৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ০৯২০১৭
 
 ০৯/১১/২০১৭  Posted by

সুমন মল্লিক-এর কবিতা


অভিসারিণীকে

রাত গভীর হলে কেন আজও
তৃষ্ণা মিটিয়ে দাও জাদুতমসায়
দিনশেষের ভিখিরি আমি
দুহাতে ঢেলে দাও জিয়ন-জোছনা
আমার সমস্ত শূন্যের সামনে
ফুটে ওঠে স্থবির সম্মোহন
আর গিলোটিন ঘরে ডানা মেলে
সোহাগ-ফিনিক্স

কোন অভিলাষ নেই আর
নেই অশান্ত নদীর দিব্য ফেরি
কেন তবুও দেখা দাও ঘুমে-নির্ঘুমে
কেন কেড়ে নাও বাউল-বন্দিশ

 


মাঝরাতে

মাঝরাতে হ্রীমতী হয়ে ওঠো
লেপ্টে থাকা ঘামভেজা শাড়ি
আর অধোলীন বুকের অর্ধবৃত্ত
জন্ম দেয় অর্ধখোলসহীনতার
বাকিটুকু কেটেকুটে ঝাঁপ দিই
এক মসলিন-মধুর সর্বনাশে

 


সুচতুর দূরত্বে

নিরালা দুপুর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে
ক্ষণিকের জলপ্রপাত
সুচতুর দূরত্বে এখন আর কোন ধ্বস নামে না
অভিমুখ বদলে নদী ধেয়ে আসে না ডোবাতে
তাই এতো অবসর… অবসরে ঘুড়ি ওড়াতে ভুলে যাচ্ছি সুচতুর দূরত্বে

 


বসন্তবিলাপ – ২

শৌখিন ক্লান্তির ঘামে জেগে আছে অনুতাপ
অন্ধকার সময় কিছু প্রশ্নচিহ্ন বয়ে চলেছে
শরীরে তোমার শেষ উড়ানের প্রহেলিকা
স্থবির করে রেখেছে
কবিতার ঘরে কুপিত কুঙ্কুমের অলীক ঘ্রাণ
চোখে টুকরো টুকরো স্মৃতি
বুকের মাঝ বরাবর দিনরাত ছুটে চলেছে
বসন্ত রাত্রির প্রমথন আর নষ্ট ভালোবাসা

 


হৃদফিনকি

ওমশূন্যে একটা কুয়াশাপুতুল গিলছে আমায়
নিষ্ক্রিয় করতে পারছি না আত্মধর্ষণের ড্রিলিং
রেডিমেট রোমান্স পাচ্ছি ঘরে বাইরে
পাচ্ছি স্তনবোমার বিস্ফোরণ… যোনির ঝরনা…
তবুও সারাদিনের দলাপাকানো পাশবচক্রে
বিষপিণ্ডে নিষক্ত হচ্ছে ব্যাথার অরোরা
আমি যোগভঙ্গ পয়গম্বরের মতো তরপাচ্ছি রোজ
আর প্রত্যাকর্ষণের রোঁদে পুড়ছি রিরি

 


অন্তর্দাহ

অনায়াসে মেপে নিতে পারি দূরত্ব
টেবিলে উড়ালমুখো নির্বাচিত বিষাদ
ঘামগন্ধে প্রেমগন্ধ নেই আর
ভস্মগন্ধে ভরপুর এখন তনবদন
ম্যাজানডারান-ঘরে পোড়ে রোজ
আসক্তির রিঙ্গণ ও রেওয়াজ
টুটাফুটা মনের পরতে পরতে
ভবিতব্য এঁকে যায় বিয়োগ-রৌরব

নিজেকে মৃতদেহ ভেবে পড়ে থাকি বিছানায়

 


নান্দনিক

শিশিরভেজা জোছনায় ক্লান্তি হরণ করলে যেদিন
তোমার জামার আস্তিনে দেখেছিলাম
ভস্মীভূত হবার ম্যাজিক ৷
আপাত নীরব সন্ধ্যার ভেতর সুরভিত চন্দ্রমল্লিকা
জীবন্ত করে তুললো শাণিত ইস্পাত –
ঘুমন্ত আত্মার কেবিনে তখন তৈরী হচ্ছে মহাসাগর
আর তার অতলান্তে ভালোবাসা নতজানু হয়ে আঁকছে
মুগ্ধতার অন্তরভেদি স্বপ্ন ৷

 


পরকীয়া

দিনরাত এক অদ্ভুত মেঘভারে
গলে যায় অনুরত স্পর্ধাবাসনা ৷
মধুর কলঙ্কে তবুও
ফিরে আসে দুপুরবেলার মায়াঘোর ৷
ভেতরে তখন নাছোড়বাধা শিলাবৃষ্টি
ভেঙেচুরে দেয় অম্লমধুর সীমারেখা ৷

 


পরকীয়া – ২

দুপুরগুলো মরুভূমি হয়ে উঠলেই
নজর নোঙর গাড়ে প্রতিবেশী ব্যালকনিতে
প্রতিবেশী একলা ভীষণ –
অসময়েও খুলে দেয় লুকোনো ঝরোখা
আমি ভোঁকাট্টা ঘুড়ি হয়ে ঢুকে পড়ি
কামরাঙা পিপাসায়

 

১০
আবার হারিয়ে যেতে চাই

পৃথিবীর আড়ালে আজও
সাজিয়ে রেখেছি তোলপাড় করা
সেই নজরপ্রপাত ৷
অবসরে উড়ে যাই
নীল আবেশের বর্ণময় সহবাসে ৷
আমার বিশ্বাসে ঝড় তোলে
তোমার অভিজাত প্রশ্রয় ৷
এসো , ধ্যান ভাঙো আবার ,
আবার হারিয়ে যেতে চাই মিথুনবিলাসে ৷

 

১১
লজ্জা অতি মনোরম

যেন চাঁদ গলে নামছে
মধুরাতের বিজন বিভঙ্গ৷
আরও বেশি রূপসী হয়ে উঠেছে
এলোমেলো বেডরুম ৷
যেন এতদিনের অপেক্ষা মুছে দিচ্ছে
শিঙ্গার ও প্রশ্রয়ভরা হাসি ৷
এই এক মুহূর্তে
একটা জীবন কাটিয়ে দেয়া যায় ৷

এই লজ্জা অতি মনোরম –
আজ মুগ্ধ বিহঙ্গ হয়ে উড়ে চলেছি
সুরম্য আবেগে আবেশে ৷

 

১২
প্রতীক্ষা

এখনও কি আঁধার নেমে এলে
দেখতে পাও আমার মুদ্রাদোষ ?
কে কাকে ভেঙেছি
কে কাকে গড়েছি জহুরির মতো
থাক সেসব প্রশ্নোত্তর এতদিন পর ৷
শুধু চোখ বুজে একটিবার ঝাঁপ দাও
অতি ব্যক্তিগত সেই সরোবরে ৷
দুহাত ভর্তি ক্ষমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি…

 

১৩
কিছুটা তন্দ্রায়, কিছুটা নির্ঘুমে

জ্যোৎস্নায় ফুরফুরে বরফের অর্কিড
কান্নার ভেতর ছড়িয়ে দেয়
মখমলি ব্যসন ৷
ধোঁয়া ভেদ করে দেখি
ঈশ্বরের ঘরে হবন করছি
প্রতিটা পতন পুড়িয়ে ৷
চাঁদের মুখোস গলে যায়…
মরণের গর্ভে একটু একটু করে ফিরে আসে
বিহুর জিয়ন-সুর ৷

 

১৪
প্রদাহ

প্রতিটা বিকেলে নিজেকে নিংড়ে
নদীর বুকে বিসর্জন দিয়ে আসি যাবতীয় তোলপাড়
অথচ তবুও খালি খালি লাগে না
কোথা থেকে যেন সমস্ত রং ফিরে এসে
ছবি এঁকে দেয় মিলন ও বিচ্ছেদের

এভাবেই শূন্যতা দীর্ঘ হয়
আর শূন্যস্থানে বাড়তে থাকে একটা বিরল প্রদাহ

 

১৫
তোলপাড়

তিনটে বসন্ত পার করেও
যেসব কথা কখনও বলা হয়ে ওঠেনি
তাদের ঘ্রাণ নিতে নিতে
এখন বিপণ্ণতা ফুটে ওঠে চারপাশে
দেয়ালজুড়ে বিপদসংকেত…
ফলতঃ স্পর্শকাতর প্রতিটা মুহূর্ত
কলমে আঁচড় কাটে

আমি মাঝরাতের নির্ঘুমে
খনন করে দেখি
কতটুকু বাকি আছে মৌন তোলপাড়

_______________

সুমন মল্লিক-এর কবিতাভাবনা

সারাদিনের ক্লান্তি ও বিষাদ আমি রাতের কবিতাভ্রমণে ভুলে থাকি ৷ কেন লিখি কবিতা – তা আজও বুঝিনি, ভেবেও দেখিনি কখনও ৷ আমার অতীত , বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আমাকে অজগরের মতো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে ৷ আমি কখনও মুক্তি খুঁজে চলেছি, কখনও অসহায়তার মাঝে ভেসে চলেছি সৃজন-মান্দাসে ৷ যা কাউকে বলতে পারছি না, তা কাগজে সাজিয়ে চলেছি ৷ কাগজের বুকে ঝরিয়ে চলেছি অ্যাসিড বৃষ্টি, আবার ফুটিয়ে চলেছি ভালো থাকার অনন্য রডোডেনড্রন ৷ আসলে সাদা কাগজ দেখলেই তাকে নিজের শূন্যভরা যাপনের সাথে মিলিয়ে ফেলি আর তখনই বুকের মাঝে কি যেন একটা চাগাড় দিয়ে ওঠে – কলম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি কাগজের ওপর ৷ রাতের অন্ধকারে জ্বালাই এক একটা সুশোভিত ও সুরম্য কবিতা-প্রদীপ ৷

কখনও প্রেম লিখি, কখনও পতন লিখি ৷ আসলে, এই দুই-ই তো আমার আধার; আমার বুক চিড়ে বয়ে চলা গঙ্গা-যমুনা ৷ তাই প্রেম-পতনের জটিল কোলাজে স্টাইল, স্ট্রাকচার, রিদম ভেঙেচুরে সৃষ্টি করছি শব্দশ্রমের আফিম ৷ কেন করছি এমন – জানি না ৷ নিজের অ-খেয়ালেই ভাসছি কবিতার জাদুখেয়ায় ৷ নাকি কোন এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে সম্মোহনের সৌম্য মায়াজালে বেঁধে রেখেছে ৷ বুঝি না ৷ শুধু বুঝি – রাতের শান্ত নিরালায় আমি কাগজ-কলমে নিজেকে ভেঙে চলেছি রোজ; আর সেই ভাঙনের মাঝেই আবার জন্ম নিচ্ছি নতুন করে ৷

 


 

কবি পরিচিতি

সুমন মল্লিক

সুমন মল্লিক

সুমন মল্লিক। জন্ম : ২৬/০৪/১৯৮৫ কোচবিহারের তুফানগঞ্জে (পঃবঃ,ভারত) ৷ [বর্তমানে শিলিগুড়ি নিবাসী]। শিক্ষা : ইংরাজি সাহিত্যে এম এ ৷ পেশা : শিক্ষকতা (সরকারী স্কুল শিক্ষক)। শখ : ভ্রমণ, আড্ডা, গান শোনা, বই পড়া, ছবি তোলা ও সিনেমা দেখা। * বাবা, মা, স্ত্রী ও যমজ সন্তানদের (পুত্র ও কন্যা) নিয়ে পরিবার যাপন ৷

প্রথম দশকের কবি ৷
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : ১] আর্দ্র নিশাত ২] মনকেমনের হাউল
৩] অগ্নিগোলাপ ও শাশ্বত ক্যাটাসট্রফি

সক্রিয় সদস্য – সম্পাদকমন্ডলী : “উত্তরের কবিমন” পত্রিকা

 

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E