৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ফেব্রু ২৫২০১৭
 
 ২৫/০২/২০১৭  Posted by
শামীম রেজা

শামীম রেজা

শামীম রেজা
যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে

এক

এমন পাগলা বয়স, ঘুমরাত্তিরে মাটির বাঁশিবুকে ঘুমাইতে পারি না, পাপ স্পর্শ করে না চোখের পাতা- পানশালায় সাতাইশ বছর পইড়া আছি, বেহায়া বাতাস পিছন ছাড়ে না- অনুভূতির রহস্য আছড়ে পড়ে বুকে, দুঃখের দেয়ালে ধাক্কা মারে-; পৃথিবীর বুকে ঘুট-ঘুটে আন্ধার নিয়া অনিচ্ছায় শুইয়া থাকি কত কত বছর; চোখের লাই ভাঙে না- পুঁথির গয়না পরি সাঁঝবেলায়, শামুকের ভিতর দীঘির ঢেউ গুণি-; ইন্দ্রপাশা গ্রামের মেলায় পাশা শিকারীদের সঙ্গে পাশা-পাশা খেলি, ঘুম আসে না; ধূলামাখা চাকতির মতো শবরীর স্তন, সবই কলকব্জা মনে হয়, ছেউড়িয়ার ঘাটে সিকিচাঁদ পইড়া থাকে দীঘল দৃষ্টির আড়ালে- এসব আমার চোক্ষে ধরে না। ময়নামতির বৃক্ষ-ডালে মধুরাত্তিরে, জলপ্রণয়ী পাখিসাঁতারও ভালো লাগে না; লাঙলের ঘষা খাওয়া রেখাহীন হাত দেইখা-দেইখা মানুষ-জন্ম ভুইলা যাই, আদি-আদিম- একই ঘৃণা কামশ্বাস- কোথাও ভালোবাসা নাই। পদ্মা-সুরমা-কুশিয়ারা-আগুনমুহা কত কত নদী নাম বুকে বাজে না, ঘুম আসে না; একবার কমলদহে প্রিয়তমার শরীর দাহ হলে কমলারঙের আগুন ছড়ায়েছিল পূর্ণতোয়ার জলে; আর আমি সেইদিন থেইকা সাঁতার কাটছি আগুন-জলের ভিতর, তাতেও মৃত্যু আসে না।
এমন পৃথিবীতে ঘুম আসে না- মৃত্যু আসে না।

৭ মাঘ ১৪১০
২০ জানুয়ারি ২০০৪

দুই

যখন রাত্তির নাইমা আসে মনের গভীরে আমার, শুকতারা গাঁইথা থাকে আকাশের ঘরে, তুমিও তেমনি বাঁইধা থাকো মনের অন্দরে; আর আমি শুঁড়িখানার ঠিকানা-হারানো বালক, নিজেরে খুঁইজা মরি কোনো এক অজানা খাঁচায়।
যে আমি প্রলয় ছাড়া লড়তে জানি না, বানের জলকে বাগ মানানোই যার স্বভাব, পূর্বপুরুষের আর্তনাদ খাবি খায় বরফ-দেয়ালে-পশ্চিমে; অন্যদের বদলে দেয়ার যাদুকথা শোনানোই যে-আমার কাজ; ক্ষুধার্ত ডোমের চোখে শ্মশানের আগুনে হোলিখেলা দেখতে দেখাও পণ্যমানুষের কলজে ছিঁইড়া ফ্যালানোই আমার আদর্শ, সেই আমি হাওয়ারে সাথী আর নদীরে বাহন কইরা একদিন রাইতে শয্যাবাহারী জোছনায় অজান্তে দিয়াছি সাঁতার! একটি চূড়ান্ত অপেক্ষার পর এইরহম পরিবর্তন হয় বুঝি সবার? সব হলুদ পাতারা ক্যামন সবুজ হাসে দিবালোকে, সব অনুভূতিই প্রথম-প্রথম, যেন এক নতুন শৈশব।
যখন রাত্তির নাইমা আসে মনের গভীরে আমার, তুমি বিন্ধা থাকো হৃৎপিণ্ডের চলমান রক্তের ভাঁজে; আর আমি থমথমে জলে বাইন্দা-রাখা নক্ষত্র আর তারাদের ছবি মুক্ত কইরা দেই হাত-ইশারায়; মধুগন্ধা জোছনা আমারে ডাকে, তারা ভোর নামাতে চায় আর শুকতারা গাঁইথা থাকে আকাশের গায়, আমি হাত বাড়াইলেই কাছে আসে- দূরে চইলা যায়, আসলে সে কোথায় লুকায়, শুঁড়িখানার ঠিকানা জানি না বইলা পথ হারাই। বলো তোমায়, কীভাবে স্বপন দেখাই।

৩০ শ্রাবণ ১৪১১
১৪ আগস্ট ২০০৪

তিন

যখন রাত্তির নাইমা আসে উলঙ্গ সবুজ দ্বীপের শরীরে, ভয়ানক কাইপা উঠি আমি, যেন ঝড়ে-পড়া সারস-শাবক। মৃত্যুর শীতল শিস বইয়া যায় ভিতরে আমার। আর দোয়েলা তুই পবিত্র পুরোহিতের মতন নির্বিকার তাকাও; এ কী দেখি ঢ্যালা উপড়ানো শাদা চোখ!

তোর ঝলসানো চোখে অনুভূতির আংটা আগুন দেখে না কেউ, দেখে শুধু হাজার বছরের অন্ধকার ঢেউ, মরণ যেথায় থির হইয়া আছে বরফ রাত্তির দেয়ালে, ঘুমন্ত নদী হেথায় কাঁইপা ওঠে মধুর আস্বাদে আর তারা ত্রুর হাসি হাসে গ্রহস্নান শেষে দুর্গম বনে।

যখন রাত্তির নাইমা আসে হাজার বছরের ক্লেদ কোলে মেখে, পৃথিবীর কোলাহল থাইমা যায় হাড়ভাঙা কৃষকের নিভন্ত চোখে, ক্ষিপ্র চিতার থাবা গুড়ি গুড়ি নক্ষত্র ছেটানো আলোয়, তোর শরীরে স্পষ্ট হয়। মৃত মুনিয়ার দেহে সমস্ত সমুদ্রজল ভর করে জোয়ার নামাইতে চায় মরা জোছনায়। আর সবাই যখন মৃত দ্বীপ ভেবে রাইখা যায় প্রাচীন পৃথিবীর অপার শাখায়, তখন  আমি চিনতে পারি প্রিয়তমা দোয়েলারে, আত্মার জোছনায় জ্বইলা ওঠে সে,  বেহুলার চোখে সুবর্ণ নদীটার ধারে।

চার

যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণ নদীটার ধারে, অন্ধপাখির পাখনায় ভর করে সোনালু আগুন আইসা ঝইরা পড়ে কার অন্তরে? পোখর্ণার রাজার করুণ প্রাসাদের কথা মনে পইড়া যায়, কেন মনে পড়ে? নিসর্গের হেঁয়ালি বিছ্নায় একরাশ পরগাছা ঘাস-গ্রহের মনীষা গিইলা গিইলা খায় নিশিরহীন প্রভাত-বেলায়। আর সম্রাজ্ঞীর মেয়ে কোনো এক ক্ষৌরকার নাগরের পিরিতে ভাইসা অদ্ভুত ঈশ্বরের জন্ম দেয় সাইবার পৃথিবীতে। বিদীর্ণ সময়ে পড়ন্ত জোছনার হাটে আবারো খুঁইজা ফিরি তারে। খুনীদের পরকীয়া প্রণয়ের আড়ালে-ও দোয়েলা প্রতিকূল বাতাসের আঘাতে, কেনো এমন কইরা দু’হাত বাড়াও। প্রতিভা-প্রণয়ী দোয়েলা আমার, কুষ্ঠরোগের ছোঁয়াচে ঘায়ে পঙ্গু কইরাছে তোমায়, ক্ষমতার দুপুরে মক্ষিকার শরীরের মত বিষাক্ত করেছে ভোগে; তারপরও অন্তহীন ধৈর্যে জাইগা ওঠো নতুন স্নান শ্যাষে প্রতিমার বেশে, যে-পাড়ে আমি দাঁড়ায়ে রাত্রি করেছি পান, সেইপাড়ে, সুবর্ণ নদীটার ধারে।

পাঁচ

যখন রাত্তির নাইমা আসে জলপদ্মের পাতার উপরে, আমাদের আদিম পৃথিবীতে হাইপার রিয়ালিটি নামে। গুনাগার বান্দার খোঁজে ফেরেস্তা আইসা তোমার নাভিমূলে হেঁয়ালি কপোতীর ঘ্রাণে মুখ গুঁজে, কামরাঙার কামাতুর ঠোঁটে তুমি ভাবনার অণু বিছায়ে উইড়া আসো আমার ভিতরে। রূপবানের সোমত্ত যৈবন লইয়া ক্যামনে শৃঙ্খলিত আছিলা আহা, খোজাদের ভিড়ে! তোমার মৃগনাভির অনন্ত উপকূলে  কারে দেছো সাহস ভাঙনের, ঢেউ কুড়ানোর? বয়সী বেশ্যার মতো পাহারা দিছে তারা এতো এতো বছর, তবুও ফুরায়নি কৃষিচোখ যৈবনের অমৃত আঙুর তোমার। আহারে দোয়েলা পরানি আমার। মহাকালের সন্তান বুকে কইরা সৃজনের ঘরে দিয়াছো উড়াল। চারিদিকে অনন্ত কনভয়, কুরু-বর্ষ আসে কুরু-বর্ষ যায়, তারপরও তোমার মাটির টানে রাত্রি আর দিনে মৃতদের ঘুম ভাইঙা নতুন নতুন নদীর জন্ম হয়।

২ নভেম্বর ২০০৪
১৮ কার্তিক ১৪১১
ধানমণ্ডি

ছয়

যখন রাত্তির নাইমা আসে জ্বীনগাছের শিকড় ছায়ায়, সন্ধ্যাতারা ডোবে, শুকতারার মতন তুই কথা কও শিয়রের শিশুটির সাথে, উজাগরি রাত্তিরের খোঁপায় দেখি উপনিবেশ-ক্ষত শুইয়া আছে রক্তের ভিতরে, এখনো চিবায় শুধু, চিবাতে থাকে। চারিদিকে পাখিদের কান্নায় দোলনচাঁপার কামুক ঘ্রাণ বন্ধ হইয়া আসে; তারপরও রাজহাঁসের কলরবে আউশের ক্ষেত রূপসাগরের পাড়ে অপরূপ দৃশ্য হয়া নামে দোয়েলা নদীর ধারে।

নতুন শহরের বুকে যখন রাত্তির নাইমা আসে তখন গেঁয়োপথ আর নদীটারে কে মনে রাখে? নকল নগরে আইসা বারবালিকার হাতে সুরা পান শেষে দেখি পরিচিত মুখ তার, ফ্যাশনে মোড়ানো এ কার চিবুক, চিনি-চিনি আসলে যে চিনিনারে, সেও হাসে আমিও হাসি কৃত্রিম প্রেমের জোরে; টপলেস ক্লাবে গিয়া আবারো তাড়ি গিলি সাজানো আবেগে; একি দেখি চোখে? তুমি কেনো ভাসো, রঙিন গ্লাসের বুকে, দোয়েলা নদীর পাড়ে, শাসনের চোখে তুমি আছো দাঁড়ায়ে, সতীবতীর মতো অনন্ত সময় ধরে, বাংলায়।

সাত

যখন রাত্তির নাইমা আসে শিলিগুড়ি পাহাড়ের ধারে, উৎসবহীন ঈদ নামে আমাদের নগরে, সেই একবার কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে হাঁটতে গিয়া মনে হইছিল খুব সুরত আমার পৃথিবীর, এমন সুন্দার বুঝি আমাগোরে ডাকে। আর একবার মঙ্গার বাড়ি গিয়া অনাহারী দুইশো একটা লাশ দাফনের কালে কাফনের মইধ্যে খুঁজে পায়াছিলাম বীভৎস সুন্দরেরে; ঠিক তার পরের বছর গাইয়া-গাইয়া চেহারা লইয়া জীবনবাবু আইসা দাঁড়ায়ে ছিলেন মৃতপ্রায় ধানসিড়ি নদীটার ধারে, যখন কি-না লাবণ্যরা হারাইতে থাকে দূর ক্যাসিনোর জিপসি আঁধারে। চে’র ছবি আঁকা খণ্ডিত মুখ বুকে আঁইকা তরুণী হাঁইটা যায় টিভির পর্দায় কিংবা আজিজ সুপারে, উরুসন্ধিতে চিচিঙ্গার ঘ্রাণ। ডাক দিয়া বলি জীবনবাবুরে, আহাজারি করো না, তোমার বনলতা সেন নাটোরের কোথাও থাকে না। দেখে যাও এই যে তোমার প্রিয়তমা রূপসীয়া গ্রাম! মাধুরী আর নাদিয়াদের এই বালাখানা, এখানে অঘ্রানে বালাম ধান ওঠে না, অর্ধেক লোক থাকে অনাহারে আর আমরা বেজোড় প্রতিবেশী-কতক থাকি বাটাজোড়ে।

আট

যখন রাত্তির নাইমা আসে আদিম হেতাল বনের আঁধারে, আমি চাইয়া দেখি ঘনিষ্ঠ বারিন্দা থেইকা চিরচেনা জানালার একপাট কপাট উইড়া যায় অচেনা গ্রহে, আসলে কি জানালার কপাট ওড়ে? নাকি মনসাগন্ধী শরীর তোমার, যে তুমি বলছিলা আমারে নিলা না তুমি অচিন খেয়ায়? বুঝবা একদিন, রাত্তির-শয্যা চুইয়া চুইয়া যহন রক্ত ঝরবে তোমার চড়ায়, চাইলেও আসবে না ঘুম পৃথিবীর কোন দাওয়ায়। আহারে আমি বুঝি নাই! আজ পুরাকীর্তির নাহান ভাঙা জানালা যেই সারাতে যাই আর মায়াবী তাওয়ায় তোমার শরীর মৃগ-কমল ঘ্রাণে দুইলা ওঠে; ছুটতে থাকি বিশ্ব-সংসার-সকল নরক ভুইলা পাল তোলা গায়েবি হাওয়ায়, পরে বুঝি এ যে হননের পথ, খুব সহজ-সরল। এত সহজে মইরা গিয়া কীভাবে সবাইরে বাঁচাই, এও জানি সেইদিন থেইকা আজ অবধি আমার ঘুম নাই, তবু তিন ফসলা জমিনে সঙ্গম শ্যাষে আমার ফসল আমারই চাই, আমার নারীর ভাগ দেবো না, এরপর চিরঘুম ঘুমাইতে চাই।

নয়

এই জনপদে তুই ছাড়া আর কোনো নদী নাই ও কুমারী নদী দোয়েলা আমার, তুই কি জানো তোর চোখে ঘুমায় বৃষ্টিমাসী সকাল, ইমনরাগে সন্ধ্যা জাগে কণ্ঠে তোমার। আর আমি দুইলা উঠি অন্ধ জোছনায়। দুধালি লতায় আলোর বর্ষণ হলে তোর চুলগুলা আকাশের নাহান খোলে। তোর মধু আলতা শরীরের ভাঁজে জোছনা উঁকিঝুঁকি মারে রাত্তির-শাখায়। বুনো ঝোপ থেইকা বয়ে আসা দোয়েলা আমার, জান তো এই সমতলে জন্মে না দ্রাক্ষার ফুল কিংবা ন্যাংটা আঙুর। যখন রাত্তির নাইমা আসে তোর নিদ্রাতুর ঠোঁটে তখন খরার মেলা-বহে, জোর কইরা জরায়ু কাইটা দিছে তোর, তুই তো জানিস এই ফসলি জমিনে পাখির বিষ্ঠায়ও বৃক্ষ জন্মায়। তোর শুকনো ত্রিকোণ যোনিতে জল ছাড়াও ঋতু আসে ঘোটকীর লাফে-পাখির ডানায়। এইসব দেইখা, আগুন-লিপিতে নিজেকে আঁকি ঊষর সময়, মাঝে মাঝে মনে হয় তিন-ফসলা জমির শরীর লইয়া আড়াইশ’ বছর, ফাঁসির সেলের ভিতর পইড়া আছি নিঃসঙ্গ-একা।

১১ আশ্বিন ১৪১১
২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৪

দশ

যখন রাত্তির নাইমা আসে হাড়গুঁজি পাতার কাঁটায়, আঁতুড় বংশীয় আমরা কেউ কেউ গুঁজাবকের ঠোঁটে বুইছামাছ হয়া লইড়া যাই মৃত্যুর ধাঁধায়। চিৎকার কইরা যতবার মাকে ডাকি ততবার দগ্ধ-ছেঁড়া একখানা কণ্ঠহীন মুখ দেইখা আঁতকে উঠি, আমার মুখ থেইকা শব্দের বদলে বমির মতন কী যেন ফেনা ফেনা বাইর হয়, ওইবার শেষবারের মতন আত্মহত্যা করছিলাম, আমার কোনো স্মৃতি নাই, পূর্বপুরুষের গানগুলা মনে পড়ে না, এমন মৃত্যুপুরীতে জলপরীদের জলীয় জালে ঝুইলা আছি ঝুলবারান্দায়। পরীবৃষ্টি শ্যাষে দেখি সেলাইকলে বাঁইধা রাখা গারমেনস মাইয়া গুলার কিশোরী-শরীর লইয়া ভেজা উঠানে অনুভূতিহীন খেলা চলে, তাদের লাগাতর বইশ্যার দিন যায়, স্বপ্নের উপকূল ভাইঙা বইন্নার জল ঢোকে, বুড়বুড়-ওঠা মনের বীজে পচন লাগে, কোকিলের সুর কাকের কণ্ঠে বাজে কথিত মুক্ত হাওয়ায়; কুহুতলায় শৃগাল গলা সাধতে থাকলে আদমসুরাতের দিকে তাকাইয়া ভুইলা যাই ভাঙনের হগল পদাবলী, ডাহুকি স্বভাবের এই তুমি বাংলা আমার, তোমার মনের নাগাল পাইলে আমি আটকে-থাকা খোপ ভাইঙা শ্মশান-শয্যা ছাইড়া হানিফার বেশে একবার দিমু উড়াল, অজন্তাগুহা থেইকা নৃত্যরত মৃগবধূয়ার মতন তুমি সঙ্গী হবে আমার আর তখন বলেশ্বরী নদীতে ঈশ্বর নেমে আসবেন খালিপায়ে, হাতে সবুজের ঘ্রাণ-পাশে হাসবে মুক্ত সুবর্ণগ্রাম।

৪ অগ্রহায়ণ ১৪১১
১৮ নভেম্বর ২০০৪

এগার

অতঃপর বোধের আগুনে ছন্দ ভুইলা শৃঙ্খলের শিকল পইরা শাপভ্রষ্টা দেবীকার রূপে, তোমাদের নাচমহলে কাটছি সাঁতার। কণ্ঠে আমার খাসিয়া রমণীর গান, গতরে জুলুদের জংলাপ্রাণ, তৃষ্ণার্ত আমি কাটাখালি খালের হোতায় নাইমা দেখি আন্ধার তুফান। পাশে হরিণঘাটার চর-হরিণীরা নাই, মৃত কায়া হাঁটে দিনভর। আরো তৃষ্ণা জাগে মনে অদৃশ্য ও দৃশ্যের জ্ঞাতারে খুঁজতে গিয়া ছেউড়িয়ার ছাপড়া ছাউনিতে এ কারে দেখি? গাইছে অন্তিম গান, গানের তোড়ে সকাল নাইমা আহে ঢলের নাহান। অমন পুঁজ পচা ক্ষত ফিরিঙ্গি আর বর্গীদের বৈরী হাওয়া যেথায় অবিরত, এর মাঝে এ কোন মানব কীভাবে পাইছে ভোরের সন্ধান! দেখি তারারা পায়ের নিচে তার, তারারা লজ্জা পায় আবার। পাথরচাপা হলুদ ঘাস, সবুজ হাসে এ কোন জাদুর নির্যাস। তারারা উজ্জ্বল আলোতে ভাসে, তারারা অনন্ত গান গায়; আহা! বৃহৎগ্রহ ডিগবাজি খায় তার হাতের রেখায়। সেইদিন থেইকা হরি ছাড়ি আল্লাহ ছাড়ি মানুষ ভজি হায়! আর নয় জীবনের লগে অভিনয়, নিজেরে চিনি না বইলা আন্দার রাত্তির নামে আমার প্রণয়।

৫ অগ্রহায়ণ ১৪১১
১৯ নভেম্বর ২০০৪

বারো

গুলাই খেলার গতে সমুদ্রের সীমানা কুড়াই, ডুবুরি-চোখে দেহি চিরচেনা ক্ষত, এখানে রাত্তির নামে তথাগত; এ-যে তোমার কুমারীয়া শরীর বিয়ানের আগে প্রসব বেদনায় পড়শীরা জাগে অবিরত। সাঁওতাল পরগনায় যাই, একই চেহারা আমরাই খায়া ফেলি তাদের তৈয়ারি ক্ষ্যাতের খিরাই! এখানে কলাবতী পাড় পরা কুমারী মেয়েটারে কেউ খোঁজে না আবার, আর্তনাদ ওঠে-ওঠে কলঙ্কের ঢেউ, রাখিগ্রহ রাত্তিরে শিকার হয়েছে বাংলার মত সে-ও, সেই থেকে আমি শিশুর চেহারায় ভাসি, হামাগুড়ি মেঘে গুঁড়ি-গুঁড়ি ছায়ায়, গুনাই আর হোসেন পালা এখন আর হয় না আমাদের গাঁয়। জীবন বাবু চাইলেও ছিন্ন খঞ্জনার মত পারবে না বেহুলারে নাচাইতে ইন্দ্রের  সভায়। নদী-মাঠ-ভাঁটফুল ঘুঙুর হইয়া গড়াইবে না তার পায়, সকল খাইয়া ফ্যালছে সময়ের ঘোড়ায়। বুঝি না অনেক কিছুই আমরা কেউ কেউ, চাই না তাই শৃঙ্খলিত স্বর্গের ঢেউ, তোমার কুমারীয়া মনে ভাসতে চাই, গোপনে-প্রকাশে মুক্ত হাওয়ায়, সমুদ্রের সীমানা কুড়ামু যার শরীরের খেওয়ায়।

৬ অগ্রহায়ণ ১৪১১
২০ নভেম্বর ২০০৪

তের

দীর্ঘ রাত্তির নাইমা আসলে তুমি গাঁইথা থাকো পতঙ্গ শিকারী ফুলের লালায়। এইসব দেইখা পোষা কৈতরগুলা উইড়া গেছিল সেদিন সন্ধ্যায়; তারা আর ফিরা যাই নায় খোপে। বনি ইসরাইলিরা নাই কিংবা ফারাও শাসক, গোরখোদকরা খাইয়া গেছে সময়। মনিপুরী মনের দোহাই, এতদিনে জাইনা গেছি কৈতরগুলার জন্যি খালি খোপ হয়া বইসা আছি, শূন্যতায়, আসলে শূন্যতা জিয়াই। বেগানা নারীর চুমু ছাড়া হায়াত বাড়ে না, একথাও এতদিন ছিল নদীর চড়ায়। জানায়েছে সব প্রাণী যূথবদ্ধ প্রণয়িনীগণ, মাংসের ভেতর মাংসের অমৃত স্বাদ নিতে প্রাণীকূল হয় না কৃপণ। শিকারীর লালায় থমকে যাইয়া হলো না সৃজন শুধু তোমার শরীর, ও হে যুবতী তুমি কারে খোঁজো, সৈকতে ফিইরা আসা ঢেউয়ের নাহান; জানো না, আমি যে উজানী নদ, নিজেরে ভাঙি ভাঙারির হাতে, নতুন সৃষ্টি নেশায়।

চৌদ্দ

যুবতী মাংসের ঘ্রাণ গইলা গইলা মিশে পশ্চিমী হাওয়ায় রেটিনার পিছে তার ছায়া আঁইকা রাখি-অনিদ্রা পাইলে স্মৃতিও ঝরে প্রতারণায়, আসলে সে দাঁড়ায়া ছিল ছায়াপথ থেইকা কিছু দূরে মনকড়ালি পাখির ডানায়, তখন বাতাস কেমন জানি ভারি হয়া চুমু খায় রাত্তির কপোলে, মৃত পাখিদের অনন্ত সুর বাইজা চলে পাখিহীন বৃক্ষ-পাড়ায়। এসব কথা হয়তো সে বইলাছিল কিংবা বলেনি আমায়, প্রথম রতির কালে ত্বকছেঁড়া ভয় নারীর বিস্ময়, ভয়ার্ত-সুন্দরম; ভালোবাসা আছিল কি-না, জানে শুধু ত্বকের শ্রবণ, এমন স্পর্শ বেদনা-স্মৃতি শুরুর তারে সকলে বাইন্দা রাখে এ যে চূড়ান্ত মধুর-গোপন। আর এই তোমার শুরুর তার ছিঁইড়া তারা ঘটাইছে আলোড়ন, ওটাই তাদের রেনেসাঁ, হায়! আমাগো দুরারোগ্য-মরণ, সেই থেইকা দিবাকালে রাত্তির জাইগা আছে মৃত জোছনার মতন।

১৬ অগ্রহায়ণ ১৪১১
৩০ নভেম্বর ২০০৪

পনের

যখন রাত্তির নাইমা আসে জংলাপাখির ঝরা পালকের লোমকূপে, রুক্ষ বনের খেয়ালী একটা বৃক্ষ হাঁইটা যায় দূর চন্দ্রালোকে, সেখানে স্নান শ্যাষে বৃক্ষ আর জংলাপাখি ঘর বান্দে, ফেরে না ক্ষয়িত বনের রুদ্ধ আঁধারে। চিরতার মতো স্বাদ যে রাতের, যেখানে চিৎ হয়া পুইড়া যাচ্ছে রাতের উনুন নিরীহ পানির আগুনে, সেখানে পাখি ও বৃক্ষের নম্রসোঁদা দীর্ঘশ্বাস ঘুইরা ঘুইরা পাক খায় রাত্তির দেয়ালে; রাতের আন্দারমুখে স্বর্গবাড়ির রক্ষক হাড়ঝিরঝির প্রাণে কাঁদে, এসব দেইখা বৃক্ষ আর পক্ষিকুল চইলা যেতে থাকে, কাঁচপোকার আবেশে ঘুমন্ত বন ঘুমায় গভীর ঘুমে, এই ফাঁকে বনের পাশের চন্দনা নদীটাও নিলামে উঠলে অভিজাত তালিকার চন্দনকাঠ নদীটার সঙ্গে চইলা যায়, শাল-সেগুন আর ফলমূলেরা আগেই গিয়াছে একে-একে, ঈশ্বরে বিশ্বাস নাই তবু বাতাসকে ঈশ্বরের ভ্রাতা ভেবে, এই ঈশ্বরীকেও ধার করে বাঁচতে হবে জাইনা, বনের দোচোয়ানি ঘোরে, অর্ধমৃত প্রাণিকুল বাদে অন্যরা সবাই চইলা যেতে থাকে অনিচ্ছায়, তৃতীয় আসমানের খোঁজে; আর আমি ঘুমহীন প্রাণী, উৎকণ্ঠার স্নানে পীড়িত হয়া বইসা আছি, পক্ষাঘাতগ্রস্ত বালিকার দৃশ্যহীন চাহনীর মাঝে।

১৯ অগ্রহায়ণ ১৪১১
০৩ ডিসেম্বর ২০০৪

ষোল

অজন্তায় আঁকা হরিণীর দৃষ্টিতে যে বীজ উপ্ত ছিল, সেই বীজের শিরার টান লাইগা ছিল রাঢ়-বঙ্গ কিংবা পুণ্ড্র জনপদে, বীজের ভেতর ক্ষিপ্র জোয়ার-নতুন সম্ভাবনা; বায়ানায় খুঁইড়া পাওয়া প্রস্তুরীভূত প্রত্নমেয়ে এখনো দাঁড়ায়ে আছে, অজয়া নদী তীরে গোপনে, আমাদের অতীত বইলা কিছু নাই জেনে, হতাশায়, নেশার নিপলে নাইচা ছিলা মেয়ে-অমরাবতীর প্রাণ, ছাইড়া আসা শরীরের খোঁজে এমন রাত্তিরে তার বুকে মুখ গুইজা কাঁদো ক্যান-তুই, বলেছিল সে? কেন ফেরো পিছনে, অতীতরে খুঁজতে গিয়া নিজেই হয়াছো অতীত; হেমন্তের ভাঙা মেলায় মাতৃগর্ভ-মাতৃঋণ-মাতৃভজনার যত ছবি আঁকা হয়, এ-তোমার-এ-তোমারই নিশ্চয়। ভালোবাসা উচ্চারণে ঘৃণা হয়, ময়লা ধরাইছে প্রাচ্যের সময়ে, তুমি প্রত্নমেয়ে হয়া পইড়া আছো কোন এক রাজবংশীর খড়ের ডেরায়। বীজের অঙ্কুর বনসাই হয়া আছে, তারপরও কোন এক শিল্পী দুরন্ত তুলিতে প্রতিদিন আঁইকা যায় নতুন বীজ বর্তমান অজন্তায়।

২০ অগ্রহায়ণ ১৪১১
৪ ডিসেম্বর ২০০৪

সতেরো

মৃত নগরের ছবি বেনামী চিঠির খামে ভাইসা আসে অদৃশ্য রাত্রির উড়ন্ত পেখমে, গ্রীষ্ম নামে চন্দ্রবোড়া সাপের ফণায়, ছেলানো নেড়ি কুত্তা কিংবা কাকেদের গণসংবর্ধনা শ্যাষে নেতা নামেন ঘুমের ভাষাবিজ্ঞান হাতে, তন্দ্রা পাহাড়ের উপতলে। জুয়াড়ীর বোর্ডে তাসের মতন আমরা ঘুম সঙ্গীত গাই-হিংস্র পশুর রোমশ বুকে মাথা রাইখা কে কবে ঘুমাইছে, ঘুমায়; নর্তকীর মুদ্রার তালে দেহ নেভে জ্বলে, আসলে কি দেহ আছে, দেহ নাই। চন্দ্রবোড়ার গতর ফুইশা কোন চান ডাকে আমাগোরে, এমন গ্রীষ্মরাতে? আন্দার ঠেলি যত, ভালোবাসা পিছাইয়া যায়, ভালোবাসাও নাই তথাগত। মুর্শিদি মদির রাইত নাই, বাংলার অন্তঃপুরে ধুতরার চাষ। পুঁজ রঙের নাহান ঝরে সব; অন্ধ গলিতে তার ছেঁড়া দোতরার বর্ণহীন সুর এখানে ধূলায় গড়ায় সাধারণ মানুষের শব। অচল আধুলির দামে আমাদের অন্তঃপুরে বৈধব্য-সন্ধ্যা নামে, গুমোট হাওয়া, চিমনির ধোঁয়া-ভরা রাত নীরব পাঁচালি লেখে ইটের ভাটায়।

আঠারো

সকাল আমার আন্ধারমুহি রাত্তিরে গড়ায়, রৌদ্র নিভে গিয়ে সে-যে আঁধারে মিলায়, ঝলসে যাওয়া আগুন আমার বর্ষারে ডরায়, আষাঢ় মাইসা এমন দিনেও পানি পাওয়া দায়, ও দয়াল তোমার দেখা পাবো কোথায়। দয়াল তুমি মুর্শিদ আমার পাহাড়পুরী মেয়ে, চন্দ্রাবতী রূপ যে তোমার শুকতারারও চেয়ে, বুকে তোমার দুধালনদী নদীমার এই দেশে, তারপরেও না খেয়ে রই দুর্গতের বেশে, সকাল আমার আন্ধারমুহি রাত্তিরে গড়ায় ঝাঁঝরা বাতাস ঝলসে দিয়ে নীরবে দাঁড়ায়, ভালোবাসার মাইয়া মানুষ অন্য গীত যে গায়, ছুঁতে গেলে সে যে আমায় সাপ খেলা দেখায়; ও মুর্শিদ, তোমার দেখা মিলবে কোথায়?

২২ আষাঢ় ১৪১১

উনিশ

যখন রাত্তির নাইমা আসে আমাদের নীলাচল পাহাড়ে, তারাবাড়ি কথা বলে ইলোরা জোছনায়, তুই দোয়েলা বরফ আগুনে পুইড়া মরো সাধনার ফেরে, জোড়াহীন দোয়েলা আমার, সাধনা জানো না বলে তলিয়ে যাচ্ছো ঘুমনদী-জলে।

আহারে দোয়েলা মা-মাটি আমার, কান্নারেণু থেইকা পরদেশী গন্ধ-ঘাম এখনো ঝরে, জাউরা হাওয়া প্রলয় নৃত্য করে করোটি আর রক্তের ভিতরে। এতটা বছর দাসের মতন লীলা মাতমে নিজেরে করেছো দান শাদা শকুনের মখমলে। অন্ধ ঢেউয়ের ছায়ায় যে তুমি মৃত ইচ্ছাগুলা খনন করেছো আজ, তার দিকে সুপ্ত আগুন গুমরিয়া মরে, পিপাসায় শুকায় আপনার সমুদ্রতল; আকাক্সক্ষার দ্যাশে গিয়া ককেসাসের নির্জন চূড়া ধইরা আর্তনাদ করি, জিউসের ঈগল আসে না, প্রমিথিউসও না; যকৃত ছিইড়া খায় নতুন ঈগল, পুড়তে চাই, পোড়ে না- তৃষ্ণা মেটে না যার আরব সাগরের সমস্ত জলে, সেই আমি সন্ধায় গোধূলিরে পাখির ডানায় বাইন্ধা তারাদের স্নান শেষে- দিয়াছি উড়াল, স্বপ্নসমুদ্র দেশে; আশ্চর্য বীরের বেশে।

বিশ

আহারে! দোয়েলা; রাত্তির আমার, একলা পরান! কার ভিডায় কান্দো নরমকণ্ঠী পাখি, কার প্রশ্রয়ে ভিজাও মন, কার ঠোঁটে কাঁপে অনুভূতির প্রথম চুম্বন, কোথায় তোর বাউড়িয়া গাঁ, খাডালের ছিট ছিট জোছনা-রৌদ্রে কীরহম তোর চলাফেরা মনে পড়ে, মনে পড়ে না? কৈশোরের বেশ কিছু দিন পর, তোর সাথে বাইন্ধা ছিলাম ঘর, সাক্ষী ছিল হাওর-বাঁওড় আর দেবীঘাটার চর, আরো ছিল ম্যাগলাকাটা আকাশ; হেদিন কুলহারানো হাওয়া; এরপর, কতবার সুশীল পাটিনীর খেওয়া কত্ত কত্ত বার হয়েছি পাড়, তহন ঢেউয়ে ঢেউয়ে জাইগাছি তোর বুকের ভিতর, এহন তুই ক্যামন আছো, কোনহানে তোর বাস, রোদ-পোহানো পাখির নাহান নিভৃতে কি যাস? বেইন্নাবেলা এখনও কি দক্ষিণ দুয়ার খোলো, পারাভাঙা ধানের বীজে মন কি তোর করে এলোমেলো, দুপারকালে ঘুঘুর ডাহে কাঁপে যহন হোগলপাতার ঘর, ভাডারটানে দেখো কি তুই নারাকুডার খর, বাইচা নাওয়ের ভাঙাগুরা পইরা রইছে সব, ও দোয়েলা? তোর মতোই সব একেলা পদ্মাতেও জাইগা গেছে বিশাল বিশাল চর; সব নদীরই এমনই হাল বেপরোয়া দেশ, অদূরকালে পানির অভাব, বিষাক্ত শ্বাস! কী কমু মুই, চাইয়া দেহি নিমের গাছ কাইটা সবাই বাঁচায় পরিবেশ!

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E