৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ফেব্রু ২৮২০১৭
 
 ২৮/০২/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

সমীরণ ঘোষ

সমীরণ ঘোষ

সমীরণ ঘোষ। জন্মঃ ১৯৫৫। থাকেন মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরে। সাতের দশক থেকে কবিতাচর্চা করে আসছেন। মূলত লিট্ল-ম্যাগাজিনই তাঁর কবিতার আধার। রং-তুলিতে ভালো আঁকেন। প্রচ্ছদ তৈরিতে সিদ্ধ-হস্ত। ‘রৌরব’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে ছিলেন প্রায় ২৪ বছর। তার আগে ‘সয়ম্বর’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ হে বদ্ধ কাপালিক; কাঞ্চনবেড় থেকে কলকাতা; তলোয়ার পোহাচ্ছে রোদ একা একা; মিয়া কী মল্লার; নূহের জাহাজ; পর্যটকের ডানা; সাঁই আমাকে ওড়াও; কবিতা সংগ্রহ; চাঁদলাগা চৌষট্টি আসমান; অন্তর্বর্তীরেখা

অনূদিত নাটক : সুইফট নির্মিত প্রাসাদ

সমীরণ ঘোষ-এর কবিতাভাবনা
ভয়ই আমার তাঁতযন্ত্র

মৃত্যুর পরও এতো বেঁচে থাকা! আর এই স্বর্গ-নামক বেআক্কেলে নিরক্ত-প্রবাস। বিষাদসঙ্গী আমার পালক-মা, অর্থাৎ দিদিমা। আর অনন্ত-যোজন হাহা ভূমি। দুই অসমবয়সীর ক্লেদ-গ্লানি উচ্ছাস-অভিঘাতহীন অসমাপ্ত জিয়ান!

ছেলেবেলার এই দুঃস্বপ্ন হাহাকার ভয় আমার অথই ঘুমের ভেতর ডুবোজাহাজের মতো নেমে যেত। আঁতকে উঠতাম। আর দিদিমা আমাকে বুকের ভেতর মিশিয়ে পাশ ফেরায়। রাই জাগো রাই জাগো।

তো সত্যিই সেসব ভোর। সংকীর্তনে। দলময় তুমুল দৌরাত্ম্যে। ফুলবাগান থেকে গোরস্থান। ঝুলন, তো চলো, চাই করাতকলের কাঠরেণু। চাই মাংসল ঘাসের চাঙড়। সরস্বতীর দেওদার-তোরণ, তো সেই ফিকিরেও ভুতুড়ে দৌড়। তখন সকাল বেসুমার গন্ধে চোখ বুজে। দিগন্তের আলোয় জাগা চড়াসঙ্কুল ফিরফিরে ভাগিরথী। ওপারে ঝাপসা খেত। আর চক্রবাল জুড়ে মরসুমি সবজির মায়ার আভাস। ফিরেই খাঁচার স্কুল। বাইরে প্ররোচনাকারী নিসর্গের সাতকাহন। বিকেলের মাঠ। কাগজ পাকানো বল। বাতার ক্রিকেট। খেজুরডালের হকি। ডাংগুলি কবাডি আর যত পুকুর তোলপাড়-করা আমার অফুরাণ বিকেল। আর সন্ধেয় খুশবুদার ফেরেস্তার হাঁক ‘মুশকিল আসান’। এত গন্ধ ছবি উত্তলতা আর চলচ্চিত্রে বিপরীতে নির্বান্ধব স্বর্গ। সমাপ্তিহীন একঘেয়ে শ্বাসরোধী অনন্ত।

শৈশবের এই সঙ্কটই আমাকে ঘেরগেরস্ত বা প্রতিবেশ থেকে অনেকটাই ভিন্ন চেহারা আলাদা অনুষঙ্গের অমানুষ করে গেল। শুধু সঙ্গপিপাসা আর ধাক্কা-কাহিল ভীত বালক এবং পর্যায়ক্রমে কিশোর যুবক থেকে দ্বারপ্রান্তের প্রৌঢ়।

অতীতের সেই সংরাগহীন স্বকপোলনির্মিত ভীতি আর সমকালের চ্যুত ন্যুব্জ একলষেঁড়ে সমাজরেখায় প্রায়-লুপ্ত বেঁচে থাকার বিড়ম্বনা বাল্য থেকে এই অব্দি যথেষ্ট ডোবাল। আর কষের রক্ত মুছে সহায়হীন নির্বিশেষ দেউড়ির আঁধারে ফিরে আসা।

দৈনন্দিনের হার উজ্জীবন মাধুকরী কিংবা ব্যথার রেখানিখিলে সমদর্শী মানুষ আর বস্তুপ্রান্তরই আমার সাঁই, একতারার চরাচর, গুবগুবির গভীর মন্থন। এই আরশিনগরে প্রকৃতই ব্যর্থ অপারগ আর অকৌশলী মানুষের সাদাকাগজ আর রং-তুলিই হলো সুহানা-সরগম। সেই যে কোন-অতীতের এক বালকের ভীতি, যা কালের মাত্রায় নানান রঙে আবহে আবর্তে বদলে-বদলে সেই ভয়েরই সাগর-মন্থন চলেছে এই প্রৌঢ়ে। আর সেই ভয়েরই বক্রতা, অসমচলন, দোলাচল, রঙে ও রেখায় জুড়ে তৈরি করে আমার কবিতা শরীর! যেন দূরতম কান্নার ধ্বনি, শব্দের নিশীথে ডুবে ধাবমান শূন্যের গর্ভে।

কোনও ভড়ং নয়। কেবল সাদাকাগজের ঝিলে কালো বিন্দু-সংরাগ, রঙের উন্মুখ ডানা আর শুভানআল্লা গান; কোনও আখড়ার পেশি-কসরতও নয়। এক সমাজব্যর্থ মানুষের অবলম্বনই সেই ঘুঁটি। যাকে প্রাণেতাপে জড়িয়ে রাতজাগা, দিনগুজরান, সম্বৎসরের তিজেলের জাউ।

খুঁটি কখনও হড়কে, তবু বেফিকির। তাঁবুর চাদর গুটিয়ে বেদম বেলুন, তো, আবার শ্রম মেরামতি। ধুনিজ্বালা, গোলপাতার চালা, বেড়ায় মাটির প্রলেপ। সাতভূতের ঘর। লণ্ঠনের আলোয় জাগা, ভীতের সংসার।

কষের ফেনাও তো কখনও মরকতমণির মতো জ্বলে ওঠে। সেই ভরসায় এই ভয়ের জোয়াল টানা। ভয়ই আমার তাঁতযন্ত্র। খাঁজেখন্দের তেল। কলকব্জার ধ্বনি। আমার ফেনা ওঠা লেখার জগৎ।

সমীরণ ঘোষ-এর কবিতা

সায়ং সন্ধ্যা

কিছুটা প্রকাশ্য, কিছুটা হাঁসুলিবাঁক
জলশিস পায়রা তুলছে

মাস্তুল, এখনও মেঘের নীচে
ডেকে খোলা আরব্যরজনি

সমুদ্র ওলটাই, নামে গ্রহের ইজারা
বজ্র ওলটাই, ওঠে শেষের খিলান
কিছুটা গানের শেষ, কিছুটা কুয়াশা
মুহব্বত তাস ফেলছে রঙের তুমুলে

যেটুকু খোয়াব তাতে স্নান
লাল ধুলোকণা, লাল মেহেদিবাগান

কিছুটা সরল আর খানিক বক্র
ক্ষয়ে দিগন্তে নামছে


ভাঙন

স্পঞ্জের পা দিয়ে লোহাকে দোলাচ্ছি
যেন ঘুমিয়ে না-পড়ে

রবারের চোখ দিয়ে নিসর্গ দোলাচ্ছি
যেন ঘুমিয়ে না-পড়ে

পাড়-ভাঙা গ্রাম শুধু কুক্কুট-সম্ভব
যায় দিগন্তে গড়িয়ে


ভাষা

অন্ধের অবকাশ
পরশপাথরে বাজে

আঙুলের অগ্রে বাজে
বেদনার চূর্ণতম বীণা


দেয়াল

নখে চিরে চিরে ডাকি

বালিকাঁকড়ের নদী
স্তব্ধ জমাট

নুন ঝরে

বেলা গলে যায়


অঙ্কনশিক্ষা

সাদাপাতা কিছুটা আঁকছি
বাকিটুকু আঁকছে আঁধার
কিভাবে তৈরি সেতু, ভাবে
ঘাসের নীচের ডুবো-তারা

জলই বইছে, কিন্তু শব্দ যেন
ধাতুর ঝংকার। কীভাবে তুলবো
মুখ, যদি গলে যায় মাটির পিঙ্গল

বসে বসে রাত্রি ভাবি, পৃষ্ঠাসরোবর

সাদাপাতা আমাকে আঁকছে
বাকিটুকু আমূল পাথার


শীত

পতঙ্গপালন থেকে সরীসৃপ-চাষে ফিরে আসি
আশ-শেওড়ার নীচে ফণার মাণিক্য জ্বেলে মহাকাল

আমিও ভিখিরি-চাঁদ কাঁধে তুলে নেমে যাই
গহ্বরের প্রবল ক্ষুধায়

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E