৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ২২২০১৬
 
 ২২/১২/২০১৬  Posted by

কবি পরিচিতি

রেজা রাজা

রেজা রাজা

রেজা রাজা। জন্ম ১৮এপ্রিল ১৯৭০ খৃষ্টাব্দে মানিকগঞ্জে। পড়ালেখাঃ বি।এসসি।(অনার্স) এম। এসসি (পদার্থবিদ্যা) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ মেঘলোকে শহর ভেসে যায়।
অনুবাদ গ্রন্থঃ মিলান কুন্ডেরার Laughable Loves.   

রেজা রাজা’র একগুচ্ছ কবিতা টানাগদ্যে


কবি-১

সকল শব্দেরা পথে ঘাটে বাজারে গলিতে তুমুল মুখরিত হলে নির্বাক চেয়ে রয় নিখাদ নির্জনতা প্রত্যাশী নিঃসঙ্গ কবির বিহবল চোখ। দুরালাপনীর লাল তারে ছুটে চলে অনঙ্গ শ্বাস, পল্লবের নিবিড় কাঁপন, গরম নলের ভেতর হুহু হাওয়া। কৈশিক নলে ভরে তরল আগুন মেঘদূত নির্লিপ্ত মেপে যায় প্রত্ন-প্রেম, লঘু বায়ুচাপ। সিডর সিডর, উপকুল জুড়ে রুদ্ধশাস ভয়ানক ভাঙ্গা-প্রেম, আচমকা ঝঞ্জার রুদ্র-রুপ। তেল-ঝুলে একাকার গলির সরু কটিদেশ, ম্যানহোলের করুন সঙ্গীত। বিবিধ পসরা মেলে কেজি দরে বিকিকিনি প্রাত্যহিক মূল্যবোধ, জটিল পিরিতের ক্লেদ, রক্ত নোনা ঘাম, সুমধুর কথার ফুলঝুরি, মুকুট বিড়ির কুন্ডলিত  ধোঁয়া্য়, আশ্চর্য অলীক বিপনন।
 


কবি-২

গোধূলিও শেষ হয়ে এলো। বৈশাখি প্রথম বৃষ্টি আগুনে গন্ধ নিয়ে এলে আমি তার ঘ্রাণ নিতে সাতমুখী বিল পার হই; মহাজ্ঞানীরা মুখ টিপে হাসে। দেহে কিলবিল ঘোরলাগা বর্ষা দু’কুল ছাপালে সে তাঁর উদোম সুপার মুন ঘষে ঘষে চকমইক্যা আলো জ্বালায়; আমি পতঙ্গ-ঝাঁপ দিয়ে সযত্নে শহীদের খাতায় নাম নিবন্ধন করি। জ্ঞানীরা দাঁত খিঁচিয়ে হেসে পরিতৃপ্ত হয়। সর্পের ফনার ছায়ায় মরুদ্যানে লালিত-পালিত প্রত্ন-ভালোবাসা নস্টালজিক হলে বিগত-যৌবনা প্রাক্তন প্রণয়িনী অভিমান ভূলে বিবিক্ত আমাকে চুম্বন দিতে উদ্যত হতেই সে তার কুড়ি বছরের রুপ-যৌবনে প্রত্যাবর্তন করে। আমি তাকে আমার এক হাজার তিনশ’ বিয়াল্লিশ বছরের পুরনো উলু-খাওয়া পান্ডুলিপি উপহার দিলে মহাজ্ঞানীরা মহানন্দে হাত-পা বেঁধে আমাকে মহানন্দার করাল স্রোতে ফেলেদেয়।


কবি-৩

শুকনো পাতায় হাওয়া-গাড়ি নিরন্তর সিটি বাজিয়ে চলে। কুয়াশার চিতল-প্রাণ কবিতার বাতায়নে সেরেনাদ গায়। চরাচরে হল্লার রাত-সংগীত মৃয়মান হলে হিমেল হাওয়ায় ভেসে জানালায় একরাশ বিষন্ন ভোর ঝুলে থাকে। খানিকবাদে ঝলমলে সোনালি রোদের তেজ গ্লানির বরফ ভেঙ্গে ভরে দেবে কবির পানপাত্রের আশ্চর্য মদিরায়। কবি তখনো অলীক অন্ধকারে মজ্জমান, দিকভ্রান্ত দিশাহীন, বিপন্ন প্রান-মন। উপায়হীন দেহের রক্ত কণিকা ঘষে ঘষে জ্বালিয়ে দিলো অগ্নিশিখা, ঝলমলিয়ে ওঠলো চিরায়ত প্রকৃতি।


কবি-৪

ঘোরলাগা মধাহ্নের নির্জন নৈঃশব্দ্যে কাঁপে অজস্র পল্লবিত শাখা। আলোক-রশ্মির দিঘল সুতীক্ষ ফলা সে-ঘোরে কুয়াশার জল ঢালে। পথের দু’ধারে দীর্ঘ তরুর সারি বিমূর্ত চিত্রল বক্ষে অনঙ্গ চোখে চেয়ে থাকে। নীরব জমিনে বিলিয়মান গাছের কাণ্ড যেন কলোনেড; তৈরি করে আশ্চর্য তোরণ উড়িয়ে কেশ নিবিড় সবুজ পল্লবে পল্লবে। উড্ডীন পাতা, শাখা গলাগলি করে তোরনের অন্তে নন্দনতত্ত ঝাড়ে। মোহন বর্ণালী ভ্রমনশীল একাকী কবির চোখে স্বপ্নের কুহক আঁকে।


কবি-৫

০১.
বাঙ্গালী নিকেরীর চিরকালীন মৎস্য-বিতান থেকে কবি তুলে আনেন অপার সৌন্দর্য। ক’টি বেহালা, আরো কতো বাদনযন্ত্র গেয়ে যায় সে-বিতানের সমবেত গুঞ্জনে সঙ্গীতে।
 
০২.
নিঃশ্বাস থামিয়ে দেয়া সৌন্দর্যের পার্কের শরীর বেয়ে বয়ে চলে রজঃশীলা অপার্থিব নদীর রক্তজল, বয়ে যায় ছলাৎ ধ্বনিতে কবির পরাণ ঢেউয়ে নাচে, সুর মেলায় তার ঘুঙ্গুরের আওয়াজে।

০৩.
লন্ঠনের ফুরিয়ে আসা জীবন-প্রদীপ দেখে চৌদিকের অন্ধকারগণ সহজ শিকার পেয়ে যুৎ করে ঘন হয়ে আসে।পরষ্পর মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে, মাথা নাড়ে। শিশির কণারা দুরুহ চোখের জলে ভেসে বিপন্ন হয়। নির্জন নৈঃশব্দ্যে কবিই নিরব দর্শক শুধুই সাক্ষী ।


কবি-৬

সোনারং নারীদেহের মতোন একরাশ বালিয়াড়ি চিৎ হয়ে ঘুমোয়। আচমকা খসেপড়া ধসনামা বালুরাশি গড়ে তোলে মিহিন কটিদেশ মরুর বুকের মৃত ঘাস ও ছায়া মসৃণ উরুর আলোয় সঞ্জীবিত হলে কবি খুলে বসে তার প্রিয় কবিতার খাতা। বুকের জমিন তার অন্ধকার মুখে দেয় আলো।বহুদূরে বালু-মরীচিকা ইশারায় ডাকে।


কবি-৭

এ-কেমন দৃশ্য নাকি দৃষ্টি বিভ্রম? অলীক যৈবতী ঢেউ দোলে কবির চোখে; নিকট অগ্নিশিখার পাশে কাচের জানালা গলে গলে হয় যে কাঁপা কাঁপা তরঙ্গ; তরঙ্গের ভেতর দিয়ে দেখা প্রতিবেশী পত্র-পল্লব-শাখা হেলে দোলে নেচে গলে যায়; কাচের ভেতর দিয়ে যুবতির সুশ্রী সবুজ মুখ অষ্ট-বক্র হয়ে দুরুহ শিল্প হয়ে যায়; পল্লবের গলিপথে সূর্য-রশ্মির যাতায়াত কবির জানালায় এক ধাতু মুদ্রা হয়ে নাচে।   


কবি-৮

মধ্যরাতের নৈঃশব্দ্যে কুয়াশামোড়া কষাইবাড়ি মোড়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে কৈফিয়ত তলব করে কবি। প্রবঞ্চ সময় পাছায় সিলমোহর মেরে চলে। তোমরা অচেনা কবিকে এক মুঠো ভাতে কাপড়ে মার? মুখরা সময় হাটে ঘাটে উদোম শরীর দুলিয়ে চলে; নির্জন নৈঃশব্দ্যের মহানুভবতার আশায় কবি তার সফেদ ফতুয়ার পকেট থেকে রাশি রাশি পায়রার বাকবাকুম উড়িয়ে ছড়িয়ে দিতে থাকে। তোমাদের শহুরে করতালির কষাঘাত বিপর্যস্ত করে তার মাদুলি ছিড়ে নিলে কবি সাইপাড়ার তালাবে গিয়ে শাড়িপড়া খলসের ঝাঁকে মিশে যেতে থাকে।জল-দেবতা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।


কবি-৯

ভালো লাগেনা আমার। আমার এ বায়ু-বার্তা্য তার গোপন তৃষ্ণা-প্রদেশের বর্ণহীন জল-দ্রবনের নিরন্তর ধারা চুইয়ে গেলে তার শব্দে ইলশেগুঁড়ি নামে। তার অদৃশ্য শিৎকার কামনার অদ্রিশিখরে বসে থাকা লোভী মাছরাঙার হঠাৎ ঝাঁপ হয়ে জলে মজ্জমান কবির বুকে আছড়ে পড়ে। মাধুরীর সোনারং কোমলাঙ্গ জিউসের বাহুতে বন্দী হলে শৃঙ্গা্রের তুঙ্গে নক্ষত্রেরা জ্বলে জ্বলে খসে পড়ে। চৌদিকে ঢেউয়ের লুটোপুটি, হল্লাকরা বাতাসের অন্তহীন উদ্দাম যাত্রা, বিশাল টাওয়ার ধসে পড়া। মেনকার মথিত যৌনাঙ্গে বিশ্বামিত্রের উষ্ণ রেতঃ ঝরে।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E