৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ২৯২০১৬
 
 ২৯/১১/২০১৬  Posted by

গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতার ছায়াশরীর

– সরোজ দেব

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবিতায় বিষয়বস্তু উপলক্ষ্য মাত্র; সেটাকে অবলম্বন করে কবি একটি বিশেষ লক্ষ্যে পৌঁছান, যার সঙ্গে বিষয়ের সম্বন্ধ অনেক সময় সুদূর। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারলেই কবিতাকে আমরা ‘ভালো’ বলি, আর লক্ষ্যভ্রষ্ট কি লক্ষ্যহীন হলেই কবিতা হয় অন্ত্যজ, তার বিষয় চিরন্তনই হোক আর আধুনিকই হোক।
(এ যুগের কবিতা: উত্তর তিরিশ – বুদ্ধদেব বসু)

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যাপী আর্থসামাজিক ভাঙাগড়ার টালমাটাল আবহ মানুষের চিন্তা, চেতনা আর মূল্যবোধে ভিন্ন মাত্রা সংযোজন করে। পরিবর্তিত হয় শিল্প সাহিত্যের নিস্তরঙ্গ ভুবন। এই পরিপ্রেক্ষিতে গত শতকের তিরিশের দশকে বাংলা কবিতার গতানুগতিক ধারাকে নতুন খাতে প্রবাহিত করার প্রয়াসী হন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, ফরাসি প্রতীকবাদী নিরীক্ষাপ্রবণ কবিদের দ্বারা প্রভাবিত কবিকুল। এঁদের অন্যতম পুরোধা বহুমাত্রিক লেখক বুদ্ধদেব বসুর কবিতা সম্পর্কিত উল্লিখিত মন্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। বাস্তবিকই এ যুগের কবিদের মৌলপ্রবণতা বিষয় নয় আঙ্গিক আর অলঙ্কারের বিনির্মাণ ও প্রয়োগরীতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অবশ্য বিষ্ণু দে এবং আরও দু-একজন এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও অচিরেই এই প্রবণতা থিতিয়ে আসে। বাংলা কবিতায় মালার্মের Poetry is writing with words, not ideas – এই সংজ্ঞার অনুসারীদের তৎপরতা হালে পানি পায় না। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ধ্রুপদী কাব্যশৈলী খানিকটা শব্দনির্ভরতার বৈশিষ্ট্য ধারণ করলেও জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্ত্তী, বুদ্ধদেব বসু থেকে শুরু করে সমর সেন অবধি বাংলা কবিতায় শব্দের ইন্দ্রজাল অনুপস্থিত।

গৌরাঙ্গ মোহান্তের ছায়াশরীর আধিপ্রান্তর জুড়ে জিইয়ে রাখে আগুন ও অঙ্গার এবং যদিও তিনি অগ্নিমান অন্তর্গৃহে ব্যর্থ মেঘের দ্রবণ ঢালেন – তবুও আগুন ও অঙ্গারের রাসায়নিক বিক্রিয়া যে হীরক সৃজনে সহায়ক সেটিও তাঁর কবিতার অন্তর্গর্ভে সঞ্চারিত। সমাজ, মানুষ, প্রকৃতির অনুষঙ্গ এবং ব্যক্তিগত ক্ষোভ হতাশা আর ভালোলাগার অভিব্যক্তি ছড়িয়ে আছে তাঁর আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীরের তেত্রিশটি শিরোনাম চিহ্নিত রচনায়। তাঁর কবিতার বিস্তীর্ণ ভূগোলে বিষয়-বৈচিত্র্যের বাহুল্য না থাকলেও বিষয়-নিরপেক্ষ নিরীক্ষা প্রবণতার কমতি নেই। বিষয়কে উপলক্ষ্য করে তিনি যেখানে পৌঁছেছেন অনেক সময় সেখান থেকে বিষয়ের সম্বন্ধ নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। অবশ্য বিষয়কে উপলক্ষ্য করে লক্ষ্যে পৌঁছানোর ব্যাপারেও তাঁর পারঙ্গমতা লক্ষণীয়। যেমন

পত্রালিক্রন্দন মৃত্যুগানের শূন্যতা হতে ঝরে পড়ে তামাটে পাথরের উত্থানশূন্য বক্ষঃস্থলে …
জন্মপূর্ব অস্তিত্বের আহ্বানে কেঁপে ওঠে পাথর ঃ হে অগ্নিনির্ভর পত্রালি, আদি ভস্মমেঘে ভাসাও অনন্তকাল।
(মৃত্যুগানের শূন্যতা হতে)

প্রার্থনামন্দ্রিত সমুদ্রতল প্রতারণাগহন রাত্রিজলে প্রসারিত হতে থাকে। …শূন্যতা বিষাদিত বৃক্ষের দীর্ঘশ্বাসে সমাচ্ছন্ন উন্নিদ্র নিশা। শূন্যতা নভোণ্ডলের ঔদার্যে উদ্ভাসিত ব্যাপ্ত দিগন্ত। শূন্যতা, শবযাত্রার ম্লানতায় অনুলিপ্ত, অনিবার্য হিমবাহ। শূন্যতা পূর্ণতার সম্পূরক।
(প্রতারণাগহন রাত্রিজল ও শূন্যতা)

উদ্ধৃত দুটি কবিতারই বিষয় শূন্যতার স্বরূপ নির্ণয়। প্রথম রচনার বিষয় অস্পষ্ট ও অসম্প্রসারিত অথচ দ্বিতীয়টিতে বিষয়কে দক্ষতার সাথে স্পষ্ট ও প্রলম্বিত করা হয়েছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, যেখানে কবি শব্দসুন্দরীর কটাক্ষে মজেছেন এবং প্রতীক ও রূপকল্পের গোলকধাঁধার বিসর্পিল পথে অগ্রসর হতে চেয়েছেন সেখানে বালিয়াড়ির অন্তরালে তাঁর কবিতার সোনালি কঙ্কাল চাপা পড়েছে।
গৌরাঙ্গ মোহান্ত স্বভাবকবি নন, রীতিমতো কবিতার আধিপ্রান্তরে নিরলস পরিব্রাজক। মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার আঙ্গিক, শৈলী ও অলঙ্কার প্রয়োগের বিষয়ে তাঁর গবেষণাই প্রমাণ করে তিনি এ-কালের পাশ্চাত্য কাব্য সম্পর্কে কতটা প্রাজ্ঞ, আগ্রহী ও অনুসন্ধিৎসু। সঙ্গত কারণেই বাংলা কবিতার নির্মিতি ও ঋদ্ধির নব রূপায়ণে প্রতীচ্যের কবিদের কাব্যাদর্শ তাঁকে প্রাণিত করেছে। তাই তাঁর আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর কাব্যগ্রন্থের রচনাসমূহে বিধৃত হয়েছে অন্তর্লীন জীবন-ভাষ্য, উপলব্ধির নিগূঢ় ব্যঞ্জনা। সেজন্যই তিনি উচ্চারণ করতে পারেন – ‘আমি নিশ্চল গ্রহের নির্বিণ্ণ কক্ষপথে দাঁড়িয়ে সমুদ্রবর্ণ ভ্রমরের গতিতত্ত্ব পাঠ করি’, ‘আমি পার্থিব শব্দের সৈকতে হেঁটে হেঁটে পর্বতে প্রতিধ্বনিত অর্ফিয়াসের গান শুনি’ ইত্যাদি গহন, গম্ভীর শব্দ-ঝঙ্কৃত সজ্ঞার স্তোত্র।
মোহান্তের কাব্য-ভাবনা ও শব্দ-নিরীক্ষা নন্দিত ও ফলপ্রসূ হোক -এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর: গৌরাঙ্গ মোহান্ত
প্রকাশক: শ্রাবণ প্রকাশনী, ১৩২ আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০। প্রচ্ছদ: পিযূষ দস্তিদার, মূল্য: ৬০ টাকা।

***************************
লেখক পরিচিতি
সরোজ দেব। একজন কীর্তিমান মানুষ

সরোজ দেব

সরোজ দেব

উত্তরজনপদের একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। জন্ম ২৭ আগস্ট ১৯৪৭ গাইবান্ধায়। বাবা ওস্তাদ  উপেন্দ্রনাথ দেব। ১৯৬৪ সাল থেকে গাইবান্ধার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছেন আজ অবধি। এখন পর্যন্ত নিয়মিতভাবেই শতাধিক শিল্পনন্দিত লিটলম্যাগ প্রকাশ করে লিটলম্যাগ আন্দোলনকে বেগবান করেছেন। শিক্ষা জীবনের দ্বারপ্রান্তে এসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে গড়ে তোলেন ‘সংস্কৃতি সংসদ’। ষাট দশক থেকে আজ অবধি দুর্দান্ত গতিতেই তার পদচারণায় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন মুখরিত। নিজের লেখার চাইতে অন্যের লেখার প্রতি তার মনযোগ বেশি। এছাড়াও নিজস্ব প্রকাশনা শব্দ প্রকাশনী থেকে প্রায় অর্ধশতাধিক স্থানীয় ও উত্তরজনপদের সম্ভাবনাময় কবিতাকর্মীর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে প্রজন্মের প্রতিশ্রুতিশীল লিখিয়েদের অনুপ্রাণিত করেছেন অত্যন্ত সহনশীলতায়।

সরোজ দেব সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রিকা বা লিটলম্যাগ প্রাণেশ্বরীর মাচান, বজ্রে বাজে বেণু, লাল গোলাপের জন্য, শতদল, মোহনা, সংশপ্তক, শতাব্দী, নান্দনিক বিভিন্ন সময় ১৩৫ টি সংখ্যা বের হয়েছে।
 
সরোজ দেবের (কাব্যগ্রন্থ)
*    ধবল মেঘের দিন গুলো (২০০৬)
*    অনন্ত রোদ্দুরে এসো (২০০৯)
*    স্বরচিত সুখের সৎকার (২০১০)
*    স্বপ্ন শুয়েছিল কুয়াশায় (২০১১)
*    সময় আমাকে হত্যার কথা বলে গ্যাছে (২০১৩)

সম্পাদিত গ্রন্থ
*    রবীন্দ্রনাথের ভালোবাসার গল্প (ঢাকা, ২০০৬)
*    শরৎচন্দ্রের ভালোবাসার গল্প (ঢাকা, ২০০৬)
*    কবিতার যৌথ খামার (কাব্য, ২০০৯)
*    নির্বাচিত কবিতা (২০১২)
*    ছোটদের শরৎচন্দ্র (২০১২)

বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তাকে সম্মাননা প্রদান করেছে যার মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার পদক (১৯৭৭), স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পদক (২০০), একুশের শহীদ স্মৃতি পদক (২০০৬), আদিবাসী সাহিত্য পদক ময়মনসিংহ(২০০৭), দুই বাংলার কবিতা উৎসব পদক (২০০৭), ছান্দসিক পদক (২০০৮), আনোয়ার আহ্মেদ স্মৃতি পদক (২০০৯), অভিযাত্রিক রংপুর পদক (২০০৯), শেরপুর লেখক চক্র পুরস্কার (২০১০), ছোট কাগজ পুরস্কার (ঢাকা ২০১১)। সাত বিভাগ থেকে প্রকাশিত লিটলম্যাগ চিহ্ন সম্মাননা লিটলম্যাগ মেলা ২০১১ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর সম্মাদিত ‘শব্দ’ শ্রেষ্ঠ লিটলম্যাগ এবং কবি সরোজ দেব শ্রেষ্ঠ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওপার বাংলার ডুয়ার্স অঞ্চলে বিভিন্ন সংগঠন ও জলপাইগুড়ি, কুচবিহার, দিনহাটা, আলিপুরদুয়ার, দার্জিলিং, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, শিলিগুড়িসহ বিভিন্ন আদিবাসী অঞ্চলে সরোজ দেব ইতিমধ্যে সংবর্ধিত হয়েছেন।  বর্তমানে কবি সরোজ দেব নতুন প্রজন্মকে হাজার বছরের বাঙালীর গৌরবময় গাঁথা সংস্কৃতিক, ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস পৌঁছে দেয়ার কাজে এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে তার কর্ম প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। 

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E