৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ৩১২০১৬
 
 ৩১/১০/২০১৬  Posted by
কবি শারদুল সজল

কবি শারদুল সজল

কবি পরিচিতি

শারদুল সজল। জন্ম: ৭ ডিসেম্বর , বাশাইল টাঙ্গাইল। পড়াশুনা : মার্স্টাস। পেশা: শিক্ষকতা।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : অন্ধকারে যতদূর দেখা যায় (২০১৪); মাতাল মৃত্যুর ইশারা ২০১৬।

শারদুল সজল -এর কবিতাভাবনা

কবিতা- চিন্তা ও জিজ্ঞাসার শোধিত মাধ্যম। যেখানে জীবন-জগতের সন্ধান মেলে আর এই সন্ধানের ভেতরেই আত্মজিজ্ঞাসার বর্হিপ্রকাশ। এখন যদি কেউ আমাকে প্রশ্ন করেন কেন লিখি, কি লিখি, তার উত্তর লিখি না- লিখতে হয়, তা অভ্যস্ততার জন্যই হোক বা উপলব্ধির জন্যই হোক। কবিতা আমার অক্সিজেন- উদ্ভিদজন্মের এক বৈদ্যুতিক খুঁটি! যাকে সকল সময়ে সত্য ও নন্দনের পথ আবিস্কার করতে হয়। একজন কবি জীবনদার্শনিকতার মহাকাব্য; তাই কবিতা আমার কাছে প্রার্থনা।

শারদুল সজল -এর কবিতা


জাদুকর

গতজন্মের আগেই আমার ভবিষ্যত হারিয়ে আসছি ঈশ্বর
এই কংকালসমেত হাড়গোড়ের ভেতর যাকে দেখতে পাচ্ছেন
সে এক দার্শনিক

গতজন্মে যার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল- আপনার সার্কাসবিষয়ক গবেষণায়

তাই এইজন্মে একজন জাদুকর হয়ে এসেছি
মিথ্যে আর লোভ দেখিয়ে মানুষকে অন্ধ করে দেবো বলে

পাপ নেবেন না ঈশ্বর
এবার আপনার মতো ভেলকি ছড়াবো


জলকুসুমের সংগীত  

শহরজুড়ে ভিড়ছে কামবর্তী উড়োজাহাজ
জলপাই জনমের ধোঁয়া নিয়ে
সাইরেনদিন
জলকুসুমের সংগীত ছাপিয়ে
শোপেনহাওয়ারের দার্শনিক চোখ
ডাউনলোড করে
মনমাধুরীর সফট্ওয়্যার

যেন
উৎসাহ ইশারায়
আকাশ কাঁপিয়ে বলছে

ভিজে যাও
ভেজাও


হাড়ের মিউজিয়াম

বেদনাসুন্দর অহংকার আমার ভোরের বিশালতায় ফুটে আছে
আনন্দময়- বিবেকগলিতে রাত হলেই মৃত্যুর নাম রাখি
কথোপকথন, রাস্তার ওপাশ থেকে এ্যাম্বুলেন্সে জড়ো করি
লাশের ইচ্ছে! ডেঁয়ো পিঁপড়েদের বাড়াবাড়ি
ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে দেই ব্যর্থসময়
শূন্যতার হাহাকার
হাহাকাররা কলম্বাসের সান্তামারিয়া জাহাজে চড়ে
আবিষ্কার করে আমার ভেতরই স্বর্ণমুদ্রার ঝলমলে খনি
অবিনশ্বরবাদের তত্ত্বকথা
মরণের নাম লুকিয়ে থাকা- সূর্য পুড়িয়ে
পশ্চিমে জেগে ওঠে অন্ধকার অজগর
আয়ুরেখার ইশারাসুইচে তখন জড়ো করি
ভবিষ্যত সকালের নাভীনিপল রোদ!


বয়সের ফড়িং-সময়

কাম ও ক্রোধের আগুনে মফস্বলের উঠতি ডালিমবাগান পুড়ে যাচ্ছে
সূর্যের রঙ ধূসর-তামাটে হয়ে আছড়ে পড়ছে বেগানা যুবকের ঘামে
এই সময়ে বলো কীকরে চুপ থাকি, কীকরে কামকে
কার্পাস তুলোর হালকায় উড়িয়ে দেই!

প্রতিনিয়ত শরীরের সেমিনারে আমি প্রধান বক্তা
গোলাপ বাগানে গর্জে ওঠা বিদ্যুৎতরঙ্গে রাজহাসের সাঁতার
এসব টাটকা জীবন থেকে কীভাবে তুলে রাখি

ঘামের কাহিনি!


চুমুর সাথে তোমার বিরোধ মেটাও এই বলে

চুমুগুলো আমার উড়ে চলছে

ঠোঁটের কর্মশালায়!

 


জীবনানন্দ

ট্রেনের ফেরা না ফেরা নিয়ে
কোন রহস্য নেই
পকেটবিহীন না-ফেরা পুঁইশাকের লতায়
আজও হারায়
জীবনানন্দ!

সশস্ত্র মেঘ হয়ে
কোন কোন ট্রেন আজও
অবুঝ রমণীর করাত
কাটতে থাকে
শত চুম্বনের আয়ু!


দূরত্বের কথা নিয়ে আসিনি

অন্ধ হতে হতে কী যেন দেখে ফেললাম
কুয়াশার অস্থির পাতাবাহারে হেঁটে ঘেটে দৌড়ে
একটি জন্মের অতীত ব্যবধানে
অনর্থ এই জীবন কতবার গিলে খেয়েছি
গ্লাসভর্তি মদে, কতবার তুলে দিয়েছি নিঃশর্ত
তোমাদের দখলে!
তার হিশেব বা ফর্দি নিয়ে আসিনি আমি আসিনি
পিথাগোরাসের জটিল ধাঁধায়

শীত আসে! বিস্মৃতির পরাস্ত মাঠে গান গেয়ে
যে কোকিল গেছে ভুলে
স্বর্ণলতা যেভাবে পেঁচিয়ে বাড়ে একটি আস্ত জীবনে
তার চোখ হারানো
দূরত্বের কথা নিয়েও আসিনি আমি

আমার মতো এভাবে কেউ আসে না
ক্ষতির সংবর্ধনা দিয়ে বিপরীত ভাঙা বোতামে
সূর্য ছড়াতে!


একটুকরো হাসি রান্না করতে চেয়েছিলেন

চাঁদের বারান্দায় এ কার লাশ? কার বিরহে
ভেসে গেছে গোলাপ-গন্ধের ইতিহাস!
আলফা সেনচুরির নিকটবর্তী হয়ে
কষ্টগুলো আমাদের ঘরে বড় হয়েছে, মা-ও
আহ্লাদি
ওগুলো যত্ন করে করে রোয়া চৌকাঠে

একের পর এক

সাজিয়ে রেখেছে


আর বাবা নিরুদ্দেশ
ভোরের বাজার থেকে প্রতিদিন
ব্যাগভর্তি অন্ধকার কিনে বাড়ি পাঠাতেন


আমরা কেউ বুঝতাম না

মা যতই একটুকরো হাসি রান্না করতে চাইতেন
দুঃখগুলো ততই আমাদের হাঁড়িতে নেচে উঠত
মা আড়ালে তা লোকমা ভরে গিলে খেয়ে
আমাদের প্লেটে দানা দানা শাদা আনন্দ
ঢেলে দিতেন


মনোজগতের ইশারা      

না গেলেও থাকা যায় না
বুকের বাঁ’পাশের সোনালি মাছ
লাফিয়ে পড়ে অদৃশ্য অ্যাকুরিয়ামে

অ্যাকুরিয়ামে তুমুল অস্থিরতা
সময় পেরিয়ে হলুদ দিনের রজনীগন্ধা
অবর্ণনার গভীরে শনাক্ত করে

পেয়ে গেলেও- পাওয়া হয় না
পাওয়া যায় না

একজীবনে এ দুচোখ যত মানুষ দেখে
অর্ধেক পড়ে থাকে তার না-দেখা চোখের আড়ালে
আর অর্ধেকের ৯৯ ভাগ বিস্মৃতির বির্বণ বলয়ে
বাকি ১ ভাগ ভোগ ও বিনাশে
রূপান্তর করে কাফ্কার মনোজগত

পেয়ে গেলেও- পাওয়া হয় না
পাওয়া যায় না

১০
সিজদামিতি

এটি একটি প্রস্থান। ফেরার সকল দরজা-জানালা বন্ধ করে
খুব কাছ থেকে ধূলিময় বাতাসে রাত আরতির অনুপম হাতে কেউ
দাঁড়াবে না আর উঠোনের বাগানে
ভেজা ওঁশের পাতা ঝরার গন্ধে
বৃষ্টির লিরিক মিশে গিয়ে উড়ে যাবে দূরের দিগন্তে; বিমূর্ত আকাশের
রঙ আলো… টুপটুপ করে ঝরে পড়বে অদূর গাছের ঘন ছায়ায়
কেউ দেখবে না- মাটির পৃথিবী ভেঙে অতলকুসুমে
দেহলি বৃক্ষের গতি রেখে কীভাবে মৌলিক হ’লে!

এটি একটি প্রস্থান। মা বাবার মৃত্যুর শিকড় গভীরে
নুনের গল্প চেখে যে সিজদামিতি রচিত হলো
তা কেউ জানবে না; অন্ধ জ্যোতিষীর রোদের রওজায়
সুদীর্ঘ কালোবিষ কতবার জন্মেছে! কতবড়
আকাশ ছুঁয়েছে তার দৃশ্যত ছিল কেবল ঈশ্বর
আর অনুমান করেছিল যে একজন- সে বেদনাবিশ্বাস
সে আমার তৃতীয় মৃত্যু!

ওমকাতর সেই দারুণ ক্ষত, যেখানে সমুদ্র আর চোখের
কোনও পার্থক্য নেই, যেখানে সমুখ সকল সবুজবৃক্ষদের ভেঙে
গুঁড়িয়ে মহাকালের নিচে নিজেকে করেছি জীবন্ত ফসিল
এটি আমার সেই তৃতীয় ও চূড়ান্ত মৃত্যু- যা হারালে জীবন
ক্রমশই পাথর হয়ে ডুবে!

১১
ছায়াসুন্দর  

যা দেখতে পাচ্ছেন ওগুলো ছায়া
যা দেখেননি- ওগুলোও

ছায়া ছাড়া মানুষের বিশুদ্ধ কোন নাম নেই
পৃথিবীতে
ছায়ার ভেতর প্রথম জন্মেছিল
মায়া
মায়া এক অদ্ভুত উদ্ভিদ
হৃৎপিণ্ডে শিকড় ছড়িয়ে
মহাজগতের জলে মিশে রজনী শামুক

ছায়ার ভেতর মায়া ফেলে
মুখস্ত করি পরিচিত মুখ নথিপত্র হিসেব
সম্ভাব্য সম্পর্কের জলাশয়
আগুন

অথচ ওগুলো জন্মরক্ষার কুয়াশা

১২
চিত্রময় সংলাপ

আমি
মানুষের মুখ
ফটোকপি করতে এসে
নিরালার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি

দেখছি

মানুষের একহাত গলায়
একহাত পায়ে
ধরতে ভুলে না
যখন যেটা লাগে

১৩
বিনয় মজুমদার

তিন আঙুলে নাচে দশ জনমের মহাকাল

অন্ধকার সতিচ্ছেদ প্রথম এই ঘরে, হুঁড ছড়ানো হাওয়ায় ছড়িয়ে

এখানে হুকুমকর্তা ও পালনকারী একই ব্যক্তি

এ ঘরের বালিশে তোশকে রুটিছেকা তাওয়ার ওমে ও ঘুমে
নিবিড় গৃহস্থালি
আকাশের বুকজুড়ে আউশ ধানের হাড়গুলি

হঠাৎ মাটি কাঁপিয়ে কে যেন নামলো। তিনি আদেশ করলেন
কে কোথায়- দেখতো, সদর দরজায় কে এলো

তিনিই এগিয়ে গেলেন-  দেখলেন
চোখের ক্লান্তিতে ঘেমে যাচ্ছে জিব্রাইল

১৪
মঞ্চ

উঁচু চেয়ারে অভিনব হত্যাকারীই বসবেন
প্রধান অতিথি হবেন কৌশলী গোপন দালাল
সভাপতিত্ব করবেন খুনি-শয়তানের মিষ্টি মুখ
বোকচোদ বয়ানের প্রটোকল দেবেন
বাজার ফর্দির মতো কতিপয় কিছু অফিসার
আর করতালির মজুদে উপস্থিত হবো
তুমি আমি তারছেঁড়া অবুঝ আবাল!

১৫
মায়া

কেউ কেউ ঘুড়ি নাটাইয়ের তারহীন
বাতাসের বেলুন উড়ায়
দিগন্তে হারানো অসীম শূন্যতায়
আঙুলে ঝুলানো সময়ের খাঁচায়
ঘুণপোকায় খেয়ে যাওয়া
সূর্য
ও শৈশবের দিনপোড়া শরৎ-শরীর
অক্সিজেনের শীতমায়া জলের বুদ্বুদ

মাটির কলসে সুতাহীন সুরে
বেঁধেছিল একদিন মাটির পৃথিবীর ঘর
মাটির এত রঙ! মাটি বুননী সমুদ্র ঘরে
সংসার পেতে মাটির মানুষ একদিন
মাটিতে ঘুমায়
মাটির ঘর ছিঁড়ে পোষামুনিয়া
কুমকুম বাতাসে নিঃশব্দ উড়ে যায়

আমরা কেউ দেখি না- মাটির ব্যাংকভাঙা
জমানো পয়সায় চিকচিক করে
অফুরান দিনের স্মৃতি ও সংলাপ
একটি চিঠি হয়ে
ডাকবাক্সে আজও পড়ে আছে প্রযত্নে রওশন

১৬
বর্তমান

বন্ধুত্ব বাঁচিয়ে রাখা যায় না
চলো শত্রু হয়ে উঠি

পাখিপালকের উড়াল না জেনে
পৃথিবীর বিপরীত স্রোতে যারা ভাসমান
সমতল অন্ধকার যাদের করেছে গ্রাস
তাদের
ভেতর পৃষ্টার ফটোকপিতে
মায়ারশ্মি কাঁদে
কেঁদে ওঠে শিলাবৃষ্টি শহর

ভূগর্ভস্থ
৭০ ফিট মাটিস্তন জলের ফোয়ারা
শস্যের শিকড় গভীরে পৌঁছনোর আগে
জলাতঙ্ক রোগের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে
মহাকাল

আর আমরা ছোট হতে হতে পিঁপড়ের ছায়ায়
তলিয়ে যাই

বর্তমান নাকি এরকমি- কেউ কাউকে
খুঁজে পায় না

১৭
যোদ্ধা         

একাধিক রাক্ষসের চেয়ে
আজরাইল সত্যিই চমৎকার
তার চেয়েও চমৎকার
যদি কাউকে না পুছ!

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E