৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মার্চ ১৯২০১৭
 
 ১৯/০৩/২০১৭  Posted by

ট্রোগনের গানের ধ্বনি প্রতিধ্বনি ।। শাপলা সপর্যিতা

মেঘ নিয়ে ভাবতে শুরু করি আবার এই কালবেলায়। ছোটবেলার অসংখ্য মেঘ রাজকন্যা রাজপুত্র আর পাখ পাখালি এসে ভর করতে থাকে আমার কল্পনায়। তখন দারুন বিস্ময়। পরিষ্কার নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বদলে যেত তখন আকাশের ড্যাশবোর্ডে কল্পিত রাজকন্যার মুখ। হঠাৎ যেন মেঘগুলো রুপ নিত কোন ময়ূরের পেখম ধরে।আবার কখনো বনের সিংহরাজ অথবা কোনো পরীর পাখনায় ভর করতো রাজ্যের বিস্ময়। আমি লালমাইয়ের পায়ের কাছে ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে শরতের নীল আকাশের দিকে চেয়ে অবাক বিস্মিত। কে আঁকে অমন সুন্দর এক রঙা দারুণ ছবি? কে? কোথায় তার তুলি? দেখিনাতো তার হাতও? এইতো একের পর এক এঁকে চলেছে আমারই চোখের সামনে কি বিষণ্ন রূপকথা কিংবা দারুন সব মনোহরণ! এই সব মেঘ, মেঘে আঁকা ঠান্ডা ঠান্ডা সব ছবি দেখে দেখেই পার হয়েছে আমার আদুরে দূরন্ত কিশোর বেলা। কৈশোরের সকল শরৎ বেলা।এই মেঘ দেখে দেখে সুদীর্ঘকাল। আজ এখানে বহুকাল বহু বছর পরে দেখি তার লেখাতে যেন সেই ছবির ধ্বনি প্রতিধ্বনি।অবাক? বিস্ময়? ছবির আবার প্রতিধ্বনি কি?

-আমার অর্জিত সংখ্যার ভেতর মেঘযাত্রা। নীল জুড়ে বিস্তৃত সংখ্যাগুলোর কাছে নিরাকার বাতাসের আনাগোনা। (সংখ্যাপদ্ম)

আমি এটুকু পড়েই মুগ্ধ হই। বুঝতে পারি গতি ঠিক আছে। এগুবে বাতাসে পালের ধাক্কায় নাও। যাব দূরে। এই পথ ধরে – তার নাম ট্রোগানের গান। সব বই পড়িনা যে আমি। সব লেখা টানেনা আমারে। নাওয়ের রঙিন রঙিন সব জোড়াতালি দেয়া পাল। পালের বাতাস আমার মন আর তার অক্ষর-কথা-ছবি আর কবিতা। সবই আমি এক করে দেখি। ক’জন আছে আমার মতো এমন দরিদ্র পাঠক। তবু ভালোলাগাকেই ভাবি জীবনের অপার পাওয়া। ভালোবাসাই জটিল আরাধ্য। তাই ভালোবাসতে পারি যদি শব্দ তার, অক্ষর তার তবেই তা আমার কাছে হয়ে ওঠে অমর। গতিশীল হয়ে ওঠে আমার স্তব্ধ মন। আগাই আমি পিছাই আবার।এগিয়ে গিয়ে পিছিয়ে আসি। কি যেন লিখেছেন তিনি? কি লিখেছেন যেন ভুলে যদি যাই তবে সামনে এগুবো কি করে। আর পড়তে থাকি

– বর্ণময় মেঘ পথরেখায় রেখে যায় সজল সাক্ষ্য। মেঘ আছে বলেই অন্তর্গত ড্যাসবোর্ডে তুমি দেখে নিতে পারো সচিত্র যাত্রাজ্যামিতি। (সংখ্যাপদ্য)

মেঘে ঢুকতে কি থাকে? জটিল জীবন, টোট্যাল গণিত নাকি অংক? আহা-আমার প্রিয় মেঘ। কৌতুহল জেগে ওঠে। দেখিনা মেঘের শেষে কি আছে এখানে!?

– এক কথা জেনে গেছি, আমাদের মৃত্যুর সাথে সংখ্যা তত্ত্বের অবসান নিশ্চিত, প্রজন্মান্তরে তা প্রচারিত হবার কোনো সুযোগ নেই।(সংখ্যাপদ্ম)

মেঘের এমন জ্যামিতিক কিংবা আংকিক বিন্যাস কিংবা কবিতায় মেঘের বিন্যস্ত প্রকরণ আমাকে মুগ্ধ করে। এও সম্ভব? মেঘের মতো স্হুলো – এই ঘন এই ছেড়ে দেয়া আলগা আলগা আকার কিংবা প্রকৃতি কি ভাবে অদ্ভুত মাদকতায় তুলে আনা সম্ভব কবিতায়! তখন নিজের দিকে তাকাই। পাঠের গভীরতা আমার সুগভীর হোক তাতে কি। আমারতো পাঠের সংখ্যা পরিমান কম। তাই বোধ করি অল্পতেই বিষ্ময় জাগে। আমি মেঘে মেঘে কোথায় যে হারাই। আর আমার পরিচালক তখন মেঘের কবি। তার হাতে মেঘ স্টিয়ারিং

– স্কাইট্রেন কিংবা বিমান্এঞ্জিনের ক্রমাগত হুংকারের ভেতর তোমার বাক্যদল ভেসে আসে উন্মাদ মেঘে।(দুর্ভিক্ষদিনে তোমার কৌশিক বস্ত্র)…………………

এই কবিতাটির শুরুটা হয়েছিল দুধকলার গন্ধে প্রিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে। দূভিক্ষদিনে তোমার কৌশিক বস্ত্র যার নাম। খুব ঘোর লাগে। এমন অদ্ভুত ইমেজ আমি আগে কবিতায় দেখিনি। মনে পড়ে জীবনানন্দের ‘তোমার যেখানে সাধ চলে যাও আমি এই বাংলার পাড়ে রয়ে যাব। দেখিব কাঁঠাল পাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে। সন্ধ্যায় শালিখের ডানা হিম হয়ে আসে।’’ কিংবা মাইকেলের সেই হৃদয় মোথিত বিলাপ ‘‘সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে, সতত তোমারি কথা ভাবি এ বিরলে।’’ যেখানে নিজ মাতৃভূমিতে অবস্থান করেই হোক আর দূর পরবাসে বসেই হোক প্রিয় জন্মভূমির ক্ষুদ্র তুচ্ছ দারুণ রূপ কিংবা রূপের বিরহ, প্রিয় স্নেহ স্পর্শের জন্য দারুণ আকুতি কবির মনকে ব্যথিত ভারাক্রান্ত করে তোলে। এখানেও যে প্রিয়ার ছবি আমি দেখেছি সেখানে কখনো একজন মমতাময়ী দেহাতি বাংলার মায়ের মুখচ্ছবি আকার হয়ে ফুটে ওঠে। আবার কখনো দেখি ভালোবেসে প্রিয়তরের জন্য গ্রামবাংলার নারীর আপ্যায়ণের কোমল রূপ। ঘোর লাগে।

-দুর্মূল্য দুধ কলার গন্ধ ভেসে এলে তোমার দিকে তাকাই। মানকচুছত্রের ঔদার্যে শঠি-সোনালু পথে ভেসে আসা স্বাদ ও শব্দের কাছে তুচ্ছ হয়ে পড়ে সিফুড (দূভিক্ষদিনে তোমার কোশিক বস্ত্র যার নাম।)

কি জানি। ঠিক কি যা ভাবছি তা। কিন্তু বার বার পড়বার পর আমার সেটাই কেন মনে হয়! কেন বারবার মা আর প্রিয়ার মুখের আদলে উঁকি দেয় বাংলার অপরূপ সোনা সোনা পথ ফুল?কেন দারুন গন্ধে মেতে ওঠা কচু শাক উঁকি দেয় কবিতা অক্ষর আর মনের ক্যানভাসে? এই বুঝি কবিতার আশক্তি রস আর কবির দারূণ প্রজ্ঞা। একই কথায় তুলে আনা শত শত ভাব। লিখে চলেন তিনি আর পাঠক যতবার পড়ে ততবারই তৈরী হয় এক একটি থিওরী – আ রিয়েলিটি অব রিসেপশন থিওরী!

গাঁয়ের পথে পথে গাছে গাছে ফুটে থাকা সোনালু ফুল।বনের মধ্যে মানকচু কিংবা শঠির সামাহার সব পেছনে ফেলে একদিন বুঝি বিমান নিয়ে এসেছে কারে তার মায়ের আঁচল ছিঁড়ে, প্রিয়ার ভালোবাসার আয়োজন কিংবা স্পর্শের বাইরে। অন্য কোথাও। অন্য কোনো ইপ্সিত নয় তার, যে পৃথিবীতে। কেবল তারই আর্তনাদ শুনি আমি অক্ষরে অক্ষরে বেদনায় বেদনায়।

দৈনন্দিন জীবনের পরতে পরতে ছড়ানো মেঘ লতাকচু দুধ কলা কিংবা সন্তরণরত মাছ তার কবিতায় দারুণ উপজীব্য দেখেছি আমি। মাছ আর জলের সাথে আমার দারুন সখ্য প্রদোষ বেলা থেকেই। বাঁধানো পুকুরে যখন সাঁতার কাটি তখন বয়স ছয় কি সাত। আর সাঁতারের কঠিন নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে যেদিন একটু সময় পেয়েছি তখনই আমি অঞ্জলীতে তুলে নিয়েছি কোমল ছোট ছোট মাছ। কখনো উপুড় হয়ে জলের ছায়ায় নুয়ে পড়া আসমানের নীল রঙের আঁচলে উড়ছে কি ভাসছে কি সাঁতার কাটছে ছোট ছোট মাছ শ্যাওলা পিছল পানিতে ডু্বে থাকা সিঁড়ির ফাঁকে।গভীর বিষ্ময়ে আর সুগভীর মনোনিবেশে দেখেছি তার ছবি। কোনো কোনোদিন যদি না দেখেছি জলের তলে শ্যাওলার আঁচলে ছোট ছোট মাছ তখন গভীর প্রত্যাশায় বসে থেকেছি কখন আসবে প্রিয়সঙ্গ। আজ এত বছর পর দেখি তাঁর কবিতায় ঠিক সেই ইমেজের দারুন শিল্পায়ন। মাছের জন্য আমারই মতো কী যে সুগভীর আর্তি, নিদারুণ সৌন্দর্যের অসহ্য কারুণ্য কেমন বিষন্ন মূক করে তোলে আমার কল্পনার আঙন

-ইভাসকুলার লেক থেকে মাছ উঠে আসবে বলে আমি হিমার্ত প্রভাত থেকে বসে থাকি ধবল বার্চের  নিচে………..মাছেরা জলবক্ষে সাঁতার দিয়ে যায়। আমি অজস্র মাছের ভেতর অনন্ত সৌন্দযের ছায়া দেখি; রক্তের উজ্জ্বলতার জন্য ছায়াকে জরুরি বলে চিনি।(মাছের সৌন্দযছায়া)

প্রিয়তরের স্মৃতি। কিংবা স্মৃতির আস্ফালন কখনো কি বিষন্ন করেনা কারো মন? কখনো কি আন্দোলিত করেনা কারো সুন্দরতার অনুভব!প্রতিনিয়তই করে। যা কিছু হারানো তার সবই সুন্দর। প্রিয় খেলনা, মেলা থেকে কেনা তালপাতার পাখা, কিংবা দূরন্ত বাতাসে তালগাছ থেকে পড়ে যাওয়া খরকুটোয় বোনা বাবুই পাখির ঘর ভালোবাসা মন প্রেমিক প্রেয়সী প্রেম এমনকি বিরহ সবই । যা কিছু হারায়ে গেছে তার ছায়া টেনে টেনে লম্বা করে ধরে রাখি রাতের কার্নিশে আর জেগে থাকি সারারাত দারুণ বেদনায়।  এই বেদনার নাম রোমান্স আর তারই প্রকাশের নাম কবিতা কাব্য – এক আধ্মাতিক সত্য এক অতিন্দ্রিয় মানবিক বোধ অনুভবে যেন আমারই চেতনার প্রচ্ছদ

-আমার শূন্য অন্ধকারে তুমি ফিরে আসো, অর্থাৎ তোমাকে টেনে আনি। প্রলম্বিত অন্ধকারে মেঘকণা আয়না হয়ে ওঠে। আমার জন্য নেমে আসা নক্ষত্রআলো তোমাকে প্রতিফলিত করে-আশ্চয গতিময় প্রতিফলন খুলে দেয় সমস্ত দরজা।(কার্ল প্লেস পার্ক)

প্রিয় স্মৃতি নিয়ে কাটিয়ে দেওয়া অলস বেলা। যতই রক্তাক্ত করুক হৃদয় আমরা সবাই গোপনে চুপিসারে সেই স্মৃতির দরজাটা খুলি। বসি তার সাধনায়। হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির চারণা করি কিছুটা সময়। আর কখনো কি ফিরে পাইনা তাতে জীবনের নতুন গতি? কেউ কি বলতে পারি নিশ্চিত করে?

বিনাশ ও বিন্যাসের অসাধারণ এক রূপ নিয়ে আমার কাছে উদ্ভাসিত হলো কবিতা ‘ট্রোগনের গান।’ মৃত্যু আর জীবন দুইই এ জীবনের প্রধাণ স্বাদ। প্রত্যাশার মাত্রাধিক্য কিংবা প্রত্যাশিত আর উদাসীন প্রত্যাশাবিহীন মানব সত্ত্বার নির্বিরোধ অবস্থান এই কবিতাটিতে দিয়েছে দারুণ প্রাণ। অদ্ভুত এক বোধ জাগিয়ে তোলে আমার চেতনায়। হয়তো আজিবন এই কথাটিই জানতে চেয়েছি। এই কথাটিই বোধের ভেতর ধারণ করতে চেয়েছি কিংবা বলতে চেয়েছি। কিন্তু বলতে পারিনি। ভাষা খুঁজে পাইনি। কিংবা সাজাতে পারিনি তারে অক্ষরে অক্ষরে বেদনায় বেদনায়। কিন্তু ‘ট্রোগনের গান’ এ সে কথাটিই খুব সাধারণভাবে উচ্চারিত হয়েছে

  • জীবিতের জন্য জীবন ও মৃত্যু দুই ই মনোভারের কারণ। (অন্ধকার ও ট্রোগনের গান)

নিজেকে দিয়েই বুঝি কবির এই দারুণ সত্য উচ্চারণ। জীবনের জন্য কি নিদারুন টানা আর পোড়নের দহন কে না জানি আমরা,  এই ভোগী জীবনধারীরা। তবু মৃত্যু ইপ্সিত নয় মানুষের কাছে। তবু আকালের গ্রাসের মতো আমাদের মনোভারে জর্জরিত করে রাখে অবশ্যম্ভাবী একটি শব্দ অবশ্যম্ভাবী একটি সত্য – মৃত্যু। প্রতিটি দিনই কোনো না কোনোভাবে আমরা মনে করি একদিন চলে যেতেই হবে এই বিচিত্র পৃথিবী ছেড়ে। আর তখনই মন জুরে নেমে আসে অপার বেদনা। কেউ কেউ এই বেদনা ধারণ করে চলেন । কেউ কেউ এই বেদনাকে পূঁজি করেন। রচনা করেন অমর কাব্য । খানিকটা জীবনানন্দের কবিতার ঘ্রাণ পাই ট্রোগনের গান পড়তে পড়তে। আসলে জীবনানন্দের কবিতার ঘ্রাণ নয়। এ মানবের চিরকালিন শাশ্বত বেদনার রূপ।একমাত্র অলঙ্ঘনীয় সত্য। যা অন্য সকল ব্যাথা বেদনাকে প্রত্যাহরণ করে তাকেই গভীর করে জীবন দিয়ে চলে মানুষের মনে। চিরায়ত এক অনিবায পতনের দহন। আমি নেই যেখানে আমি ছিলাম যেখানে সেখানে সব কিছু একদিন কেমন হবে? আমি নেই যে পৃথিবীতে সে কতটা কাতর আমারই জন্য? কতটা বিবশ হবে আমার জানালায় প্রতিদিন জেগে থাকা কাঁঠালের পাতা আমারই জন্য? কতটা নিথর হবে রাত্রি আমার শূন্যতায়?কোনো এক মধ্য দুপুরে কতটা বিষন্ন সুরে গেয়ে উঠবে ঘুঘু আর কতটা হাহাকার তারই সাথে ছড়িয়ে পড়বে অন্য আর এক জীবাত্মায়-

  • কৃষ্ণচুড়ার হলুদ পাতার বিষন্ন বৃষ্টি যখন অতিথিভবনের প্রাঙ্গনে নেমে আসে, ট্রোগন গেয়ে ওঠে মেঘরং শূন্যতার গান। স্মৃতির সূক্ষ্ণ আধার একদিন বাতাসে ভেসে। কোনো নিভৃত গৃহে নয়, গৃহহীন অনন্ত শূন্যতার মাঝে শোনা যাবে ক্রন্দন ধ্বনি, দৃশ্যমান হবে অশ্রুজল!পৃথিবী কি বৈপরীত্যের আধার? জীবন সূয ও মৃত্যু তুষার নির্বিরোধ কি? আনন্দ আছে বলে কি অশ্রুপাত?

এই ক্ল্যাসিক প্রশ্নটি আমাকে কত যে রাত জাগিয়ে রাখে। জাগিয়ে রাখে ভাবনাগুলো

  • নির্লিপ্ত যিনি তাকে কেনো কাঁদতে হয়? মৃত্যুপ্রবণ মানুষের সংরাগী হওয়া সাজেনা; আত্মায় জাগিয়ে রাখতে হয় বিনাশ ও আর্তনাদের আইলাস্ফীতি (ট্রোগনের গান)

আত্মায় জাগিয়ে রাখতে হয় বিনাশ ও আর্তনাদ। কি অসাধারণ উপমা। কি দারুণ বিন্যাস মনের অধঃচেতনের। আমি খুব গভীরে চলে যাই কবিতাটি পড়তে পড়তে। কি গভীরে যে দেখি নিজের মুখ! লেখকের মুখ! কি পৃথিবীর মানুষের জটিল মন আর তার মানষ! দেখি জীবনের পরতে পরতে  মানবের মৃত্যু ভাবনা। আমি এসেছি আমি একদিন চলে যাব? আমি চলে যাব তখন আমার সাথে আর যারা যারা আছে কিংবা যা যা আমাকে ঘিরে রয়েছে তারা কেমন হবে? কেমন থাকবে তারা সেদিন? কে কাঁদবে আমার জন্য কে ভাববে সেদিন আমার জন্য। এই আকাশ এই মানুষ এই নদী জল এই কর্মপ্রবাহ এই চির প্রবহমান যাতনা ভীষন সব উপেক্ষা করে চলে মানুষের জীবন। বেদনার চেয়েও ভীষন বেদন কান্নার চেয়েও গভীর কান্না খুঁজে পাই ‘ট্রোগনের গান’ এ। তাই বলি ট্রোগনের সুরে সুরে এই যে কান্নার সুর তা জীবন ভাবনা আর মৃত্যু ভাবনার এক অসাধারণ ডি সেকশন –

স্পর্শানুভূতিহীন জীবন কি মৃত্যু সমান? উৎস ও অনিবাযতার  মধ্যকালে সংবেদনার প্রাকৃত রূপায়ন মানুষের শ্রেষ্ট কীর্তি। প্রাপ্তি চেতনাবাউলকে পূর্ণতার চেয়ে শূন্যতার দিকেই নিয়ত করে চালনা। শূন্যতা ত্বরান্বিত করে মহাশূন্য মৃত্যুর প্রস্তুতি। অন্ধকার মৃত্যুর ধ্বনি তোলে; আলোয় জাগে তার প্রতিধ্বনি । (ট্রোগনের গান)

যে পথ গ্রহণকামী তা দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে ওঠে।… সাদা ও কালো ডনার পাখি শাসনকরে খন্ডিত আকাশ। (কুয়াশা কিংবা ব্রিজ)

দারুণ এক সত্য উঠে আসে কুয়াশা কিংবা ব্রিজ কবিতাটির ভেতরে। গভীর এক যাতনার ভেতর থেকে উঠে আসি আমি তখন। কত কত যে সময় আমি বিভ্রান্ত হয়ে থাকি ঠিক এমনি বিষ্ময়ে। আর খুঁজতে থাকি ক্রমান্বয়ে উত্তরণের পথ। বেঁচে যাওয়ার পথ কিংবা বাঁচিয়ে রাখার পথ। খুব বিপরীতে অবস্থান করি আমি তখন। ভীষন ক্রুদ্ধ আর বিধ্বস্ত থাকি আমি যখন। কিন্তু নিজেরই ভেতর গ্রহণকামী এক মন আবিস্কার করি যখন এই রুদ্ধ ক্রুদ্ধ হত হৃদয় তুচ্ছ আর ক্ষুদ্র এক ঝলক আলোর স্পর্শে দারুণ রূপে পরিবর্তিত হয়ে ওঠে।আর তাই

  • এ কথা ভাবতেই উষ্ণ প্রস্রবণে স্নাত সৃজিতার অনুরোধ প্রতিধ্বনিত হলো। বে-তীরে তার জন্য একটি শিল্পকর্ম হন্যে হয়ে খুঁজছি গতকাল। আজ গভীর বুক পকেটে ভরে নিচ্ছি রেইনবোর শক্তিময় চেতনাচিত্র। (রেইনবো ব্রিজ)

গৌরাঙ্গ মোহান্তর কবিতা পড়তে পড়তে আমি মিশে যাই ডুবে যাই ভেসে যাই কেবলই নিজের ভেতর। যদিও ট্রোগনের গান এর কথাগুলোকে আমার কবিতা বলতে ইচ্ছে করেনা। যদি বলি ‘মনোলগ’ তবু বুঝি ঠিক ঠিক হয়না কিংবা মন ভরে না। কিন্তু পাঠের এ দারুণ তৃপ্তি পূর্ণ করে রাখে পুরোটা পঠন কাল। আর ক্রামন্বয়ে ‍ঋদ্ধ করে তোলে চেতনার প্রান্তরকে হতবাক করে দিয়ে। আমি পাঠক। নিদারুণ এক পাঠক। এত এত বড় বড় লেখককে চিরিকেটে বিশ্লেষণ করা আমার জন্য দুঃসাহস। যোগ্য হলেও হয়তো পারতামনা এ কাজ। কারণ আমার পাঠ আমার ধ্যানের অংশ। আমি পাঠ করি আর মেলাই। পাঠ করি আর পরিভ্রমন করি জীবন থেকে জীবন। ভ্রমন করি একঘেয়েমী থেকে বৈচিত্র। আর তারপর ফিরে আসি নিজেরই আয়নায় যেখানে আমূল বিদ্ধ করে রাখে এই অক্ষর এই সব বাক্য বাণী আমারে চিরকালের ভালোলাগায়।ঠিক তেমনই ট্রোগনের গান আমারে নিয়ে চলে উর্ধ্বতর উন্মার্গ এক আধিদৈবিক সত্ত্বাায়। দেখি নিজের ভেতর অন্য আর এক মানবের রূপ। দেখি অন্যের বেদনায় নিজেরই ক্ষরিত হৃদয়। দেখি আর বেদনায় নিজেরই বেদনায় গভীর প্রশ্রবণ।তাই ট্রোগনের গান পাঠ শেষে গভীর থেকে গভীর হয়ে ওঠে আমার আদিগন্ত বেদনার ভার। সম্মোহিত হয়ে থাকি বেশ কিছুদিন সে কবির লেখায় সে কবিতার কথায় এবং ভরে তুলি পরম আদরে নিজের শূন্য গৃহাঙ্গণ বহুমূল্য সম্পদে। ট্রোগনের গান এই পাঠক জীবনের আর এক সম্পদ।

 

***

 শাপলা সপর্যিতা

শাপলা সপর্যিতা

শাপলা সপর্যিতা। জন্মঃ ৬ অক্টোবর, ১৯৭৪। সিলেট সরকারী পলিটেকনিক কলোনী (সুরমা নদীর পাড়ে)। গ্রামের বাড়ি – সুনাম গঞ্জ। বাবা- মোঃ আব্দুল হক একজন শিক্ষক (সরকারী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট- রিটায়ার্ড)। মা- মোছাঃ আনোয়ারা হক। গৃহিণী। কবি বর্তমানে বাস করছেন ঢাকায়। শিক্ষাঃ বি এ (অনার্স) ১৯৯৪ এবং এম এ (বাংলা) ১৯৯৫ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ এই পৃথিবী এই দেশে (১৯৯১); নিভৃত পরবাস (২০০৮)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E