৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
এপ্রি ২৫২০১৭
 
 ২৫/০৪/২০১৭  Posted by

সাহিত্যে দশকভাবনা ও দশকের রাজনীতি
– মাসুদ মুস্তাফিজ

শুরুতেই বলে নেয়া ভালো, সাহিত্য- বিতর্ক ট্রাফিক আইনের ব্যাপার নয়। যদিও তা হয়, তাহলে কোন অন্ধাবেগে কে কতোটা বেসামাল- তার একটা তদন্ত হওয়া খুবই জরুরি। সাহিত্যের রাজনীতি কীভাবে আমাদের ওপর চড়াও হয়েছে তার বিপুল শক্তি নিয়ে সে সম্পর্কে আমার বক্তব্যের বিরোধীতা করবেন না নিশ্চয়ই কেউ।  রাজনীতির সাথে কবিতার কোনো বিরোধ নেই- সাহিত্যের রাজনীতিতে বিরোধীতা আছে। আর- সব বিষয়ের মতোই কবিতা রাজনীতিকে ধারণ করে, আত্মস্থ ও অতিক্রম করে।

দশক আগে না লেখা আগে? যদি আমরা দশককে আগে ধরে নিই, তাহলে অলেখক-অকবি কিংবা ব্যাঙের ছাতার মতো গজে ওঠাদের স্থান সংকুলান হয়ে যায় ঐ দশক নির্বাচিত খাঁচায়। তাই লেখার গুরুত্ব ও নিরিখ বিবেচনায় কবির আবির্ভাবকাল খুঁজতে গিয়ে আমরা দশককে একটি সময়সূচক হিশেবে গণ্য করি সেক্ষেত্রে দশক-দশক নামের তালিকা কতোদীর্ঘ হতে পারে তা ভাবাই কষ্টকর আর ওই দশককে উৎসবমঞ্চের লেখক কবিদের দর-কষাকষির হিশাব আমাদেরকে বিব্রত করে। কবিতার আলোচনায় দশক বিবেচনা অনেকের কাছে  অবান্তর প্রসঙ্গ। আমি নিজেও এর ঘোরবিরোধী বিশেষক্ষেত্রে কালখণ্ডে আত্মপ্রতিষ্ঠা প্রাপ্তিবিচার অথবা কালখণ্ডের ভিত্তি মেনে কাব্যবিচারের বিষয়টা তেমন তাৎপর্যপূর্ণ নয়। আমরা লক্ষ করি গদ্যের ক্ষেত্রে দশক বিবেচনা অনেকটাই সাহিত্যের রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি ধারা তৈরি করেছে। এখানে প্রতিনিধিত্ব, উজ্জ্বলতম, বাবুগিরি ইত্যাদি দৌরাত্ব চোখে পড়ে। তবে বাঙলাসাহিত্যের ইতিহাসের বিবেচনায় এর একটা কালানুক্রক্রমক গণনার গ্রহণযোগ্যতা হয়তো আছে। এর ধারাবাহিকতার একটা রূপ আমরা লক্ষ করি-

প্রাচীন যুগ ১০০০-১২০০ খ্রিস্টাব্দ
মধ্যযুগ ১২০০-১৮০০ খ্রিস্টাব্দ
প্রাক-আধুনিক যুগ ১৮০০-১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ
মধুসূদন যুগ ১৮৪০-১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ
প্রাক-রবীন্দ্র যুগ, ১৮৬০-১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ
রবীন্দ্র যুগ ১৮৭৫-১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ
আধুনিক যুগ(ত্রিশ) ১৯৩০-১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ
আধুনিক যুগ (চল্লিশ) ১৯৪০-১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ
আধুনিক যুগ (পঞ্চাশ) ১৯৫০-১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ
আধুনিক যুগ (ষাট) ১৯৬০-১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ
আধুনিক যুগ (সত্তর) ১৯৭০-১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ
আধুনিক যুগ (আশি) ১৯৮০-১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ
আধুনিক যুগ (নব্বই) ১৯৯০-২০০০ খ্রিস্টাব্দ
আধুনিক যুগ (শূন্য) ২০০০-২০১০ খ্রিস্টাব্দ
আধুনিক যুগ (শুন্যের দ্বিতীয়)  ২০১০-০ খ্রিস্টাব্দ

এই কালানুক্রমিক গণনা এক পর্যায়ে দশক পরিচয়ে সাহিত্যের রাজনীতির উৎপত্তি ঘটে। সাহিত্যের গ্রহণ-বর্জন আনন্দবোধ- হতাশা যা এক নৈ:শব্দ থেকে শুরু হয় এবং শেষ হয় আরেক নৈ:শব্দে; যা বস্তুপৃথিবীর নতুন ও অর্থপূর্ণ ফেনোমেনা হাজির করে; যা অভিপ্রায় সমগ্রতা; চেতনার প্রচলিত ছককে যা নস্যাৎ করে; যার দাবি পাঠকের চিন্তন সক্রিয়তা।

একটি দশক গাণিতিক নিয়মে কেবল দশকেই দশ বছরে ফুরিয়ে যাবে তা ভাবা নিতান্তই অবান্তর। কাব্য নিশ্চই গণিত মেনে চলে না; কখনো কখনো একটি দশক শতকেও পর্যবসিত হতে পারে, আর তার প্রমান পৃথিবীর নানাভাষিক কাব্যোতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে। অনেকে দশ বছর (০ থেকে ০৯) বয়ে যায় নিরবেই, কোনো নতুন ঘটনা ছাড়াই কিংবা কোনো নির্দিষ্ট দশকে কেউ উজ্জ্বল নাও হতে পারেন যার কোনো সনাক্তযোগ্য প্রবণতা ব্যতিরেকে। কোনো কবিকে দশক বিবেচনায় এনে বিচার করা অনেকখানি অবিচারের সামিল। কেউ কেউ দশক পেরিয়েই উজ্জ্বল তাঁকে আমরা কোন দশকের বিবেচনায় ফেলবো। তাই দশক নয়- শতকস্পর্শী সুবোধ্য কারণ চিহ্নিত করা যেতে পারে।

এক দশক থেকে দশকান্তরে যখন বিচার্য অনিবার্য হয়ে ওঠে, পাঠকের এই দশক-অনিবার্যতায় সজাগ বা সতর্ক থাকতে কঠিন হয়ে যায়। কেননা লক্ষ রাখতে হয় প্রাক্তন দশক থেকে পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন কোনো প্রবণতা ও দৃষ্টিকোনের সৌজন্যে চরিত্রবান হয়ে উঠেছেন এক বিশেষ সময়ের পরিকাঠামোতে আর সময়ের তাওয়ায়  সেঁকে নিতে নিজস্ব স্বরায়ণ, উপকরণ ও প্রকরণের সম্ভাব্য সমীকরণে কতোটা নির্ধারিত হচ্ছে তার দিকে খেয়াল রাখতে হয়। আমাদের জেনে নিতে হয় টাটকা অবস্থানে থাকা এই যে দশক, তার বিবর্তন, তার রূপান্তর, তার বদলে যাওয়া, এটা নিঃসন্দেহে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। তাই পাঠক বুঝে নিতে চায় বিশেষ সময়ের নির্দিষ্ট দাবি মিটিয়ে বাক্সময় হয়ে উঠেছে কার কাব্যে কোনখানে তিনি স্বভাবজ স্বতন্ত্র কিংবা ঐ তথাকথিত দশকগুলো থেকে কোন কোন দিক দিয়ে অর্জিত হয়েছে বিশিষ্ট প্রবণতা, অন্যমাত্রিকবোধ এবং প্রাকরণিক ভিন্নতা।

দশকের বিবেচনায় এই সীমারেখার গণ্ডিবদ্ধতায় কোনো সৃজনশীল সৃষ্টিকে বা তার স্রষ্টাকে মূল্যায়ন করা কঠিন। আমি ব্যক্তিগত ভাবে এই দশক বিভাজন- বিন্যাসের ছকে ফেলে কাউকে আলোচনা, মূল্যায়ন  এবং পর্যবেক্ষণে অস্বস্থিবোধ করি। ভাষাতাত্তিক গবেষক এই বিভাজনকে দূরত্বের নিরিখে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের স্বাতন্ত্রে সময়ের এককে একটি নির্দিষ্ট কালপর্ব সৃষ্টিশীলতাকে বেঁধে ফেলতে পারেন। কালপর্বকে একপর্যায়ে শতকে অর্ন্তভূক্ত করে দশকওয়ারি বিভাজনে গণ্য করেন।  এ বিবেচনা অনেকের কাছে সুবিদিত হয়তো অনেকের উপেক্ষা করার উপায় নেই। আর এ কারণেই সময় ভিত্তিক এ দশকের যোগ-বিয়োগে কতোটা বাঁকবদলে হিশাব মিলানো যায় রূপবৈচিত্র্যের সমস্তকে চিহ্নিত করা এই একক-দশক বিভাজন সে অর্থে হয়তো প্রয়োজনীয়ও বটে!

দুই
সাহিত্যে সমকাল কথাটি খুব প্রাসঙ্গিক। কেননা এখানে ধারা ও পরিক্রমা নিরুপণ করা সম্ভব তবে সরাসরি দশকে নয়। সাহিত্যের স্বরণীয় ও আশ্চর্যের একটি দিক হলো- নিরস্কুশভাবেই তা নতুনের দিকে যাওয়া এবং অবশেষে আরোও নতুন হয়ে ওঠা। আর এই মেটামরফসিস আছে বলেই সাহিত্য অন্তহীনভাবে সব কিছু প্রকাশ করতে পারে । নিজস্ব কালের গর্ভ থেকে  জন্ম নিতে হয় প্রত্যেক কবিকে, বার বার তাঁকে প্রত্যবর্তন করতে হয় কালের কাছে, শিখে নিতে হয় সময়ের সমস্ত পরিভাষা। যুগ ও কালের বন্ধন থেকে কোনো কবিই মুক্ত নন। দেশ-কালের ভূগোল-ইতিহাস সমকালীন ঘটনাপ্রবাহ কবির চেতনাকে আলোড়িত করে, পাল্টে যায় কবিতার ভাষা, প্রসঙ্গ প্রকরণ, বদলে যায় জীবন অনুভবের মহৎ উচ্চারণ। Every age in an age of transition –  তাই কালান্তরের চাপে সচেতন কবির হাতে বদলে যায় কবিতার অবয়ব, অন্তর্জগৎ। তৈরি হয় কবিতার নতুন ইতিহাস। কালের বিবর্তনে বাংলাকবিতার গতিপথ বার বার বাঁকপরিবর্তন করেছে। সেখানে কখনো দশক বিভাজন ভূমিকা রাখে নি বা কোনো দশকে আটকে থাকে নি। কেননা দশকের কোনো নির্দিষ্ট চরিত্র নেই।

আধুনিক কবিতা সূচনালগ্নকাল হিশেবে ধরা হয়ে থাকে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দকে। কেননা ইংরেজি কবিতার বিবর্তনের ক্ষেত্রে এ বছরেই প্রকাশ পেয়েছিল টি এস এলিয়টের দ্যা ওয়েস্টল্যান্ড, তেমনই বাংলাকবিতার পরিক্রমায় বহুল তাৎপর্যপূর্ণ সময় বহন করে রবীন্দ্র-পরবর্তীবলয় থেকে বেরিয়ে ত্রিশের (যেভাবে দশক গণনা শুরু) কবিসংঘ শূন্যতাবোধ, অবক্ষয়চেতনা এবং অস্তিত্বে¡র বিচিত্রমাত্রিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও বাংলাকবিতার আধুনিকায়নের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বৈপ্লবিক রূপান্তর সাধনে সমর্থ হয়েছিলেন। এভাবেই বাংলাকবিতার বাকপরিবর্তন ঘটে বিষয় ও প্রকরণে এবং সম্ভাবনা বীজমন্ত্র নিহিত হয় সমাজ সময় ও সমকালস্পর্শী জীবনাগ্রহের মধ্যে শুরু হয় দশকের হিশাব-নিকাশ।

কবিকে সময়ের সন্তান হিশেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কেননা সময়কে ধারণ করেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই কবি তাঁর কাব্যভুবন রচনা করেন বর্ণমালার সংসারে। এবং সেই ভুবনে তিনি বার বার নিজেকে খোঁজেন আর একাত্ম করে তুলতে চান পাঠককে। পাঠকের সাথে  মনোজগতের একটা আদান প্রদানের সম্পর্ক তৈরি করেন কবি-তাঁর অভিজ্ঞতায় নেশায় অভিজ্ঞানের বর্ণমালা সাজান। পরিবর্তনের মধ্যে ধারণ করেন সময়ের পাঠ । পাঠক এভাবেই তার রুচিতে বেছে নেন প্রিয়তম রচনাটি।

নানা ধরণের কবিতা হতে পারে । সময়ের চাহিদা অনুযায়ী কবিতার ধরণও পালটে যেতে পারে। দেখা যায় বাঙলাকবিতায়ও এর আদিযুগ, চর্চাপদের আমল থেকে একবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বিচিত্র মেজাজের কবিতা রচিত হয়েছে যা দশকের জালে নির্দিষ্টভাবে ধরা যায়নি বা চিহ্নিত হয়নি। যুগের দাবি পূরণকরে এই বাঙলাকবিতা জন্ম দিয়েছে বিষয় এবং প্রকরণের অপরাপর  থেকে পৃথক এবং অনন্য কিছু অধ্যায়ের। একে দশকে বিচার করা অসম্ভব যা কাল বা সময়ের বিবেচনায় চিহ্নিত হয়ে আছে। সাহিত্যান্দোলনে এই দশকের ওপর ভিত্তিকরে বাঙলাকবিতায় কোনো যুগের সনাক্ত হয়নি-অবশ্য অসম্ভব বটে। বিশ্বসাহিত্যে শিল্পকলায় কবিতাকে-রোমান্টিক, সিম্বলিস্ট, সুররিয়ালিস্ট, ফিউচারিস্ট ইত্যাদি নামে পরিচিত হয়েছে কিন্তু দশক নামে পরিচিতি লাভ করেনি। শুধু বাংলাসাহিত্যে যার ব্যতিক্রম ঘটে।

তিন
সৃজনশীল লেখক মাত্রেই তার অবস্থানকে পরিস্কার করেন তবে  দশকে  অবতীর্ণে হয়ে নয়। এখানে তথাকথিত পন্ডিত ও ডিগ্রিধারীরা দশক বিভাজন যথেচ্ছাই শুন্যতার সার্টিফিকেট হাতে তুলে দিচ্ছেন ক্রমাগত। দশকের আদলে এক ধরনের সাহিত্যের মাস্টারি বলা চলে। সাহিত্যে কোনো মাস্টারি চলে না। মাস্টারেরা মনে করেন, যে দশকের কবির সংখ্যা বেশি সেই দশক কবিতার দশক- সমৃদ্ধির দশক। এই বক্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই যা খুবই ইনডাক্টিভ ও বিতর্কিত। আসলে কবির সব লেখাই কি কবিতা? কখনো চারদিকে বড় বেশি লেখার মধ্যে কবি কবিতা না খুঁজে, খুঁজে বেড়ান কবিতা না হয়ে ওঠা লেখাগুলো আর বোধহীন কিছু শব্দের সাড়ি, তাঁর পূর্ব থেকে নির্ধারিত ভাষাবোধহীনতা অনেক উদাহরণ হাজির করা সম্ভব। মার্সেল প্রুস্ত, একাকি ও নির্জনতম, যার কাছে দিন রাতের মতো,  রাত দিনের মতো। এই রাতদিনের প্রাকৃতিক বিভাজনকে অগ্রাহ্য করেই রচনা করেন সৃষ্টিশীল অধ্যায়। প্রকৃত কবি অনুভুতিকে অনুভুতি দিয়েই ব্যাক্ত করেন অন্য এক অনুভুতির কাছে। কেননা অনুভুতি সবসময় ক্রিয়া-কাঠামোর এক ধরনের পরিবর্তনশীল অস্থিতাবস্থা সৃষ্টি করে। তাঁর অভিজ্ঞতার মাত্রাচেতনকে ছোঁয়াতে ব্যর্থ হয়ে। আসলে অভিজ্ঞতার যে ভাষা রচনা করেন তাতে কাব্য কখনই ব্যক্ত হতে পারেনা মূলত সংগত যে কবি নিয়তাপরাপর কবি সংস্রব ঘটনে অ-পূর্ব স্বভাব নির্মাণ করেন। তাই আমরা দেখি কবি প্রকৃতপক্ষে দশককে নয় সময়কে পরিভ্রমণ করেন এবং এই সময়ের রন্ধে রন্ধে পদবিন্যাস গড়ে তোলেন তা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়- নয় কোনো দশকের। আর কবিতার জন্য কোনো বিশেষ মাধ্যম একেবারে প্রয়োজনীয় নয়- অনিবার্য নয়। কবি যে কোনো মাধ্যমে যে কোনো দশকে- (যদি দশক থাকে) উজ্জ্বল হতে পারেন এবং স্বচ্ছন্দবোধ করেন তাই তার সময়- প্রশ্রয় দশকে নয়।

চার
আসলে আধুনিকতা একটা চেতনার ব্যাপার। দেশ ও কালের প্রেক্ষাপটে প্রগতির লক্ষ্যে তার হয়তো রুপান্তর ঘটে। কবি বা লেখক তো আর স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে জন্ম নেননা ! দেহগত বিবর্তনের সাথে মন ও মননের স্তরে স্তরে তার চৈতন্য ও পরিপূর্ণতা ঘটতে পারে। প্রকৃতির অনেক জিনিসের কার্যকারণ সম্পর্ক কবি ক্রমাগত নির্ণয় করতে শেখেন। যেভাবে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সে একদিনে গড়ে ওঠেনি। আধুনিক হওয়ার ব্যাপারটাও ঠিক সেভাবে সনাক্ত হয়েছে। দশক এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। দশক কোনো নির্দিষ্ট করে কবিকে চিহ্নিত করতে পারে না। হয়তো কখনো কখনো কোনো কোনো কবি দশকের হয়ে যান  বা দশক তাকে গিলে-ফেলে ধারণ করে ফেলে।

কবিতার দশক বিভাজনে আপত্তি অনেকেরই। এ বিষয়ের পক্ষে বিপক্ষে নানা রকম নানা মত আছে। বাঙলাসাহিত্যের তুলনামূলক কবির সংখ্যা বেশি হবার কারনে তা খুব সহজে চিহ্নিত করার প্রয়োজনেই দশক বিভাজন অনেকেই মেনে নিয়েছেন। অনেকে মানেন নি। সাহিত্যের যেমন কোনো চিরস্থায়ী বা স্থির সংজ্ঞা থাকে না ঠিক তেমনি এ বিভাজন পদ্ধতিও পরিবর্তন হওয়াই স্বাভাবিক। নতুন শতাব্দীতে কাল বিভাজন নিয়ে নানা মতান্তরে সূচনাও হয়েছে। কবি ও কবিতা বিভাজন রেখাকে দশক দিয়ে সম্পূর্ণতা দানের বিষয়টি এভাবে বিতর্কিত এবং অস্বস্থিকর। যতোদুর জানা যায়- বুদ্ধদেব বসু বাংলাকবিতা আলোচনার প্রয়োজনে দশক শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছেন। কবি এবং কবিতার ক্ষেত্রে দশকের তাৎপর্য ঠিক কী বোঝায় বা এর অন্তর্হিত বিষয়কে অনুধাবন করতে কি নির্দেশ করা হয় তা এখনোও কোনো কবি অথবা কোনো লেখক সুনির্দিষ্টভাবে জানেন না। দশকে কী কবির আত্মপ্রকাশ- কিংবা সময়ের বিশিষ্টতার মাপকাঠি! বিষয়টির চুড়ান্ত বিতর্ক আগামীর  পথে নির্ধারিত হোক।   

পাঁচ
বাংলাদেশের কবিতা বয়সের হিশেবে দেখতে গেলে ষাটের কোটা পেরিয়ে গেছে। স্বভাবত কবিতার সার্বিক চরিত্র, তার আধুনিকতা, স্বার্থকতা ইত্যাদি নিয়ে অনেক আলোচনাই হয়েছে কিন্তু দশক বিবেচনায় বা কবিতার দশক ভাঙা বিচার নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই বললেই চলে। সময়ের নির্দিষ্ট প্রাচীরঘেরা এ জাতীয় বিচার কবি ও কবিতার জন্যে সব সময় যুক্তি নির্ভর হয়ে ওঠে না। বিশেষকরে নির্দিষ্ট দশক পর্বে যদি কবিতার চরিত্রগত সুষ্পষ্ট মূলধারা তৈরি না হয়। তেমন ধারা চল্লিশে গড়ে উঠলেও শেষার্ধে এর চরিত্রে বদল ঘটে। অন্যদিকে ত্রিশের কবিতায় কোনো দশকনির্ভর চরিত্র দেখাই যায় না। কবির দশক পরিচিতি এভাবে সময় থেকে সময়ে ভিন্ন চরিত্রে প্রকাশ করে তার আবির্ভাবকাল। শুধু দশক বিচারে গদ্যের বিচার হতে পারে, কবিতার বিচারে তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেননা এক দশকের কবিতার চরিত্রে বদল ঘটতে পারে। প্রসঙ্গত আমরা বলতে পারি, রবীন্দ্রনাথ কোন দশক চিহ্নিত কবি নন। কিন্তু চল্লিশের দশকে সুভাষ মুখোপাধ্যায় পঞ্চাশের পর আরেক সুভাষ হয়ে যান। এমন উদাহরণ অনেক দেয়া সম্ভব। তাই বলা যায় কবিতা পুরোপুরি স্বতন্ত্র ব্যক্তিমেধা নির্ভর। এই ব্যক্তি নির্ভর ধারাই হলো স্বতন্ত্রধারা। আমরা পরিবর্তী দশকগুলোতেও কবিতার এই দশক ভাঙার চরিত্র লক্ষ করি। তাই দশক নির্ভর কবিতার বিচার কবিতার চরিত্র ধর্মের নিশানা সঠিকভাবে চিহ্নিত করেনা। বাংলাকবিতার ইতিহাস-প্রেক্ষাপট  ও কাঠামোকে পুর্নবার বিবেচনায় সকলকে মনে করিয়ে দেয়া মাত্র। এ পথে অনেকে হেঁটেছেন- হাঁটবেন কেউ কেউ হাঁটতে হাঁটতে শতাব্দীর বটবৃক্ষের  মতো অবস্থান নেন- আর এই সুযোগ ঠাঁই হয়ে যায় দশকে। কবিতা চরিত্র সনাক্তকরণে স্থান কাল ও ব্যক্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। যা কাল বা সময় স্থানের গতিশীলতার সাথে সম্পর্কিত। দৃশ্যজগতে সময় অবশ্যই স্থান, বস্তু ও ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার ওপর নির্ভর করে। এখানে শুধু পার্থিব সময়ও আমাদের জীবৎকালের তুলনায় অনেক। সময় চিহ্নিত করতে কম্পাঙ্ক বা খণ্ডাংশের প্রয়োজন যাকে আলোচক দশক বলে ডাকেন। কবিতার আঙ্গিক বিবর্তন কতোটা পথ পেরিয়েছে এর উত্তর খুঁজতে হয়তো আমরা বর্তমানে দশকের আশ্রয় নিয়ে থাকি কিন্তু তা কি চুড়ান্ত? কবির অনুপস্থিতিতে তার কাব্যবিচার নিজ নামে বহন করবে এবং মহাকালের দরজায় রসসংবেদের কড়া নাড়বে।
আমরা অপেক্ষায় আছি- অপেক্ষায় থাকবো।  

***

লেখক পরিচিতিঃ

মাসুদ মুস্তাফিজ

মাসুদ মুস্তাফিজ

মাসুদ মুস্তাফিজ। জন্ম ২২ নভেম্বর ১৯৬৯ খ্রি: বাংলাদেশের দিনাজপুর শহরের মাধববাটি গ্রামে। স্কুল-কলেজ বিমুখ ছাত্রটি আপাদমস্তক কবি হয়ে ওঠেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে, যুক্ত হয়েছেন সমকালীন কাব্যচিন্তায় এবং প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজস্ব কাব্যবাহন। বাংলাদেশসহ ভারতের কিছু সাহিত্যকাগজ লিটলম্যাগ, প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যপত্রিকা এবং জাতীয় দৈনিকে লিখে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে পরিচিত হয়েছেন। শিক্ষকতা করেন-  মূলত কবিতা লিখেন, কিন্তু গদ্যচর্চায় তাঁর আগ্রহ প্রবল। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিনিধিত্বশীল-গবেষণামূলক পত্রিকায় তাঁর গদ্য সাড়া জাগিয়েছে। বর্তমানে তিনি এ প্রজন্মের কবিতার প্রবণতা: বিয়য় ও বিনির্মাণশৈলি নিয়ে কাজ করছেন। গদ্যফর্মের নতুন আঙ্গিকের কাব্য-প্রকরণ আর নিজস্ব স্টাইলের মুক্তভঙ্গিতে সুখহালের জীবনাবলি রচনা করে চলেছেন এবং অন্তরবন্দি হয়েছেন নবনিতা শব্দকলির প্রাণে। প্রিয় শব্দকলি তাঁর আজীবন আরাধ্য। কবির আত্মজ- অনুভব মুস্তাফিজ, নিঝুম মুস্তাফিজ।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ

কাব্যগ্রন্থঃ ‘বিষ্টির প্রহর গুনতে গুনতে’ (২০১০); ‘ব্রিজ পেরোচ্ছি না স্বপ্ন পেরোচ্ছি’ (২০১১); ‘কিছু সমুদ্র কিছু বিষণ্ণতা’ (২০১২); ‘জলবাতায়নে রঙঘুড়ি’ (২০১৩); ‘স্বভাবদুর্বৃত্ত বাতাসে কুয়াশার কৃষ্ণতীর্থ’ (২০১৫); ‘মাতালরোদে মেঘে অরণ্য’ (প্রকাশিতব্য ২০১৭, কোলকাতা বইমেলা)।

প্রবন্ধঃ ‘সাহিত্যচিন্তা ও বৈচিত্র্যপাঠ (২০১২)’;  ‘অবমুক্ত বৃত্তায়ন’ (২০১৫)।

সম্পাদনাঃ নাক্ষত্রিক, অগ্নিসেতু।

সম্মাননাঃ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সাহিত্য পদক (২০১২)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E