৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২৫২০১৬
 
 ২৫/১০/২০১৬  Posted by
সাফিনা আক্তার

সাফিনা আক্তার

কবি পরিচিতি

সাফিনা আক্তার। জন্ম- ৩০ অক্টোবর, ১৯৮৫। কালশী মিরপুর, ঢাকা-১২১৬। পিতা- মধূ মিয়া মাদবর। মাতা- রূপবান বিবি। তিনি বাংলা একাডেমী তরুণলেখক প্রশিক্ষণ কোর্সের ২০১৩ এর সপ্তম ব্যাচের সনদপ্রাপ্ত।

প্রকাশিত গ্রন্থ : স্বপ্ন মূখর বসবাস (২০১১)।

সম্পাদনা :     ঢোল, সাহিত্যের ছোট কাগজ।

সাফিনা আক্তার -এর কবিতাভাবনা

সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি নারী-পুরুষকে একই আকারে-গঠনে সৃষ্টি করেছেন। মেধা-মনন চিন্তাশক্তি বিবেক হয়তো বা ভিন্ন সত্যি। সমাজে কিছু লোক সাহিত্যিক কেউ রিকশা চালক, কেউ আইনস্টাইন কেউ ফেরিওয়ালা। এক লোক বা সাহিত্যিক লেখেন হাজার-লাখো লোক তা পড়েন। যিনি লেখেন তিনি অবশ্যই ঐশ্বরিক ক্ষমতার বলে লেখেন বিভিন্ন চেষ্টার মাধ্যমে। তা নয়তো সমাজের সবাই শুধু লেখকই হতো পাঠক থাকতো না।  আমার কাছে কবিতা ঐশ্বরিক একটা দানের মতো, অতিপ্রিয় অতিআপন, আমার অস্তিত্বের একটা বৃহৎ অংশ। কবিতা আসলে কী? কেন আমি খাতা ভরে তা লিখি? আমি লিখে তা শুধু বাক্সবন্দি করে রেখে দিই না কেন? তা আবার প্রকাশ করি অন্যের কাছে -এর মূল কারণ কী?
এর উত্তর ভিন্ন ভিন্ন মতের, তবে আমি বলবো “যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখকে শৈল্পিকভাবে ব্যাখ্যা করে অন্যের কাছে প্রকাশ করার শিল্পিত রূপ হচ্ছে কবিতা”। আমার আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, অনুভব-অনুভূতি ও সংবেদনশীলতা আমি এমনভাবে লিখবো, বলবো বা ব্যাখ্যা করবো যা শুধু আমার নিজের মাঝেই জমে থাকবে না, তা হবে সার্বজনীন। আমার বলা কথা যখন কোন ব্যক্তি শুনবে বা পড়বে – জানবে – তখন সেই ব্যক্তি এমনভাবে তা গ্রহণ করবে যেন সেই কথা বা কবিতার ভাব ও অভিজ্ঞতা তার নিজের মনের কথা। তখন কবি সফল পাঠক সফল আনন্দিত জনতা। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন “ভাষা ও ছন্দ সব প্রাণী অপ্রাণীর মধ্যেই বিরাজমান। শুধু তা গ্রহণ এবং প্রকাশের ক্ষমতা ভিন্ন।” গোধূলিবেলায় আমি বলতে পারি সূর্য উদয় এবং অস্ত হতে প্রতিটি ব্যক্তি দেখে, কিন্তু যিনি তা শৈল্পিক কিছু শব্দের মাধ্যমে মনের মাধুরি মিশিয়ে এমনভাবে তুলে আনেন যেন তাঁর পাশের মানুষটি তা জেনে মনে মনে পুলকিত হয়ে ভাবতে পারেন – আহ্ এই তো আমি, আমার মনের কথা ভাবনাগুলো সে খুব সুন্দরভাবে বলেছেন। এইভাবে কবি, কবিতা এবং ভাবনা মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়।

সাফিনা আক্তার -এর কবিতা


হৃদয় জ্বলে

পৌষের এক নিশ্চল দীর্ঘরাত।
একা জেগে থেকেছি-
শিশির সিক্ত হিম শীতল মুহূর্তের সমষ্টি,
আর্দ্র বাতাসে গলে গলে ঝরছে শীত।
তখন দীর্ঘ নিঃশ্বাস, নাকের ভেতর
বাতাসে পোড়া পোড়া গন্ধ যেন
কোথাও অগ্নিদগ্ধ হয়েছে সব,
পুড়ে গেছে দেহের ভেতর আত্মা!
নীরবে জ্বলে বহুকাল, আজ দগ্ধ
হয়ে গন্ধ ভাসে পৌষের বাতাসে!
রাত জেগে জেগে নিঃশ্বাস গুলো
শব্দের মতো ফোঁস ফোঁস করে
ছোট-বড় নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস পুড়ে
ছাইচাপা আলামত সর্বত্র।
নীরবে হিসাব মেলায় কংকালের ভেতর।
হৃদয় পোড়ার হিসাব, কার হৃদয় জ্বলে
তোমার, না একান্তই আমার?


তে’ভাগা রাজ্য

খাতার পাতা ফুরিয়ে গেলো, কলমের কালিও!
অথচ তোমরা ডাকলে না পূর্ণিমা চাঁদের আকাশে
নক্ষত্রভরা গালিচায় -স্বপ্নের পায়রা ওড়ে যেখানে।

তবে ডেকো না আমায়, বিশেষ সংখ্যায় মেলাতে –
তোমাদের তে’ভাগা রাজ্য!
এক আমি, দুই তুমি, তিন তিনি – তাঁহারা।

বিস্ময়ে দেখো না, জল জোছনার গল্প শুনো না।
অট্টহাসিতে তবু লিখে রেখো করতলের হিসাব,
একদিন সেই দিন দেখবে —
মহাকাল লিখে রেখেছে আমার নাম।


শিকড়ের মূল

স্বপনের আবির কাটে নীলাভ শামিয়ানা সূর্য আলোর রঙ
বদল হতে থাকে অসম্পূর্ণতার ছায়া শিল্প, তামাট ভাবনা
কুঁকড়ে যাওয়া ছাড়া চোখে তেমন কোনো কাজ থাকে না।

শহর বালুর চর মরুভূমি শূন্য উদ্যান প্রাণহীন ভাবতে ভাবতে
এক বসন্ত বেলা শিমুল ফোটার অপেক্ষায় ছটফট করে।
রিক্ততা এসে বন্দি পাল- সব বিষণ্ণতা –
মুছে, জেগে ওঠে মহাপ্রাণ।
জেগে উঠি আমি আমার শিকড়ের মূল থেকে।


নদীমুখী ভেসে চলা

ক্রয় বিক্রয় মূল্য পরিবর্তনের মাধ্যমে
প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে আমাদের ভাগ্য জীবন প্রণালী
নির্বোধ থেকে থেকে আমারও সহজলভ্য
বিরতিহীন মতবাদ নাই
প্রবাহ মান নদীমুখী!
এপার থেকে ওপারে ভেসে চলা
কেউ একজন ভাসায়,
প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান অতঃপর ভবিষ্যৎ
মেঘলা দিন বা রোদ্দুরের সকাল, কালো রাত্রি
সব কিছু ছাড়িয়ে কেবল হাত বদলেই বেঁচে থাকা।


কবিতা জীবন হলে

জীবন স্মৃতির সমষ্টি! পদ্মার খরস্রোতে পাড় ভাঙা পাটুরিয়া -দৌলদিয়া পারাপার। দশটার শাইটেলে বেলগাছি – চড়াইখোল, বিশাল শিমুল গাছে অসময়ে কোকিলের ডাক! শিলাইদহ -ঠাকুরের নন্দিত কুঠিবাড়ি আট বেয়ার পাল্কী, বিধ্বস্ত বকুলের ডাল! শেওলাধরা দিঘির ঘাট, কামিয়ার গ্রামে নিল আকাশ নুয়ে পড়া সোনালি বিকেল, বাসুদেবপুরের ঈদগাহর পান্ত ছুঁয়ে বিস্তৃত চারশো বছরের বট বৃক্ষ আর বাতাসে ছড়ানো তোমার চুম্বন -শরীরের ঘ্রাণ নিতে নিতে আমার দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা।


মাঘ চিত্র -২

জলযৌবন উপচে পড়া নদী ছিল শ্রাবণে
তীরে তীরে চারা কাশের সবুজ ডগায় মেলে ধরা
নতুনের গান, মনে উথালী পাথালী ছিল
এ কালে -তীর মরা, কাঁকড়ার গর্তে ইঁদুর দাপায়
ডাহুকের দল খোঁজে ফসলি!
আর দূর পরবাসে তুমি -এই শুষ্ক মাঘে
প্রহর গুনে গুনে আমি অতীতের পদচিহ্ন খুঁজি।।


পৌষ

পহেলা পৌষ এসে কড়া নাড়ে
আসি আসি করে চলেই আসে ঘরে
জুপ করে আমার বিছানায় বালিশের কাভারে
কানের লতি ছুঁয়ে শিহরণ জায়গা শরীরে
আড়াআড়ি মতবাদে লুকিয়ে যায় লেপের ভেতর
আঙুলের ডগায় ও শীতলতা!
খানিক ধস্তাধস্তি করে আমি আর শীত
হয়ে উঠি পরম আত্মীয়।।


স্বপন

নিঝুম রাত্রি নিস্তব্ধতা আমার বুকের পাটাতন জুড়ে।
নিস্তব্ধতার পাশেই স্বপ্নরা-কেবল ঘুমহীন প্রহরী
যুগ থেকে যুগান্তরে
মাঝে-মাঝে ঘুমের ভেতরে,
অযথাই স্বপন’রা ফেরি করে যায়-নিয়ম রক্ষার কৌশল
তবুও বেঁচে থাকি নিয়ম মেনে।।


উদরের ঘা

বিষাদেও অদ্ভূত বিস্ময় নগ্নতায় মগ্ন
প্রাণ পাখি জল খোঁজে
উদরের দেরাজ বেয়ে
ওঠে উচ্চতর চাওয়া
এক বিভীষিকাময় রাত
ঝরা বিষাদে উদরের ঘা
আমি এক কালজয়ী পথচারী
নগ্ন উরুর টানে হাঁটি পৃথিবীময়।।

১০
জনান্তিক জীবন

ছুটো জনান্তিক জীবন
এইবার দাও এক ছুট।
লালরক্ত ঘোড়া শিরা -উপশিরায়
ফুরিয়ে যাবার আগে যুদ্ধ হাতিয়ার।
বুকের ভেতর চিড়বিড় করে বেথা
দুরন্ত এক ট্রেন ছুটে গভীর রাতে।
সব প্লাটফর্মে আপ এন্ড ডাউন কর্কষ হুইসেল
নাগরিক চাঁদ কাঁদে জানালার পাশে
মাঝরাতে ঘুমকাতর চোখের পর্দা দোলায় –
দে, এইবার দে এক ছুট।
পাল্টে পাল্টে যাক চৌকাঠের সব রঙ
ডানার পালক খোঁজে তীর্থের কাক।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E