৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ১১২০১৬
 
 ১১/১১/২০১৬  Posted by

গৌরাঙ্গ মোহান্তের চিত্রকল্পপ্রকৃতি
সুজাতা পাল

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি সুজাতা পালে

কবি সুজাতা পাল

কবিতা তৃষিত সত্তার ফসল। কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কাব্যগ্রন্থ পাঠকালে এ কথাটি বারবার মনের

পর্দায় উঁকি দেয়। যে কবিসত্তা থেকে মুক্ত কল্পনার আলোক বিচ্ছুরণ, তা সমুজ্জ্বল করে তোলে অপর সত্তা। এই আলো আদৌ শূন্যতায় মিলিয়ে যাবার নয়, কারণ এ আলো একান্তভাবেই কবিমানসের প্রত্যয়নিষ্ঠ। গৌরাঙ্গ মোহান্তের একাধিক কাব্যগ্রন্থ পাঠে মনে হয় তিনি যেন বারবার ভবিতব্যকে উন্মোচিত করবার তাগিদ অনুভব করেছেন। তাইতো তার কবিতাগুলো অনাগত প্রজন্মের জন্যেও ভূগোল রচনায় ব্রতী হয়। কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের সংবেদ্য কিছু চিত্রকল্পের স্বরূপ তুলে আনা যায় – “একটি শব্দের জন্যে প্রান্তর বা রাস্তার নির্জনতায় নেমে পড়ি। পরিবাহী ইথারে ভাসতে থাকে দুর্বহ ঝরনাক্রন্দন। টিলাভূমির নিরাকার স্বত্বলিপি বাঁশের হুকোয় আর্তনাদ করে ওঠে। লতাগুল্মের অপার স্নেহে থেমে যায় নৃতাত্ত্বিক বিলাপ; নিভৃত জীবনপ্রকল্প পর্বতবৃক্ষের ছায়ায় শ্বেতকমলের স্বপ্নে নিদ্রাতুর পড়ে থাকে।” শেষ চিত্রকল্পে ‘শ্বেতকমল’ -এর প্রতীকী ব্যবহার চমকপ্রদ। অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের আর্ত, পরিশুদ্ধ বোধ কবির মনোজগৎকে আলোড়িত করে। এ চিত্রকল্পের আশ্রয়েই কবির স্বত:সিদ্ধ ঘোষণা- “পৃথিবীতে ক্রন্দনের চেয়ে প্রকৃত কোন শব্দ নেই, প্রকৃত কোন ভাষা নেই।” অসামান্য এই শব্দকল্প ব্যবহারের মধ্য দিয়েই কবি সন্ধান করেছেন শৈল্পিক সংবেদ সঞ্চারের পথ।

আসলে গৌরাঙ্গ মোহান্ত সৃষ্ট অসংখ্য চিত্রকল্পে রয়েছে বিষাদ বেদনার অমল মুক্তাশ্রু। Daniel B. Shapiro বলেছেন, “The imagery is very much released from reality. It’s not nailed down to specifics of the words. They’re painting a picture, not telling linear stories”। একজন কবির চিত্রকল্পের ভেতর থাকে বস্তুপরিধি-অতিক্রমী অনুষঙ্গ। কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত সৃষ্ট অধিকাংশ চিত্রকল্পে রয়েছে বস্তুউত্তীর্ণ, অপ্রতিম শিল্পাবয়ব। অর্থঘন রূপকল্প সহযোগে তিনি রচনা করেন কবিতার অবিনাশী পঙ্ক্তিমালা-

“তুহিন গহ্বরে আশ্রিত সময় হয়তো আবার আসবে ফিরে
বিষণ্ণ প্রস্তর অভিলেখ হয়তো হবে সুপাঠ্য, সুকর,
যুগল ভ্রমরের প্রমত্ত নৃত্য হয়তো হবে মঞ্চে দৃশ্যমান,
সলজ্জ বৃক্ষের সুপ্রভ আত্মার শিহরণ হয়তো হবে প্রকটিত,”- ‘উদ্ভাসন সূত্র’ (আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর পৃষ্ঠা-৩৭)। কবি যে আশাবাদী তার সুস্থির প্রকাশ ঘটে উদ্ধৃত পঙ্ক্তিমালার পরবর্তী চরণে – “যদি তুমি একবার, শুধু একবার করুণা করো।”

Imagery কখনো ফ্যাক্টরিতে নির্মিত কোনো বস্তু-সামগ্রী নয়, তাই সেখানে অসংখ্য উপকরণ থাকলেও তা কবির হৃদয় রসে জারিত হয়। তাই পাতা তখন পাতা থাকে না, মাটি তখন সহজলভ্য উপকরণ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; – সেগুলো হয়ে যায় ‘কবিতার প্রোটোপ্লাজম’। কবিকে “কার্পাস বুনতে হয়, তুলো ফোটাতে হয়; তুলো থেকে ব্যক্তিগত সুতো।” আবার সেই “সঞ্চিত তুলো-বস্ত্র অগ্নিদগ্ধ হয়;” কারণ সব থেকেও যে “কবির কোনো বন্ধু নেই।” এই ভাবনায় সুস্থির কবি ‘ট্রোগনের গান’ কাব্যগ্রন্থের ‘ব্যক্তিগত সুতো’ কবিতায় আলো বিকীরণ করেছেন। আমরা বিস্ময়াবিষ্ট হই কবি যখন বলে ওঠেন- “…. এখানে তোমার পিতামহ অমল জলে ধুয়েছিলেন হাত। এই জলে আর হিজলের দেশে রেখে গেছো কি তুমি ত্রিকোণমিতি উত্তাপ? দূর সৈকতে আজ জেগে উঠেছে উন্মন ঢেউ। হিজলগন্ধহীন জলে ভিজে একবার তুমি গেয়ে ওঠো সুরমাশিহরিত সঞ্চারী।” (‘ত্রিকোণমিতি উত্তাপ’, জলময়ূরের শত পালক/ পৃষ্ঠা-৯৭) আমরা মুগ্ধ হই। আবার ‘ট্রোগনের গান’ কাব্যগ্রন্থের ২৮ নম্বর পৃষ্ঠায় “ফ্লাওয়ার ডোম” কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে- “…. আমি চিরকাল রূপের আগুনে ভস্মীভূত প্রাণী। ভস্ম আমার অস্তিত্বে মেখে রাখে রূপাগ্নি। তুমি যখন অপার ছায়ার ভেতর আমাকে ঢেকে রাখো আমার বিকাশ ও স্থায়িত্ব দীর্ঘায়িত হয়। বস্তুত তুমি অসীম ফ্লাওয়ার ডোম। তোমার আগুন আমার সত্তাকাল গ্রাস করে – আমি মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে উঠি।” আমরা মুগ্ধ না হয়ে থাকতে পারি কি?

কবির কবিতায় ইমেজের ছড়াছড়ি – অসংখ্য ইংরেজি শব্দবন্ধের ব্যবহার- ওয়েস্টবেরি, অরবিট, নিউরন, স্কাইট্রেন, ইলেকট্রন, ভাইবার, ক্রিস্টাল, হুইসেল, লিথোগ্রাফ, ফ্লেয়ার্ড বেল, ডিসক্যাস, সিয়েনারং, স্কারলেট প্লেট, সিল্কটুইল, অর্ফিয়াস, গ্লেসিয়ার, ট্রেইল, হুইসেল কর্ক, লিথস্ফিয়ার, বার্ডস নেস্ট, সেলফোন, প্লাসেন্টা, স্যানাটোরিয়াম, ম্যাকেট ইত্যাদি অজস্র ইংরেজি শব্দ আমাদের নজর কাড়ে। কিন্তু দৃষ্টিকটু লাগে না, বরং কাব্যকায়ায় মিলে-মিশে স্বতন্ত্র এক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে – যা একান্তভাবেই কবির নিজস্ব ভাষ্যশৈলী।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ‘গ্লেসিয়ার’ শব্দটি কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের আগেও বাংলা সাহিত্যে ব্যবহার করেছেন কবি বিষ্ণু দে তাঁর ‘ঘোড়সওয়ার’ কবিতায়- ‘… কামনার টানে সংহত গ্লেসিয়ার …’। কিন্তু এখানে কবি শব্দটিকে ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করেছেন। ‘পাখিপরিমল শিস’ কবিতায় গ্লেসিয়ারের স্পষ্ট নামোল্লেখ করেছেন কবি- “আমি প্রস্রবণের খোঁজে ছুটে চলি, বাতাস রংবুক গ্লেসিয়ারের বরফজল ঢেলে দেয় স্নায়ুগঙ্গালিয়ায় (জলময়ূরের শত পালক/ পৃষ্ঠা-৬২)। আসলে এই মায়াময় প্রস্রবণেই কবি খুঁজে পেতে চান তার কাঙ্ক্ষিত তৃষ্ণার জল। কবির একাধিক কবিতায় আছে ‘প্রস্রবণ’ শব্দটির ব্যবহার। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে – “প্রস্রবণ রেখার রহস্যগতি উন্মোচিত না হলে অন্তঃপুরে সঞ্চিত হয় শ্রাবণমেঘের ধূপছায়া ফটোগ্রাফ!”- ‘অধিগ্রহণকাল’ (জলময়ূরের শত পালক, পৃষ্ঠা- ৮)।

সবিস্ময়ে লক্ষ করি, কবির বেশ কিছু কবিতায় রয়েছে আন্তর্জাতিক ভাবনার শাব্দিক প্রকাশ। হয়তোবা সে কারণেই বাংলা ও ইংরেজি ভাষার মিশ্রণে কবি তৈরি করেছেন এমন কিছু শব্দবন্ধ যেগুলো একান্তভাবেই তাঁর স্বকপোল কল্পিত। যেমন- দৃষ্টিকম্পোস্ট, অক্ষম স্টারনাম, অনাশ্য ডিসক্যাস, শীতফোবিয়া, গন্ধবতী-প্লাসেন্টা, রবীন্দ্রস্কেচ, বিমানএঞ্জিন, কাঠবেঞ্চ, টারকোইজ-উচ্ছলিত, ইথারাশ্রিত, অধিবিদ্যক অরবিট, দিগন্তআর্চ, মেঘের মেটামরফসিস, ক্যাফে-চত্বর, স্পেসবন্দি বহির্ফ্ল্যাট, স্নো-পদ্ম-ইত্যাদি শব্দবহ পঙ্ক্তিমালা অনন্যসাধারণ টেক্সট উপস্থাপন করে – “আামকে ভিজিয়ে যায় অতি শীতল সাহসী বৃষ্টি। উঁচু বৃক্ষরাজির দুর্বল শাখা শীতফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে” (জলময়ূরের শত পালক/পৃষ্ঠা-৮৭); কিংবা আমরা স্মরণ করতে পারি ‘শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ’ কাব্যগ্রন্থের সাতচল্লিশ সংখ্যক পৃষ্ঠায় ‘অন্ধকার ও স্বপ্নহীন বাতাসের ফ্লেয়ার্ড বেল’ কবিতাটির কয়েকটি পঙ্ক্তি- “… দৃশ্যমান ক্রেভাসের মুখে রুপালি মই জুড়ে অতীত নিয়ে যায় হিমভবিষ্যতে”। বিমূঢ় কবি অনুভব করেন নির্বাক ঝরনাজলে কেঁপে ওঠা আহত স্থলপদ্মের শেকড়কে; নিষ্প্রদীপ ধূসরতায় তিনি ডুবে থাকেন অরণ্যের গন্ধে।

মার্কিন কবি Anne Sexton বলেছেন “Images are the heart of poetry … You’re not a poet without imagery.” গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতার শরীর জুড়েও ছড়িয়ে আছে অপূর্ব, বিভাদীপ্ত, রত্নসম্ভবা চিত্রকল্প – যা একইসাথে আমাদের বিস্ময়, মুগ্ধতা ও সমীহ আদায় করে নেয়। আবার এমন অনেক কবিতাও আছে যেগুলির বিষয়-উপকরণ বৃক্ষ-কাণ্ড-পত্র ও বল্কল- “বৃক্ষ জেগে ওঠে – ঘাসে ঢাকা থাকে তার কর্দমাক্ত তলদেশ।” আবার এ বৃক্ষের রক্তেই থাকে নিদ্রার বিষ ও বিষে প্রলয়-স্বপ্ন – ‘বৃক্ষবিভাস ও প্রলয়স্বপ্ন’  (জলময়ূরের শত পালক, পৃষ্ঠা-৯)। কোথাও বা কবিতার বিষয়-উপকরণ হিসেবে উঠে এসেছে দৃষ্টিগ্রাহ্য পাহাড়-অরণ্য অথবা সবুজ পাণ্ডুর পত্রাবলি। কবি-মনের উচ্ছ্বাস-নিবিড় স্মৃতি কবিকে এমনতর চেতনায় জাগিয়ে রাখে আর আত্মমগ্ন কবি একের পর এক চিত্রকল্প, উপমা ইত্যাদি আভরণে কবিতার শরীর নির্মাণ করে তাকে সাজিয়ে তোলেন।

স্মৃতি সততই সুখের র্স্পশে আমাদের হৃদয়কে উদ্বেল করে না, স্মৃতির ছোঁয়ায় কখনো কখনো বেদনা ভারাতুর হয়ে ওঠে হৃদয়। মেঘ-মেদুর সন্ধ্যার আলো ছায়ায় স্মৃতি জড়িয়ে যায়; এবং তা যেন কদাপি সুখের নয়। ’৭১ এর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি রোমান্থন কবিমনকে ব্যথাতুর করে তোলে বারবার। বিশেষ করে মায়ের স্মৃতিবিজড়িত মধুময় চিহ্নগুলো যেভাবে হানাদারদের ‘নাপাক’ নখর থাবায় ছিন্নভিন্ন হয়েছে, লুপ্ত হয়েছে, তা কবিকে মনে করিয়ে দেয় সেইসব ফেলে আসা দিনের কথা – যখন কবির পরলোকগতা মায়ের সমাধিরূপ ঢিবিটি কবিকে শেষ সান্ত্বনা দিয়েছে। যুদ্ধশেষে আত্মমগ্ন কবি নিজভূমে যেন পরবাস জীবন যাপন করছেন। কবির ভাষায় “বিধ্বস্ত স্বদেশে ফিরে দেখি প্রাণময় পুষ্প-পত্র-টিবি যুদ্ধস্রোতে গেছে ভেসে। পুরোনো কাঁথার সেলাই কেটে মার শ্যামল শাড়ির কমনীয় টুকরো সযত্নে রেখেছিলাম তক্তপোষের উষ্ণ কন্দরে । লুটেরার নাপাক থাবায় আমাদের আসবাবপত্র চিরতরে হয়েছে দৃশ্যাতীত; একখণ্ড ন্যাকড়াও পড়ে থাকে নি বাস্তুভিটায়…।” ‘টিবি’ (জলময়ূরের শত পালক, পৃষ্ঠা-৪৪)। ’৭১ পরবর্তী জন্মভূমি তথা  স্বদেশ এবং জন্মদাত্রীর মধুর স্মৃতির প্রতি তাঁর সংবদী অন্তরের বেদনাশ্রু এভাবেই ঝরে পড়েছে। আর সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে অনুভবী কবি, জীবন চেতনায় ঋদ্ধ কবি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ অনায়াসসাধ্য স্বতন্ত্র কাব্যভাষা, চিত্রকল্প ইত্যাদির মাধ্যমে আত্ম উন্মোচনের পথ খুঁজে গেছেন।

“নৃশংস অন্ধকার” কবিতাটিতে কবির অপ্রত্যক্ষ আলোকোজ্জ্বল মানসলোকটি যেন আমাদের কাছে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। বাংলার মা-মাটি-মানুষ এর প্রতি কবি-হৃদয়ের ঐকান্তিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা এই কবিতায় আমাদের অসহায় এক আবেগাকুল জগতের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এ জগৎ আর তখন  কবির একান্ত নিজস্ব জগৎ হয়ে থাকে না। বর্বর পাকহানাদার-হায়নার নৃশংস থাবায় নিশ্চিহ্ন হয়েছে – নিভে গেছে কত সম্ভাবনাময় প্রাণের আলো, তাঁদের কথা বলতে গিয়ে কবির লেখনী থেকে নির্গত হয়েছে সেই অসহায় নারীদের কথা – যাদের “আর্তনাদের দুর্বহ কম্পাঙ্করাজি বৃক্ষলতা গুল্মের ভিত্তিকোষে জমিয়েছিল ভয়াল অন্ধকার। একাত্তরের এপ্রিলে উদ্ভিন্ন কচি পাতারা আলোচঞ্চল হয়ে উঠতে পারে নি …”

আমরা কবিতায় বস্তুজগৎ, কবির মনোজগৎ এবং পাঠকের মনোজগৎ – এই ত্রিভুবনের সন্ধান পেয়ে থাকি। তাইতো কবিতা এই তিন ভুবনের সামগ্রী। কিন্তু জীবনপথিক কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত -এর অধিকাংশ কবিতা শুধু সামগ্রীর বাহন হয়ে থাকেনি। তিনি বলেছেন- “আমার চেতন ও অবচেতন-চক্রে সংলিপ্ত মঞ্জরির বিভাস আমাকে অহর্নিশ আচ্ছন্ন করে রাখে।’ তখন আমাদের প্রতীতি জন্মে যে বাস্তব পৃথিবীর সত্য থেকে জীবন-তন্বিষ্ঠ কবি যেন আরও এক বড় সত্যে উপনীত হন। সেই সত্য উপলব্ধির উচ্চারণে এভাবেই প্রকট হয়ে ওঠে- ‘আমি তুলে রাখি সান্ধ্যপ্রকৃতির কিছু ছবি – জীবনের ম্লানতায় ছোপানো বেদনাবিভাব। সন্ধ্যার বিষণ্ণ আকাশ, ধূসর বৃক্ষ-লতার দিকে চেয়ে অনিবার্য নিরালোকে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি।” বিমূর্ততার দক্ষ কারিগর গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতাপাঠে পাঠক অনন্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেন – শব্দাতীত এক অপার্থিব ভাবলোকে পৌঁছে যাই আমরা। যদি একথা সত্য হয় যে পৃথিবীর সব দেশেই শোক থেকে শ্লোকের উৎপত্তি তাহলে কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের অনেক কবিতাতেই সেই সত্য গভীরভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে। কবি-অন্তরের বেদনা-রসে জারিত হয়ে নিটোল মুক্তোর মতো উঠে এসেছে এমন দুর্লভ কিছু কবিতা বা পঙ্ক্তিমালা যেগুলো সৃষ্টি হয়েছিল যেন স্বাতী নক্ষত্রের উদয় সম্ভাবনা-কালে। তাইতো তাঁর ‘শূন্যতা ও পালক প্রবাহ’, ‘শূন্যতা ও সাইডউইন্ডার’, ‘নীলকম্পপথ’, ‘শূন্যতা ও ঘুমনাচ’, ‘অন্ধকার ও দাহস্মৃতি’, ‘অন্ধকার ও ট্রোগনের গান’, ইত্যাদি অনেক কবিতার মতোই ‘শ্যামল অন্তর্গৃহ’ কবিতাটিও রংধনুর ছটা বিকীরণকারী একটি নিটোল মুক্তো। “সূর্য স্কারলেট-প্লেটে রূপান্তরিত হলে হাঁসেরা শেষবার ধুয়ে নেবে গলা; সুপারিবাগান ক্রমে গাঢ়তর হলে তোমার দরজায় আমি করবো উতল করাঘাত। অবাক তুমি ডেকে নেবে নিভৃত গ্রহের শ্যামল অন্তর্গৃহে।” (জলময়ূরের শত পালক, পৃষ্ঠা-৮২)। শব্দজগতের বিপুল ভাণ্ডার থেকে কবি যখন নির্বাচন করেন ‘স্কারলেট-প্লেট’, অথবা ‘নিভৃত গ্রহ’ -এর মতো কিছু শব্দ তখন তা কবিতায় এক ভিন্নমাত্রা যোগ করে দেয় বৈকি! কবি তাঁর কবিতায় কাব্যোপযোগী কিছু শব্দ তথা চিত্রকল্প নির্বাচন করে তাঁর দায়িত্ব শেষ করেন নি – নিপুণ স্রষ্টার মতো পাঠকের মনোজগতে উপলব্ধির আনন্দ সৃষ্টি করে কবি ও পাঠকের মধ্যে অপূর্ব সংযোগসেতু রচনা করেছেন।

আমরা স্মরণ করতে পারি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ, অনুপম গদ্যশৈলীতে লেখা এই পঙ্ক্তিমালা – “… তবু শরণার্থী উৎকর্ণ হয় স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদে; মুক্ত ভিটেমাটির স্বপ্নে কঙ্কাল কাঁকালে জেগে ওঠে যমুনার ঢেউ”। কিংবা “কোনো অন্ধকারই উৎসবকে আচ্ছন্ন করতে পারে না। বাংলাদেশের শংকাহীন গ্রামে পুনর্বার বেজে উঠবে ঢোলের  নবতর লহরা” (জলময়ূরের শত পালক- পৃষ্ঠা-৪৯)। অথবা আমরা চোখ বুলিয়ে নিতে পারি ‘জীবন-প্লাবিতার কথকতা’ কবিতার এই অংশে- “জলের উদ্বেল প্লাবিতা রচনা করে সুবেদী সরোবর। দুর্লভ নীলপদ্ম আর জলজ লতা-পাতা উন্মোচন করে গহন দৃষ্টির শিশির-রশ্মির কথকতা।” ‘অন্তরপ্লাবী’ বন্ধন পিপাসু কবি যখন এই বিশ্বাসে উপনীত হন “জীবন স্বপ্নময়তায় মৃণাল। অনুরাগ সত্য হলে গহন জীবন-স্রোতের কলধ্বনি শ্রবণ দোষাবহ নয় জেনে আমি জীবন-দৃশ্য-ধ্বনির কাছে নতজানু হয়ে থাকি।” এবং কবিতার শেষে কবি-উপলব্ধ ঘোষণা – ‘মানুষ সব কিছু জেনে যেতে পারে না।’- তাঁর জ্ঞানের বৈভবে, চিন্তন শক্তির গভীরতায় এবং দার্শনিক সত্তার কাছে মুগ্ধতায় নতজানু হয়ে থাকি।

হ্যাঁ, তাঁর বহু আলোক ছটায় উদ্ভাসিত কবিতা প্রবাহের সামনে আমরা শুধু বিস্ময় মিশ্রিত শ্রদ্ধাকেই স্থাপন করতে পারি। তাঁর চিত্রকল্প তাঁর গদ্যশৈলী অর্থাৎ তাঁকে পাঠ করবার অনুভূতি যেন অনেকাংশে অব্যক্ত থেকে যায়।

কবির ব্যবহৃত চিত্রকল্পে ধরা পড়ে পাথরের ম্লান হাসি, বালিয়াড়ির অন্তরাল, জ্যোৎস্নাময় বাতাসের ঝাঁঝর, সমুদ্রবর্ণ ভ্রমর, মরুদ্বীপ, মীনপুচ্ছ, অগ্নিপ্রাচীর, শ্বেতকমল, ঘোড়ার জিন, রবিশস্য, ময়ূরপঙ্খী খাম ইত্যাদি। তাঁর অসামান্য গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে সূর্য রূপান্তরিত হয়- ‘স্কারলেট প্লেটে’ (শ্যামল অন্তর্গৃহ)- শুকনো ক্ষতের মাঝে উঁকি দেয় ‘পাংশু মোহর’ (অন্ধকার ও স্বপ্নহীন বাতাসের ফ্লোয়ার্ড বেল)। এত সব কিছুর মধ্যেও কবির স্মৃতি দূরগামী হতে হতে থেমে যায় সেই অতীতে যেখানে এক সময় কেটেছিল কবির বিমর্ষকাল। স্বভূমির গন্ধ নিতে নিতে অনেকের পাশে পাকা রাস্তার ধারে সারিবদ্ধ হয়ে কবি দাঁড়িয়ে থাকতেন অন্ধকার কেটে যাওয়া সুদিনের আশায়। কখনো কবি সন্তর্পণে বেরিয়ে পড়তেন নৃশংস বুলেটের দৃষ্টি এড়িয়ে গ্রামের আঁধার পথে। সে সময় কবির ভয়ার্ত চোখের গভীরে ভেসে উঠতো – “মৃত্তিঙ্গা গ্রামের গৃহদাহবিভীষিকা …।” সেখান থেকে আরও অনেকের সাথে কবিকে যেতে হবে- “শুশ্রুষাময় সীমান্তে” (‘আগুনের পলাশমুদ্রা ও স্বদেশ’- ‘জলময়ূরের শত পালক, পৃষ্ঠা-৪৫)।

এসব কিছু কবির সজল চেতনার এক অসম্পূর্ণ ইতিহাস যেগুলোর মাঝে রয়েছে কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের স্বাদস্মৃতির হাহাকার বা তার ছায়াশরীর।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E