৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ০৯২০১৭
 
 ০৯/০৭/২০১৭  Posted by

আমার জীবনযন্ত্রণার কবিতা ও তার প্রেক্ষাপট
– তৈমুর খান

 

ঘাসকাটা
__________
দু’বেলাই ঘাস কাটি মজুরের ছেলে
কাঠখড়ের উষ্ণতায় রাত্রি করি পার
তবুও পার্টির লোক আমার দরজায়

না বাপু, কামাই হলে আমিই উপোস
কী খাই, কী খাই সারাদিন….
মিছিলের লাল ধুলো, ঘুরবে আকাশ

আর একটু দাঁড়াও কার্ল মার্কস,
কয়েক শতাব্দী আরও কেটে নিই ঘাস ।

 

কবিতাটির প্রেক্ষাপট
প্রায় বাল্যকাল থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত চরম দারিদ্রের মধ্যেই আমার জীবন কাটে। বুনো কচুর শাক সেদ্ধ থেকে হেলা, ডুমুর, শালুক এবং খুচরো মাছ ধরে প্রায় প্রতিদিনই খাবার জোগাড় করার রীতি হয়ে দাঁড়ায়। বেশ কয়েকবার মুম্বাই শহরে গিয়ে মুটেগিরি করেও রোজগার করতে হয়। কিন্তু পড়াশোনা চালানোর জন্যই থাকতে হয় গ্রামে। স্কুল-কলেজে পড়ার সময়েও মাঠে মাঠে গরু চরানো, মুনিষখাটা, ঘাসকাটা, ইঁদুর গর্তের ধান তোলার মতো ক্ষুন্নিবৃত্তিও গ্রহণ করতে হয়। কষ্টলালিত এই জীবনে বড়ো হয়ে ওঠার গল্পটিও খুবই যন্ত্রণাদায়ক। কেননা, বস্তুগত অভাবই মানসিক মনোবলকে অনেক সময়ই ভেঙে ফেলেছে। বাবার কোনো আয় নেই। ছোটো ছোটো ভাইবোনদের অনাহার ক্লিষ্ট শুকনো মুখ। কয়েক ছটাক গম অথবা খুদ ভাজা নিয়ে মাঠে গিয়ে ঘাসকাটা। কয়েক বস্তা ঘাস কাটলে এককেজি গম অথবা এককেজি খুদ পাওয়া যায়। তাই দিয়ে রান্না হয় জাউ। সারাদিন পর সেই জাউ খেয়েই উঠোনে বাবার সঙ্গে বসে পড়াশোনা। এরকমই অবস্থার মধ্যে দীর্ঘদিন চলে যাচ্ছিল।

কবিতা কি তখন আসত না ?
অবশ্যই কবিতা আসত। যৌবনের সংরাগ, কামনার অপার্থিব স্বপ্ন এবং বিরহের অনন্তদিশারি আগুনের স্পর্শ অনেকটাই দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। পেটে ক্ষুধার আগুন, তাই অন্য আগুনের ততটা স্পর্ধা হয়নি। নব্বই দশকে বামপন্থী রাজনৈতিক দলের মিছিলে কলকাতায় কতবার এসে দুটো রুটি ও গুড়ের জন্য কত লড়াই করতে হয়েছে। সেসবও মনে জ্বল্ জ্বল্ করে। বামপন্থীরা তাদের দলে ডেকে নিয়ে যায় ভবিষ্যতে কোনো কাজের ইশারায়। কিন্তু কাজও হয় না। শুধু মার্কামারা “মিছিলের লোক” হয়ে উঠি। পরে বুঝতে পারি এ সমস্তই স্তোকবাক্য। কাজের কাজ কিছুই হবে না। আমাকে লেখাপড়া শিখেও ঘাসকেটেই খাবার জোগাড় করতে হবে। কার্ল মার্ক্সীয় নীতি সাম্যবাদ আনতে পারবে না। গরিব চিরদিন গরিবই থেকে যাবে। এই বোধই আমাকে আমার অভিজ্ঞতার একটা মরমি ক্ষেত্র দান করে। সেখানেই কবিতার জীবনসত্যটি মর্মরিত বাণীমূর্তি লাভ করে। নব্বই দশকের শেষলগ্নে এসে চরম এই আত্মদহনের পর্যায়টিতে যতগুলি কবিতা লিখেছিলাম তার মধ্যে “ঘাসকাটা”ই অন্যতম। সেই সময় প্রথম পাঠাই “দেশ” পত্রিকায় কবিতাটি। অবশ্য লেখার বছর দুয়েক পর। পাঠানোর পর পরই খুব দ্রুতই ৪ নভেম্বর ২০০২ সালের “দেশ” পত্রিকায় কবিতাটি প্রথমেই স্থান অধিকার করে প্রকাশিত হয়। কবিতার সঙ্গে একটি বড়ো চিত্রও সেখানে সন্নিবিষ্ট করা হয় এবং সেটাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষুধার্ত হাড্ডি পাঁজরাসার একটা মানুষের হাতে ধরা একটা কাস্তের ছবি। ঘাসকাটা মজুর।

আমার প্রাণের আকুতি, কষ্ট, স্বপ্নভঙ্গ, অভাব সবই এই কবিতাটিতে ধরা আছে। আমি পার্টির লোককে সত্যিই একদিন বলেছিলাম, মিছিলে গেলে আর খেতে পাব না। সারাদিন বীরভূমের লাল ধুলো মেখে আমাকে ঘুরতে হবে। মিছিল করেও আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন আসবে না। কবিতাটি সেই অন্তর্জ্বালার সত্যতা থেকেই লেখা। এই সময় থেকেই বামপন্থী শাসনের অন্তঃসারশূন্য গর্জন সকলের কাছেই প্রতিভাত হতে থাকে। এবং পরবর্তী সময়ে তা প্রায় ভেঙে পড়ে। কবিতাটি যে একটা রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের পটপরিবর্তনের ইংগিত হয়ে উঠেছিল তা অনেকেই স্বীকার করবেন।

সত্যি কথা বলতে গেলে কী, প্রকৃত কবিতার জন্ম তো কোনো সত্যতাকেই অবলম্বন করে। এই সত্যতা জীবনের চরমতম অভিজ্ঞতা, যেখানে দুঃখ কষ্টের ছোবলগুলি প্রতিনিয়ত ক্ষত সৃষ্টি করে। কয়েক বস্তা ঘাস কাটতে হত আমাকে রোদে জলে ভিজে না-খেয়ে। তা মাথায় করে বয়ে এনে গেরস্থ বাড়িতে দিতে হত। তারপর আঁচল পেতে নিতে হত গম অথবা খুদ।

শীতকালে অথবা বৃষ্টিদিনে বাড়িতেও থাকার তেমন জায়গা হত না। তালপাতার ও খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরে শীত ঢুকত অথবা বৃষ্টি। জ্বালানির জন্য কাঠ-পাতা জমা করে রাখতাম। অথবা খড় বিছিয়ে তার উপর শোয়ার ব্যবস্থা হত। দিন আনি দিন খাই লোকের বাড়ি। সেখানে কুকুর বেড়ালের আনাগোনা। কিন্তু পার্টির লোক মিছিলের জন্য আসত। সরাসরি এ কথাই কবিতায় উপস্থিত হল। আর শেষ দু লাইনে সমাজতাত্ত্বিক কার্ল মার্ক্সের উল্লেখ করে আরও গভীর ভাবে উচ্চারণ করা হল জীবনের ক্ষুন্নিবৃত্তির কথা। তিন দশক ধরে বামপন্থী শাসনের আস্ফালন দেখে দেখে আমাদের হৃদয়বৃত্তির আকাশ ক্রমশ ঊষর মরু হয়ে উঠেছিল। কবিতাটি সেই নিহিতার্থেই পুষ্ট হয়ে উঠেছে।

আমার প্রিয় কবিতার মধ্যে এটি যে অন্যতম, তার কারণ আমার দীর্ঘশ্বাস। আমার অসহায় জীবনের আত্মধ্বনি বা আর্তধ্বনি এবং অপশাসনের রাষ্ট্রীয় প্রতিভাস কবিতাটির দর্শনে উঠে আসে। খুব কম কথা বলেও একটা যুগের অমোঘ নির্ঘোষ হয়ে থাকবে কবিতাটি। ব্যক্তির ইতিহাসে, সময়ের ইতিহাসে , রাষ্ট্রের ইতিহাসে এবং সমাজতাত্ত্বিক দর্শনে কবিতাটির উচ্চারণ শোনা যাবে। অক্ষরবৃত্তের চালে ব্যঞ্জনাবহ সহজ সাবলীল শব্দ প্রয়োগে এবং নাটকীয়তায় কবিতাটির আত্মাকে খুঁজে পাওয়া যাবে।

সময়লিপির ভেতর অস্তিত্বের পরিমাপটিই বুঝিয়ে দিয়েছে কবিতাটি।

 


কবি পরিচিতি

তৈমুর খান

তৈমুর খান জন্ম ২৮ জানুয়ারি ১৯৬৭, বীরভূম জেলার রামপুরহাট ব্লকের পানিসাইল গ্রামে। পিতা ও মাতা: জিকির খান ও নাওরাতুন। পড়াশোনা: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে মাস্টার ডিগ্রি এবং প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা নিয়ে পি এইচ ডি প্রাপ্তি। পেশা : উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহ শিক্ষক।

প্রকাশিত কাব্য : কোথায় পা রাখি (১৯৯৪), বৃষ্টিতরু (১৯৯৯), খা শূন্য আমাকে খা (২০০৩), আয়নার ভেতর তু যন্ত্রণা (২০০৪), বিষাদের লেখা কবিতা (২০০৪), একটা সাপ আর কুয়াশার সংলাপ (২০০৭), জ্বরের তাঁবুর নীচে বসন্তের ডাকঘর (২০০৮), প্রত্নচরিত (২০১১) ইত্যাদি।

পুরস্কার : কবিরুল ইসলাম স্মৃতি পুরস্কার ও দৌড় সাহিত্য সম্মান।

ঠিকানা : রামরামপুর (শান্তিপাড়া), রামপুরহাট, বীরভূম, পিন ৭৩১২২৪, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। ফোন ৯৩৩২৯৯১২৫০

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E