৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
সেপ্টে ২০২০১৭
 
 ২০/০৯/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

রাসেল রায়হান

রাসেল রায়হান

রাসেল রায়হান। জন্ম ৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৮; বাগেরহাট। ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স। বর্তমানে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত। প্রকাশিত বই : সুখী ধনুর্বিদ [কবিতা; প্লাটফর্ম, ২০১৬] বিব্রত ময়ূর [কবিতা; প্রথমা, ২০১৬] তৃতীয় অশ্বারোহী [কবিতা; জেব্রাক্রসিং, ২০১৭] ই-মেইল : rasahmed09@gmail.com

কবিতাভাবনা
এই যে বেঁচে আছি, খাচ্ছি, কাজ করছি, ঘুমাচ্ছি; তেমন করেই কবিতা লিখছি। বেঁচে থাকার মতোই কবিতা আমার কাছে সাবলীল একটি বিষয়। তবুও কবিতার যে আলাদা বিশেষত্ব আছে তা হলো বেঁচে থাকার জন্য আমাদের বহু জায়গায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয়, ইচ্ছায়, কিংবা অনিচ্ছায়। কবিতা আমার কাছে সেই বিলিয়ে দেওয়ার পরের সান্ত¦নাটুকু। উপশম। যেসব কথা আমি সরাসরি বলতে পারি না, সেগুলি কবিতায় অনায়াসে বলে দেওয়া যায়, বলে দিই। উদাহরণস্বরূপ, ঘৃণার কথা। কিংবা প্রেমের কথাও। শিল্পের ঢঙে সত্যি কথা বলা অনেকটা নিরাপদ বিষয়।

কবিতায় অনুষঙ্গ হিসেবে আমাকে খুব আলাদা কিছু খুঁজে নিতে হয় না। নিজের জীবন পড়ে আছে; নিজের শৈশব, কৈশোর থেকে নিই। এমনকি নিজেরই কল্পিত ভবিষ্যৎ থেকেও নিই। সামনে পড়ে আছে অজস্র মানুষের জীবন, যারা আমার সামনে হেঁটে বেড়াচ্ছে, আনন্দ পাচ্ছে, বিষাদগ্রস্ত হচ্ছে। স্বার্থপরের মতো তাদের থেকে নিই। আইডিয়া ছাড়া কবিতা লিখি না আমি। এসব জীবন থেকে আচমকা আইডিয়া আসে, যেটাকে কবিতার জন্য যোগ্য মনে হয় সেটি নিয়ে নিই। লিখি। সত্যি কথা হলো, আমার ভিতর কবিতা নিয়ে কোনো আহামরি কিংবা নাক উঁচু ভাব নেই। লেখা ছাড়া আমি আর কিছুই পারি না। একদম না। চেষ্টা করে দেখিনি, তা নয়। একসময় ক্রিকেট খেলতাম। অনেকেই জানে না, একটা ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় পর্যন্ত করেছি, সেই নাটক আর আলোর মুখ দেখেনি। ব্যবসার চেষ্টা করেছি, সেখানেও ফ্লপ। হয় আমি পারি না, কিংবা ভাগ্য আমাকে অন্য কোনো ক্ষেত্রে সহায়তা করেনি। অন্যের সাপোর্ট পাইনি। বরং বিরোধিতারই সম্মুখীন হয়েছি। সেটা অবশ্য এখনও হই। প্রকাশ্যে কম, অপ্রকাশ্যে বেশি। কিন্তু কবিরা তো ইশারার ভাষাও বোঝে। সুতরাং গোপন করা অত সহজও নয়। যদিও নিজের কবি-খ্যাতি কিংবা অভিধা নিয়ে আমি খুব তৃপ্ত নই, বিচলিতও নই। আমি লিখে আনন্দ পাই। পরবর্তীতে সেটাকে সংক্রামক রোগের মতো ছড়িয়ে দিতে চাই সর্বত্র। সবাই জানে, তাতে আনন্দ আরও বাড়ে। আর আনন্দ ছড়িয়ে দিতে অস্বস্তিও নেই। সুতরাং সহজ করে বললে, কবিতা আমার কাছে স্বার্থপরতা। নিজের আনন্দ পাওয়ার স্বার্থপরতা। প্রতিষেধকও।

কবিতাভাবনা নিয়ে আর খুব বেশি কিছু বলতে ইচ্ছে করে না। তারচে কবিতা লেখা সহজ এবং নিরাপদ।

কবিতাগুচ্ছ


পরম্পরা

মাছের লেজের ঢঙে, মাছির ডানার ঢঙে জেগে উঠতেন আমার বাবা। তারপর ছুটতেন বাজারে। রাতে যখন ফিরে আসতেন মাছ ও মাছির গন্ধ নিয়ে, আমি ভাবতাম, আহা, একদা কি চন্দনের ঘ্রাণ নিয়ে আসতে পারেন না? (তখন মোটেই জানা ছিল না, সেসব নিয়ম অনেক আগে উঠে গেছে, আজকাল শুধু মৃত্যু এই গন্ধ নিয়ে আসে)। আজ রাতে যখন বাবার শরীর ভর্তি চন্দনের ঘ্রাণ, ভাবছি, মাছ ও মাছির গন্ধ আরও বেশি ভালো ছিল!

২.
আমি যখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি, ফিস চাইতে গেলে বাবা আমার দিকে ম্রিয়মান ভঙ্গিতে তাকিয়ে ছিলেন, যেন তার মনে পড়ে গেছে গত রাতের কথা, যখন আমি মোমের আলোয় চেঁচিয়ে পড়ছিলাম, ‘ফিস মানে মাছ, ফিস মানে মাছ…।’

তিনি মাছ কুটছিলেন। সেই মুহূর্তে আমার দিকে মনোযোগ দেওয়ার ফলে তার একটি আঙুল ছিন্ন হয়ে যায়। যেহেতু ফিস দেওয়া হচ্ছেই না, কিছু অ্যাডভেঞ্চার করা যাক ভেবে আমি সেই আঙুল রঙিন পেপারে মুড়ে স্কুলে জমা দিয়ে দিলাম।…এইভাবে দশম শ্রেণি পর্যন্ত দশ ক্লাসে দশটি আঙুল জমা পড়ে স্কুলে! স্কুল ছাড়ার আগে ফিজিক্স-টিচার দেখলাম শল্যচিকিৎসকের ভূমিকায় নেমে গিয়ে কাগজে মুড়িয়ে রাখা পুরাতন দশটি আঙুল আমার দুহাতে লাগিয়ে দিলেন। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আমার সন্তানকে বিশ ক্লাস পড়াতে পারব। সেও নিশ্চয়ই তার সন্তানকে পড়াবে ত্রিশ-ত্রিশটি ক্লাস…


পুনরায়াপেক্ষিকতা

মাছরাঙাটিকে ক্ষুধার্র্ত দেখে জলের উপরিভাগে ভেসে থাকবে একটি মাছ। ভাববে, আমাকে খাক। মাছরাঙাটি ভাববে, বেচারা আকাশ দেখছে, দেখুক। অন্য কোনো শিকার ভেসে ওঠা পর্যন্ত ক্ষুধা সহ্য করা যাবে।


বিবর্তন

মানুষ বারবার আয়নায়
নিজেকে দেখে। দেখতে দেখতে
ক্রমশ সে গুলিয়ে ফেলে—
কোনটা তার ডান হাত, কোনটা
বাঁ-হাত।
একদিন দেখা যায়
প্রতিবিম্বের নিখুঁত আচরণে
অভ্যস্ত হয়ে উঠছে সে।


আয়ুর্বেদ

আমার সর্বকনিষ্ঠ কন্যাটির একেক ঝলক হাসিতে আমার আয়ু দুবছর করে বেড়ে যায়। আমিও আয়ু বাড়ানোর লোভে তাকে হাসানোর নানাবিধ কসরত করতে থাকি। নিজের বাড়িতেই বানানো এই যে সার্কাসপার্টি, যেখানে ক্লাউনের দায়িত্ব আমার; দায়িত্ব চতুর দর্শকের—সেও আমার আয়ু বাড়ানোর লোভেই। নিজের সমস্ত মৌলিক জ্ঞান, বই আর অন্তর্জাল-লব্ধ জ্ঞানসমূহ কাজে লাগাই তাকে হাসানোর জন্য।

সেদিন দেখলাম, কোনো এক যুবকের হাত ধরে আমার সর্বকনিষ্ঠ কন্যাটি হাসছে। আর টের পাই, থার্মোমিটার বেয়ে সাতান্ন বছর নেমে যাচ্ছে আমার আয়ুর রেখা। মনে আছে, একদিন আমিও কারও আয়ু কমিয়ে দিয়েছিলাম এভাবেই—সাতান্ন বছর!


চায়ের দোকান

ভাবছিলাম অদ্ভুত সেই চায়ের দোকানের কথা—একশ সতের পদের চা পাওয়া যেত যেখানে? তুমি বলছিলে, সব মিথ্যে! এসব নিতান্তই বিজ্ঞাপন। অত রকম চা নিশ্চয়ই বানানো সম্ভব নয়! আমরা পরীক্ষা করার জন্য একেকদিন একেকটা চায়ের অর্ডার দিতে শুরু করলাম।

একশ ষোল পদের চা আমরা পেয়েছিলাম। জ্যোৎস্নার সাথে অ্যালোভেরার চা দিতে পারেনি কালো দোকানদার। মনে আছে কি না, একটা চা খেয়েছিলাম, জলপ্রপাতের সাথে মৌমাছির ডানার গুঞ্জন, কিশমিশ আর আমলকিমিশ্রিত। আরেকটা চা ছিল, যেটা খেলে ক্ষুধা নিবারণ হয়। সেই এক কাপ চা পানের পরবর্তী এক সপ্তাহ আমরা আর কোনো ক্ষুধা বোধ করি নি।

ভাবছি এবার শীতের ছুটিতে পৃথিবীতে যাবার সময় ঐ চা বানানোর পদ্ধতিটা শিখে যাব। তারপর আমরা পৃথিবীতে একটা ক্ষুধা নিবারক চায়ের দোকান খুলে বসব।


সুবেহতারা

জাফরানে লিখে রাখা শুশ্রষাময় এ মাছরাঙা
এখনো তাকিয়ে আছে—তোমাকেই প্রিয় মাছ ভেবে।

সামঞ্জস্যহীন হাওয়া কেটে—ভেসে, সুবেহতারা,
যে করুণ সুর আসে, তোমার ওই ভ্রুভঙ্গি ডেকে
আনছে তাকেই! তবে ডাকাতসদৃশ মেঘ থেকে
তির্যক বিদ্যুৎ ছিটকে এসে তোমার আঙুলেই
বিঁধেছিল; আর তুমি ভেবেছিলে ধেয়ে আসা কারো
দাঁত—যার ছল ছিল ভালোবাসা। যুদ্ধফেরত
সৈনিকের শিরোস্ত্রাণাহত আঁচড় আর আচরণ!

বলতে চেয়েছি বহুবার, ওই কামারশালার
মালিক ছিলাম না আমি, যেখানে তৈরি হচ্ছে এই
শিরোস্ত্রাণ, টকটকে হিংস্র হচ্ছে কোনো অবিরাম
ব্যবহারযোগ্য খঞ্জর—শেষমেশ উজ্জ্বলতায়
ফিরে আসা উৎসবমুখর ডানাসমূহ কেটে
দিতে, সুবেহতারা, প্রতিনিয়তই উদ্যত যার
কণ্ঠার হার। আমার অপরাধ হতে পারে এই
সহস্র বছর পরেও তার ঝংকার শুনতে পারা;
আদিম এ রাত্রিতে রাজকীয় মোরগের পাশে
শয্যা পেতেও পরবর্তী উৎসবের দিনে তাকে
প্লেটে সাজাতে কুণ্ঠাবোধ না করা।
আমার অন্তিম
ইচ্ছাকৃত অপরাধ, অনাহূত মেঘের আড়ালে
স্থবির লুকিয়ে থেকে টের পাওয়া—প্রিয় ভঙ্গিতে—
তোমার আঙরাখার ঘূর্ণী আর ঘুঙুরের লোভ।


১৯৭০

আমার বাড়িতে একটি পুরনো গ্রামোফোন আছে। আমার পুত্র মাঝে মাঝেই সেটা চালিয়ে একমনে বসে থাকে। তার প্রেম এবং বেদনার প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষী এই গ্রামোফোন। একেকটি কলম্বিয়া গ্রামোফোনের ডিস্ক যখন ঘোরে, গ্রামোফোনটি জানে না, আমার পুত্রের সমস্ত হৃদয় তার সাথে ঘূর্ণ্যমান হয়।
যেমন আমার পুত্র জানে না, আমার সমস্ত হৃদয় নিয়ে তার ঘোরার ভঙ্গি।


বেবিসিটার

ঝাপসা কাচে লেপ্টে আছে প্রাচীন মোম; তাই ওপাশের তুমি স্পষ্ট নও, মাতা মেরি। মার্বেলের মেঝেতে শুয়ে থাকা সফেদ যেই শিশুটির অনন্ত কান্না শুনতে পাচ্ছি, যাকে আমি নিজ-নামে চিনতাম—তাকে পর্যন্ত চিনতে কষ্ট হচ্ছে। শুধু শুনতে পাচ্ছি চিরহরিৎ কোনো বৃক্ষের সান্ধ্যসঙ্গীত, তার স্বপ্নের মর্মার্থ ব্যাখ্যা করা এক বৃদ্ধের গোঙানি, আর্তস্বর, আর বাতাবিলেবুর বনে খরগোশের নরম রোমসদৃশ শাদা তারার আহ্বান—ঘন্টাধ্বনির কর্কশ শব্দের সাথে সাথে যে গূঢ় ডাক তীব্র থেকে তীব্রতর হয়।

সেই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে উড়ে যেতে থাকে প্রতিবিম্বময় অজস্র বুদবুদ ও বোরাকের ডানা। অনন্তের গির্জায় শুয়ে শুয়ে আমি দেখতে থাকি একজন নিঃসন্তান ফিলিস্তিনি বেবিসিটারের করুণ মুখ


দর্জি

…তারপর তিনিও জানলেন সেলাই মেশিনের বেদনা।

—আমাদের পরিধেয় জামায় লেগে আছে সতের হাজার তেরটি
রেশমের বিদীর্ণ খোলস আর তিনজন দর্জির দীর্ঘশ্বাস।

কে না জানে, রেশমের প্রতিটি উড়াল আর দর্জির আলাদা আলাদা
সেলাইগুলির উহ্য গল্প থাকে—
প্রতিটি ফোঁড় বলে দেয়, তারা কেমন আছে

১০
প্রতিবেশি

আমাদের এক প্রতিবেশি ইন্ডিয়া চলে গিয়েছিল। তখনও সব বাড়ি ইলেকট্রিসিটি পৌঁছায়নি। চুলায় ভাত চড়িয়ে, ঘরে কুপি জ্বালিয়ে তারা চলে গিয়েছে। আস্তে আস্তে ভাত পুড়ে গন্ধ ছড়াতে লাগলে আমরা গিয়ে টের পাই, তারা নেই। বাইরে তখন প্রচলিত প্রজ্জ্বলিত জ্যোৎস্না সংক্রামক রূপ নিয়েছে

…এখনো কোনো রাতে বন্ধুর বাড়ির চুলায় ভাত চড়ানো দেখলেই ভয় হয়। আবারও কি ভাত পুড়ে যাবে? পোড়া ভাতের সাথে জ্যোৎস্নার গন্ধ ভয়াবহ ব্যাপার

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E