২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ফেব্রু ০৫২০১৭
 
 ০৫/০২/২০১৭  Posted by

রাজা হাসান-এর কবিতা

রাজা হাসান

রাজা হাসান

সুদূর

আজ হেমন্তের সন্ধ্যায় যখন আচ্ছন্নতা, যখন নিমগ্নতা যখন আয়নার প্রতিবিম্বের মতো মুখোমুখি- তখন মনে হলো, স্বপ্না দাশের সঙ্গে আমাদের কোনো ছবি নেই। আমাদের বন্ধুদের ছবিতে স্বপ্না দাশ অনুপস্থিত। অনেকবছর আগের আমাদের সব ছবি এখন হলদে ম্যাটমেটে বিমর্ষ। ছবিতে বিস্মৃতি কীভাবে আসে? খুঁজতে খুঁজতে নিঃস্বতা… ব্যাখ্যার ওপার থেকে গল্প শুরু হয়। এখন আত্মপক্ষ সমর্থনের অবকাশ নেই। আলোরও রূপান্তর ঘটে গেছে। অলিগলির ভিতর দিয়ে পথ এগিয়ে গেছে… হেমন্তের অন্তর্বয়ানের মতো স্বপ্না দাশ শেষ পর্যন্ত সুদূর অস্পষ্টতায় জড়িয়ে গেল…

অপারগতা

আমি যদি স্বপ্নে তার হাত ধরি এবং বলি অনিশ্চিত প্রতিদিনের কথা আর আমার ভিতু আচরণের কথা আর আমার নিরুদ্দেশ প্রবণতার কথা- তবে তার কাছে খুব বিরক্তিকর মনে হবে? এই ঘসটানো ধারাবাহিকতা কীভাবে অস্বীকার করবো? সমুদ্র ফেনার মতো উদ্বেলতা নিয়ে যারা গভীর সুখ অন্বেষণে দরোজা বন্ধ করে দেয়- তাদের আমি চিনি? নিজের ভিতরে চাপা পড়ে থাকা কফিনের স্তব্ধতা যা ক্রমশ পরিব্যাপ্ত হতে থাকে- যা দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার আলেখ্য। বিড়ালের ঝিমুনির ভিতর দিয়ে আমার অন্যমনস্কতা অলিগলির চিত্রময়তায় স্থির। আমার অস্তয়মান কথাবার্তা হয়তো কোনোদিনও তাকে জানাতে পারবো না…

অনুপস্থিতি

এবার শীতে আবারও তোমাদের সেই রেলকলোনিতে গেলাম। কত বছর আগে তোমরা এ কলোনি ছেড়ে চলে গেছ, তোমাদের প্রতিবেশীরাও আজ আর কেউ নেই। শীতের শেষবেলায় মনে হয় ‘অন্ধের স্পর্শের মতো’ সবকিছু হাতড়ে দেখি। সূর্যাস্তের আলোয় পরিত্যক্ত রেলপথের পাশে ঝাঁকড়া কড়ইগাছগুলো শূন্যতার স্বপক্ষে আজও প্রাসঙ্গিক। রেলকোয়ার্টারের দেয়ালগুলো যেন প্রতিধ্বনির রূপান্তর। চন্দ্রগ্রস্ত সবকিছু মুছে গেছে- এখন শুধু অনুপস্থিতি…

পাহাড়ের দিনরাত্রি

ফুরিয়ে যেতে যেতে আমরা এতদূর এসেছি। পাহাড়ের গায়ে সাদা মেঘ, আদিবাসী গ্রাম, ঢালু পথ, আদিগন্ত নির্জনতার ভিতর ছড়ার একটানা জলশব্দ আমাদের আত্মউন্মোচনের পৃষ্ঠাগুলো উল্টে দেবে? আমাদের গোপন ঈর্ষা, পরস্পরের প্রতি ভিতরে ভিতরে শানানো ছুরির ধার আজ ভোঁতা হয়ে এসেছে। উদাসীন ঝরে-পড়া শালপাতা আমাদের অনেকদূর উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে। দিস্তা দিস্তা কাগজে ছাপানো চাকরির আবশ্যক কর্মসূচি নির্দেশনা কত তুচ্ছ মনে হয়। আমাদের ভারি জুতো আজ যাবতীয় অগ্রাহ্যের শেষ সীমানায় আমাদের পৌঁছে দিতে পারে। বোতলের মুখ খোলা থাক, ছিপি আটকানোর প্রয়োজন নেই, যেন নিজেকে অতিক্রম করে নিজের পায়ের কাছে ভিখিরির মতো বসে থাকতে পারি। সূর্যাস্তের বিপরীতে হেঁটে যাওয়া ঐসব আদিবাসী মেয়েদের পোশাকের গাঢ় রঙ, নির্ভার চলন আমাদের ধূসরতা ও স্থবিরতাকে প্রকটিত করে দিচ্ছে…

ক্লান্তি

অসুখের দিনগুলোতে ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম-দুঃস্বপ্ন; অবচেতন অস্পষ্টতায় শুধু ভয়। কোথায় যেন ঘুণেধরা বন্ধ দরোজা, পোড়োবাড়ির ভেজা ভেজা ভ্যাপসা গন্ধ ঘরের দেয়ালের কুলিঙ্গির ভিতর নেভা মোমবাতি। তখন বিকেলের শেষাংশ রক্তিম আভায় বাইরের দেয়ালে লেপ্টে ছিলো। অনেক ক্লান্তি পেরিয়ে আজ তোমার কথা ভাবতে হচ্ছে। বিচ্ছিন্নতায় কেমন অর্থহীন অনুভূতিসকল। সেইসব দূরবর্তী সন্ধ্যাগুলোর অনুরণন আমরা কোথাও পৌঁছে দিতে পারিনি…

শীতঘুম

বিকেলের দূরত্ব বোঝে কুয়াশাম্লান আয়নাগুলো। যোজন যোজন ব্যাপ্ত ঘুম, আত্মবিস্মরণ – তার চোখের সমাচ্ছন্ন সুদূর ছায়ায় আরেকবার ফিরে এখা। চিঠি লেখার অন্তরঙ্গতায় লিখে রাখি তোমাদের বৈকালিক চায়ের টেবিলের সম্মোহন প্রতিভাস। গন্ধে নুয়ে আসা লেবুপাতায় বৃষ্টির ফোঁটা – শ্যাওলা স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালে ঝোলানো লেটারবক্স কী-যে লাল। ঐখানে নিরুদ্দেশ যুবকের আর্তস্বর জ্যোৎস্নার অসহ্য নীরবতায় ডুবে গেছে। গাছে গাছে আরও অনেক নতুন পাতার আসন্ন সংকেত জেনে গেছে তোমাদের বাগানবাড়ির নিদ্রাহীন পাহারাদার। আমি চাইনি শীত ঋতুতে ভেড়ার লোমের উষ্ণতায় আমার কবিতাগুলো প্রাসঙ্গিক হোক। শবাচ্ছন্ন আমাকে প্রামাণ্য করেছে। তোমার জাতিস্মর জাগরণ আমি পাঠযোগ্য করতে চেয়েছিলাম…

সংবেদন

যেসব প্রেম আমাকে নির্জনতা চিনিয়েছিলো, ছায়ার ভিতর কীভাবে মিশে থাকে বিষাদ – মন্থরতা হেমন্তের প্রতিচিত্র হয়ে পোড়োবাড়ির দেয়ালে বিছিয়ে থাকে। গনেশ পাইনের চিত্রিত চিঠিতে পেঁচার অপেক্ষা – যা অনেক শীতরাতকে ভাবতে শেখায়। মফস্বল শহরের দীর্ঘ পরিভ্রমণ, ছায়া থেকে অনেক ছায়ারেখা, অনেক ঝাঁকড়া গাছের নিচে বৃষ্টির ফোঁটা, অনেক মগ্ন সুর ও খোলা জানালার আচ্ছন্নতা, জ্যোৎস্নায় পুকুরের নিস্পন্দ জলে কয়েকটি রাজহাঁসের ভেসে থাকা। উঠোনে শুকোতে দেয়া শাড়ীতে ম্লান রোদের ভাষ্য – পাঠযোগ্য হওয়ার আগেই যা হারিয়ে যায় এবং বিমূর্ততায় নির্মিত হয় নিঃসঙ্গতার নিমগ্ন নীরব বার্তা …

দেখা না দেখা

তুমি এমন অনুগত ভঙ্গিতে মুখ তুলে তাকিয়ে হাসো যেন মাইল মাইল বিস্তৃত কাশবনের পাশে শেষ বিকেলের ঢলে-পড়া রোদ; এ দৃশ্য শরৎকালের, আকাশ স্বচ্ছ নীল। মন্থরতায় গাছের নিচে বিছানো থাকে ছায়া, স্থির শান্তি। আমাদের এখন কী আছে! শুধু টুকরো কথার ভেতর দিয়ে হঠাৎ উদ্ভাস, ‘বলো তো কোথায় যাওয়া যায়?’ আবারও দূরের মায়াটান, সুবর্ণরেখা। মনে পড়ে মাধুরীর উঠোনে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখেছিলাম, অতর্কিত বৃষ্টি আর ঢেউয়ের উন্মাতাল সাদা ফেনায় দূরের জেলে নৌকাগুলো অস্পষ্ট হয়ে মুছে গিয়েছিলো – মাধুরীর উঠোনে দাঁড়িয়ে এ পর্যবেক্ষণে কী কোনো অঙ্গীকার ছিলো? এ ছবিতে শুধু বিষণ্ণতা ছড়ানো থাকে, দূর বাঁশির সুর। রাত্রিনিবিড়তায় তুমি এখন চাঁদের নিচে একলা যেতে ভয় পাও; জ্যোৎস্নাক্রান্ত ফুল, গাছ, লতাপাতা, জলের তলদেশে কাঁপতে থাকা চাঁদের প্রতিবিম্ব ভয়ের পটভূমি হয়ে তোমাকে ঘিরে ধরে। … অফিসের ব্যস্ততায় তুমি এখন খুব বিমর্ষ-ক্লান্ত – কখনো তীব্র মাইগ্রেন, কোনো কোনোদিন বন্ধ বাথরুমে বেসিনে অসহ্য ঝুঁকে পড়া –

নীলচে বমির কাছে সমর্পিত মাথা নিচু দাঁড়িয়ে থাকো …

আগন্তুক

তুমি কার সঙ্গে কাকে মিলিয়ে দেখছো? কুয়োর শান্ত জলের ওপর পেঁপেপাতার স্থির ছায়া, লোনাধরা দেয়ালের পাশ ঘেঁষে হাস্নুহেনার সন্ধ্যা অবগাহন – গন্ধের উন্মীলন। একা সান্ধ্যশোক? কেউ তোমাকে বুঝেছে? মনে পড়া প্রসঙ্গে একবারও কেউ তোমাকে কোনো প্রশ্ন জিগ্যেস করেছে? মফস্বলের প্রেক্ষাপট, চায়ের দোকানের আলো-অন্ধকার, অসম্ভব পিছুটান, শ্যাওলা জড়ানো সিঁড়ি – যা আজ নীরবতাপ্রত্যাশী। রাত্রির স্তরে স্তরে অনুভবের ঘোরে নির্মিত দৃশ্যকল্প মুছে গেছে। খুঁজতে খুঁজতে আবারও ভুলের পুনরাবৃত্তি। এতগুলো বছরের ভিতর তুমি আরও একা হয়েছো, কুঁচকানো চামড়ার দিকে তাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছো। দিগন্ত ছোঁয়া কোনো স্বপ্নের বিস্তার নয় – সম্পর্কহীনতার নিরেট স্তব্ধতা মগজের কোষে ছড়িয়ে পড়েছে …

সন্নিহিত সংশয়

তোমার কথা কখনো সংশয়হীন ভাবতেই পারিনি। হঠাৎ হঠাৎ মেঘ বিন্যাসে তুমি কেমন যেন অচেনা দূরগামী হয়ে যেতে। মেঘাচ্ছনতার ভিতর ঘনিয়ে উঠতো বিপন্ন গুমোট। তোমার একাকি হেঁটে যাওয়ার মধ্যে ছিলো আমাদের মফস্বল শহরের হেমন্ত ও শীত ঋতুর ধারাক্রম; গাছপালার ভিতর দিয়ে নেমে আসা সন্ধ্যার আচ্ছন্নতা। তোমাকে অনুসরণ করতো যে শান্ত ছায়া, একদিন দুপুরবেলা সেই ছায়ায় কয়েকটি প্রজাপতি উড়তে দেখেছিলাম। তোমার ঘুমের আড়ালে কেমন ছিলো ঝুঁকে পড়া জবা অথবা লেলিহান কৃষ্ণচূড়া এবং আয়নার নির্জন আলোয় তুমি কোথায় কোথায় উড়ে যেতে, তখন কে তোমার অন্তরঙ্গ সঙ্গী হতো – তা কোনোদিনই জানতে পারিনি। নিজেকে লুকিয়ে কেবল জ্যোৎস্নার অর্থহীনতার দিকে হেঁটেছি। এতসব ভয়, হীন্মন্যতা, আত্মহননের সংকেতবাহী পৃষ্ঠা জোড়া দিয়ে নির্মিত হয়েছে নির্ঘুম অধ্যায়; নিসর্গ সংলগ্ন বিষাদ।

সংবেদনশীল স্বপ্নদৃশ্য অনুপ্রবেশের খোলা জানালায় তুমি কেন যে দাঁড়াতে …

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E