৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ১৬২০১৭
 
 ১৬/০১/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

সুনীতি দেবনাথ

সুনীতি দেবনাথ

সুনীতি দেবনাথ। জন্ম বাংলাদেশের সিলেটের বিয়ানীবাজার সাবডিভিশনের পঞ্চখণ্ডে। ১৯৫০ সালে দেশবিভাগজনিত দাঙ্গার কারণে সপরিবারে পাঁচ বছর বয়সে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে উদ্বাস্তু হয়ে আগমন ও স্থায়ী বসবাস। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যে এম.এ., বি. এড. এবং ওয়ার্ধা থেকে হিন্দী সাহিত্যে কোবিদ পাশ। সরকারি দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়ে বিষয় শিক্ষিকা হিসেবে চাকরি করে ২০০৩ সালে অবসর গ্রহণ। ১৯৮৬ সালে ভারত সরকারের মানব সম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের সংস্থা সি.সি.আর.টি. থেকে জাতীয় স্তরে শিক্ষক পুরস্কার লাভ। বিশিষ্ট সংস্কৃতিকর্মী ও নাট্যকার তথা নাট্য পরিচালিকা হিসেবে কৃতিত্ব। রবীন্দ্রনাথের চণ্ডালিকা ও স্বরচিত মহেশ ( শরৎচন্দ্র রচিত ছোটগল্প অবলম্বনে নাট্যরূপ)  -এর পরিচালনায় বিশেষ কৃতিত্ব।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কবি ও লেখিকা। কবিতা প্রিয়ভূমি। শৈশব থেকেই তিনি কবিতা লিখছেন। প্রবন্ধ, বিশেষ করে বিজ্ঞান প্রবন্ধ লিখে জনপ্রিয়তা অর্জন এবং ছোটগল্প লেখিকা। শ্রেণী বিভক্ত সমাজের বৈষম্য এবং নারীর মুক্তি ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নে প্রতিবাদী কবিতা লিখেন তিনি।
প্রকাশিত বই :
১) ম্যাজিসিয়ান ডি মুরারি প্রেক্ষিত পূর্বোত্তরের জাদুচর্চা ( গবেষণাধর্মী বই),
২) ঋদ্ধ সত্য অনুভবে আসে, কাব্যগ্রন্থ।
৩) প্রকাশিত  ই – বুক ‘স্বগত সংলাপ’।

সুনীতি দেবনাথ -এর কবিতা-ভাবনা

খুব ছোট্ট করে বলতে চাই আমি বিশ্বাস করি ‘ মানুষ মানুষের জন্য …’। মানুষকে ভালবাসি, স্বদেশ ভারতবর্ষকে ভালবাসি, জন্মমাটি ছিলো অবিভক্ত ভারতে। দেশ বিভাজনের ফলে সেই মাটি এখন বাংলাদেশ। বাংলাদেশকেও আমি ভালবাসি। আমি এই পৃথিবীর কন্যা, মা পৃথিবীকেও আমি ভালবাসি। ‘দেশে দেশে মোর ঘর আছে আমি সেই ঘর খুঁজি …’। বিশ্ব নাগরিক পরিচিতি আমার জন্য গর্বের। শ্রেণীহীন সাম্যের পৃথিবী আমার কাম্য। কুসংস্কারমুক্ত, হিংসা – বিভেদ মুক্ত শান্তির পৃথিবী চাই, সমাজ চাই। এ সমাজে নারী তার যথাযোগ্য মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ক্ষমতা পাক এ আমার স্বপ্ন। নীল গ্রহ পৃথিবী বিশ্বে অনন্য, পৃথিবীর প্রতিটি ধূলিকণা আমার প্রণম্য এবং এই অনন্যা পৃথিবীকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। আমার কবিতার মৌল ভাবনা এসব কথায় নিহিত।


অজানা

এই যে নিরালম্ব অবস্থান কতদিন কতকাল
এই যে অস্তিত্বের হাহাকার হয়তো চিরন্তন।
আমার তোমার যাপনের কাল স্বস্তিহীন শুধু
স্বর্ণলতিকার মতন সোহাগী শোভন হলেও
পরজীবী হবার যন্ত্রণার অবসান নেই কোনদিন।

ওপারে সমুদ্র উথাল পাথাল বেলাভূমি তপ্ত বালুময়
কখন উঠবে প্রলয় ঝড় সেও তো অজানা,
বন্দরে কি ফেলবে নোঙর অচেনা জলযান?
অলৌকিক স্বপ্নের যাত্রা শেষ হবে কি নতুন কোন
পারাপারহীন আলোকের ইশারায় অন্য উপকূলে?

কাজরী, ৬ জানুয়ারি, ২০১৭


অনুভবে

কিছু কথা থেকে যায় উচ্চারণ বহির্ভূত
স্মৃতি কিছু কিছু হৃদয়ের পলল মৃত্তিকায়
শিকড়ের ঘর বাঁধে একান্তে নীরবে আশায়
আকাশে ছড়িয়ে বাহু পত্রপুষ্পে কানাকানি করে।
আরো কিছু স্মৃতি ঘিরে থাকে আজীবন
মধুমক্ষিকার মত সারাক্ষণ গুণগুণিয়ে কথা বলে
জনসমুদ্রে কত তরঙ্গ ওঠে সকাল দুপুর রাতে
তবু একাকী জীবনে কেউ কেউ পথ হেঁটে চলে
আলোকবর্তিকা হাতে  অন্ধকারে স্বপ্নের পানসি
ভাসিয়ে কেউ মরাগাঙে স্রোতের আাকাঙ্ক্ষায় থাকে
জীবনটা আসলে এক কল্পকাহিনীই মনে হয়
হাজার চুমকির ওড়না আকাশে উড়িয়ে ছুটে চলা
আকাশ খণ্ড হয়ে এ কাহিনীতে ডুব দেয় ডুবেই যায়
যুগ যুগ ধরে ব্যর্থ স্বপ্নেরা আকাশকে ঢেকে ফেলে।

কাজরী, ৭ জানুয়ারি, ২০১৭


গণদেবতা

ঐ কুসুম কোমল দেশের নবনীত একটি টুকরো
ভেঙ্গে এনে কে যেন ছুঁড়ে ফেলেছে এখানে
ঘূর্ণির তোড়ে পাথুরে অনুর্বর মাটিতে
আমার মনটাকে কেবল কেমন করায়
এখানে মাটি আছে রসকষহীন
গাছ আছে রুখুসুকু পাতা আছে খরখরে
ফুল আছে ফল আছে আছে মাত্র ক্যারিকেচার
পাখিসব কর্কশকণ্ঠ বেসুরো ঝগড়াটে
মানুষ আছে লাবণ্যহীন নারী আছে কাঠপুতুল
প্রেম পিরিতি আছে আছে বেখুবসুরত
পেটে আগুন খাই খাই আগুন নেভাতে
শরীর চাই গণ্ডায় গণ্ডায় ছাওয়াল চাই
চলতে শিখবে গতর খাটাবে পয়সা কামাবে
আড়ালে আবডালে খিস্তি মারবে বড়দের মত
মহান গণতন্ত্রের মহতো মহীয়ান গণদেবতা!

কাজরী, ৫ জানুয়ারি, ২০১৭


ডুব দে ডুবুরি

ডুব দে ডুবুরি তুই অতল সমুদ্রে
দুটি হাতে জল কেটে ঢেউয়ের তালে
সমুদ্রের অতলে আছে আরেক সমুদ্র
পৃথিবীর অন্তরে যেমন অন্য পৃথিবী।
বড়ই ক্লান্তি আমাকে ঘিরেছে এবার ঘুমোবো
আমি মৎস্যগন্ধা নারী শৈবাল অরণ্যে
এলিয়ে শরীর ঘুমোতে চাই অবগাহনে
আমার এই দেহ ঘিরে নেচে যাবে তীব্র ছন্দে
সোনালি রূপোলি রূপসী মৎস্যকুমারীরা
স্পঞ্জের তুলতুলে হাত মুছাবে মুখের গ্লানি
শম্বুকের পিচ্ছিল চলাচল অনন্য অনন্তে
হাতছানি দেবে অন্য এক আলোর বিভাসে
নক্ষত্রেরা আধো রাতে মহাশূন্যের অশ্রুত সঙ্গীতে
শূন্য সাধনায় আমার সত্তাকে সমগ্র আমিকে
স্পন্দিত করে সব ক্লান্তি অপনোদনের পরে
পৌঁছে দেবে মহাশূন্যের অলৌকিক জগতে।

কাজরী, ১ জানুয়ারি, ২০১৭


দুই নদী

কালো নিকষ কালো অরণ্য সবেমাত্র পার হলাম
এ অরণ্যের প্রলম্বিত ছায়া এক সময় আমার
সামনে শুয়ে হাঁটছিল আমার গতির সঙ্গে মিলে,
একসময় ধীরে মাথায় উঠলো চুলে বিলি কেটে
ঢুকে গেলো আমার অন্দরে, আমি কিছু বলিনি।
বিকেল হতেই আমার ভেতরে ছায়া ভাঙ্গছে
কাঠঠুকরো সময় ঠুকেই চলেছে ঠক ঠক ঠক
ভেঙে ভেঙে ছায়াটা চূর্ণ জলকণার মত পেছনে
রক্ত জলে মিশে অলৌকিক নদীর মত শুয়ে পড়ে।

অরণ্য শেষে সামনে আরেক নদী বিক্ষোভে ভয়াল
পেছনে নদী সামনে নদী আমি টলমল মাঝখানে
পেছনে অরণ্য ছায়ে শুয়ে আছি পাশে শুয়ে পৃথিবী আমার,
সব রক্ত জল অশ্রু একাকার হয়ে নদী হয়ে কাঁদে  কুলকুল।
সামনে বিশাল নদী কূলপ্রান্তহীন পারাপারের তরী বিহীন
তরঙ্গ গর্জনে ভীষণ হাহাকারে জল ভাঙ্গে ঢেউ শুধু  তোলে
আর অনন্ত অসীমে চেয়ে করুণ আর্তিতে আক্রোশে ফুঁসে।

কাজরী, ৩ অক্টোবর, ২০১৬


লাশ

শব ব্যবচ্ছেদ হয়ে গেলো সাদা কাফনে ঢাকা লাশ
স্বজনের হাতে তুলে দেওয়ার পাটও শেষ
রাষ্ট্রীয় কর্তব্যের সুচারু সমাধান।

সারারাত করিডোরে একা বজ্রাহত বৃক্ষের মত
ছোট ভাইটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাত শেষে রিক্ত বৃদ্ধ,
ভ্যানে তুলে লাশটি নিয়ে গেলো অন্ধ গলির অন্ধকারে।

খোলা দরজায় প্রস্তর প্রতিমা জন্মদাত্রী জননী
প্রসব বেদনায় যেন  বিমর্ষ মুখে তাকিয়ে
সন্তান হারিয়ে বাঁচার মানেটা অর্থহীন।

গতকাল ভোরে তার প্রথম স্বপ্ন গলির মোড়ে
বোমাবাজিতে লাশ হয়েছিল
দেশটা এখন জ্যান্ত মৃত লাশে ছয়লাপ।

কাজরী, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬


এবার দ্রোহ

আর নয় ক্রন্দন এবার শুধু দ্রোহ!
ঝড়ের ওপারে নিশ্চয় আছে বিজয়,
আছে নতুন সূর্যের মিঠেল আলোয়
স্নাত হবার উজ্জীবিত হবার সুখ।
তাই কান্না বিষাদ নয় শুধু ভাঙ্গন
যত জঞ্জাল দূর হয়ে যাক এখন,
পুড়ে উড়ে যাক ভেসে যাক চিরতরে।
সব রক্তপিপাসু শত্রু নিপাত যাক,
মুক্ত হই তুমি- আমি সেইসব প্রাণ
বঞ্চিত শোষিত যারা যুগ যুগান্তরে।
এক আশ্চর্য আলোর স্রোতে ভেসে যাই
অত্যাশ্চর্য অলৌকিক আগামীর তীরে।

কাজরী, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৫


স্বেচ্ছানির্বাসন – ১

শেষ অব্দি রাত গভীরে দেহকে দুমড়ে মুচড়ে
ম্লান আলোর মত স্বচ্ছ কিছু একটা বৃত্তের মাঝে
অনড় অচলে আমি নয় যেন আর কাউকে
ঘূর্ণায়মান করে চূর্ণ চূর্ণ করতে চেয়েছিল
তাই সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি নিতেই হলো অবশেষে।
আমি নাকি সেই মেয়েটির স্বেচ্ছানির্বাসনে যাওয়া
একমাত্র ঠিকানা হয়ে গেল, রাতের শেষ প্রহরে
খোলা দরজার চৌকাঠ পার হতে তিরিশ সেকেন্ড
উঠোন পেরিয়ে পথে নামতে আরো তিরিশ
আকাশে তাকালাম ধোঁয়াটে জ্যোৎস্না কেটে কেটে
কেটে কেটে সপ্তর্ষিমণ্ডল পেরিয়ে উল্কাপতন হলো
ধূমায়িত লাভাস্রোতে থরথর কেঁপে ভূমি যামিনী সাথে
নতুন সকালের দিকে অবগুন্ঠনে মুখ ঢেকে তাকালো
ধরিত্রী তুমি পেছন ফেরো নয়ন তুমি শুষ্ক কঠিন হও
স্বেচ্ছানির্বাসনকালে আত্মার প্রতিকণা মুক্তি চায় শুধু

কাজরী, ১০ জানুয়ারি, ২০১৭


স্বেচ্ছানির্বাসন – দুই

ধ্রুবতারার ভাস্বর চোখে তাকিয়ে ছুটলাম
আমি নাকি সেই মেয়েটি বোধের বহির্ভূত,
হালকা পায়ে বেজে চললো অনাদি ঘুঙুরের
অশ্রুত সুস্পষ্ট গম্ভীরা আওয়াজ ঝমঝম,
চেনাজানা অচেনা শব্দেরা অভিনব ভিন্নতর
কোরিওগ্রাফিতে নান্দনিক সৃষ্টির বেদনায় কাতর।
দু ‘হাতে তাদের কুড়িয়ে কবিতার দেহ গড়তে গেলে
অনিকেত আলোর  ফুলকি শব্দসব নিভে গেল।
ছুটছি ঘামের স্রোতে ভেসে ভিন্ন গন্ধে ব্যাকুল
সামনে নদী পাগলপারা হঠাৎ মিঠেল হাওয়া
মায়ের আঁচল ছুঁয়ে গেল। ঐ দিকে পাগলা শিমূল
ঝরায় ফুল রক্তস্রোতে হৃদয়েতে বিশাল ফাটল,
চে গেভারার ঝরছে খুন লাল উড়ুনি উড়ছে যেন
নির্বাসনের দিনগুলিতে নতুন করে গড়তে চাই
কবিতা তোর শরীরখানি তরতরে ঐ স্রোতের মত।

কাজরী, ১১ জানুয়ারি, ২০১৭

১০
স্বেচ্ছানির্বাসন -৩

চলে যেতে যেতে পথের দু’পাশে নিস্তব্ধতা শুয়ে রয়
সন্ধ্যা হবো হবো কালে পাখিরাও পরিপাটি চুপচাপ
ক্লান্ত পা দু’টি রুক্ষ মাটিতে রক্তাক্ত ব্যতিব্যস্ত নির্জীব।
তবু যেতে হবে নীলাভ তরঙ্গায়িত নদীটির তীরে
এই নদীটি না পেরোলে ব্যর্থ হবে নির্বাসনে যাওয়া।
নদী, আমি যে ওপারে যেতে চাই নৌকা কোথা মাঝি কই
নেইতো কিছু আছে শুধু অন্তহীন কুটিল কালস্রোত,
সবুজ নক্ষত্র আলো কোন একদিন ডাক দিয়ে যাবে
অন্ধকারে বেঠিকানা অন্য কোন গ্রহে পাড়ি দিতে হবে,
হয়তো এ নদী পথ করে দেবে ওপারে চলে যাবার।
প্রতীক্ষার অন্ত নেই পরিমাপও নেই দশদিগন্তে
ক্ষুদ্রমাত্র পথচিহ্ন নেই দিশাহীন এই নির্বাসনে,
বোধের একান্তে শুয়ে নদী বুকে শূন্য মাঝে শূন্য হতে
কালঘুমে ডুবে যেতে হয় বুঝিবা, জানা হলোনা হায়
বহু কিছু এ জীবনে অজানাই থেকে যায় জানি শুধু।

কাজরী, ১২ জানুয়ারি, ২০১৭

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E