৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ১৭২০১৭
 
 ১৭/১০/২০১৭  Posted by

শাপলা সপর্যিতা-র সিক্রেট পাথর ও অন্যান্য কবিতা

সিক্রেট

কাউকে বলো না যেন
তুমি দেখেছ ওই মৃত চাঁদ
দেখেছ পাথরে গেঁথে থাকা কাঁটা
রক্তাক্ত জোৎস্নার মরণ
কাউকে বলো না, প্লিজ ………


পাথর

কেন সে পাথর?
গলে যায় সহজেই?
মিশে যায় নদীর অতল?
কেন ভালোবাসে ফুল?
পূর্ণিমার গরল?
কেন ভালোবাসে জন্মান্ধ প্রলয়?
কেন ধুপের প্রায় জ্বালে আত্মার শিখা
কেন নিষিদ্ধ অন্ধকারে জেগে থাকে একা?
কেন সে বুকের পাথর ঠুকে ঠুকে
রোজ আঁকে প্রিয় মুখ?


তোমার ছবি

বিছিয়ে রেখো হৃদয়
আঁচলে তুলে দেব কিছু শিউলির প্রেম
রাতভর জন্ম দেব নতুন আলো
গোধূলিতে নিভে যায় যদি আত্মার শিখা
ক্ষতি কি..
প্রহর গুনে গুনে শিউলি শরীরে
রক্তস্নান শেষ হলে
শুন্য পথের ’পরে
এঁকে দেব তোমার মুখের ছবি


দাগ

যদিও কোজাগরী চাঁদ ঢালে পূর্ণিমা, তবু
পূর্ণ হয়ে ওঠে না ওই মাধবী রাত
কপালে নীল হয়ে ফুটে থাকে
গত জনমের সব রক্তের দাগ……….


জোনাকি জোনাকি রাত

কোনো কোনো রাত যেন এক একটা মৃত জোনাকি। ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে বের হয়ে আসে ফিনকি দিয়ে। একটা ব্ল্যাকবেল্টে ঝুলে থাকে ফাঁসির দড়ি গলায় পরে। একটা সিগারেটের প্যাকেট এবং ফ্লাইং কিকে ছিটকে পড়ে গভীর গাঢ় এক বেদনার ঘুম। ঘুমের এত ব্যথা…রক্তে ভেসে যায় পূর্ণিমার উঠান। সব ব্যথা অবশেষে নদী ভেঙে নেমে যায় পুরোটা শরীর। নিয়ত জেগে থাকে কুয়াশা কুয়াশা রাত। রাতগুলো হায়, বিমর্ষ মৃত এক একটা জোনাকি শরীর। সেইসব রাতে আর ঘুম আসে না আমার……….


জেগে আছি

এখনো জেগে আছি। জেগে থাকি প্রাণে ও প্রেমে। জেগে থাকি গল্প ও কবিতায়। জেগে থাকি। জেগে থেকে তোমারে জাগিয়ে রাখি। জেগে থাকি দুঃখে আর দৈন্যে। জাগিয়ে রাথি তোমারেও বিরহ আর নীরবতায়। এইভাবে বহুকাল জেগে আছি। জেগে থাকি তৃষ্ণায়। জেগে থাকি শেষ চুম্বনের অধীরতায়। জেগে থাকি। জেগে থেকে জাগিয়ে রাখি ভেতর। জাগিয়ে রাখি বাহির। জেগে থাকি করাল দুপুরেও বৃষ্টি জলের আশায়। জাগি প্রেমে। জাগি পরাজয়ে। প্রদোষে শিউলীর ঘ্রাণে……….লালমাইর চুড়ায় পাথর মানুষের নিথর পরশে। জেগে থাকি মধ্যরাত। জেগে থাকি মায়ায়। জাগি মাধুরীতে। জেগে থাকি ছায়ায়। জেগে থাকি – জেগে থেকে নিজেরে জাগিয়ে রাখি। তোমারে জাগিয়ে রাখি এক নিদারুণ প্রতারণায়……….


ধুপ

কেন পোড়ে এত ধুপ?
কেন এত হাহাকারে ভরে ওঠে নীলাকাশ?


স্নান

প্রচুর অর্জুনের সাথে কথা হয় রোজ
দু’হাতে ঠেলে দিয়ে বিষাক্ত তীর
প্রতীক্ষায় থাকি বৃষ্টির
এসো বৃষ্টি…
স্পর্শ করো জলে
প্রবল বারিপাতে ধুয়ে যাক অবশেষ…
এটোকাদা মন আর মানুষের মুখোশ।
কেবল বৃষ্টি হলেই চলে যায়
শুধু জলে বাঁচা যায় অনন্ত জীবন।
বৃষ্টি এসো
ধুয়ে দাও বিষমাখা তীর
স্নান হোক অনন্ত বিশুদ্ধতায়
তোমার আমার….


কাজল কথা

ক’টা কবিতা লিখলে আজ
ক’টা ফুল তুলে দিয়েছ খোঁপায়?
আমি আজ মেঘে, মেঘে
আঁকছি রাজকন্যার মুখ
তার চোখে তুলেছি তুলির কাজল
খোঁপায় তারার ফুল
তবু দেখি তোমার চোখ
কেবলই বৃষ্টি, আহা…..
কবিতার খাতায় অক্ষর – নক্ষত্র
হায়, ধুয়ে যায় যদি সব
তবু বলি…
চোখের কাজলটুকু রেখো শুধু
আর সব জলে ভেসে চলে যাক

১০
স্মৃতি

ভাবছি……..
ধীরে ধীরে ভুলে যাব তার মুখ
ভোলা কি যায় আহা, স্মৃতি – কাঁটা – দুখ!
ভাবছি, তীরে তীরে হেঁটে যাব বহু দূর
ঢেউগুলো ফিরে কেন আনে বিষণ্ণ সুর!
যত দূরে যাই কেন ঢেউ ভাঙে নদী?
যত দূরে যাই
ঢেউ ভাঙার শব্দ শুনি….

১১
বিষ

এরকম জ্যোৎস্নায় তার শরীর জড়ায়ে উঠেছিল এক কালসাপ। মধু পূর্ণিমায় যখন ডেকেছিল বান। সাপটি ছোবল বসিয়েছিল বুকের ঠিক মাঝখানে। নীল বিষে ভিজেছিল রূপালী আঁধার। আর পৃথিবী পেয়েছিল অমরত্বের বর। হায় নীলকণ্ঠ – আজ এখানে জ্যোৎস্নায় সমুদ্র ভেসে যায়…………

১২
লেখক

অতটা লেখক হতে চাইনি কখনও
যতটা হলে কলম হারিয়ে যায়।
লিখেছি সহস্র জীবন
কালিতে উড়িয়েছি গত জন্মের সব পাপ
লাল নীল আর কালো কালির ফোঁড়ে ফোঁড়ে
উঠে এসেছে বহু নক্ষত্র আর রাত
কলমের নীলে অভিমান সাঁতার কেটেছে পুকুরের নোনা জলে
লাল কালির আগুনে পুড়ে গেছে আমার জন্মান্ধ চোখ
তবু কলম
আহা কলম
লিখেছি আত্মার ক্ষয়
জীবনেরও অধিক জীবন
লিখেছি জীবনের কফিন শব অন্ধকার
ঝলসে যাওয়া চামড়ার পোড়া ঘ্রাণ
কপালের ফাটল
লিখেছি হাতের শাখায় বেজে ওঠা নিনাদ
লিখেছি বুকের পাঁজরে শিশুর মুখ।

এখন কলম নেই
প্রেম প্রত্যাশা কিছু নেই
পাঁজরে আগুন নেই
রঙ ক্রোধ নেশা নেই
কোজাগরী রাতে নীল যমুনায় ভেসে যায়
পূর্ণিমার চোখের কাজল
ঠোঁটৈ ঠোঁট নেই শরীরে শরীর
বিস্মৃত এক প্রাচীন নগরে
খুব আকাশ পোড়ানো ঘ্রাণে খুঁজে চলেছি
যতটা হতে চাইনি ঠিক ততটুকু এক প্রাচীন লেখক।

১৩
ঈশ্বর

যতদূর পথ হেঁটেছি আমি
ঈশ্বর হেঁটেছেন পায়ে পায়ে
নির্বোধ আমি নিঃস্ব করেছি
জীবাত্মায় নিজেরে……

১৪
ঘুম ভাঙানিয়া

কথামালা!
গাঁথা হয় এক একটা কথামালা!
কথাগুলো এক একটা নক্ষত্র হয়ে
ফুটে ওঠে সারা আকাশ জুড়ে
ফুল খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত দিকভ্রান্ত
বিছিয়ে রাখি আমার আঁচল আকাশ ঘিরে..

নক্ষত্রেরা স্বপ্ন হয়ে ঘুম ভেঙে দিয়ে যাক।

১৫
দূরত্ব

আবার তুমি
ডুবে যাবে অতল
যেহেতু আমি কাল রাতে
ভেসেছিলাম নদীর সঙ্গম।
বসন খোলা হাওয়া
আড়ালে গাঢ় রক্তজবার
গল্প ছিল তার।
ওদিকে তুমি বেসামাল
আমারও চোখে নেশা
নেশা নেশা রাত
ভোর হয় হয়……
অথচ তুমি নেই আমি নেই কোথাও
পুরোটাই এক ভীষণ গল্পের ঘোর।


শাপলা সপর্যিতা

শাপলা সপর্যিতা

শাপলা সপর্যিতা। জন্মঃ ৬ অক্টোবর, ১৯৭৪। সিলেট সরকারী পলিটেকনিক কলোনী (সুরমা নদীর পাড়ে)। গ্রামের বাড়ি – সুনাম গঞ্জ। বাবা- মোঃ আব্দুল হক একজন শিক্ষক (সরকারী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট- রিটায়ার্ড)। মা- মোছাঃ আনোয়ারা হক। গৃহিণী। কবি বর্তমানে বাস করছেন ঢাকায়। বর্তমানে ম্যাপললিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। শিক্ষাঃ বি এ (অনার্স) ১৯৯৪ এবং এম এ (বাংলা) ১৯৯৫ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : এই পৃথিবী এই দেশে (১৯৯১); নিভৃত পরবাস (২০০৮)।
উপন্যাস : টাইম মেশিন (২০১৭)।

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E