৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২১২০১৭
 
 ২১/১০/২০১৭  Posted by

কবিতা একটা সময়ের শিমুলপুর
– তৈমুর খান

একজন কবিকে পাঠকের উপরই ভরসা করে কবিতা রচনা করতে হয়। পাঠক যদি কবিতা না পড়ে তাহলে কবির সার্থকতা কোথায়? এই কারণেই reader-response theories-টাকেই মান্যতা দিতে হয়। কারণ, কবিতার যে প্রকাশ তাতে সর্বদা একটা রহস্যময়তা, একটা খণ্ডতা, একটা অপূর্ণতার ব্যাপার থেকেই যায়। কবি যা বলেন তার অনেক বেশি পাঠককে ভেবে নিতে হয়। কবির ভাবনাটিও বহুমুখী হতে পারে পাঠক বিশেষে। সর্বদা একই রকম অর্থও প্রকাশ করে না। এই কারণেই ডিজিটাল পাবলিশিং Shmoop Premium সেকথা উল্লেখ করে যে a point of view দিয়েছে তা প্রনিধানযোগ্য :

The big contribution of Reader-Response theorists was to call attention to the importance of the reader in the making of literary meaning. Reader-Response theorists like to ask questions like: How do we feel when we read a certain poem, or a passage from a novel? Why do we feel that way? How does our psychology affect the way we read literary texts? How does each of us read differently? Only when we ask those questions, these theorists argue, can we truly begin to understand literature.

তা বলে কবি পাঠকের মুখ চেয়ে কবিতা লিখবেন?

না, তা কখনোই নয়। প্রকৃত কবিতা এমন এক অনুভূতি যা ব্যক্তিহৃদয়ের উৎস থেকেই উৎসারিত হতে পারে। বাইরের বস্তু জগতের কোনো ঘটনা কবির মনে যে অভিঘাত সৃষ্টি করে কবিতাতে তারই প্রতিফলন ঘটে। ব্যক্তিহৃদয়ের ভাঙন থেকে, কষ্ট থেকে, বেদনা ও শূন্যতা থেকেও এই অভিঘাত সৃষ্টি হয়। প্রকৃত কবিতা কখনোই ছলনা জানে না। তার আত্মরসায়নের শব্দেই স্তব্ধতা অনুভব করা যায়। আবার উদ্বেগ ও বিপন্নতাও। আসলে সময় ও ব্যক্তি একই সঙ্গে কবিতায় উঠে আসে। সময়কে অস্বীকার করা যায় না। তেমনি ব্যক্তি চাহিদার পর্যায়টিও সর্বদা উপেক্ষা করা যায় না। যেমন, ব্যক্তি হৃদয়ে প্রেমের শূন্যতা nothingness বা emptiness এর জন্ম দিতে পারে, তেমনি স্তব্ধতারও। বস্তু সংকট থেকে একজন স্রষ্টার কাছে আত্মিক সংকটই মারাত্মক হয়ে ওঠে। কবিতা সেই শূন্যতারই ধারক। তখনই লিখতে হয় :

কোনোদিকেই রাস্তা নেই আর
সব রাস্তায় বিপন্ন কাঁটাতার

বিশ্বাস হারানো কোনো পথেই তখন আলো থাকে না। এই পথ হারানো তো হৃদয়ের ব্যাপার। এই রাস্তা পার্থিব আলোতে খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রেমের শূন্যতা সম্পর্কের ছিন্ন স্বরলিপিতেই বাজতে থাকে। এই কারণেই থমাস গ্রে বলেছেন : Poetry is thoughts that breathe, and words that burn. হৃদয়ের ঘনিষ্ঠ উত্তাপ যাকে বলে কবিতা সেখানেই আত্মরসায়নে জারিত হয়।

তবে কবিতায় থাকে আদিম প্রবৃত্তিরই নিষিক্ত প্রলাপ যা সব সময় রহস্যচারী, সম্মোহক, সরাসরি তা প্রকাশ হতে পারে না। কেবল মাত্র ইংগিতে বা রূপকে বা শূন্যতায় বা বিনির্মাণের মধ্যে দিয়েই বেজে ওঠে। এই আদি প্রজ্ঞাই হল লিবিডো। সৃষ্টিচৈতন্যে তা সর্বদা বহুমুখী ব্যাপ্তি নিয়ে জেগে ওঠে। এর উত্তরণে কবিরা একধরনের ভাষাও আয়ত্ত করেন। যে ভাষায় সুর-রিয়া-লিজম্ বা অধিবাস্তবতা দেখা যায়। আবার ম্যাজিক রিয়ালিজম্ বা জাদুবাস্তবতাও গড়ে ওঠে। কখনো ওই বোধ শূন্যতায় চালিত হয়ে অবদমনের ক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়। ‘কিছু নেই’ কথাটি অবদমনের ভাষা। ‘শূন্য’ কথাটিও অবদমনের রূপান্তর। আমরা যে পথ দিয়েই যাই না কেন, যে দৃষ্টি দিয়েই জীবনকে দেখি না কেন — জীবনের উল্লাস, জীবনের অর্থ, জীবনের পরিচয় তো সেই আদিম প্রজ্ঞাতেই সমর্পিত। এই প্রজ্ঞাকে কেউ সরাসরি লেখে কবিতায়, কেউ আড়ালে ব্যঞ্জনার ভাষায়, কেউ সংকেতের পরামর্শে তার অভিব্যক্তির পথ খুঁজে পায়। কেউ কিছু না লিখেও কতকগুলি শব্দ রেখায় পদবিন্যাসে কিছুটা ধারণা দিতে চায়। এই ধারণার নানা স্তরে আমাদের জীবনরসায়নেরই কোনো পরিচয় থাকে। এই পরিচয়ের ভাষাটি পাল্টে যায় মেটাফোর বা মেটাফিজিকস্ এর ব্যবহারে। সেভাবেই কবিতা জীবনেরই অবিচ্ছিন্ন চিরন্তন প্রজ্ঞা হয়ে ওঠে। লিওনার্দো কোহেন এই জন্য বলেছেন : Poetry is just the evidence of life. If your life is burning well, poetry is just the ash. কবিতা জীবনদহনেরই ছাই স্বরূপ। যার মধ্যে স্বপ্ন ধ্বংস এবং শূন্যতা এবং মৃত্যুর অন্ধকার ছাড়া আর কিছু নেই।

কত দূর যাব?
যেখানে শিমুলপুর
এক হৃদয় থেকে অন্য হৃদয়
পায় না নাগাল তার…

শিমুলপুরের বিনয় মজুমদারকে আমরা ছুঁতে পারি না, অথচ তাঁরও হৃদয় ছিল, গান ছিল, প্রেম ছিল। কবিতায় তা রয়ে গেছে। একটা হৃদয় অন্য হৃদয়ের দূরত্ব মাপতে পারে না। কবিতা এই খণ্ডতা নিয়েই চিরদিন বেঁচে থাকে একটা সময়ের শিমুলপুর হিসেবে।

 


তৈমুর খান

তৈমুর খান

তৈমুর খান। জন্ম ২৮ জানুয়ারি ১৯৬৭, বীরভূম জেলার রামপুরহাট সংলগ্ন পানিসাইল গ্রামে। শিক্ষা বাংলা ভাষা সাহিত্য নিয়ে মাস্টার ডিগ্রি ও প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা নিয়ে পি এইচ ডি। পেশা : উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহশিক্ষক।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ আটটি >- কোথায় পা রাখি, বৃষ্টিতরু, খা শূন্য আমাকে খা, আয়নার ভেতর তু যন্ত্রণা, বিষাদের লেখা কবিতা, জ্বরের তাঁবুর নীচে বসন্তের ডাকঘর, প্রত্নচরিত ইত্যাদি।

পুরস্কারঃ কবিরুল ইসলাম পুরস্কার, দৌড় সাহিত্য সম্মান এবং সুখচাঁদ সরকার স্মৃতি পুরস্কার ইত্যাদি।

ঠিকানা : রামরামপুর, শান্তিপাড়া, রামপুরহাট, বীরভূম, পিন কোড ৭৩১২২৪, পশ্চিমবঙ্গ। ফোন নম্বর ৯৩৩২৯৯১২৫০

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E