৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ০২২০১৭
 
 ০২/০১/২০১৭  Posted by

রাহুল পুরকায়স্থ

রাহুল পুরকায়স্থ

রাহুল পুরকায়স্থ

জন্ম : ৬ ই ডিসেম্বর, ১৯৬৪। কলকাতায়। পড়াশুনা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। গণমাধ্যমকর্মী ও কবি। ভালোবাসেন ভ্রমণ, লোকগান আর সংসারের সন্ন্যাস। প্রবল আগ্রহ দেশ-বিদেশের সাহিত্য ও চিত্রকলায়। প্রায় তিন দশক ধরে কবিতা লিখছেন। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্মাননা, শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্মাননাসহ পেয়েছেন আরও কিছু সাহিত্য সম্মাননা।

কাব্যগ্রন্থ :
অন্ধকার প্রিয় স্বরলিপি (১৯৮৮)
শ্বাসাঘাত তাঁতকল পুরনো হরফ (১৯৯২)
একটি জটিল আয়ু রেখা (১৯৯৫)
গোরস্থান রোড (১৯৯৬)
আমার সামাজিক ভূমিকা (২০০০)
রাহুল পুরকায়স্থর কবিতা (২০০১)
অবাকযান ( ২০০৪)
আটটি জ্বলন্ত মুদ্রা (২০০৪)
কলোনির কবিতা (২০০৯)
নেশা এক প্রিয় ফল (২০০৯)
ও তরঙ্গ লাফাও (২০১৪)
শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০০৫)
নির্বাচিত কবিতা (২০১৪)
সামান্য এলিজি (২০১৬)

সম্পাদনাঃ ভূমেন্দ্র গুহর কবিতা সংগ্রহ।  

রাহুল পুরকায়স্থ -এর কবিতা


বঙ্গীয় শিল্পধারা

আঁশবটি
উপমাসন্দেহ আজ অপ্রচলিতের

তবু তাকে চাই

পুরনো খেলার দিন শেষ
চিড়িয়ামোড়ের পানে কখনও যাবো না আর

তবু তার
আবছা করুণ স্বর জাপটে ধরবো দুই হাতে

ক্রমঈর্ষাবশে


জীবন সংক্রান্ত

কান্না ছড়ানো তোমার পথে
পথ ধনুকের মতো বাঁকা

এই শহরের বিষনখ
ঘুরছে তোমার রক্তে রক্তে

রক্ত কুয়াশার মতো চুপ
রক্ত ডুবুরির মতো একা

যত শহরের দেবদূত
হাত রাখল তোমার হাতে

তুমি উহাদের স্নায়ুনলে
ঢুকলে, চিনলে কানাগলি

জানলে কান্না ছড়ানো পথে
পথ ধনুকের মতো বাঁকা…


সাদা-কালো পংক্তিগুলি

এক)
দেহজলে নৌকা চলে
এই জল মায়াতন্তুজাল

এই দেহ, দেহপট, এই জল, এই মায়াজাল
আমাকে প্রশ্ন করে, এ-শরীর কার ?

উত্তর জানি না তাই শুধু দেখি
দেহজলে প্রশ্নপরাজয়

দেহস্রোতে বর্ণ জাগে
বর্ণ আর বর্ণবিপর্যয়…

দুই)
মনদেহে দেহমন রঙিলা রঙিলা
জলে ভাসে শিলা

এই জল দেহজল, জলে ইন্দ্রজাল
প্রকৃতি দেখায়, দূরে জলের কঙ্কাল

লেখে শূন্য, আঁকে শূন্য, এই শূন্যতায়
দেহে দেহ, দেহরন্ধ্র চাঁদ ভেসে যায়

সেই চাঁদে কথা বলে খণ্ড খণ্ড দেহ
প্রতি দেহ করে প্রতি দেহকে সন্দেহ…


সাদা কালো লেখা

আমি ফেলে এসেছি, ফেলে এসেছি
হাতপাখার মতো আমার স্মৃতি
হাতে হাতে ঘোরে, সংসারে। আনন্দ ও অনটনে।

প্রিয় বন্ধুদল, তোমাদের হাসি আর হাই তোলা
আমাকে অভিজ্ঞ করে।
চোখে চোখে আলপিন আর ডানাভরা
পতঙ্গের ছাই আমি বুঝি।
প্রতিটি দৃশ্যই তাই সন্দেহজনক,
প্রতিটি উড়াল তাই বিপদরেখায়।
পাঠসম্মতির কুকুর আমার আগে আগে যায়।

বন্ধ চটকলের পাশে, আহত ভাষার পাশে,
থেমে থাকা চাঁদের পাশে
ব্যক্তিগত পুজাবিধি, উৎসব ও আলিঙ্গন

যেসব শিশুরা আজ ইস্কুলমুখী
তাদের সবার পিঠে প্যারাট্রুপারের ঘন ছায়া।
আমার ছায়ায় শুধু বিস্ফোরণ
বায়ুহীন কল্পনা, বোধহীন হাহাকার।
অতএব নির্বাক হও।
শীতের রাতের পথে ভিখারির কাছে
উত্তাপ চাও।
বোঝো, দিকভুলের বিপরীতে আমাদের ছন্দজন্ম
আসলে বেঁচে থাকার কসরৎ।

শোকের ভিতর তৈরি হচ্ছে তোমার একা থাকার ঘর,
আনন্দের ভিতর উড়ে যাচ্ছে তোমার বিষণ্ন বায়স
তুমি আরও একা, কাছেই জল।
গন্ধ ভেসে আসে। গন্ধ পাও?
টের পাও? হাতে হাতে ঘোরো।

প্রিয় হাতপাখা, তোমার শরীরে আজ জাদুবাস্তবের নেশা, সম্ভাবনাময়।


ছিল চাঁদ

আমার সমাধি দূরে, আরও দূরে সেগুন বাগিচা
হাওয়া সাহেবের মেয়ে প্রতি ভোরে মৃত চাঁদ রেখেছে শিয়রে
বাউলেরা নাচে গায়, ফকিরেরা চিমটা বাজায়
রূপটান, ঘন মেঘ, নীল মাটি, চিতাভ্রম তরীগহনায়

তোমার কঙ্কন তুমি ফেলে গেছ সমাধির পাশে
ঘুম না ভাঙালে মেয়ে আমি কি দেখতে পারি সাঁই


জলে লেখা কবিতা (৫)

এইসব হিরন্ময় সাঁকো পেরিয়ে পেরিয়ে
এইখানে আসা
আমাদের একহাতে পানপাত্র
অন্যহাতে কবিতাপুস্তিকা
অক্ষরেরা আঁকাবাঁকা
যেন পা ফেলার ছন্দ হারিয়েছে
যেন চাকা ভাঙা গাড়ি
টলতে টলতে চলেছে
দিগন্ত পার হয়ে

এই অক্ষরেরা কোন ভাষাবেদনায়
কেঁপে কেঁপে ওঠে
আমরা জানি না
আমরা জানি না আমাদের পরস্পরের ভাষাই বা কী
আর অক্ষরেরা?
তাদের জ্বলন্ত মেঘপুঞ্জ, বৃক্ষপুঞ্জ, রক্ত, স্বেদ, অশ্রুপুঞ্জ
বর্ণহীন জবাব শরীর

তারা লাফ দেয়
পানপাত্রে ডোবে
পুনরায় লাফ দেয়
গড়িয়ে গড়িয়ে চলে
যৌনতার দিকে

আমরা জন্মের কথা বলি
আমরা মৃত্যুর কথা বলি
মৃত্যুজন্মের মশকরা আমাদের দেখে
চোখ মারে, মুখ টিপে হাসে
তাঁর তীক্ষ্ণ ফলা বিদ্ধ করে
আমাদের পানপাত্র

তবে কি কবিতা আজ অক্ষর ছেড়েছে!
উন্মাদ উন্মাদ, শরীর ছেড়েছে আজ মৃত্যুর আভাস!
পাহাড়ি ঝরনায় রাখি মুখ
মুখ দেখি পরস্পরে
মুখে এত পাখি, মুখে এত পাতা!
পোড়া পাখি, পোড়া পাতা,
স্মৃতিজন্মে পরজন্মে লিখে চলি রোজ,
কবিতারা আসে
লিঙ্গহীন, স্পর্শহীন, চক্ষুহীন কবিতারা আসে
কবিতা হে, স্মৃতির নাগর
পুরনো কুপির আলোয়
আমাদের পড়ে নিতে চাও!
ব্যক্তিগত, ব্যক্তিগত বীর্যপাতহীন
সময়ের দিকে আজ তুলেছ আঙুল!
যে আঙুল পারাপার
যে আঙুল বজ্রের মানিক
সেও শোন বলে ওঠে, ওদিকে পাতাল
পানপাত্র পাতালমনীষা
জ্বলন্ত অক্ষর তুমি ভাষাহীন, ভারহীন
মাতালমক্ষিকা
শব্দস্রোতে দুলে ওঠো সাঁকোর সংগমে

আমরা দু-হাঁটু গেড়ে বসি
আমাদের জ্বালা নেই, আলো নেই, দুঃখ নেই
তবুও আগুনে পুড়ি
পথের কুকুর তবু পিছে পিছে ঘেউ ঘেউ করে…


জলে লেখা কবিতা (৬)

পিছিয়ে পড়েছে
আস্তে আস্তে গড়িয়ে নামছে সূর্যাস্তে

সূর্যাস্তে করুণ বর্ণ শরীরে আমার
আমি আলিঙ্গন করি বিষবাষ্প
উড়ন্ত সেতুর শব মাথার উপরে
আমি দেখি
যে-আমি আহ্লাদে আনি মেধার ময়ূর
সূর্যাস্তে ময়ূর দেখি, মেঘ দেখি–
পেখমমনীষা
এভাবেই তোমার সংসারে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি
বাজারের কাক এসে আমার শরীরে বসে
তাদের উষ্ণতা টের পাই
টের পাই অক্ষরবিভূতি

অক্ষরের ছাই ওড়ে ঘরের দেওয়ালে

তবে কি অক্ষর আজ জীবন চেয়েছে!
চেয়েছে রন্ধনশালা, খাদ্যপ্রাণ, রতিহারাকিরি!
চেয়েছে রক্তের রস, রাগরক্ত, উলটানো সিঁড়ি!
সিঁড়ি ধরে নেমে যাব পুন্নাম, রৌরবে!
রৌরবে পাতা-ওড়া বহরমপুরে
বড় একা অক্ষরের ফানুস ওড়ায়
যদিও অনঙ্গ তারা
বাঁচে তবু আমার এ-দেহে

অতএব বমি পায়, জল পায়, রক্তগঙ্গা পায়
যদি ডাকি, পারমিতা…

সুখনামে ডুবে যায় নাও


কলোনির কবিতা (৪)

পতঙ্গ মেলেছে অক্ষি, ভালোবাসি তবে
আঁধারতরঙ্গমাঝে মন দ্রুতযান
আমার এ-অন্ধ গীত গেয়েছিল কবে
সন্দেহ মানসচক্ষু আনন্দের প্রাণ

বিষাদ তুলেছ আস্য, চুম্বনে চুম্বনে
ভাসাই মান্দাস তবে অঝোর ঝর্নায়
যায় প্রাণ যায় যায় কপোততাক্ষে যায়
জানি না প্রণয়ওষ্ঠ কী ছিল কী মনে

মৃত, স্পর্শে সম্মোহিত, বুঝি উষ্ণতায়
প্রখর তুলেছ গ্রীবা, ভঙ্গি পরিচিত
দেহভঙ্গি, মূর্ছাভঙ্গি, রতিভঙ্গিস্থিত
ভাসে মন, ভোলামন, ক্রূর যৌনতায়
এমন আঁধারে অন্ধ গেয়ে ওঠে গান
বিরহ ইন্দ্রিয়সম, পতঙ্গসমান…


কলোনির কবিতা (১৫)

যে রাত দংশনে জাগে
আমি তা্র অন্ধ ক্রীতদাস

মরুশহরের থেকে ভেসে আসা বিষন্ন বাতাস
আমাকে বধিরে রাখে
পাখি ওড়ে আমা্রই ছায়ায়

বোবা পাখি, অন্ধ পাখি
স্মৃতিহীন নগ্ন পাহারায়
আমাকে আগ্রহী করে

আগ্রহ মিলনক্ষত
তপ্ত, মনোরম

যে রাত দংশনে জাগে
আমি তার বিদেহসঙ্গম

১০
একটি হত্যার দৃশ্যে

যোগাযোগ ছিন্ন হলে ঘরের পরিধি কমে যায়
কমে যায় রক্তচাপ, ঘরের দেয়াল থেকে ঝরে
স্মৃতির পোকারা, ঝরে আর গৃহময় পড়ে থাকে
তাদের লালার আঠা, আঠায় জড়ানো বায়ুজল
জালের নিভৃত থেকে উঠে আসে বিগ্রহের ডানা
ডানার বিগ্রহ ভাসে, ভাসে স্রোত, অতলান্ত শিখা
একেই জীবন জেনে জনপদ পেরোয় পরিখা

পেরিয়ে নিশির ঘোরে মাঝরাতে কাহাদের ঘরে
বলে, দাও, সম্পর্কে নিহিত যত বাস্তবের সুতো
তাদের সর্বস্ব দাও, শোনো, শরীর শরীর চায়
মন চায় মন, ডানা চায় আরও ডানা, মুগ্ধ এবং
অপলক দৃষ্টিরেখা চায় আরও কৃষ্ণগহ্বর

এসববিহীন যদি, এসো, ধরো, চাপো কণ্ঠনালি
আবার নতুন ভাষা, আরও এক প্রচারপ্রণালী

১১
গোরস্থান রোড (১২)

সম্পর্কে শূন্যতা আছে
এই সত্য ক্রমে আরো উদ্ভাসিত হোক

‘হৃদয় আমিষদষ্ট’
সত্য শুধু জানে পরলোক

পরলোক দৈবপাখি
চক্ষু ভরা ক্রীড়া

কুয়োতলে স্নানরতা
মৃত রমণীরা

এইমতো যোগাযোগ
কেশ-রূপ সাঁকো

শহর যেখানে শেষ
সেইখানে থাকো…

১২
নেশা এক প্রিয় ফল (৪)

আমিও চেয়েছি তাকে, সে আমাকে যতটা চেয়েছে
গৃহহীন, আমি তাকে করেছি আশ্রয়
পাহাড়তলির পথে দ্রুত কনভয়
তোমার নজরে এল
আমাদের শান্তি বুঝি বড্ড এলোমেলো
কল্পনাখানিক
দূরে বনআস্তানার পাশে, আগুনের পাশে
তুমি আজও তত আন্তরিক?

এই প্রশ্নে জ্যোতি দেখি
কুয়াশামিশ্রিত জ্যোতি, বনবস্তির আকাশে ওড়ে ছাই
তুমিও তাকাও আর আমিও তাকাই
ওইসব ঘূর্ণির দিকে
এভাবেই ভালোবাসা হয়ে আসে ফিকে
আমাদের রিপু হাসে দিগ্বিদিকে
আমি আরও প্রাকৃতিকে নিজেকে জড়াই

প্রতিটি প্রণয়হত্যা বারবার লিখে যেতে চাই

১৩
নেশা এক প্রিয় ফল (২০)

বন্ধুভাবে ভাবি

এই যে মস্তিষ্করাশি উড়ে চলে দিকচিহ্নহীন
আমি তারই সমর্থনে অক্ষর ভাসাই

যে বন্ধু বান্ধবহীন আমি তারে চাই

চাই আলো, চাই তেজ, চাই অন্ধকার
বেদনার বহ্নিপুঞ্জ অঙ্গার অঙ্গার

খররিপু দিগ্বিদিক, ক্ষুধাতুরা প্রাণপ্রলোভন
রতিরশ্মি বিভাজিকা, শ্রমণ শ্রমণ …

১৪
নেশা এক প্রিয় ফল (৩৮)

দক্ষিণে বারান্দা খোলা
একা বৃক্ষ প্রত্যক্ষে রেখেছে
প্রত্যক্ষে রেখেছে ক্রুদ্ধ যুবতীর হাসি
আমিও রেখেছি তাকে, প্রত্যক্ষে রেখেছি
হাসি নয়
বৃক্ষটির একা সঞ্চালন
বৃষ্টি নামে
আবছা জলের প্রতি বর্শাফলা চিরে
দেখেছি দুলছে একা কৃষ্ণাঙ্গ মাতাল
স্থির দৃষ্টি
ক্রোধ তাকে দিয়েছে যৌবন
ক্রুদ্ধ হাসি যৌনতার প্রতিরক্ষা, ঢাল

বারান্দা দক্ষিণে খোলা
বৃষ্টিপাতা দোল খায় আরও দক্ষিণে
পাখিরা চিৎকার করে শৃগালেরা কাঁদে
আকাশ থেকেও ঝরে কালো বিদ্যুৎ
বৃক্ষ তবু স্থির, একা, সুযোগসন্ধানী

যুবতীর হাসি জানে
সঞ্চালন ঘনযৌনভার
যৌনতাও রহস্যকাহিনী

১৫
নেশা এক প্রিয় ফল (৪৭)

অতীত সূর্যাস্তপ্রি
ডানা ভাঙা, রক্ত ওষ্ঠাধরে
রিপুযান অতলান্ত
প্রিয় ধ্বনি, প্রিয় অঙ্গারের বশীভূত
এইরূপে দেখে ফেলি তোমাকে প্রদাহ
গত শোক, গত কাম, গত ক্রোধ
গত হিমবাহ
আমাকে আগ্রহী করে
আমাকে জড়ায় দাহস্রোতে
শিরাভ্রমণের দাস
জেগে উঠি প্রতিটি রুধিরে
ভাঙি ঘর, যৌনভর
চেতনা শ্রমের ক্ষত
ক্ষতে উড়ের বৃক্ষের ছায়া
উড়ন্ত ছায়া গৃহের ছায়া ক্রমে
স্নেহ করে, ক্রীড়া করে
আমারই বরাহে ছোড়ে তির
আর্তনাদ গীত হয়
বাদ্য হয়, নৃত্য হয়
পাপ পুণ্যেরও অধিক হয়
শান্তি হয়, চিরমনস্তাপ
প্রাচীন শব্দের দিকে
আমাকেও টেনে নেয়, ধীর
অক্ষরের কাছে আসি, অপলক, অনন্ত আঁধারে
তোমার বাঁকানো দেহ ডাক দেয়, আবারও, আমারে

১৬
রক্তপাথর

যদিও মন্থর দিন, তুমি পার কর

স্নায়ু ও শিবির থেকে দূরে
অতিরিক্ত ভারবাহী, যেন ধর্ম, কলহপ্রবণ

বৃথাবাক্য, স্নায়ুশিবিরেরা
যদিও মন্থর দিন, কোলাহল করে

২)
যদিও মন্থর দিন
অন্ধকার, বেজেছে নির্জন

মৃত হাড় ভাসমান
ইতস্তত বনমরীচিকা

যতিহীন, ছিন্ন এই উপমাশৃঙ্খল
কী চেয়েছে জলবিগ্রহের কাছে

ঝাউবনে, সমুদ্রগর্জনে
নৌকা, একা পড়ে আছে…

১৭
সামান্য এলিজি (৬)
(পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে)

আমি কি তোমাকে জানি
জানি নাকি
যেভাবে অলীক
ছন্দপটুয়ার দেশে
শহরের নীল ঘাসে
আদিগন্ত খালাসিটোলায়

প্রতিটি রাত্রির শেষ
চিরে চিরে
অন্য আরও অন্য দুনিয়ায়
উড়েছে অন্তিম ঘুড়ি
স্রোতহীন
সন্দেহের বিষণ্ণ টিলায়

তুমিও উঠেছ জেগে
সময়ের কিছু আগে-পরে
তোমারও দুচোখে আজ
বিদেহ সঙ্গম
ক্রীড়া করে

এই চোখ অবনত, এই চোখ
কামনার ঘোর
তোমাকে বেসেছে ভালো
অবশেষ
প্রণয়জর্জর

তুমি কি আমাকে জানো, জানো নাকি
অলীক, চিতায় !

১৮
সামান্য এলিজি (৮)
(অরূপরতন বসুর স্মৃতিতে)

সতর্ক মৃতের অগ্নি, বনপুষ্পমায়া
ক্ষণে ক্ষণে মূর্ছা যায়, ক্ষণে ক্ষণে জাগে নিশিডাকে

স্মৃতিহত্যা, স্মৃতিক্রোধ, স্মৃতিযৌনভার
রপ্ত করে, বুঝে নেয় আবারও নিজেকে

বুঝে নেয় হিমশিখা, বাতাস ও পরাভূত
দেহ আর দেহের আগুন

স্মৃতিসৌধ এখনও আগ্নেয়
ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত খুন

রচনা করেছে যেই অনিশ্চয় জন্ম নিল মনে
অন্তরীপে জাগে দ্বৈপায়ন, কথা বলে অরূপরতনে…

১৯
সামান্য এলিজি (১০)
(রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরীর স্মৃতিতে)

তোমার মৃতকে দেখি
তোমাকেও দেখি
রূপজান
আমার শিরায় টান
তোমার কাঙ্ক্ষিত

তুমি মৃত
আমি জানি
তারায় তারায় ভরা
এ-শৃঙ্খলখানি
এখনও আমার

আরশিনগর ভাসে জলে
কবিতা রচিত হয়
মৃত্তিকায়,ছলে-বলে
বজ্র হাসে

কলঙ্কিত ঈশ্বরে ঈশ্বর
গ্রন্থিত করেছ তুমি
প্রশ্নও করেছ
এ-জীবন কার?

মৃত্যুকেও সন্দেহে রাখেন রমেন্দ্রকুমার

২০
সামান্য এলিজি (১৬)
(ভূমেন্দ্র গুহর স্মৃতিতে)

মুহূর্ত অগ্রহণীয়, খন্ডমুহূর্তের
রন্ধ্রে রন্ধ্রে বজ্র, বর্ষা, অক্ষরের ক্রোধ,
রক্ত ঝরে প্রতি শব্দে, রক্তের মর্মর
ঢেউ তোলে প্রাকৃতিকে, বিষাদের বোধ
ভেসে চলে অস্তাচলে, ঢোকে রোমকূপে,
শরীরে অস্থির আসে, অস্থিরের স্বেদ
সংলাপ রচনা করে; পিতৃ পিতামহ
নক্ষত্রসংকটে আজও পাঠান সংকেত

প্রতীকের মৃত্যু লেখা সেই সংকেতে
তন্ত্রের মলিন হাড়ে জেগে ওঠে প্রাণ,
যম প্রদক্ষিণ করে, জলের কুণ্ডলে
তুমি বিবসন শোনো অস্ত্রের আহ্বান-
শরীরে জাগাও মৃত্যু, উপভোগ করো,
পড়ো এই অন্ধকার, চেটেপুটে পড়ো

২১
চন্দ্রদোষ

দংশন একটি সম্পর্কবাহিত রোগ
এই কথা ভাবতে ভাবতে রাতের চৌরঙ্গী পার হই
দংশনের অশ্রুক্ষত, প্রণয় ও মৃত্যুক্ষত
চাঁদের কোটর থেকে
ট্রামের লাইনে নেমে আসে

শেষ ট্রাম চলে গেলে একটি বেদনারেখা
সাপের শরীরে দেখি
চন্দ্র-অনুব্রজে চলে যায়

গীত জাগে, নৃত্য জাগে, স্পর্শ-বিদ্যুৎ জাগে
অন্ধকারে, ট্রামলাইনের বাঁকে বাঁকে

সম্পর্কবাহিত রোগ এইরূপে
চাঁদের আলোয় মিশে থাকে

২২
দুপুর ১২টার কবিতা

রঙিন তাঁবুর পাশে বিজ্ঞাপনে তুমি, রোমাঞ্চরমণী
দু’চোখে বিপদরেখা, অতিক্রমণেই জানি অতিআধুনিক
বাদামি আঁচিল বুকে, যাবতীয় সন্দেহ তোমার
আমাকে সাহসী করে, বুকে হাঁটি, খোলাবাজারেও

তোমারই ইচ্ছায় আমি এগিয়ে চলেছি ওই মুখে
তাঁবুর আকাশ ছেঁড়া, তার পাশে তুমি হে রমণী

আমাকেও ছায়া দিও, চাঁদ দিও, দিও ক্ষুধা, অনিদ্রা তোমার

২৩
অস্থি

তোমার মহিমা জানে পঙ্গু লোকালয়
যেহেতু বিগ্রহ তুমি, আলোড়ন, কেন্দ্র তুমি

আমরা আড়াল হতে দেখি কীভাবে তোমার আঁখি
নীল থেকে আরো নীল…অতিনীল…নীল…

এবং মুগ্ধতা হেতু ইদানিং টের পাই
কাহাকে বশ্যতা বলে, কাকে বলে প্রতিক্রিয়া…

২৪
বিনয় মজুমদারকে

বসে আছো, দিনান্তের দিকে
ভেসে গেছে গোটা দিন, আর তার ফিকে
শরীরের সেতু আজও দেয় হাতছানি

আমরা জানি না তাকে, তুমি জানো, এ-বাস্তব জানি
আরও জানি প্রতিঘাত-প্রিয় গাছে গাছে
কীভাবে তোমার চোখ আজও বসে আছে

কীভাবে প্রাচীন ক্ষত ছাই হয়, ওড়ে,
দিগন্তে পাখিরালয়, আদিগন্ত ঠাকুরনগরে
তোমার জন্মের দিন, তুমি আর দ্রাবিড় উপমা–

সূর্যাস্তের কাছে ধর্মবক, রক্তমাখা জামা…

২৫
কলোনি

ও বাড়িতে ভাত রাঁধা হলে
এ বাড়িতে নড়ে শিরদাঁড়া

হলুদ নদীর এক দেশ
চাঁদ ভাসে পাহাড়চূড়োয়

হাঁটুর ওপরে রাখা মুখ
দুটি চোখ ছাড়ছে খোলস

গতরাতে খুনের হিসেব
রটাতে নেমেছে কার বোন

মোড়ে মোড়ে জটলার মতো
ফিসফিস বিড়ির আগুন

পচাগলা শরীর দুহাতে
ঠেলে ওই চলেছে ক্লাউন

শ্বাসাঘাত তাঁতকল পুরনো হরফ

২৬
রজনী চাটুজ্জের দিনলিপি

১)
ক্ষুদ্র কবিতার দেশে
ভয় ও বিভীষিকার দেশে
লোককথা বুনে চলে মধু তন্তুবায়

আমাকে জানায় তার
সান্ধ্যভাষা, লিঙ্গতেজ, ক্ষণভঙ্গুরতা

দিকে দিকে ঘটমান বর্ণের বারতা
সেই বর্ণ প্রক্ষালনে তেজতপ্ত আরও
আমাকে রঙিন কর, তুমি, যদি পার

২)
আবার কবিতা আসে
বহুদূর থেকে
ডেকে চলে তোমাকে আবার

তুমি বিদ্ধ কর তাকে
এইভাবে বাতাসে বাতাসে দেখি
বজ্র রেখা টানে
নিজেকেই খুঁজে ফিরি অ্যান্টনি বাগানে

তুমিও কবিতা লেখ? হারাকিরি?
কাব্যপ্রাণ শিকারির ক্ষত
তোমার আমার প্রেম বাস্তবসম্মত।

২৭
ইচ্ছামৃত্যু

গৃহতলগত এই প্রেম, অগ্নিশিস
কখনো বলিনি, শোনো, তেতো আপেলের
কারবারি আমি নই, নিজস্ব মিনার
নেই, নেই জরা, লিপি-রহস্যের ঢেউ
কখনো ডাকেনি কাছে, গিরিশিখরের
আদিম কান্নার রোল শুনে অহরহ
সংকেত পাঠায় যারা, নই সেই দলে

মাঝরাতে উঠে দেখি চাঁদ বেনোজলে
ভেসে গেল পড়ে আছে ভাঙা মনোরথ

গতানুগতিক এই অধঃপতনের
ফেরিঘাটে জেগে-থাকা দালালের শিস
যদি ডাকে, যাই আজও, যাই তার কাছে

এই শুধু শিরঃপীড়া, এই শুধু বিষ
গৃহতলগত এই ডাক, অগ্নিশিস…

২৮
শূন্যের কবিতাখানি (১)

আমিও নিদ্রিত
পাখি দূরে ভাসমান

আমার শয়ন
তারই দুই পক্ষদেশে

অবশেষে
দেখি আমি মেঘে মেঘে ঘষা

বজ্র হই, বিদ্যুৎ ও বর্ষা হই
বুঝে ফেলি
এ-জীবন রগড়, তামাশা

২৯
শূন্যের কবিতাখানি (৮)

আগুনের চেরা জিভ

তোমার শরীরে যদি কাঁপে
আমিও উত্তাপে

উড়ে চলি দিগন্তের দিকে,
দিগন্তে শ্যামের বাঁশি, ভালোবাসি

রাশি রাশি শ্যামাপোকা
যৌনতারে ছায়

যায় দিন, যায় দিন
ভরা দিন যায়

তুমি আরও ফুলে ওঠো
আগুনের মতো ওঠো

দেহে দেহে বুলি ফোটে
বসন্ত গর্জায়…

৩০
শূন্যের কবিতাখানি (১৫)

সেই গান
আজও ভেসে ওঠে

যখন ডুবতে থাকি
ডুবতে ডুবতে থাকি
খাদের অতলে।

আমি দেখি
আমাকেই দেখি
সুরে ও সংকটে
বৃক্ষে বৃক্ষে, ফুলে ফুলে
খাদ্যে ও খাদকেও
আমি জানি শরীর আমার

যেভাবে একদা জানি যৌথের খামার
অবলুপ্তপ্রায়
আমাদের আয়ু যায়, বোধ যায়
বসন্ত গর্জায়, অন্ধকারে

অন্ধকারে
খুঁজে ফিরি আগুন আমার
কামনার জ্বর

দেহরসে আঁকা
আমারই পতাকা
তাকে সর্বাঙ্গে জড়ায়
আমার পরশখানি খায়, আমাকেই খায়
খেয়ে চলে

আমার কলোনি কেঁপে ওঠে
ঠোঁটে ফোটে কূজন, কাকলি
আমি বনমালী
ফুল তুলি, ফুল খুলি
নিভৃতে নিভৃতে
যদি চাও বিলোচন
গ্রীষ্মকেও পালটে ফেলি শীতে

শীতে বেদনারা ঘোরে
ঘোরে আলেয়ারা
আমাদের জেরা
করে যে যে মন

তাদের শমন
আমি লিখি
শিখি, কিছু শিখি
বেদনার কাছে
চাঁদ ওঠে, ফুল ফোটে
প্রতি গাছে গাছে
সর্পিল রেখায়

সর্পিল গৃহস্থরেখা
সংসারের রেখা
প্রতি পদে পদে দূরে যায়
দূরবর্তী ভ্রূণে
আমাদের লিবিডোলিখনে
চিত্রখানি স্ফুট হয়ে ওঠে

আধোস্ফুট আমার শরীর
তুমিও যে ধীর ধীর
স্থির সৌররেখা
আমার কবিতাখানি
শূন্যপথে লেখা
সন্ধিপথে লেখা
সন্ধ্যাপথে লেখা

সন্ধ্যাও শরীর ধোয়
সন্ধ্যারা গতর মাজে
এজমালি কলে
চোখ গেলে বুকে ঢাকে জলের আঁচলে

অতঃপর ভাতরুটিভাত
তরিতরকারি
মাঝে মাঝে সাদা ফেনা
মাঝে মাঝে কাটা পোনা
আনাগোনা দেহের পিঞ্জরে
মনবায়ু ধীরে
আমাকেই খুঁজে ফেরে
নীলমণি লেনে

আমার শরীর ডোবে, অর্ধসত্য ডোবে
গানে ডোবে, সেই গানে
গোপনরঞ্জনে…

৩১
খেলনাবাড়ি

দেখো গো দেখো গো রাই শূন্যে ভাসে মন
গ্রীষ্মঋতু সমাগত, সন্ধ্যার পবন

লিখেছে নিপুণ লেখা, দাহ্য ঘরবাড়ি
চন্দ্রদোষে চন্দ্র গুপ্ত দেখেছে আনাড়ি

গ্রহকেন্দ্রে, গৃহকেন্দ্রে ঘুম-ঘুম ঘোরে
প্রতি মৃত্যু জন্ম নেয়, প্রতি জন্ম মরে

১)
ভেঙে পড়েছে উড়ো জাহাজের ডানা। গাড়ির চাকাগুলিও
খুলে এসেছে। হাওয়া পুতুলের চোখ উপড়ে নিয়েছে হাতির শুঁড়,
হাতিটিও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। তিনটি বাঁদর, হেলে আছে এ ওর
গায়ে। ঘোড়াটি দৌড়চ্ছে, যদিও দেহে মুণ্ড নেই । পাখিটিরও
ডানা ভাঙা। হাওয়ামোরগ স্থির হয়ে আছে। লাটিমটি
ঘুরছে, কিন্তু আলো জ্বলছে না। ভালুক ব্যান্ড নুয়ে
পড়েছে মাটির কাছাকাছি। কচ্ছপটি থমকে, পেট থেকে
বেরিয়ে এসেছে জং-খাওয়া স্প্রিং। সাইকেলের টায়ার
ফুস। তলোয়ারের হাতল নিখোঁজ। উড়ে গেছে
বন্দুকের নল…

এই যে সংসার, একে উলটে দিই, খুব ইচ্ছে করছে…

২)
ভেসে যায় দেহতরী। মাথার ওপরে মাছরাঙা। পালকের
নাও ভাসে। নদীটিও জলরং-এ আঁকা। সাঁতার-সাঁতার
খেলা, শিকার-শিকার খেলা গোটা দিনমান! ওই ওই
চক্ষুতির, ওই ওই শিকারির ঢেউ। মাটির পাখিটি
দেখে চোখে চোখে মাছের সাঁতার!

ও-শরীর, মাছপক্ষী, এ-জীবন মায়াজল, ক্রুদ্ধ যমুনার

৩)
কাচের বয়াম, আধভাঙা কাচের বয়াম, পুরাতন গানগুলি
নানাছলে ঘুরে ফিরে বলে, ভালোবাসা স্মৃতির আরক। ওই ক্ষীণ
রস্মিরেখা চেয়ে রয় বয়ামের দিকে, তারে আমি ঠাকুমার ব্রতকথা
বলে ভ্রম করি, তেঁতুল ও কুলের আচার ভ্রম করি। বাল্যে বেজে
উঠে ক্রমে হারিয়ে গেল যে-ধ্বনি তার ডাকনামে আমি ঠাকুমার
দেহগন্ধ পাই! সদা অচঞ্চল নদীনীড়

মোহন, ও মোহন, কোথায় হারাল ধ্বনি ওই
মোহনবাঁশির!

৪)
ঘুরে ঘুরে নাচো তুমি বসন্তবাতাসে

সম্পর্কময়ূর তুমি নাচো, সম্পর্কবিড়াল তুমি নাচো,
সম্পর্কচড়াই তুমি উড়ে উড়ে নাচো, সম্পর্কশিয়াল তুমি
বাজাও দোতারা, সম্পর্কছুতার তুমি করাতকলের গান গাও,
সম্পর্কসারস ওষ্ঠ বাড়াও দেখি চুম্বন-বিরহীর দিকে। নীল-
নীল, লাল-লাল, সাদা ও সবুজ রক্ত সংসারে সংসারে
গড়াগড়ি যাও, যাও নৃত্যের তালে তালে। প্রেমের শুশুক
তুমি যাও ডানা ভাঙা পক্ষিণীর কাছে। ধীরে ধীরে বসন্ত
জাগাও, ও ধ্বংস গাড়ির চাকা, জানু ভাঙা প্রজাপতি, দিনেও
জোনাক জ্বলে দেখো। হাসির ফোয়ারা দেখো, আতশ কাচের
নীচে হাপড়ের ওঠা-নামা দেখো, সম্পর্কে সম্পর্কে দেখো
দে-দোল দে-দোল প্রীতিভোজ। ও আমার কৌণিক সম্পর্ক,
গোলক সম্পর্ক, দেখো দেখো জলহাঁস, শ্বেত আচ্ছাদন।
দেখো চাকা ভাঙা গাড়িগুলি সীমানা পেরোয়

ভোলামন, আমার মন রে, মনে মনে তরঙ্গপ্রলয়

৫)
ছেঁড়া-তার একতারা কাচের টেবিলে শুয়ে আছে। শয্যাভঙ্গি
অবনত ছায়া ফেলে টেবিলের কাচে, ছেঁড়া সুর, স্মৃতি আর
অধুনা-সংহার মনে আসে। স্তব্ধ ঘড়ি, হাতঘড়ি, টেবিল ঘড়ির
দিকে শুকনো নয়নে চেয়ে আছে। ছক্কা-খোয়ানো সাপলুডো,
সিঁড়ি সাপ বেয়ে বেয়ে ছায়া ওঠে-নামে। প্রচ্ছদ-হারানো
মিনিবুক, হরিণচর্মের ডুগডুগি টেবিলের পুবমুখে ছায়া ফেলে
আছে। সাদা বিড়ালির চোখ উঁকি মারে ছায়ার অতলে।
তারামণ্ডলের ভিড়ে দেওয়ালে টাঙানো মা’র ছবিখানি হাওয়া
দিলে মাঝে মাঝে ছায়া রেখে যায়। একই রূপে
পানপাত্র, তমরাশি, ঘনমেঘ ক্রমে ক্রমে কবেকার পারা-ওঠা
স্থির মণ্ডলক

টেবিলের এককোণে মৃদুহাসি-ছাইদান প্রকৃতই
শ্মশানস্মারক

৬)
দৃষ্টি অসীমের। ক্ষীণ ডিঙা শরীরে শরীরে ভেসে যায়। জলে
ডোবে চাঁদ, চাঁদ দেহজলে। দেহে দেহে চাঁদ ভেঙে যায়।
ভাঙা চাঁদে দোলা লাগে, চাঁদে চাঁদে রমণ-সহায় ছিন্ন এই
গৃহগ্রন্থি ক্রমে ভেসে যায়। চন্দ্রতপে দেহ পোড়ে শীতল-
শীতল, পোড়া দেহে ঘুরপাক স্মৃতি-রসাতলে। দোলো হে,
দোলো হে চন্দ্র শরীরে, স্বপনে। চাঁদ ভাঙি, চাঁদ খাঁই আমি
মনে মনে।

৭)
বাতিল বালুকাঘড়ি, বালিঘড়ি, উল্লাস প্রধান রাতে
তোমার নিকটে আমি আসি। উড়ালপুলের ছায়া
ভেঙে পড়ে আমাদের ঘরে! আহত নিহত গিলি
গোগ্রাসে টিভিগত প্রাণ! রক্তের ঝাপট এসে
আছড়ে পড়েছে এই শরীরে, মাথায়! বুড়ো
আরশোলা, টিকটিক আর দেহে পোষা মূষিকেরা
কেমন যে থম মেরে আছে! কোথায় পালাব
আমি? কোন পথে ঘন যামিনীরে? কাতর-কাতর
বর্ণে তোলপাড় হে বালুকা ঘড়ি, রক্ত-কাদা মাখা
ঘরে তোমাকে বিগ্রহ মানি

প্রাণ মানি, বেদনা অপার

৮)
প্রতিটি রেখাই রহস্যের। কুয়াশার ময়ূরেরা ইতস্তত
ছড়িয়ে রয়েছে। প্রতিটি গ্রন্থের রিপু নিদ্রাহীন।
আলো জ্বলে মলাটে, প্রচ্ছদে। আমি উড়ি। আরাম
চেয়ারে উড়ি, টেবিলে টেবিলে, খাটে। আলমারি
আর শান্ত কমোডেও আমি উড়ি। জলকলে উড়ি
আমি কলজলে।
উড়ি। উড়ন্ত রেখায় দেখি বাতাস-বিভ্রম। বিভ্রম
রচনা করে আমাদের ডানাজন্ম, মৃত্যু পারাপার।
বিস্তৃত শিকার হাতে গৃহে গৃহে গুন গুন ফিরি, গ্রহে
গ্রহে ফিরি। আশ্রয়-তাঁবুর শিরে পতাকা উড়াই।
দেওয়ালে চিত্তির করি। বলি, ওড়ো

রহস্য স্পন্দন প্রিয়, ওই ওড়ে তার উত্তরীয়

৯)
কেন কাঁপবে না দেহজল যদি জলে ঘাই মারে
কুসুমকুমারী! প্রিয় পানপাত্র দেখি জলে ডুবে যায়!
ও রাঙা ও ভাঙা মুখ, পানপাতা পানপাতা,
লাস্যহাস্যময়ী সাঁতারের চাঁদ, সংসারে ভেসেছ
বলে তেলকালি স্বল্প মাখামাখি। আমি তো বসেছি
প্রান্তে উড়ু-উড়ু মনে। পটের বাবুটি যেন দেহের
বাগানে। চোখে ঢুলু ঢুলু, আর চুলে লাগে জলের
বাতাস! কোথাও কি সুর জেগে আছে, দু-এক
কলির মতো, অন্তত নিধুবাবু, নিদেন হাছন!

ক্রীড়াক্ষেত্র প্রসারিত। দাও ডান, চালো ঘুঁটি, অশ্ব
চলো আড়াই আড়াই

১০)
ওহো রে শিউলি, দেখো ঘরে ঘরে দাঁত নখ
ছড়িয়ে রয়েছে!

১১)
হাসো তুমি, মধুরিপু, ক্ষরণে ক্ষরণে তাঁত বুনি।

১২)
সম্পর্কবাহিত ক্রীড়া, কলহ প্রসার দেখো, রণভেরি,
আহত ব্যাকুল!

১৩)
ভয়ের দেওয়াল বেয়ে উঠি। দেওয়ালে রক্তের ছিটে,
রাঙা মাটি আরও রাঙা নিসর্গ হয়েছে। পেটো ও
পিস্তল যদি পিচকিরি হয়ে ওঠে বর্ণে বর্ণে আমি
আতস উড়াই, খুনির গেঞ্জি দেখি দড়িতে শুকোচ্ছে!
বাতাসে রক্তের গন্ধ। মাছি উড়ছে। ইঁদুর দৌড়চ্ছে।
গেঞ্জির ছায়ায় ওই বেজি ও সাপের গলাগলি।
ক্ষমতা-কেন্দ্রের দিকে মৌমাছির মিছিল। এতোল
বেতাল কান্না পেতল। ১,২,৩,৪…। অগণন দেহভাব
বডিভাবে শুয়ে আছে ক্ষমতার ঘরে ও উঠোনে।
চৌদিকে বিবিধ বাদ্য, হা-হা কলরব, হই হই
খোলামকুচি, সবুজ, লাল ও গেরুয়ার রগড়-রহস্য।
অতএব অদৃষ্টি কীটের চোখে সমাজ বসাই।

ইন্দ্রিয় রঙিন বড়ো, আকাঙ্ক্ষার ছাই

১৪)
হে তুমি নিপুণ কারিগর, বাঁশের সাঁকোর ওপর কেন
যে বার বার লন্ঠন নাচাও! লুণ্ঠনেও সূর্য ধরো, চন্দ্র
ধরো, এতটাই জাদুর অধীন! আমি তো প্রলয়ভিক্ষু,
দেহে ধরি সমুদ্র-লবণ, সেঁকো বিষ, ধুতুরার তেল,
আরও আরও আকাশ-আফিম। ঘোড়া ছোটে সিন্ধু
বরাবর। বাতাসে ট্রাপিজ দোলে। প্রাকৃতসুন্দর
সুন্দরীর হাত ধরে উড়ান-উড়ান! দেশে দেশে
জনগণ জনসাধারণরূপে হাত নাড়ে, পুচ্ছ নাড়ে,
চোখে চোখে নামায় ঝিলিক। আমি উন্নাসিক
হৃদয়দর্পণে দেখি নিজস্ব ময়ূর! নেশা চুরচুর রাতে
আমার-এ-দেহলাট্টু দুনিয়া দুনিয়া ক্রীড়া করে!

ডাকি আমি ঊর্ধ্বকর্মা বেদনার স্বরে

১৫)
কাঠের দরজা, ঝুলে থাকা মই, শূন্যের লিপিকার
লাল টলমল টালির ঘরেও ঢুকে গেছে জ্যোৎস্না।
রোহিত-পিছল ঘরের মেঝেতে কার পদছাপ, কার?
পিয়ানোর রিডে কার হাত ঘোরে! কার সুর ঘোরে
রাতের বাতাসে! বড়ো খিদে পায়। কাকজ্যোৎস্নায়
উড়ে যায় গৃহখানি

খেলা শুধু খেলা, একেলা একেলা।
এই কথাটুকু জানি

৩২
শূন্য গ্রীবা, শূন্য জিহ্বা, শূন্য কবিতারা

এক)
শূন্যে যদি দুলে ওঠো বিবর্ণ পুস্তক
তোমার কবিতাখানি স্ফুট হয়ে ওঠে
কোথাও ডাকছে শুনি অবাক ময়ূর

শূন্য গ্রীবা, শূন্য জিহ্বা, শূন্য কবিতারা
বলে, ওকে বিদ্ধ করো, পুনঃ টানো বুকে
আমার শরীরে দেখি স্বীয়শূন্যতাকে

বাজারে ভ্রমের বাঁশি, বাজাই, বাজাই আর
মাঝে মাঝে থামি
সময়ই প্রকৃতি বোধে ভোরবেলা জেগে উঠি আমি

দুই)
অর্ধেক চেতনামাত্র, বাকি অনুসারী
সুরে সুরে দোলে নৌকা, ওপারে শ্রাবণ
অন্নহীন, পানিহীন, অন্নপানি রঙ
মুখে যদি রক্ত তোলে কেঁপে ওঠে বাতাসের ভিত

উঠোনে বায়স নাচে, বজ্র নাচে,  বজ্র বাষ্পে মেশে
যমপট লিখে চলি তবু মুদ্রাদোষে

শবের শকটে উঠি পক্ষীভাবে আমি
মাঝে মাঝে মেঘে চড়ি, মাঝে মাঝে নামি
গুহার সংসারে আর সংসার-গুহায়
এভাবেই মৃত্যু ও শিল্প জন্মায়

তিন)
একটি শরীর শুধু
আমার শরীরে আজ
ঘুরপাক খায়
পার্ক স্ট্রিটে, ক্রিক রো-তে
শহরের বিভিন্ন রাস্তায়

কখনও দু’চোখে কাঁপে
কখনও বা স্পর্শে আলজিভ
দুলে ওঠে রজকিনী
নেচে ওঠে গাজনের শিব

চৈত্রঘূর্ণি, লাল মণি,
ভস্ম মাখা কল্কের আগুন
আমার শরীর জানে শরীরের মানেখানি
পান্তাভাতে নুন
জোগায় যে সে  তো আজ
শরীরে শরীরে ঘোরে ডমরু বাজায়

ময়দানে, ধুলাঘাসে বহুরূপী গড়াগড়ি যায়

চার)
যে পাড়ায় বসে আছি
ছায়ামেঘ গাছে গাছে ঝুলে

বসে আছি চায়ের দোকানে
টেবিলে, বেঞ্চিতে
পাঁপড়ের ঘ্রাণে আর কামনার শীতে

নীলমাছি, লালমাছি ওড়ে
গৃহী ও তস্করে
দাবা খেলে

মায়ামৃগ ঘোরে তৃণে তৃণে
স্মৃতির দক্ষিণে
দরজা, জানলা খুলে যায়

বাবা ও মায়ের সাথে হাত ধরে
রথের মেলায়
ঘোরে জগন্নাথ

বসে আছি ছায়ামেঘে
কোথায় আমার দুটি হাত!

পাঁচ)
আশ্রয় চেয়েছি আমি প্রতিটি সন্ধ্যায়
যেভাবে গাছের ছায়া গাছেই মিলায়
ভালবেসে

এ-শহরে প্রেম আসে
উল্কাপাত হয়

প্রতিটি সন্ধ্যাই জানি
বিগ্রহের রতিচ্যুত ক্ষয়

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E