৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
সেপ্টে ০৪২০১৭
 
 ০৪/০৯/২০১৭  Posted by

সুধীর দত্ত-এর ভাষাপথ ও কিছু কবিতা


ভাষাপথ

তুমি তো আকাশ আঁকছ। শোনা যাচ্ছে ডানার আওয়াজ।
আমি পাখি
কোথায় সাঁতার কাটব? ডানা জোড়া মুড়ে
পালকে গুঁজেছি ঠোঁট, দীর্ঘ গ্রীবা
টানটান, আজ
তোমার বুকের গন্ধ প্রজ্ঞা পারমিতা
প্রযত্ন শিথিল করে দ্যায় l
শিস দিই, জাগে গান, পাতার মর্মর; উড়ে যাই
দিক ও দিগন্ত ভাঙে, ভাঙে চক্র, যে দিকে দু চোখ
খ-মণ্ডল, অনন্ত সুখের
তুমি রাখো ভাষাপথ, উড়ান ও বিশুদ্ধ আঙ্গিক


মধু, মধু!

এত ফাঁক! কোথায় পা রাখতে বল! তিনি
এক আকাশ শান্তিজল
ছিটিয়ে বলছেন, মধু, মধু! মাড়িয়ে এসেছ শুঁড়িপথ
বাঁকা চোরা, ভাঙা সাঁকো, অন্ধকার অসূর্যের দেশ।
হওনি আত্মহা। তবু কাজলের ঘর, ছিটে ফোঁটা; ‘দ্যাখো, এই দ্যাখো
আমি’ কে হঠাৎ ডেকে সরে গেল।।
ডানা ঝাপটে উড়ে বসল
সাদা এক প্যাঁচা, টুই থেকে
সরসর কে নেমে এল মণিপুরে, ওঠো বায়ু বয়, আর একটু পরেই
দেবতারা জেগে উঠবেন।
উঠোনে শিউলি ফুল, চরণ ছোঁয়নি মাটি, তবু তার
চিহ্ন জেগে আছে!


একটি তরুণ বাজ

এই তাঁর লিঙ্গ দেহ। মুহূর্তে আলোকবর্ষ অতিক্রম করে।
পড়ে থাকে পাঞ্চভৌতিক।
বায়ু খামছে তীব্র উড়ে যাই। পার হই অভিকর্ষ
ধূসর প্রান্তর।
অস্পষ্ট দুধপথ। দুই ধারে কৃষ্ণ গহ্বর, এক নারী
গর্তের হাঁ-মুখে হাত রাখে–
ফিরে এসো জল মাটি হাওয়া ও আগুনে
এই ঠোঁট তোমার জন্য, উরুসন্ধি—
এক পাদে ভূবনভ্রমণ, এই বলে
আলোতে চুবিয়ে শব্দ, পৃথিবীর দিকে ছুঁড়ে দ্যায়।
মানুষ শীতার্ত অতি, জেগে ওঠে, রূপান্তরিত
একটি তরুণ বাজ অস্থির ডানায়
ভেঙে ফেলছে ভেদসীমা
যেখানে যা, ত্রিলোকের, প্রথাজড়তার


মহাকবিতা

চতুর্থ আশ্রমে যাবে! হাতে দণ্ড, কালিভর্তি
কমণ্ডলু, হাঁড়ি–
অন্ন ফোটাবেন গার্গী
কম্বল আসন পেড়ে বলবেন, নাও
আঁকাড়া ও কাঁড়া গুঞ্জমালা
আচমন করো। আমাদের পক্ষীজীবন। এই
আকাশের নীচে
ওড়াউড়ি। মহাপাখি তুমি
ঝাপটাচ্ছ আকাশটাকে, হুলুস্থুলু, দরজা খুলে
দৈবাৎ যদি
সামনে দাঁড়ান এসে,
ভয় হয়, কী চাইতে কী চেয়ে বস, আমি
শব্দ হয়ে বসে আছি কবি।
এই দ্যাখো ভ্রূ-পল্লব, তারও নীচে যে ওষ্ঠ অধর
কী রকম শুষ্ক, ফাটা; এসো
আমাকে চুম্বন করো, গর্ভ দিও মহাকবিতার


দিকপূর্ণা

তুমি দিকপূর্ণা দেবী
নিশ্চিত তোমার জন্য এক পৃথিবী কবিতা রেখে যাব।
সেগুন পাতার তলে
গুনগুন করছে মৌ পোকা, আর সে গুঞ্জন ধ্বনি
আদি মন্ত্র, যখন বিন্দুটি
ক্রমশ তোমার তাপে ফেটে যাচ্ছে, আদি রেত, প্রথম রমণে
তুমি জ্বালো এক আকাশ তারা
এবং শীৎকারে ঢাকো বর্ণবীজ,
ছন্দ মাত্রা মিল।
আমি কবি, কপালে আধেক চাঁদ
লিখি কাব্য কলঙ্করেখার, নীচে যতেক কুয়াশা
আলো মেখে আরও ঢের সমুজ্জ্বল হল।
শৌণক বললেন, দ্যাখো
দ্যাখো এই কাব্য দেবতার, নেমে আসছে কী রকম কলকল
মৃতরাও একদিন পুনর্জাত হবে।
ম ম করবে দশ দিক, জলের কল্লোল ও জীবিতরা

 


সুন্দর

গলে যাই, আ: চুম্বন, গলে যাই, ওম্
ওম্ স্বাহা —–
দেহ কাঁপছে। অযুত বৎসর
ছাই মেখে বসে আছি, অর্ধ-নিমিলীত
যে শব্দ গোটানো ছিল বিন্দুতে, তার
খুলে নিচ্ছ লোটা ও ল্যাঙট।
আমি কামেশ্বর
মুহূর্তে প্রলয় করি, টানটান; তুমি পর্ণহীন
চাও নিষেকের বীজ, জল
অহরহ ভেজাচ্ছ কবিকে, ভাষাপথ
বেঁকে যাচ্ছে সানু থেকে,
গলে গলে নামছেন সুন্দর।

 


সুধীর দত্ত

সুধীর দত্ত

সুধীর দত্ত সাত-এর দশকের অন্যতম কবি। জন্ম ১৯৫১ সালে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায়। ১৯৭৯ সালে তিনি রাজ্য সিভিল সার্ভিস-এ যোগদান করেন। তার প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ : ‘ব্যাবেল টাওয়ারের চূড়া’, ‘আরশি টাওয়ার’, ‘প্রাকপুরাণ’, ‘দাহপুঁথি’, ‘কবিতাসমগ্র’, ‘তাঁবু মই ও শ্রেষ্ঠ কবিতাগুচ্ছ’, ‘হ্রেষা ও ক্ষুরধ্বনি’। প্রকাশিত গদ্যগ্রন্থ: ‘গদ্যসমগ্র ও প্রভু উবাচ’, ‘বোধিবৃক্ষতলে দেবতা ও তস্কর’।

‘তাঁবু মই ও শ্রেষ্ঠ কবিতাগুচ্ছ’ গ্রন্থের জন্য তিনি ১৪২২ সনের আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E