৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২৬২০১৬
 
 ২৬/১০/২০১৬  Posted by

কবি রিষিণ পরিমলের কবিতা


অসময়

কালো ভ্রমর গান করো না, গান
ভুলো, নীরবেও সুর বুনো না কোনো
জোনাকিরা আলো নিভাও, নিভৃতে শোনো
অন্ধ-বদ্ধ সময় পেরোয় অবরুদ্ধ প্রাণ
বাজাই কেমনে বলো প্রাণের অর্গান

আকাশে দুয়েকটি তারা, আলো কই
অন্ধকারে দুয়ার খুলে কে বেরোবে পথে
বৃষ্টিধারা থেমে গেছে কবে, সেই হতে
জন্মান্ধ চোরাবালি ভ‚তলে থই থই
ভাসাই কি করে বলো কালের সাম্পান


রক্তরেখা

তখনও রক্ত ঝরছিলো
সমুখে গড়াচ্ছিলো রক্তরেখা …
বীরের বুকের তপ্ত রক্ত শোষেনি বীরপ্রসূ
বীরমাতা মৃত্তিকা

তাই নদী বেয়ে সমুদ্রে রক্তের কল্লোল
তাই উজান ঠেলে উদয়াচলে রক্তাক্ত সূর্যোদয়

বীরের শতধা রক্তধারা স্রোতে
ভীরু হন্তারক ততক্ষণে পলাতকা


প্রেম

আঁখি প্রান্তে বিন্দু বিন্দু জল
বিন্দু জলে সিন্ধুর সম্বল
কাহারে যে জল দিতে এসে
বাড়ি ফিরে অভিমানী হয়েছো চঞ্চল

ভাসাবে অপার জলে সেই সুখে
ভেজানো অঞ্চল শুকালে রোদ্দুর মুখে
তবে কেন বিভাসিত ক্রোধে
হানো পুষ্পধনুশর এ হীন নির্বোধে


প্রজাপতি রাত

মৃত জোসনার মতো থেমে আছে
তোমার দুচোখ
একটু হাওয়া নেই; কাঁপনও নেই
দৃষ্টির তরলেও নেই তরঙ্গায়িত তির তির
অথচ কতো না সহজ উদার
এই প্রজাপতি রাত

কথা ছিলো তুমি এলে
খোঁপার রজনীগন্ধার ঘ্রাণ নিয়ে যুদ্ধে যাবো
রাতভর উন্মাদ আহ্লাদে
হাওয়া ছুটবে, কাঁপন উঠবে
তরল-দৃষ্টিতে ভাসবে মধ্যরাতের সুখ

অথচ এলে না বোধের মৃণাল
সময়ের চোখে জমে আছে দুখের লবন


ভষ্ম

ছাই হয়ে গেছি, ভষ্ম
-ভষ্মাধারে ঠাঁই
নিজে উড়ি, উড়ে উড়ে অস্তিত্ব ওড়াই
‘তুলা ধুণি ধুণি আঁশুরে আঁশু।
আঁশু ধুণি ধুণি নিরবর শেসু।।’
আপনারে নিরবয়ব করি, শূন্যে মিলাই

ধোঁয়া ধোঁয়া স্বপ্ন তবু কুয়াশায় ঝরে
রৌদ্রতাপ তাপজ্বালা শেষবিন্দু সংহারে
শূন্য অবয়বে তবু বাড়ে আশালতা
মানুষ পেরোয় কত নগ্ন নাশকতা

নিজেকে পুড়িয়ে মানুষ সভ্যতা গড়ে


বরিশাল

এই বরষায় কন্যা বরিশাল থাকো
কূল ভেঙে কল্লোলিনী করো জলখেলা
জলের সম্ভোগে জাগে যমজ-প্রবাহ
বরষায় বরিশাল বেহুলার ভেলা

জলাঙ্গি যৈবতি কন্যা সর্পিল চঞ্চলা
ভরাঘাটে মন তার জলোয়া পবন
কাঁখের কলসে নাচে কীত্তনখোলা
কীর্তিনাশা জলে ভাসে ও কন্যার মন

কন্যার নিবাস বুঝি ওপার কলকাতা
বরষায় ভেসে আসে ভাটির বিদেশে
বিদেশ বিভূঁই এই প্রপিতার দেশে
জলেভাসা কন্যা কালে জলজ কবিতা


দাবানল

জ্বলো দাবানল, ও স্বয়ম্ভূ অগ্নি মহীয়ান
মুষ্ঠিবদ্ধ উর্ধ্বশিখা কৃষ্ণচূড়া
পোড়াও জঞ্জাল সমুদয় বনাঞ্চল হতে
শুধু বন মোরগের রঙিন কেশর খেয়ালে রেখো
যদিও নগর পুড়িলে এড়ায় না দেবালয়
তবু সন্তর্পণে অগ্নিবাণে জ্বলো
জ্বলো দাবানল …


সন্ধ্যা

একেকটা সন্ধ্যায়
হাসপাতালের গেটে
পাখিদের কোলাহল বিষণ্ণ ঠেকে
কী রকম ভাবে মন মরে যায়
আশ্চর্য! অবসন্ন ঘনীভূত সন্ধ্যায়।

একেকটা সন্ধ্যার রঙ
চিতার আগুন নিয়ে হাতে
মানুষের পৃথিবীর সন্নিপাতে
নির্মম দাঁড়িয়ে থাকে।

কী মর্মন্তুদ! হায়!
এক লহমায় জীবন ফুরিয়ে যায় অলঙ্ঘ্য নিশ্বাসে।
গহন পরাণে জ্বলে কুম্ভারের পণ।


জীবন পরিক্রমা

ভোর অথবা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায়
আমরা হাঁটি
যারা হাঁটে, তাদেরই হাঁটবার পথ দীর্ঘ হয়

দীর্ঘপথ হাঁটায় ঘরবসতি পিছুটানে
স্বপ্নভঙ্গ জলোচ্ছ্বাস অকূলে ভাসায়
আমরা ভাসতে থাকি
যারাই গহীনে ভাসে তারাই জীবন ভালবাসে

জীবন        সূর্যমণ্ডিত     স্বর্ণসৌধ
বিষুবরেখায় বরাবর তার ঘণ্টাধ্বনি বাজে
যাপিত জীবনের অভিজ্ঞান সৃজিত জীবনের সমান্তরাল
যুদ্ধ শিল্প প্রেম সমুদয় বির্নির্মিত হয় লব্ধ চৈতন্যে সত্তায়
জীবন সিঁড়ি পরিক্রমার মহান খতিয়ান

১০
প্রস্তুরযুগ

মনখারাপ করা পাথরগুলো আৎকে ওঠে
বালুচরে
কেমন করে পোহায় বলো তার বেদনা পাহাড় জানে
জল জমেছে, জল চলেছে, জলের ছলে
জল মজেছে সেই সে কবে
উজান-ভাটির খেলা ফেলে

যে কজনা পাথরছানা হাঁটছে বুকে পাথর চেপে
তারা জানে, কবির মতো উড্ডয়নে, অস্থিরতায়
সাবাড় হবার সব কাহিনী- সবাই জানে,
সভ্যতা আজ বড় বেশি মগ্ন বুঝি উরুর ধ্যানে

উজান-ভাটির সন্ধিগুলো বুঝেই বুঝি এসবখানে
ভাসায় শরীর, ভাসায় মনন, বিবেচনা
মনখারাপ করা পাথরগুলোর চারিপাশে
ঈশ্বরনামা, সরাইখানা।

১১
হ্যাংওভার

মাথা শুধু হ্যাং হয়ে আসে
কিছুতে ছাড়ে না হ্যাংওভার
দরোজায় করাঘাত হলে এখনো মনে পড়ে-
‘ভোর হলো দোর খোল খুকুমনি ওঠো রে’।
দরোজার সন্নিকটে যেতে থামি বার বার …

খুকু এখন অনেক বড়
অনেকটা সময় তার হয়েছে সংহার
ওপারে কে দাঁড়িয়ে খোলা দরোজায়
দরোজাকে নিত্য ভাবি আমার মৃত্যুদ্বার

সংক্ষিপ্ত কবি পরিচিতি:

রিষিণ পরিমল
জন্ম: ১ মে ১৯৬৬
স্থায়ী ঠিকানা: রাজনগর, হাতিবান্ধা, নালিতাবাড়ি, শেরপুর
মূলত সাহিত্যের ছোটকাগজে লেখালেখির চর্চা করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে বি.এ (সম্মান), এম.এ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি-এইচ.ডি ডিগ্রী লাভ করেন। বর্তমানে তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর-এ অধ্যাপনা করছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
অন্তঃস্রোতের মানসাঙ্ক (২০০০)
নদী জলে চৈত্রদাহ (২০০২)
শীতের অরণ্য জানে ফাল্গুন কতদূর (২০০৭)
ত্রয়ীকাব্য (২০১৬)

সম্পাদনা গ্রন্থ:
আবুল মনসুর আহমদের আয়না : বিষয় ও প্রকরণ (২০০৮)

প্রবন্ধ গ্রন্থ :
প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ও অন্যান্য  (২০০৯)
রবীন্দ্রনাথ : খেয়া (২০১১)
কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ (২০১৬)

সম্পাদিত ছোটকাগজ :
কৃশানু (১৯৮৭), কালপত্র (১৯৮৯), নিরিখ (২০১২)

মোবাইল : ০১৭১২ ৬৪৬৩১২

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E