৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মে ১৫২০১৭
 
 ১৫/০৫/২০১৭  Posted by

শাপলা সপর্যিতা-এর একগুচ্ছ ছোট কবিতা ও কিছু প্রশ্নোত্তর

১। কবিতা দিনদিন ছোট হয়ে আসছে কেন? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টি ও চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কারণ কী? দীর্ঘ কবিতা সৃষ্টির দম-দূর্বলতা-ই কি ছোট কবিতা বেশি বেশি লেখার কারণ? নাকি, ছোট কবিতা’র বিশেষ শক্তি এর অনিবার্যতা? কী সেই শক্তি?

পৃথিবী যত দ্রুত হাতের মুঠোয় চলে আসছে ততই দ্রুত বদলে যাচ্ছে মানুষের মন। অর্থাৎ ক্রমপ্রবহমান অস্থিরতাই কবিতা ছোট হয়ে আসবার কারণ। চারপাশের অস্থিরতা থেকে নিজেকে একা করে নিয়ে নিজের ভেতরে ডুব দেবার শক্তিটাই বোধ করি কমে আসছে কবির। অথবা নেশার ঘোরটা খুব বেঘোর নয়। কেটে কেটে যাচ্ছে সহসা। আমার এটাই মনে হয়।
যিনি লিখবেন তিনি খুব দ্রুত জানান দিতে চাইছেন । খুব অল্প সময়ে বলতে চাইছেন অনেক কথা। আর যিনি পাঠক। তিনিও ভীষন ব্যস্ত। দীর্ঘ কবিতা পরবার মতো মানসিক স্থিরতা তার নেই।
এটি ব্যক্তি বিশেষের বিষয়। কোনো কোনো লেখক আছেন। প্রচুর ছোট কবিতা লিখছেন। দূর্দান্ত লিখছেন। বড় কবিতায় তার ধৈর্য একদম কম। আবার কোনো কোনো কবি আছেন যারা বড় ছোট দুটোতেই পারঙ্গম সমান দখলদারিত্বের সাথে। তবে আমি মনে করি দীর্ঘ কবিতা লিখবার জন্য দম দূর্বলতা কিংবা সক্ষমতা একটা বড় বিষয় অবশ্যই। একটি দীর্ঘ কবিতায় যে উত্থান পতন ঘটনার পারম্পর্য রক্ষা করে প্রবহমান তাকে নির্দিষ্ট সীমায় গেঁথে বিশেষ পরিণতি দেয়া তো যা তা কথা নয়। তার জন্য দম দরকার বৈকি। শব্দের দম বাক্য বুননের দম বোধের দম – বোধের সাথে পাঠককে রিলেট করতে পারার দম আর অবচেতনের সত্যকে প্রকাশ্য আলোতে নিয়ে আসবার দম। কজনই বা পারে। আর এর ধ্যান বিশাল ব্যপ্ত গভীরে নিবদ্ধ। লিখবার আগে দমের প্রাকটিস সেও এক দীর্ঘ সাধন। কজন কবিই বা এই সাধনায় রত আছেন বা এই সাধনা করে এসেছেন। যারা করেছেন তারা ছোট বড় সব ধরণের কবিতাই সাচ্ছন্দে লিখেছেন।
আমার মতে কবিতার আকার (ছোট না বড়)  কোনো বিশেষ হয়ে উঠতে পারেনা। কবিতা মাত্রই খুব অল্প কথায় বিশাল ব্যপ্ত চরাচর উপস্থাপন করে। প্রাণে প্রাণে এর যোগ। প্রাণের যোগ না হলে তা বড় কবিতাই কি আর ছোট কবিতাই কি।

২। এক লাইনেও কবিতা হয়, আবার সহস্র চরণেও। আকারে-অবয়বে দীর্ঘ বা ছোট হলেই কি একটি কবিতা দীর্ঘ কবিতা বা ছোট কবিতা হয়? ছোট কবিতা ও দীর্ঘ কবিতার বিশেষত্ব কী?

কবিতাকে যদি ছোট আর দীর্ঘ এই ধারায় নামকরণ করে ডাকি তবে অবশ্যই এর আকারকেই মিন করে আমার কাছে। বরং বলা যায় ছোট হলেও কবিতার বোধ অনেক গভীরে শেকড় ছড়াতে পারে । আবার বড় হলেও পারে। বরং এটা বলি একটি ভালো কবিতার সাথে এর আকারের কোনো মিল নেই। মিল হলো তার ব্যাপ্তিতে। প্রোথিত হবার যোগ্যতা আর গ্রহণযোগ্যতায়। যোগে।
ছোট বড় সব কবিতার একমাত্র বিশেষত্ব প্রাণের যোগ। তা আনন্দে ব্যাথায় প্রেমে বিরহে ঐশ্বযে দীনতায় প্রতারণায় দ্রোহে কিংবা বিদ্রোহে। তার প্রাণে যা খেলছে আমার লেখায় কি তা কইছি? যদি ঠিক জায়গাটিতে যোগ করতে পারি তবেই তা বিশেষ হয়ে উঠতে পারে বিশেষ শ্রেণির কাছে কিংবা কোনো মানুষের কাছে।

৩। ক) ছোট কবিতা’র গঠন-কাঠামো কেমন হওয়া উচিত মনে করেন?

কবিতা কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো হওয়া যুক্তিযুক্ত নয় আমার কাছে। কবিতা সমাজের সময়ের এবং ব্যক্তিজীবনের এক গভীর সত্য। একে কাঠামোতে বাঁধা যায়না। একে গভীরে উপলব্ধি করতে হয়।

 খ) ছোট কবিতা পাঠে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যায় কি?

কোনো কবিতা পাঠেই পূর্ণ তৃপ্তি নেই। কোনো বিশেষ শিল্পই পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারেনা। যা অতৃপ্ত রেখে যায় আকাঙক্ষাকে জিইয়ে রাখে তাইতো  শিল্প তাই কবিতা।

গ) ছোট কবিতায় কি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা পাওয়া সম্ভব?

না। ছোট কবিতা মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা দেবে এটা আমার ধারনায় আসেনা। মহাকাব্যের বিশাল আবহ পরিপ্রেক্ষিত কাহিনী বিস্তার থাকতেই হবে। তার বিষয় বিশদ বিস্তারিত তার অখ্যান ব্যাপক তার শেকড় সুদূর প্রসারিত। এর পটভূমি দীর্ঘ দীর্ঘ ……..

৪। ক) আপনার লেখালেখি ও পাঠে ছোট কবিতা কীভাবে চর্চিত হয়েছে?

আমার লেখালেখিতে ছোট কবিতার চর্চা অস্থিরতায় সময় স্বল্পতায় অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতায় আর দমে।
ছোট কবিতা পাঠে বরাবরই আমার নিতান্ত অনিহা। শুরুতেই। দেখেই । ছোট কবিতায় আমি নিজেকে যুক্ত করবার সুযোগ পাইনা সহসা। তবু শক্তি চট্টোপাধ্যায় এর কিছু কিছু ছোট কবিতা আমার ভীষন পঠিত।

 খ) আপনার একগুচ্ছ (৫-১০টি) ছোট কবিতা পড়তে চাই।

কবিতা

তোমার পায়ের নখে বেঁধেছিল আয়না।কতদিন মেলে দিয়েছিলাম সেখানে দু’চোখ। ফুটে উঠেছিল আয়নায় আমার মুখ। যেখানে সূর্য ডুবেছে কতকাল। কত মৌন অন্ধকারে আয়নার দাঁড়ে মেলে দিয়ে দেহ আমরা মিথুন। কত ভোর নতুন সকাল হয়েছে আমাদের দূরত্বে! কত যে দূর… দূর তুমি দূর আমি। দূরের বিলাসী উল্লাস। কত যে গভীর এই দেহ গেহ মাখামাখি। দেনা নেই পাওনা অপ্রতুল। বিভোর প্রেম। কবে যে হয়েছে বিধুর। এপারে সৌর পৃথিবী। ওপারে আমি। একা। সূর্যভোরে উদ্দাম পাখা মেলে দিয়েছে।উড়ে গেছে সোনার পাখি। পড়ে রয়েছে কোথাও কিছু ধূসর প্রেম।কিছু মৌন আবছায়া-শরীর নামের এক আধো ফোটা জলের কিনারে।

এই যে ধরেছি বিকেলের হাত। যাব সন্ধ্যায় – অতঃপর গভীর অন্ধকারের রাতে। ওখানে তারা জ্বলা। নৈশব্দে মানুষের ছায়া। ছায়া ছায়া জল। মায়ার কাজল। আঁকে স্বপ্নে স্বপ্নে। ওখানে দারুণ জীবন। ওখানে বসন্ত ।জলের উপর উপুর হয়ে পড়ে থাকে মানবতত্ত্ব। পরমাত্মায় বুঁদ পার্থিব হৃত অধঃ অনিশেষ প্রেম। নিঃশেষে দীপ জ্বালে অজস্র তমিস্রা এখানে। এখানে মরণ……

জেগে উঠেছেন মহাপ্রভু। অতন্দ্রা মহাকাল। সন্ধিতে নেই সমৃদ্ধি। অপমানে জ্বলে সূর্য। মহালগ্ন অপমানিত অস্পৃশ্য, জটাজাল। সন্ধিগ্ধ চিত্ত জানেনা ভালোবাসা। লুন্ঠিত নারী নর – মানবের প্রেম, পতনোন্মুখ অবাধ বিলাসে। অবগুণ্ঠনে কত আর অস্থির, কোনো ধ্যানমগ্নার সাধন? দ্বৈরথ। এ বড় কঠিণ । সমর। ধ্যান প্রেম বিশ্বাস – বিলাসে ভেসে যায় মর্তের মানব। চেনে না কে যে মর্তমানবী কে যে স্বর্গের অধিশ্বর কে ই বা প্রেমের ? কারে ভাবে আফ্রোদিতি ? কারে করে মার্জনা প্রতিপল………………………আহা, চেনে না কোনো গভীর মানুষ। পড়ে না ধ্যানের কাব্য। জানে না প্রেম……………

ভালোবেসে দিলে যদি – চাঁদও তুলে নেই হাতে। পায়ে পড়ি সৌবর্ণ আলোর মল। মেখে নেই গায়ে জোৎস্নাও বেহিসাবী। আর চলি আলোর পথ ধরে। অন্ধকার বিতাড়িত করি নিজের হাতে। তারপর চলে যাই ওই মুক্তোর কাছে চাঁদেরই আলোতে যা পড়ে রয়েছে দূরে বালির স্বর্গে। ভালোবেসে নয় যদি, জেনে রাখো, মাড়িয়ে যাই মিলিয়ন মিলিয়ন ডলা্র দুই পায়ে………………


আমার মুখে ভেঙে পড়েছিল চাঁদ। বিষণ্ণ জোছনা। আমি মানুষের আড়ালে ঢেকেছি মুখ। মানুষের ভেতরে মরেছে কত চাঁদ। জানো? আমি জেনেছি তার ঘন অন্ধকার। বিপন্ন অবসরে। হায়..যে চাঁদ মরে গেছে মধ্য দুপুরে রাতের বাসরে তারে আওভান কি সাজে?। যে জোছনা ঝাঝালো মৃত নদীর স্রোতে সে কি পাখা মেলে?। দিতে পারে আর কারে? জীবনের প্রধাণ স্বাদ?। অসীম প্রেমে ভেসে যেতে পারে তার সব ক্ষয়? ভুলে কি যেতে পারে তার সব লয়? আমি ঢেকেছি আমার মুখ। আহা, আমার সে বিষন্ন মুখ ঢেকেছি আমি মানুষেরই পিঠে। তার পিঠে কোন ক্ষত নেই…

————-

ক বি  প রি চি তি

শাপলা সপর্যিতা

শাপলা সপর্যিতা

শাপলা সপর্যিতা। জন্মঃ ৬ অক্টোবর, ১৯৭৪। সিলেট সরকারী পলিটেকনিক কলোনী (সুরমা নদীর পাড়ে)। গ্রামের বাড়ি – সুনাম গঞ্জ। বাবা- মোঃ আব্দুল হক একজন শিক্ষক (সরকারী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট- রিটায়ার্ড)। মা- মোছাঃ আনোয়ারা হক। গৃহিণী। কবি বর্তমানে বাস করছেন ঢাকায়। শিক্ষাঃ বি এ (অনার্স) ১৯৯৪ এবং এম এ (বাংলা) ১৯৯৫ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ এই পৃথিবী এই দেশে (১৯৯১); নিভৃত পরবাস (২০০৮)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E