৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
এপ্রি ৩০২০১৭
 
 ৩০/০৪/২০১৭  Posted by

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দুর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতার বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

সুকুমার মণ্ডল

সুকুমার মণ্ডল

সংস্কৃত, ইংরেজি, জার্মান প্রায় সব ভাষার কবিতাচর্চাই কিন্তু শুরু হয়েছিল দীর্ঘ কবিতার হাত ধরে। অথচ বিশ্বকবিতার বিবর্তনের দিকে আমরা তাকিয়ে দেখব, কবিতা যে বিশাল আকার-অবয়ব নিয়ে একসময় শুরু হয়েছিল, তা ক্রমশ ছোট হতে হতে আজ একটা অতি ক্ষুদ্র জায়গায় এসে ঠেকেছে। এর কারণস্বরূপ আছে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, ভোগবাদ ও কর্পোরেট কাঠামো। যুগের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে মানুষের এখন সময় খুব কমে গেছে। টেস্ট ক্রিকেট থেকে পঞ্চাশ ওভারের একদিনের ম্যাচ, সেখান থেকে আবার পণ্যায়নসর্বস্ব টি-টুয়েন্টির যুগ। কবিতাও এর বাইরে থাকবে কী করে?
দম-দুর্বলতার কারণেই দীর্ঘ কবিতা আর লেখা যাচ্ছে না, বা, ছোট কবিতার কোন বিশেষ শক্তির চাপেই দীর্ঘ কবিতা লেখার আগ্রহ শেষ হয়ে এসেছে, এর কোনোটিই আমি মনে করি না। ছোট কবিতার বিশেষ শক্তির কথা স্বীকার করেই আমি কথাটি বলছি।
তথাকথিত দীর্ঘ কবিতার সারহীন শব্দ সরিয়ে অপরিহার্য-কম-শব্দে নির্মিত একটি যথার্থ ছোট কবিতায় আমাদের মোমের মতো জ্বলে ওঠে হৃদয়। এই হীরকদ্যুতিটিই ছোট কবিতার বিশেষ শক্তি বলে আমি মনে করি।

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী?

সব সাতমহলা বাড়িই যে দৃষ্টিনন্দিত ও স্বাস্থ্যকর হয়ে উঠবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। আবার একটি ছোট আয়তনের ঘরও আলো-বাতাসে পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একটি ছোট ফুলগাছও  ফুটে উঠতে পারে সহস্রতায় ।

শুধুমাত্র আকারে-অবয়বে ছোট হলেই কখনও তা ছোট কবিতা হতে পারে না। আবার কলেবরের দিক থেকে খুব বড় হলেও তা দীর্ঘ কবিতা না-ও হয়ে উঠতে পারে। দু-তিন লাইনের সংক্ষিপ্ত সব কবিতাকেই ছোট কবিতা আখ্যায়িত করা যায় না। এই সংক্ষিপ্ত কলেবর ছোট কবিতার গঠন-কাঠামোর মূল স্তম্ভ হতে পারে, কিন্তু তার স্পন্দন হল সেই কবিতার হীরকদ্যুতি, অনেক না-বলা-বাণীর ঘনযামিনীটি।

অন্যদিকে, আমি মনে করি, মহাভারত হল দীর্ঘ কবিতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ এবং তার পূর্বসূরীও। মহাভারত রামায়নের তুলনায় প্রায় চারগুন, ডিভাইন কমেডির চেয়ে পাঁচগুণ, আর ইলিয়াড এবং ওডিসির প্রায় দশগুণ বড়। কিন্তু দৈর্ঘ্যতার কারনেই শুধুমাত্র তা একটি দীর্ঘ কবিতা হয়ে ওঠেনি। তার সুবিশাল ব্যাপ্তি, শত-সহস্র আখ্যান ও উপাখ্যানের মাঝেও তার মূল সুরস্রোতটি পথভ্রষ্টহীন,  এইটেই হল দীর্ঘ কবিতার বৈশিষ্ট্য ও বহমানতা। এরপর, দীর্ঘ কবিতাও, শিল্পের আর যে-কোন শাখার মতো তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতেই পারে, এবং যাওয়া উচিতও।

৩। ক) ছোট কবিতার গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন?
    খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?
    গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?

ছোটগল্প সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা হলেও, ছোট কবিতা বলে সাহিত্যের বিশেষ কোনো শাখা এখনও নেই। ছোট আকার-অবয়বের কারণে একটি কবিতাকে আমরা ছোট কবিতা হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি। তিনটে ছোট লাইনের হাইকু বা পাঁচ লাইনের লিমেরিক সবই আঙ্গিকের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত। চীন-জাপানের অজস্র জেন কবিতা বা দু-লাইনের চর্যাপদগুলিকে ছোট কবিতা বলা যেতে পারে। তবু বাংলা ভাষায় লিখিত ঠিক কত লাইনের কবিতাকে ছোট বলা যেতে পারে, তা এক কথায় বলে দেওয়া খুব মুশকিল। কবি দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় আট লাইনের সীমা স্থির করতে চাইলেন। একটি লাইন আবার ছোট-বড় বিভিন্ন মাত্রার হতে পারে। তাই কবি কালীকৃষ্ণ গুহ লাইনের হিসেবে না গিয়ে ছোট পরিসরের কবিতার জন্য চল্লিশটি শব্দের কথা বললেন। কিন্তু এ-কথাও মনে হয় আমার, যে, চল্লিশটির বেশি আরও কিছু শব্দ দিয়ে রচিত একটি কবিতাকেও একটি যথার্থ ছোট কবিতা বলা যেতে পারে, যদি সেই শব্দগুলির একটিকেও অতিরিক্ত মনে না হয় এবং যদি সেই কবিতায় প্রকৃত হীরকদ্যুতি ঠিকরে বেরোয়।
 
দীর্ঘ কবিতার কোনো বিশেষ লাইনে থেকে যেতে দেখেছি ছোট কবিতার দ্যুতি। সেইরকম আবার ছোট কবিতার মধ্যেও থেকে যায় দীর্ঘ কবিতার উদ্ভাস, এমনকি, মহাকাব্যের ব্যঞ্জনাও।

৪। ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে?
    খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০ টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।

এ পর্যন্ত আমার বাংলা কবিতাচর্চায় ছোট কবিতার সাহচর্যই বেশি। তবু দীর্ঘ কবিতা যে একেবারেই লেখা হয়ে ওঠেনি, তা-ও কিন্তু নয়।

ফুলগাছ

সমস্ত দিন ফুলগাছ। তোমাকে ছুঁয়ে বসে আছি

পরিচ্ছন্ন টব
কোথাও একটিও আগাছা নেই

সমস্ত বাগান জুড়ে সন্ধে নেমেছে
তোমাকে ছুঁয়ে বসে থাকব অনন্তরাত, যতক্ষণ না
ফুটে উঠছে ফুল

জলজ কবিতা

উঁচু জমি থেকে গড়িয়ে নামছে
                                                      জল
সব জল যেখানে জমেছে, তাঁকে
আমি পুকুর বলি না। সে-ও
এক জলের আশ্রয়

শ্মশানভূমি

স্বপ্ন নয়, পার্থিব। ঘুমের ভেতর
থৈ থৈ করছে পথ

পৃথিবীর সব রাস্তাগুলি
এক নদীশ্মশানের কাছে গিয়ে
আটকে পড়েছে
কোথাও আর পথিক নেই। শুধু তার
পদচিহ্নগুলি…

মন

অদৃশ্য মেঘের মতো
কোথাও যেন জমেছিল মন

মন কোথায়, খুঁজতে খুঁজতে চলে গেছি
দূর কুয়াশায়। খুঁজতে খুঁজতে
একদিন সর্বাঙ্গ ছুঁয়েছি তোমার

চিঠি

চিঠি লিখতে বসে
           চোখে জল
সব জল শুকিয়ে গেলে
           চিঠি লেখা শেষ

ঝাউগাছ     

হাতে ধরে ঝাউগাছ লাগানো বিপদ
পাঁচিল উঁচিয়ে ওই অভিসারে সে-ও
অজানা বনের দিকে চুপিসারে চায়

কতটা গোবর, সূর্য আর বালিমাটি
আঙুল-স্খলিত জল— রোপণরসিক  
ঘুমের প্রহরগুলি উড়ে চলে যায়

নিজেকে শোনাই গান রবি ঠাকুরের
সুদূরে বাঁধন খোলা শামুকের সুখ
নিচু হয়ে তুলে নিই পাতাঝরা ঢের
নতুন বোঁটায় যেন ফুটে ওঠে মুখ

লন্ঠন

কে ওই বালক রাখাল
           উদাসীন লন্ঠন জ্বালে
মায়ের ঘরে নিয়ে গেলে
           বাবা অন্ধকার
বাবার ঘরে নিয়ে গেলে
           মা অন্ধকার

উঠোন

সম্ভবত মাঝরাত। আলুথালু চোখ
ঘুমের বিছানা ছেড়ে
নিজস্ব উঠোনে দাঁড়াই। দেখি
ঘন হয়ে আসে
তুলসীপাতার গন্ধ। আর
নিমগাছ থেকে খসে পড়ে অন্ধকার

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E