৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২৬২০১৬
 
 ২৬/১০/২০১৬  Posted by

কবি পরিচিতি

সরিফা সালোয়া ডিনা জীবনের বিচিত্র বিষয় সহজ-সাবলীল ভঙ্গিতে প্রকাশ করেন। মূলত তিনি গবেষক, প্রাবন্ধিক ও বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক। বিভিন্ন গবেষণামূলক পত্র-পত্রিকা তাঁর প্রবন্ধ রচনার প্রধান ক্ষেত্র। স্কুলজীবনেই বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে কাব্যচর্চার সূত্রপাত। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তাঁর কবিতাচর্চা স্ফুর্তি লাভ করে। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে বি.এ (অনার্স, ১৯৯০) ও এম.এ (১৯৯১) ডিগ্রি লাভ করেন। ‘হাসান আজিজুল হক ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প : বিষয় ও প্রকরণ’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য তিনি ২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি শিল্প-সংস্কৃতি চর্চায় সম্পৃক্ত। ১৯৯৬ সালে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর-এর বাংলা বিভাগের প্রফেসর।

প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ :    কথাশিল্প অধ্যয়ন (২০০৬),
শহীদুল্লা কায়সারের উপন্যাস : বিচিত্র বীক্ষণ (২০০৮)
হাসান আজিজুল হক ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোট গল্প : বিষয় ও প্রকরণ (২০১০)
রবীন্দ্রনাথ : চোখের বালি (২০১২)
আমাদের কথাসাহিত্য (২০১৬)

হত সে হরিদ্রাভ (২০১২) (কাব্যগ্রন্থ)

কবি সরিফা সালোয়া ডিনা-র কবিতা


পরিক্রমা

নদীর কাছে পৌঁছুতে পৌঁছুতে ভোর হয়ে গেলো।
ভোরের শান্ত কুয়াশা আহ্লাদি পাখির বিচিত্র আবাহন
সূর্যের নিচে ইকারুসের ডানা। সে ডানা পুড়তে পুড়তে
ধ্বংসের সীমায় রাখে আমাকে। যদিও কখনও
লীথির পারে হাঁটতে গিয়ে ধরে ফেলিনি সে
ধ্বংসাবশেষ। তাহলেও ভালো হতো। বলেশ্বরের
জল উজানে গড়াতে গড়াতে পশুরের সাথে তাল
মিলিয়ে চলে আসতো মহানন্দায় আর মহাসুখে
সমতলের ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’র সৌন্দর্য মেখে
আত্মঘাতী হওয়ার সমস্ত রাস্তা দিতাম বন্ধ করে।
কারো দরোজায় আলতো টোকা দিয়ে ছিনতাই
হয়ে যাওয়া শালপ্রাংশু আকাশ দেখতে দেখতে
কাটিয়ে দিতাম দীর্ঘ আঁধার আর শরীরে মেখে
নিতাম বসন্তের সকল রেণু, শ্রাবণী পূর্ণিমার
পুলকিত ইন্দ্রধনু।


সঞ্চয়

কিছু পলিমাটি সামান্য খড়কুটো আর আকাশের নীল
শাদা শাদা কাশবন যমুনেশ্বরীর ক্ষীণতোয়া স্রোত
বৃত্তাবদ্ধ পাখির কান্না
সকলি সঞ্চয়ে রাখি লুকিয়ে রাখি সযতনে

পাছে তুমি মেঘ- ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিকণা- ঝরে পড়ে
পাছে তুমি নীলান্ধকার- গ্রাস কর আমাকে
পাছে তুমি খুলে দাও হৃৎ-প্রকোষ্ঠের সকল জানালা

সযতনে তাই বন্ধ রাখি প্যান্ডোরা বাক্স আর আশা
শুধু দুঃখ-জরা-ব্যাধি বাক্স থেকে বেরিয়ে
আক্রমণ করে নিভৃতে।


রিপু-১

পুরনো কাঁথায় সুঁচ ফোটাই। দারিদ্রকে রিপু করি
ক্রমাগত। আসেনা হাসি তবুও হা হা ধ্বনিতে বিদীর্ণ
করি ধরিত্রী। ভালো থাকার নেশায় মাতি।
বসে থাকি নৌকোর পাটাতনে। জল উপচে
একাকার, শুষ্ক থাকি জলসিঞ্চনে। এভাবেই
বেঁচে থাকা। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আঁশ।

যমুনা সেতুও রিপু হচ্ছে।


রিপু-২

রিপু করতে করতে জোড়া দিয়েছি শিল্পকুশলতা।
বুঝতেই পারিনি আমার ফুটো জামায় গড়িয়ে গেছে

ধন      মান         সংসার
সকলি।


আর্ত শব্দাবলি

এতকাল সংরাগ-সন্তোষে চলেছি
বিজনপথে চালিয়েছি দ্বৈরথ
শুধু আদি-অন্তহীন ইচ্ছেরা অনিঃশেষ

হেঁয়ালির আগুনঝড় নির্মাণ করে আশ্চর্য পথ
বাতিল পৃথিবীর আর্ত শব্দাবলী
বিস্তার করে নিত্য কুহকজাল
অপেক্ষার গানে তান সাধে বুনো জন্তুরা।

তবু ম্লানিমা ঝেড়ে ফেলে
ফিরিয়ে দিয়েছি আলো ও জলের
তীব্র কারুকাজ।


মধ্যবিত্ত মুগ্ধতা

মধ্যবিত্ত আকাশে মেঘেদের খুনসুটি বাড়ে
চিলাপাতার বুনোপথ অতিক্রম করে বাইসনের দল
সাইকেল আরোহী বনরক্ষী চেনা চিকন পথের পথিক।
চেনাপথ তবু ভয়- সঙ্গী ছায়ার রাক্ষুসীপনা হানা দেয়
মনের গহীনে
কখন এসে পড়ে বুনো মহিষ কিংবা হাতির দল!
সবুজ ফসল আর সতেজ তরুণ চাপা পড়ে না জানি কখন!

তবুও থামেনা যাত্রাপথের দীর্ঘতা
সমতল ছাড়িয়ে ক্রমশ উচ্চতায় মেঘেদের খাঁজে
গা বাঁচিয়ে চলা
রকস গার্ডেনের পাথুরে প্রবাহে
বর্ষণবিন্দুও ভুলে যায় আপন পর
বাতাসিয়া মুখরিত টয়-ট্রেনের হৃদ-স্পন্দনে

তিব্বতি পাহাড়ের সারিতে
নেপালি কাঞ্চনজক্সঘা কী অপরূপ ফুটে আছে দেখো!


প্রেমকথা

শীতনিদ্রা
কুয়াশা-চাদর
জেগে ওঠা জনপদ
বক্ররেখার ফুটে থাকা সোডিয়াম বাতি ক্রমশ বিন্দু

বিসর্গ জানি প্রেমের
দুঃখই ক্রমশ সিন্ধু।


পাপেট বালিকা

পাপেট বালিকারা নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে
সকাল        দুপুর        রাত্রি
কিংবা
গ্রীষ্ম বর্ষা শীত
নিস্তার নেই কখনো!

নিতান্ত আদরে আমরা হাত বুলিয়ে দেই ওদের পোশাকে
ইচ্ছে হলে কিনি কখনো সখনো
নির্জীব পুতুল বালিকারা নিঃসঙ্গ থাকে তখনো!

পাপেট বালিকা বুঝি হারিয়েছে
শৈশব-কৈশোরের দুরন্ত কলঝাঁপ
যৌবনের অনিন্দ্য যাত্রা
হৃদ-পাঁজরের স্বভাবী উষ্ণতা

তবুও
নব্য উপনিবেশী নিঃসঙ্গ রাজহাঁসের
গ্রীবা উঁচিয়ে ভেসে থাকা অহোরাত্রি
আর আহা! বোকা বালিকারা!


স্বজন

সঙ্গ ত্যাগ করেছে সকলে;
বন্ধু বলো, বলো স্বজন কিংবা সুজন
সেতো কেবল দু’জন- ছিন্নবাস আর উপবাস

এদের সঙ্গেই অহোরাত্রি        দীর্ঘ বসবাস।

১০
মীমাংসিত

মীমাংসিত সত্য এই
পাঁজর খুবলে খেয়ে সযতনে হাঁটে নরকুল
হিংসার হুংকারে আটকে যায় যাপিত-জীবন
অসহায় আটপ্রৌঢ়ে দিনকাল।

বিপন্নতার গল্পে সাড়া দেয় না কেউ
যত বলি আছি তোমার কাছাকাছি
তত বার ভুল হয়ে যায়
ফুলশার্টের গোটানো হাতা, দুমড়ে যাওয়া কলারে
তরঙ্গায়িত নৌকার অনুভব

নির্বিষ জ্যোৎস্নায় ভেসে যায় পম্পেই নগরী
ভাসে না নিদ্রিত নাগর
সময়-আয়নায় জাগে বিষণ্ণ নারীর মুখ

১১
ইলিনার জন্য

ইলিনার চোখে বিষণ্ণ বিকেল গোধূলি ঝরায়
তোমার চোখে মুখের প্রতি ভাঁজে খুঁজে পাই না আনন্দরেখা
ভয় হয় পাছে ছেঁড়া তার জুড়ে যায়
ভয় হয় পাছে ভুলগুলো ফুল হয়ে ওঠে
এত ভুল আর ছেঁড়া তার নিয়ে
প্রত্ন-পুতুল গড়েছো বিষাদ প্রতিমা।

তুমি জান গিটারের প্রতিটি তার জোড়ার কুশলতা
অস্থির তারের বাঁধনে দক্ষ তুমি
অথচ তোমার গিটারই ভেঙেচুরে একাকার
বারংবার।

১২
সংরাগ

উজানে বাড়ালে হাত    শেষ বিকেলের ম্লান আলো
লাবণ্য হারায়।
সন্ধ্যা নামে হৃদ উপকূলে। হঠাৎ বৃষ্টিতে নিবে যায়
তুমুল জ্বলে ওঠা জোনাকী আলো
শান্তিনিকেতনী অহিংস সাঁঝে মেঘের নিমন্ত্রণেও তৃষ্ণা মেটে না।
মৃত্যুর কাছে হাত পেতে জলাধার খুঁজি
পড়ন্ত রোদের কাছে ক্ষমা চেয়ে ভেজাই জীবন
শরীরে জড়িয়ে ফেলি হেমন্তের চেনা নির্জনতা

এভাবেই ভাঁজ খুলি    নেমে যাই জলের অতলে
চলে যাই নাগালের বাইরে ক্রমশ

অতঃপর কুহকী রাতের অপলাপে ফুরিয়ে যায় আপন বসন্ত-দিন
সঙ্গী থাকে নতজানু হাহাকার নিঃসঙ্গ-সংরাগ আর উদ্যত সঙ্গীন

১৩
দহনকাল

যদি না-ই ফিরি
মনে রেখো সুতীব্র বাসনা হৃদয়ের বারান্দায় কুসুমিত
দহনকালে থেকে পোড়ো রোদ্দুরে শুষে নিয়েছি ব্যাকুল পিপাসা
অগ্ন্যুৎপাতের বিস্ফার দেখেও পালাইনি
কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে
অগ্নিপরীক্ষায় নেমেছি বারংবার বৈদেহী

যদি না-ই ফিরি
মনে রেখো     তোমাতে পেয়েছি প্রতœ-কৌস্তভ
দেহগন্ধে ফিরেছি অমল-উজানে
দিয়েছি ঝাঁপ    অতল গহীনে
হারিয়ে গিয়েছি শ্রাবণ-মেঘমালায়

যদি না-ই ফিরি
তবুও মনে রেখো
শ্যামল মাতৃছায়া হরিৎ হৃদয়ে সর্বদা ধ্বনি তোলে
সুরেলা গেয়ে যায় বর্ণমালা-গান
এই হৃদ-খনিতে জমা রেখেছি ভালোবাসা-দহনকাল

১৪
সংক্রাম

কখনো ফেরা হয় না
পালাবদলের ঘাটে ঘাটে অরক্ষিত নীতি।
ভ্রষ্টাচার তীক্ষ্ণ দন্ত-নখে বিকশিত।
শিমুলের লালে এখন তীব্রতা কম,
পলাশও ক্ষয়িষ্ণু, নিষ্প্রভ।
থৈ থৈ জনসমুদ্রে কোলাহল জাগে।
দূরে ওড়ে পিপীলিকার পাখা
বহ্ন্যুৎসবে মুখরিত পতঙ্গকুল।

শিমুলের তুলো মুক্তির গানে ফোটায় নিজেকে
দিক্ভ্রান্তের ছুটোছুটি তার।

ফিরিনি আজও আমি।

…………………………………………………………

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E