রা। যেখানে ‘অবনি বাড়ি আছো’ ভাবের মধ্যেই ঘটল এর সূচনা, অর্থাৎ subjective দৃষ্টিভঙ্গির জাগরণ।
            
তবু বস্তুগত চিত্রকল্পের একটা ধারা সাম্প্রতিককালের কবিতাতে প্রতিফলিত হচ্ছে। যদিও কবির ব্যক্তিগত উপলব্ধি, শব্দপ্রয়োগ এবং বিশেষ্য ব্যবহারের নতুনত্ব আছে। এইসব কবিতাতেও এই সময় ও ভাবগত নানা অনুষঙ্গ বিভিন্নরূপে ফুটে ওঠে। কবি কুমার চক্রবর্তী ‘আমি’ কবিতায় নিজেকে, নিজের ব্যক্তিসত্তাকে এভাবে মেলে ধরলেন আলো-অন্ধকারের সামিপ্যসম্মেলনে—
        “এই আমি, মূলত অন্ধকার, কিছুটা আলোয় মেশানো
         প্রতিভাত করে না কিছুই, শুধু তার বিস্মৃত বিস্ময়
         ছায়াসহ পড়ে আছে নির্জ্ঞান ভূমিতে, অথবা সে নাই,
         চাকার মতন ঘোরে শূন্যতায়, মিশে যায় হাওয়ায় হাওয়ায়।”

ব্যক্তিসত্তাকে আর ব্যক্তিরূপে প্রতিভাত করা য্যা না। আলো-আঁধারের তীব্র রহস্যময়তায় সে হারিয়ে গেছে। শুধু তার ছায়ামাত্র পড়ে আছে অবচেতনের নির্জ্ঞান ভূমিতে। শূন্যতায় পাক খায় শুধু অথবা হাওয়ায় হাওয়ায় মিশে যায়। এই ‘হাওয়া’ বস্তুজগতের নিরীক্ষায় বলয় নির্মাণ করে চলেছে। ব্যক্তিশূন্য হলে নৈর্ব্যক্তিক হয়ে যায় আর বস্তুশূন্য হলে ‘হাওয়া’ হয়ে যায়।
          Subjective -> Objective
          Objective -> Nothingness
আর আমরা জানি   ‘Nothingness not being nothing, nothingness being emptiness.’ (Isabelle Adjani). সুতরাং বস্তুর মধ্যেও এই শূন্যতার দর্শনটি সাম্প্রতিককালে ক্রিয়াশীল। বাহ্যিক বর্ণনা বা বিবৃতির আড়ালে কবি হৃদয়ের শূন্যতা বা হাহাকারই প্রতিস্থাপিত হয়ে চলেছে। মেটাফোরিক দৃশ্যেও এর অন্যথা ঘটে না। চাঁদ-ফুল-পাখির ছবি, কিংবা হরিণ-উট-বাঘ-জিরাফ সব প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জের ছবির প্রতীকেই বস্তু পৃথিবীর ধ্বংস, রিরংসা, হিংস্রতা, ক্ষয় ও প্রলুব্ধতার নানা চিত্র বহুমুখীন দৃশ্যকল্পে রূপান্তরিত। প্রকৃতির নানা ঋতু, মাস, জ্যোৎস্না-অন্ধকারের দৃশ্যে সভ্যতার অবক্ষয়ীরূপই চিহ্নিত বা প্রতিফলিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে তা পজেটিভও সেকথা না বললেও চলে। পাহাড়, কুয়াশা, নদ-নদী, সূর্য-নক্ষত্র সবই চিত্রকল্পে স্থান পায়। কবি শংকর লাহিড়ী ‘জলের শব্দ ও ধাবমান টাট্টু’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতায় লিখেছেন –
          “ঘাসের ওপর লম্বা পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছে
           ফড়িং। ভোরবেলায় প্রসব বেদনায় জেগে উঠেছে
           স্ত্রী পাখিরা, একে একে খসে পড়েছে তাদের পালক।   
           বিছান থেকে চাদর খসে পড়েছে।
           উষ্ণ সাবলীল জলে ও সাবানে ভিজে যাচ্ছে
           রাতের অসংখ্য হত্যাগুলি”।
খুব বস্তুগত কতগুলি চিত্রের বর্ণনা কবি দিয়েছেন, যা প্রকৃতিরই ক্ষেত্র থেকে নির্ণীত। ফড়িং এর হেঁটে যাওয়া, পাখিদের জেগে ওঠা এবং পালক খসে পড়া, বিছানার চাদরের খসে পড়া, জলে সাবানে মিশে যাওয়া। কিন্তু লক্ষ করার বিষয় পাখিদের প্রসব বেদনা এবং জলে সাবানে ভিজে যাওয়া রাতের অসংখ্য হত্যা। যদিও দুটি বহুবচন শব্দ ‘অসংখ্য’ এবং ‘হত্যাগুলি’ পরপর ব্যবহার করেছেন কবি। তবু ‘সাবলীল জল’ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে বস্তু এখানে আর বস্তু থাকে না। স্রোতের অবিমিশ্র ধারণায় মুছে যাওয়া নিরন্তর শূন্যতাকেই বন্দনা যেন। পাখির প্রসব বেদনায় প্রাণীকুলের সৃষ্টি প্রাচুর্যকে প্রতীকায়িত করেছেন। ‘অসংখ্য হত্যা’ সভ্যতারই নিষ্ঠুরতম প্রবৃত্তিকে তুলে ধরেছেন। সমগ্র কবিতাটিতেই এই সময়কে অতীতের নিষ্ঠুরতম যুদ্ধের প্রবৃত্তির সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন এক সেতুর প্রতীকে। টাট্টু ঘোড়ার প্রতীক তো ধাবমান সময়। সময় নিয়ে এসেছে ভোগ আর ভোগের প্রাচুর্য নারী। কবিতায় কবি যাকে ‘গণিকা’ বলেছেন। কারুকার্যের উত্থান, অহংকারী সভ্যতার হৃদয়হীন রূপটি কবিতার বিষয়। কিন্তু বিষয়ের অন্তরালে প্রাণের হাহাকারই জেগে ওঠে।

কবি সোমনাথ রায় ‘বিকেলের আলো’ নামে একটি কবিতায় লিখলেন –
          “ভাঙা সেতু ডুবে থাকে
          মাথার ওপরে পাক খায় শঙ্খচিল
          তার শিসে রেফারির হুইসেল বাজে
          চোখের আড়ালে কাঁপে বিদ্রূপে তটস্থ ভিজে কাঠ

          পেছনে স্মৃতির গাঢ় সাদামাটা আলপনা নির্জনে জেগে আছে
          তার বুকে ধরা থাক শেষ বিকেলের আলোটুকু”
ডুবে থাকা ভাঙা সেতু, মাথার ওপর পাক খাওয়া শঙ্খচিল, তটস্থ ভিজে কাঠ, সাদামাটা আলপনা, শেষ বিকেলের আলো সবই খুব চেনা চিত্রকল্প। কিন্তু এই বস্তুগত বর্ণনার মধ্যে দিয়ে যখন কবি ‘রেফারির হুইসেল’ শুনতে পান, ‘বিদ্রূপ’ দেখতে পান, স্মৃতির গাঢ় আলপনা দেখতে পান তখন বিকেলটি দিনের নয় – জীবনের বিকেল হয়ে যায়। The life-afternoon. চিত্রকল্পের বস্তুগত ইমেজে প্রতিষ্ঠিত জীবনেরই অপসৃয়মান এক ক্ষয় ও চিহ্ন। যতই বস্তুগত ধারণার মধ্যে দিয়ে চিত্রকল্প গড়ে উঠুক না কেন, তাকে নিরীক্ষণ করার জন্য চোখ নয়, উপলব্ধির ব্যাপ্তি দরকার। কারণ ইমেজ চোখের উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে না। মার্ক টুইন তাঁর “ A Connececticut yankee in king Arthur’s court” – এ বলেছেন – You can’t depend on your eyes when your imagination is out of focus”. অর্থাৎ চোখের বাইরেও চিত্রকল্পের বৃহত্তর একটা জগৎ থেকে যায়। এই জগতেরই সন্ধান দেন আজকের কবিরা।

বাস্তবের কদর্য ক্রূরতা একঘেঁয়েমিতে জীবনের পথ যখন সংকীর্ণ, তখন চিত্রকল্পের হাত ধরে কবিরা তাঁদের আশ্রয়ভূমি নির্মাণ করে চলেছেন। একদিকে দুঃখ, হতাশা, আত্মিকসংকটের অন্ধকার প্রতিমুহূর্তে কবিদের দিশেহারা করে চলেছে। তখনি দার্শনিকবোধের কেন্দ্রভূমিতে নিজেকে বিস্তৃত করার মধ্যে দিয়ে কবিরা এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন। জাতীয় জীবনে Waste Land বা পোড়োজমির চিত্রকল্প একসময় মারাত্মক হয়ে উঠেছিল। মূল্যবোধের অবক্ষয়ী চিত্র হিসেবেই তা এসেছে কবিদের কাছে। কিন্তু সম্প্রতি ব্যক্তিজীবনের শূন্যতায় কবিরা এক-একজন এক একটা তাঁবুর ভিতর প্রবেশ করেছেন। প্রতিমুহূর্তে এই পরিবর্তন ঘটে চলাকে সিসিল.ডে.লুইস লক্ষ্য করেই লিখেছিলেন –
“Yet the image is the constant in all poetry and every poem is itself an image. Trends come and go, diction alters metrical, fashions change, even the elemental subject-matter may change almost out of recognition: but metaphor remains, the life-principle of poetry the poet’s chief test and glory.” (The Poetic Image)
        
একথা সত্য বলেই কবিরা চিত্রকল্পের বিনির্মাণের মধ্যে দিয়েই চেতনমন ও অবচেতনমনের মধ্যে সেতু রচনা করে চলেছেন। অনেক সময়ই আমাদের কাছে তা দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। প্রসঙ্গচ্যুতি মনে হতে পারে। বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবের কুশ্রিতা থেকে বাঁচার উপায় তো এই অবলম্বন। লুইস ক্যারল সেইজন্যই বলেন – “ Imagination is the only weapon in the war against reality”. (Alice in Wonderland).
 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E