৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জুলা ৩১২০১৭
 
 ৩১/০৭/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

রেজাউদ্দিন স্টালিন

রেজাউদ্দিন স্টালিন

রেজাউদ্দিন স্টালিন। জন্ম ২২ নভেম্বর ১৯৬২, বৃহত্তর যশোর জেলার নলভাঙা গ্রামে। পিতা শেখ বোরহানউদ্দিন আহমেদ। মাতা রেবেকা সুলতানা। কাব্যগ্রন্থ সংখ্যা ৪০, স্বকণ্ঠ আবৃত্তি ৩টি ক্যাসেট। প্রদীপ ঘোষের কণ্ঠে ‘আবার একদিন বৃষ্টি হবে’ শীর্ষক অ্যালবাম। ‘রবীন্দ্রনাথ আরোগ্য’, ‘নির্বাসিত তারণ্য’ এবং ‘ডাকঘর’ শিরোনামে প্রবন্ধগ্রন্থ। শিশুতোষ গ্রন্থ ‘হাঁটতে থাকো’ এবং ‘শৈশব’। বইপড়া, সিনেমা দেখা, আড্ডা দেয়া এবং আরামপ্রদ ভ্রমণের সখ। দেখেছেন ভারতবর্ষ, আমেরিকা, নেপাল ও চীন।

সাহিত্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমী, মাইকেল মধুসূদন, খুলনা রাইটার্স ক্লাব, ধারা সামাজিক সাংস্কৃতিক, দার্জিলিং নাট্যচক্র, পশ্চিমবর্ষের সব্যসাচী, রংপুর বজ্রকথা, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, সিটি আনন্দ আলো ও রাইটার্স গিল্ড পুরস্কার। অগ্নিবীণা ঢাকা, অগ্নিবীণা চুয়াডাঙ্গা, অগ্নিবীণা ফরিদপুর, চাঁদপুর ইলিশ উৎসব, ডায়নামিক গ্রুপ সম্মাননা, সাহিত্য বাজার সম্মাননা, টাপুর টুপুর সম্মাননা এবং ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভাসিটি ও তরঙ্গ অফ ক্যালিফোর্নিয়া সম্মাননা, বাদাম সাংস্কৃতিক সম্মাননা-আমেরিকা। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহিত্যবিষয়ক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

রেজাউদ্দিন স্টালিন বাংলাদেশের কবিতাভুবনে প্রাজ্ঞ কণ্ঠ; আশির দশকে আবির্ভূত হয়ে ইতোমধ্যে সমগ্র বাংলা কবিতায় নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন একটি স্বকীয় কাব্যভুবন। আত্মতা এবং আমিত্বই স্টালিনের সাহিত্যকর্মের মুখ্য উপজীব্য নয় বরং এক বৈশ্বিক সর্ব মানবের সংগ্রাম ও সাফল্যের ঐতিহাসিক শিল্পীত দলিল তাঁর কবিতা। আত্মপ্রীতি, দুঃখবোধ আর স্বপ্নপীড়িত বেদনা নিয়ে স্টালিন ডুবে থাকতে চেয়েছেন তাঁর অন্তস্থলে; কিন্তু সংবেদনশীল শিল্পসত্তা তাঁকে অন্তর্লোকের অতল থেকে বার বার তুলে এনেছে বহির্লোকের প্রাঙ্গণে। সময়জ্ঞান, ইতিহাসচেতনা, পুরাণস্মরণ এবং মৃত্তিকা সংলগ্নতার শক্তি নিয়ে রেজাউদ্দিন স্টালিন অতিক্রম করে যান তাঁর কালের বৈনাশিকতা আর বিভক্ততা, সময়ের নষ্ট আক্রোশ। পৌরণিক উৎস থেকে স্টালিন পৌনঃপুণিকভাবে চয়ন করেছেন তাঁর বিজ্ঞানমনস্ক ভাবনার বীজ, তাঁর কব্যাঙ্কুর। স্টালিনের কৃতিত্ব- তাঁর জাদুবাস্তবতা ও পুরাণচেতনা সমকালসংলগ্ন ঐতিহ্য এবং পুরাণকে পুনর্লিখন না করে তিনি তাকে করে তোলেন প্রতিঅর্থে সৃষ্টিশীল। সংরক্ত স্বকালের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে স্টালিনের কবিতা পুরাণ বিকিরণ করে নতুন মাত্রা, নবতর ব্যঞ্জনা। আর তিনি হয়ে ওঠেন এই উপমহাদেশের আন্তর্জাতিক কণ্ঠস্বর।

কবিতাভাবনা : আমার প্রিয় কবি

আমার প্রিয় কবি আমি নিজেই। আত্মমুগ্ধতার মতো অনন্দ কোথাও নেই। নার্সিসাস এক আত্মরতিমগ্নতা। সব সৃষ্টিশীল কবির মধ্যেই তা’ ক্রিয়াশীল। নিজেকে কবি হিসেবে গড়ে তুলতে কত যে রক্ত ঝরাতে হয়েছে- তার ইয়ত্তা নেই। ওয়াল্ট হুইটম্যান এরকমই বিশ্বাস করেন- কবিকে প্রতিটি শব্দে রক্ত ঝরাতে হয়। রাইনের মারিয়া রিলকে গোলাপের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলেন। কাঁটায় বিদ্ধ হয়ে তিনি পবিত্র প্রয়ান গ্রহণ করেন। আমিও দিনরাত্রি রাত্রিদিন আমার কবিতার শব্দ উৎপ্রেক্ষা উপমা রুপক চিত্রকল্প খুঁজতে খুঁজতে কত বন অরণ্য নদী পর্বত পাতাল আকাশ পার হয়ে যাই-তার সীমা নেই। আঘাতে আঘাতে বিক্ষত আমার পা, কষ্টে কষ্টে আরক্ত আমার হৃদয়, পিপাসায় তৃষ্ণায় কাঠ কণ্ঠনালী তবু এই যে অন্বেষণ নিজেকে খুঁজছি-নিজের প্রিয়তমাকে খুঁজছি। নেরুদার আত্মস্মৃতি কত যে বিসর্জন দিয়ে কবিতা অর্জন করতে হয়, কত অশ্রুজলে ধুয়ে দিতে হয় নিজের কবি হয়ে ওঠার স্বপ্ন। -এ হলো দেবী প্রসাদের ‘যে গল্পের শেষ নেই’ বইয়ের মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের মতো। সক্রেটিস যে বলেছিলেন-‘নিজেকে জানো’। নিজেকে জানতেই শত শত সভ্যতা ক্ষয় হয়ে গেলো কত মহাপ্রাণ আত্মত্যাগ করলো আর কত রুধিরপাতে ভিজে উঠলো হোমার, ভার্জিল, দান্তে, মিল্টন, শেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ আর মাইকেলের আত্মা। হাইনরিশ ব্যোল জানেন- কত কবিতা, উপন্যাস নাটক, আর স্বীকারোক্তি মিলে একজন কবি তার ভালোবাসার জগৎ তৈরী করে। কবি সে নিজেই একটা-বই প্রথমে সে থাকে একটা আকাশ তারপর তৃণভূমি তারপর নদী সেতুর নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে হতে একদিন একটা বৃক্ষ অবশেষে বয়সের সমান বই। আর কবি অর্থাৎ আমি নিজেই যখন বইতে রুপান্তরিত হই অর্থাৎ এক অবিনশ্বর বইতে- তখন অন্য কোনো কবি কি আর প্রিয় থাকে। সব আকর মিলিয়ে সব কবির কণ্ঠস্বর মন্থন করে আমিই তো মনসুর হাল্লাজ। লালনের আরশি আমিই তো সেই খাঁচার পাখি- নিজেরই চলাচল প্রত্যক্ষ করি। নজরুলের দ্রোহী সত্তা আমাকেই আশ্রয় করে আর আমি-জাহান্নামের আগুনে বসে পুষ্পের হাসি হাসতে থাকি। হাজার বছর ধরে পথ হেঁটে জীবনানন্দের ও আগে বনলতা সেন-এর মুখোমুখি গিয়ে বসি; আল মাহমুদের মায়ের হারিয়ে যাওয়া নোলক বনলতা সেনের কাছে আছে কিনা জিজ্ঞেস করি। আরো জিজ্ঞেস করি চাঁদ সদাগরের খোঁজে রাহমান এ দিকেই এসেছিলো- তাকে সে দেখেছে কি না? কিন্তু তাকে সে দেখেনি- কোনদিন দেখবে না আমিই এখন তার মুখোমুখি সত্য এবং অনড়। দু’দন্ডের বেশীতো আর নয়- পথ হাঁটার কি শেষ আছে- নিজের কি নাম কি গোত্র পরিচয় শুধু জানি কবি- বোর্হেস সেই কবির নামও জানতে চান না-

My name is some one and anyone
I walk slowly like one
Who comes from so far away
Who does not except to arrive.

কবির গন্তব্য- সেই গন্তব্যে কোনোদিন পৌঁছানো যাবে না। কবি তো আমি নিজেই। আমি তো আবৃত্তি করেছিলাম- তবু বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ মোর এখনি অন্ধ বন্ধ করো না পাখা। কিন্তু পাখা যে বন্ধ হয়ে আসছে, রবীন্দ্রনাথের শান্তির ললিত বাণী সুকান্তের মতো আমার কাছেও মাঝে মাঝে ব্যর্থ পরিহাস মনে হয়- কিন্তু কবি ঋত্ত্বিক রবীন্দ্রনাথের অভয়কে আমি কি করে অস্বীকার করি- কি করে বলি তুমি আমার মধ্যে অঙ্কুরিত নও- বরং আবিষ্কার করতে থাকি আমার উদ্ভবের মধ্যে কার অভয় কার আলো কিভাবে আমি আমার দুঃসময়কে আশীর্বাদ করবো। যে নিজেকেই দুঃসময়ে আশীর্বাদ করার দুঃসাহসে দীপ্ত সেইতো কবি। আমি আমার বীরত্বে মুগ্ধ -আমিই আমার প্রিয় জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি- আমি আমার সময়কে জানি- আর আমিই আমার প্রিয় কবি হয়ে উঠি-

আমার সময় গোক্ষুরের মতো বিভাজিত
মুহূর্তগুলো কালো কৃষকের পায়ের মতো ফাটা
আমার জন্ম কোনো সময়কে ইঙ্গিত করে না
এমনকি ঘটনগুলো মুহূর্তের শৃঙ্খল মুক্ত
যখন পৃথিবীতে কিছুই ঘটছে না
তখন সময় কি জিজ্ঞাসা চিহ্নের মতো থিতু
আমি কি শুধু মৃত্যুর ভয়ে সময়কে সনাক্ত করতে চাই-

আসলে আমি জানি মানব জন্মের পরিণাম ও সূত্রসমূহ:

আমার জন্মের আগে পৃথিবীতে কোনো লগ্ন ছিলো না
আমার চিৎকারই পৃথিবীর প্রথম সূচনা।

 

কয়েকটি কবিতা :


নতুন পিরামিড

ফিলিস্তিনের আকাশে চাঁদ ওঠে
                       হেলমেট মাথায়

বর্ম বুকে ওঠে সূর্য
তারারা নিঃশব্দে কাঁপে ভয়ার্ত শিশির
ধোঁয়াভারানত মেঘ চরে বেড়ায়
                         উঠোনে-উঠোনে
রক্তের নদী মরে পড়ে থাকে বিছানায়
মাথার উপর কাকেরা চেঁচায়
চিলের চিৎকারে ছিঁড়ে যায় দিগন্ত
বোমারু ঈগল আগুনের ডিম দেয় শূন্যে

কোথাও কোনো আর্তনাদ নেই
ধ্বংস আর হত্যা স্বাভাবিক করে দিয়েছে নিয়ম
বরফ আর আগুনের স্বাদ শিশুদের জিহ্বায় এক
জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে শুধু স্মৃতিস্তম্ভ

মানুষের মাথার খুলির পিরামিড
                 সম্পূর্ণ নতুন
তাকে এখনো পাহারা দেয় স্ফিংস


এক জীবন

আমাদের রাশি রাশি আকাশ ছিলো
উঁচুনিচু একগাদা মাঠ
শস্য ছিটানো তারা
মুঠো মুঠো উঠোন
অনেক অন্ধকার ছিলো আমাদের
ভেসে বেড়ানো অসংখ্য চাঁদ
আর পোষা গাছগাছালির দৈত্য
চেনাজানা অনেক লোক ছিলো, বন্ধু
ব্যাগভর্তি পাঠশালা ছিলো
পায়ে হেঁটে অনেক দেরীতে
বাড়ি পৌঁছানোর পথ

এখন অন্ধকার বলতে কালো পর্দা
উঠোন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের লন
মাঠ এক চিলতে বিপজ্জনক ছাদ
আকাশ বহুতল ভবনের কাচের দেয়াল
চাঁদ হ্যালোজেন লাইট
গাছ অভিধানের প্রাগৈতিহাসিক অক্ষর
লোকজন বলতে ভিনগ্রহের লক্ষ লক্ষ প্রাণী
বন্ধু সম্বোধন হাস্যকর, গ্রাম্য
এখন পাঠশালার ব্যাগভর্তি অচেনা পাথর
দ্রুতগতিবাহন, খুব কাছেই ফ্লাটবাড়ি
কিন্তু সেখানে পৌঁছুতে শেষ হয়ে যাচ্ছে
এক জীবন


প্রতিবাদহীন পৃষ্ঠা

এইসব দিন প্রতিবাদহীন পৃষ্ঠা,
গা বাঁচিয়ে চলা মধ্যবিত্ত গল্পে-
নারীদেহ আর জাদুবাদীদের বিষ্ঠা,
বুদ্ধিজীবীরা ভীষণ তুষ্ট অল্পে।

ধৃতরাষ্ট্রের রাজ্যসভায় ভীষ্ম
দিচ্ছে নতুন গণতন্ত্রের সংজ্ঞা,
কর দিলে কেউ হয় না কখনো নিঃস্ব-
তাতে দূর হবে আপৎকালীন মঙ্গা।

একমত যত দ্রোণ আর কৃপাচার্য,
প্রাসাদপ্রবাসী কবিদের নেই শঙ্কা।
সেবাদাসরাই আচার্য – উপাচার্য,
বিভীষণগণ বিলিয়ে দিচ্ছে লঙ্কা।

নিম্নবর্গ ব্রাত্যজনের মর্গে
গজিয়েছে কিছু ডালপালা শেষকৃত্যে;
মৃত্যুর পর বিশ্বায়নের স্বর্গে-
একসাথে যাবে, ভেদ নেই প্রভু-ভৃত্যে।

উপনিবেশের তেলরঙে আঁকা চিত্র,
অমেরুদণ্ডী প্রাণীরাই উপজীব্য।
ক্রেতারা কঠিন গণতন্ত্রের মিত্র,
গণমাধ্যমে তাদের কথাই দিব্য।

এইসব দিন প্রতিবাদহীন অস্থি,
ইতিহাস চিপে বের করে আনা রক্তে-
কণ্ঠ ভিজিয়ে পাচ্ছে কিছুটা স্বস্তি;
ভাবছে থাকবো চিরকাল বসে তক্তে।

কিন্তু সময় নিষ্ঠুর নিরপেক্ষ,
যার যা প্রাপ্য – তাই হবে নথিভুক্ত-
যিশু আর দুই চোরের গীতিআলেখ্য;
মৃত্যুর পর সবাই স্বাধীন-মুক্ত।

 

Save

Save

Save

Save

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E