৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ১৪২০১৭
 
 ১৪/০১/২০১৭  Posted by
রহমান হেনরী

রহমান হেনরী

রহমান হেনরী’র কবিতা


জন্মমুহূর্তের কথা

সামাজিক নিষ্ঠুরতা আর সব কিছু রক্ষার নামে অনুষ্ঠিত এক দানবীয় অট্টহাসির গর্ভভেদ করে জন্মেছিলাম আমি; ওরা ধর্ম আর সামাজিক মূল্যবোধের নামে দোষী সাব্যস্ত করেছিলো- ভালোবাসাকে।। তোমার শরীর বেয়ে ঝরে পড়ছিলো বোবারক্ত, অজস্র ধারায়; নিঃসৃত সেই রক্তের একটি বিন্দু থেকে, পিতা, জন্ম হলো আমার। মনে পড়ছে, সেই জন্মমুহূর্তের কথা; নির্গত রক্তবিন্দুগুলো মাটি স্পর্শ করবার আগেই রূপান্তরিত হচ্ছিলো আলোক কণিকায়; এ রকম এক রূপান্তরের স্ফুটোনোম্মুখ মুহূর্তই আমার জন্মক্ষণ। আলোক কণিকার অবিরাম জন্ম আর  সমন্বিত মৃত্যুই জগৎ সৃষ্টি ও ধংসের মূলকথা -এটুকু জেনেই, আমি ছিটকে পড়েছিলাম পৃথিবীর দিকে আর আমার সহোদর সহোদরারা মহাপৃথিবীর দিকে- তোমার শরীরবিশ্লিষ্ট প্রতিটি অণুপরমাণু আামার সহোদর সহোদরা-

অভিমান: আমার ডাকনাম নয়, ভয়: আমার পদবী নয়, প্রতিহিংসা-এমন কী আমার প্রতিবেশীদেরও নাম নয়।

জন্মমুহূর্তেই তুমি আমার নাম দিয়েছিলে ভালোবাসা; সেই কথা প্রথম আমি পাখিদের বলেছি। তারা কথা বলে, পরস্পর, বিশুদ্ধ পয়ারে।। সেই কথা আমি বৃক্ষদের বলেছি। তাদের পারস্পরিক ভাষা সনেটে বিন্যস্ত।  ভালোবাসার সেই দুটি সোপান পেরিয়ে, পিতা, আমি পৌঁছে গেছি মানুষের কাছে।  সেই কথা, অকপট আমি তাদেরও বলেছি; কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া জানতে পারিনি। কেননা, তাদের ভাবনা ছন্দোবদ্ধ নয়, দ্ব্যর্থক ও বহুবিধ অর্থে তারা কথা বলে থাকে।  ভালোবাসা এখনও তাদের কাছে মৌল নয়, অর্থবাহী নয়। এখনও ধর্মের নামে, মূল্যবোধ শব্দটির নামে, তারা বড় যুদ্ধপ্রবণ। প্রেম ছাড়া আত্মরক্ষারও কোনও অস্ত্র,  পিতা, আমাদের অর্জনে ছিলো না। তোমার নির্দেশে তবু যুদ্ধ করে যাই- পর্যুদস্ত হলে, আলোককণিকা হয়ে যাই।

ভালোবাসা এখনও নিষিদ্ধ আর আতঙ্কের নাম! অভিযুক্ত, দণ্ডযোগ্য আসামীর নাম! প্রণয়ের শরীরনিঃসৃত এক রক্তবিন্দু থেকে আলোকমুহূর্তে আমি জন্মেছিলাম-


আমি সেই ছেলে

প্রকট শৈশবে, জঙ্গলের সবুজগন্ধ শুঁকতে শুঁকতে, ছুটতে ছুটতে গহীন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়া-  আমি সেই ছেলে; অভূতপূর্ব, অচেনা এক পাখি, তার পালক ঝরাতে ঝরাতে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল, দূর অরণ্যের দিকে; আর কী বিপুল সেই জঙ্গল, ও মা! মাঝ বরাবর যেতে না যেতেই তার সবকটি পালক  গেল খসে! আমি আর এগোতে পারি না, ফিরতে পারি না, শুধু বসে বসে কাঁদি আর হরিৎ-গন্ধের মধ্যে গলে যেতে থাকি-  আমি তোর সেই ছেলে, মা! আমাকে তুই চিনতে পেরেছিলি? এই দেখ, আমার শরীরে কত গাছের আঘ্রাণ, আমার দু চোখে কত সবুজের ভিড়, আমি অরণ্যের দত্তকপুত্র ছিলাম। গন্ধের সবুজে আমি তামার শরীর নিয়ে সমগ্রকৈশোর, অপত্য যৌবন, একা এক ঋষির মতন, সে কাহার ধ্যানমগ্ন, স্বপ্নচারী যন্ত্রণা ছিলাম-  আমি তোর সেই ছেলে, মা! আমি যে তোর কান্না শুনে, বাইরে এসেছিলাম-  আমাকে তুই চিনতে পেরেছিলি?

মা গো, দেখ! আমার শরীর বেয়ে দুরদার নেমে আসছে, দুর্বোধ্য সেই পাখিটার সবগুলো পালকের ঘ্রাণ! ঝোঁপ দেবদারুময় আমার মাথার দুষ্টু চুল থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে ক্লোরোফিল কান্নার রং! কেন তুই আমাকে ফেরালি? রাক্ষুসী, তুই পাখির গলায় কেন রে ডাক দিলি? আমাকে তুই চিনতে পেরেছিলি?


উড়ো চিঠি
নির্ঝরা নীলাকে

তুমি তো জানোই, নীলা, আমার সেই পলাতক অরণ্যজীবনের কথা! সর্বনাশের মত জ্যোৎস্নায়, সেই যে উড়ে উঠলাম আর পৌঁছে গেলাম পাহাড়ঘেরা এক অরণ্যের দিনে। পাখিদের তখন ডানা থাকতো না; লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটতো আর গেয়ে উঠতো কী আর্দ্র এক বিষণ্ণতা! ওরাই তো আমাকে শিখিয়েছিলো বৃক্ষ ও লতাপাতাদের নাম! শিখিয়েছিলো- কেন প্রতিশ্রুতি উচ্চারণ করে ঝরনাও ছেড়ে যায় পর্বতের বুক, তারপর- আর ফিরেও আসে না! প্রকৃতির মধ্যে, এই  যে, মানুষের চেয়েও জটিল সব নিষ্ঠুরতার গল্প- পাখিরাই তো শোনালো আমাকে! একটা রূপসি পাখির কথা বলি, ফাল্গুনজ্যোৎস্নায় আমাকে উড়তে দেখে, খুব মনোভার হলো তার।। পিঠের পাখনা দুটো থেকে খুললাম ডানা; পরিয়ে দিলাম পক্ষিরূপসিকে। সেই থেকে ডানা পেলো পাখি; আর আমি, ওদেরই সাবেক চলনে, লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটতে থাকলাম।  অরণ্যের এই পলাতক জীবন, কোনওদিন আর শেষ হবে না আমার। কোন বিষুবরেখা থেকে আমি যে উড়ে উঠেছিলাম- সত্যি বলছি নীলা- আজ তার নিশানাও জানি না! একদিন, অচেনা পাখিদেরই ডানায় চেপে, মানুষের পৃথিবী থেকে, উড়ে এলো তোমার নাম; আমি জানলাম, মানুষের নাম থেকে থাকে; জানলাম- কোনওদিকে মানুষের বসবাস আছে। সেই পক্ষিনীকে আমি তো আর খুঁজেই পাচ্ছি না!

আর এই বাতাসের উড়ো চিঠি, আমি জানি, কোনওদিন খুঁজেই পাবে না কারও বিহিতঠিকানা। তবু আজ তোমারই উদ্দেশ্যে লিখি, বিস্মৃতিবিখ্যাত এই হৃদয়ের লোহিতলিপিকা-


জীবন ও মৃত্যু

জীবন ও মৃত্যু- এ দুয়ের, যে কারুর পক্ষেই কথা বলা যায়। মুস্কিল হলো, মৃত্যু পরিধান করে যাবতীয় ধর্মপোশাক আর সমীহজাগানিয়া দরবেশের মতো হাজির হয় আমাদের সামনে। উদ্বাহু নৃত্যানুষ্ঠানের মধ্যে হঠাৎ প্রবেশ করে মৃত্যু; থমকে যাই আমরা। তারপর অন্য কোনও অনুষ্ঠানের শুরু। তারপর কুচকাওয়াজ করতে করতে অনেকেই ফিরে যায় জীবনের দিকে। দুই আকস্মিকতার মধ্যবর্তী বিস্ময়স্থলে উদ্ভাসিত আনন্দই কবিতা; তোমার কেশরেখা ধরে নেমে আসে অর্থসম্ভাবনাহীন শব্দাবলী। আমাদের বিস্ফারিত চোখে নামে সুগন্ধী মোম, জংলি জলপাইগাছ, গোলাপলতা, চান্দ্রশাদা তুষার এবং অসংখ্য ভাষায় বিধৃত প্রত্যাদেশসমূহ-

ঈশ্বর, কবিতা এবং তোমাকে নিয়ে আজ রাতেই আমাকে রওনা দিতে হবে নরকের ভেতর দিয়ে; অব্যাহত পদযাত্রা- স্বর্গের উদ্যান অব্দি না পৌঁছে, আমরা তো থেমে যেতে পারি না!


ব্রজসুন্দরীর কথা

আমিই নৈঃশব্দ্যের জন্মদাতা; আর এই রাত্রি আমারই প্রস্তাবমতে সৃজিত হয়েছে। বিষণ্ণতার মুহূর্তগুলোতেও, কল্পনায়, আমিও তো স্পষ্ট দেখি নীলকান্তমণি আর আলো ঠিকরানো ধাতবগোলক! ভূগর্ভস্থ আমার পৃথিবী, এবং এর থেকে বহুদূরে লোকালয়; যেখানে বেড়ে উঠছে কবর সংখ্যা, সন্দেহের মতো গুল্মলতা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যত; এবং জমে ওঠা পুরু কুয়াশা- যা দৃষ্টিকেও অকার্যকর করে দিতে যথেষ্ট পারঙ্গম-

নীল আকাশে আছে নিশ্চিত এক গহ্বর আর আগুনের কুয়া; হয়তো সেখানেই মিলেমিশে ঘুমিয়ে পড়লো সবগুলো ধূমকেতু, সাগর আর নীতিগল্পসুধা- কিন্তু তার একটু আগেই, তারা আমার জন্য ভাড়া করা একটি কবরে চুনকাম করছিলো; আর দেয়ালে আঁকছিলো সেই ফুল, ব্রজের সন্ধ্যায় যে আমাকে তার নাম বলতে এসে সমস্ত পাপড়ি খুলে দেখিয়েছিলো- ঘ্রাণ কীভাবে লুকানো থাকে সংরক্ষিত প্রেমিকের লোভে!

সন্ধ্যা নামবে, কিন্তু তার আগেই দৌড়ে আসছে ঘ্রাণ; বৃষ্টি ঘনীভূত হবে, অতএব উড়ে আসছে সুবাস; আর বোধের অতীতে বেজে উঠছে প্রভাতের প্রফুল্ল সংগীত; তার আগমনী কোরাসের কোষেকোষে সেই গন্ধ মেখে আছে বর্ণিল আল্পনা। রাত্রির ঘনত্বমাখা মহিষীর কেশদামে সেই ঘ্রাণ কালোকে সবুজ করে তোলে-

হু হু করে কেঁদে উঠছে হাওয়া আর আমার প্রিয় পুষ্পতালিকা বিলুপ্তিকে বেছে নিচ্ছে; এমন চকিত সেই যাওয়া- যেন পতঙ্গ উঠছে অগ্নিধামে! ভুল পুষ্পকরথে তবু ভেসে যাচ্ছে ব্রজের মহিষী, আত্মভোলা-
আমাদের পায়ে পায়ে ছিলো প্রমোদভ্রমণের গতি। লাল পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ঢুকে পড়লাম বিস্তীর্ণ সেই গোলাপি বিকেলের ভেতর- যার দশদিগন্ত সমতল আর আঁঠালো আলোর কার্পেটে মোড়া; কিন্তু এ হলো সেই মায়াবিভ্রমের গল্প যা তুমি স্বপ্নের ভেতরে দেখেছিলে আর তা ছড়িয়ে পড়েছিলো আদিগন্ত কদম্ববনে।

বহু যুগ আগে বিগত সেই মহিষী, যার মূর্তি ছিলো আমাদের চাক্ষুষে, তাকেই দেখা গেল কল্পবৃক্ষবনে। ব্রজের পথেপথে বেজে উঠলো তার নিক্কণ-


পেশান্তর

ঘোড়ার গায়ে রং মাখিয়ে জেব্রা বানানো ছিলো আমাদের পেশা; কিন্তু বংশ পরম্পরায়, এই পেশার বাইরে রাজনীতি এবং ভেতরে নাশকতার ঘ্রাণ পাচ্ছিলো রাজারা- ফলে, কয়লাচালিত ট্রেনে তুলে আমাদের পাঠিয়ে দেয়া হলো নির্বাসনে। উপদেশ-দেশ-মহাদেশ পেরিয়ে আমরা তো চলে এলাম! এখন রং মাখবো কোথায়?

গল্প করার জন্যও আমাদের সঙ্গী রইলো কেবল মৃতব্যক্তিরাই। বিদেহী সেই সহজনেরা রাজাদেরই পূর্বপুরুষ। তারা বললো- ‘আমাদের উত্তরাধিকারেরাই এখন তোমাদের পেশায় দক্ষ। ফেলে আসা সেই ভূখন্ডে আর কোনও ঘোড়াই থাকবে না, সব জেব্রা হয়ে যাবে’।

চাইলে, হয়তো ফিরতেই পারতাম- কিন্তু ফিরলেও, আমরা তো রং মাখতাম কোথায়?


রাত্রির দিনলিপি

আবারও সেই বাড়িটার কাছে গেলাম, যেখানে থাকতাম আমরা; আর গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই তথ্য যে, সেখানেই, একটা সমগ্ররাত্রির জন্য পছন্দের নারীকে প্রথমবারের মতো সান্নিধ্য দিয়েছিলাম, উষ্ণতার। এখনও ফিসফিসানির মধ্যে বসে আছে: একজোড়া নরনারী। চুম্বন করছে পরস্পরকে। অনেক বছর পেরিয়ে গেল, সিঁড়িঘরের বাল্বটা আগের মতই জ¦লছে-নিভছে, দুলছে হাওয়ায়। বন্ধ দুয়ারের কীহোল একটা ক্ষতস্থান হয়ে আছে- যার ভেতর দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসছে রক্তস্রোত, কক্ষের ভেতরে মানুষ দুটো মৃত ও ফ্যাকাসে-

করিডোরে, পুরনো দৃশ্যের পুনরাবৃত্তিতে, আঁকড়ে ধরলাম সেই নারীকে।  বিচ্ছিন্নতা চেয়ে, সে কী ছটফটানি তার! তাকে ছেড়ে দিতেই ভেঙ্গে পড়তে লাগলো বাড়িটা, ছোট্ট সেই মফঃস্বল শহর, সমগ্রদুনিয়া। নিজেকে আবিষ্কার করলাম ধূলিগ্রস্ত একটা পথের ওপরে। এগিয়ে গেলাম ওদিকেই। সেই পথের শেষপ্রান্তে একটা ডোবা- যার কয়েক হাত আগে পর্যন্ত দিন; কিন্তু ডোবার অবস্থান রাত্রির অন্ধকারের মধ্যে-

অন্ধকারেরও এমন উত্তাপ! ফোসকা পড়ে যাচ্ছে দেহে- সেখানে, জলময় ভাসছে দুটো কুকুর; আর ও দুটোকে হত্যা করেছে যে মানুষ, আমার দিকে তাকিয়ে এমন ভঙ্গিতে সে হাসছে, যেন, লজ্জা তার অভিধানে নেই!  আমাকে, আবারও, লিখতেই হবে রাত্রির দিনলিপি- যতক্ষণ না যন্ত্রণায় খসে পড়ছে আঙুলগুলো-


ঘটমান স্বপ্ন

স্বদেশের সমুদ্র কথা বলে- আর কথা বলে পরিযায়ী পাখিদের ঝাঁক ঝাঁক পৃথকত্ব; এবং মুগ্ধতার বিস্ময়মুহূর্ত এনে দিতে জানে সেই রূপসীর গান- উচ্চতর মানুষের জন্য যার রয়েছে গোপন ঈর্ষা, ক্রোধ ও নিষ্ঠুরতা।  খুব সস্তা ও নিচুস্তরের ভাবনা থেকেও কেন যে উঠে এসেছিলো এ রকম অন্ধকরা গান! আর কেনই বা মনে হয়েছিলো, নন্দনবিশ্বের শ্রেষ্টতম সম্রাজ্ঞীর নামে তাকে ডাকা যেতে পারে! বহুদিন, এ সব অস্বস্তির কথা ভেবে, আজও আমি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি মৌনতর কবিতার পাশে- ধারণাসম্মত এক রূপসীর অহমিকা এবং তার উপেক্ষার অভিজ্ঞতাগুলো সব সময়ই উপভোগ্যতা আনে; আর জানান দিয়ে যায়- নিষ্ঠুরতার সর্বশেষ অভিনবত্বের কথা-

আত্মমর্যাদাশীল ও দূরগামী কবিতার জন্য হয়তোবা এখনও প্রয়োজন- স্বদেশ ও তার সামুদ্রিক হাওয়ার দিন; এবং ভ্রান্তরূপসীর নিতম্বের নীরবতাতূল্য অন্ধকার! সে, ভালোবাসতো এক কুৎসিত কালো ভেঁড়ার অপরিচ্ছন্ন থোকাথোকা লোমের কোমলতা; অথচ প্রতিভা লুণ্ঠনের জন্য দরকারী কোন সম্ভারই ছিলো না তার দেহসৌষ্ঠবে; তবু, কোনও এক নাতিশীতোষ্ণ সন্ধ্যায় ঘটে গিয়েছিলো স্বপ্নের চেয়েও অলৌকিক ওইসব তীব্র ঘটনা- প্রশস্ত কাঁধের দুদিক থেকে পিঠের পাখনাঅব্দি ঝুঁকে পড়া তার চুল, ব্লিজার্ডের বিকেলে পরিধানের ফারকোট, ঝকঝকে দাঁতের তীক্ষ্ণতা এবং অসময়ে অসহায়ভাবে বিনত তার স্তনের যুগ্মছায়া থেকে ঠিকরে বেরুচ্ছিলো বসন্তরাত্রির পূর্ণিমাকৌশল এবং একটা সমগ্রশীতকালের কমলারৌদ্রখচিত দুপুরের আভা- বহুকাল রৌদ্রে থেকে ধারালো কুঠারের পক্ষে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠা শক্ত বড়ই কাঠের  রাত্রিতেও, মাতালের একনিষ্ঠ ধ্যান ও জেদি একাকিত্ব হাতে, পৌঁছে গিয়েছিলাম তার প্রকা- উন্মাদনাকেন্দ্রে, বগলের উত্তাপে এবং বলিদানের জন্য উন্মুক্ত তার তিনস্তরের ঊরুর খুব সন্নিকটে; এবং ফিরেও এসেছিলাম সমকালীন লেখক বন্ধুদের অহমিকার মত অবাস্তব তার চুলের ঘ্রাণ স্পর্শ করেই! এটুকুই! শুধু এইটুকু আমাদের মিলন ও সঙ্গমের দীর্ঘ ইতিহাস- অথচ সেই সম্রাজ্ঞী বহন করে চলে স্বপ্নেদেখা দেবশিশুর মত  সুন্দর আমাদেরই সন্তান। বাতিল ও পরিত্যক্ত; কিন্তু ভয়ানকভাবে ক্রমবর্ধিষ্ণু এক ঘটমান স্বপ্ন-

এবং এইসব ঘটনা ও এর আকস্মিতাই, অবিরাম শিল্পকে করছে অনুতাপময়, আর ক্রমশ বিশ্বাসঅযোগ্য হয়ে উঠছে আমাদের জীবন ও কবিতা, আমাদের সময় ও তার ধ্রুবসত্যগুলো-


সেই নারী

সোনার ইমিটেশন করা পরকীয়া রোদে ঝলমলিয়ে উঠল সবুজ বিকেল। পূবের দিগন্তরেখা বরাবর তিন কী চারটে শাদা খরগোশ লাফিয়ে উঠছে মেঘে; আর ভারি পাথরখণ্ডের মত চাঁ-আ-আ-আ করে দুমদাম পতনমাত্রই লুটোপুটি খাচ্ছে কচি ভাদাল ঘাসের রাজকীয় গালিচায়, যা কিনা, এতটাই বিশাল ও বিস্তৃত যে, রাজ্যসীমা চিহ্নিত করে দিতে চায় যেনবা বাদশাহ আকবরের- তখনই আসে সেই নারী; যার বর্তুলাকৃতি কাষ্ঠল স্তনে কাঠঠোকরা হবার উন্মত্ত মুহূর্তে কবিতার গোপনসূত্রাবলি আবিষ্কার করব আমি মাত্র এক যুগ পরেই। কিন্তু সেটা তো সেই শৈশবের গল্প- যা যত্নে লুকানো থাকে মানুষের ব্যক্তিগত কাঠের সিন্দুকে! সব সিন্দুকই চিত্রিত আর দুর্বোধ্য লতায় আল্পনাঋদ্ধ নয়- যেমনটি ছিল আমার। কে জানত যে, বটগাছের মত আকাশচুম্বী সংহত আর জমাট সেই কালখ- থেকেই এত বিচিত্র সময়ঝুড়ি নেমে আসবে পৃথিবী, মাটি, মানুষ আর ক্ষতবিক্ষত হবার জন্য অপেক্ষমান এতসব চিন্তারাশির দিকে!

সময়ের অবগুণ্ঠনে মোড়া সেই নারী আর নেই; কিংবা দূর অরণ্যের সবুজ ছায়ায় প্রতিবিম্বিত তার অধরা আঁচল পাখিফাঁদের প্রলোভনে ডাকছে; তার স্বেদের ঐশ্বর্য, কোনওকোনও বিমল বাতাসে-  টুপটাপ ঝরে পড়ছে উজ্জ্বল মেঘেদের তনুমন থেকে-

তার ত্বকের ঘ্রাণ, চুলের দুর্বোধ্যতা, চোখ থেকে ঠিকরেপড়া মায়াবী আলোর প্রতারণা আর অসমদৈহিক পুলক থেকে উৎসারিত সুরেলা শীৎকার সংগীতের মতো ধ্বনিতপ্রতিধ্বনিত হতে হতে ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্তের পর দিগন্তে- অধরা, অনাস্বাদিত পঙ্ক্তির হাহাকারময়তায় তীব্র কামনামদির সব কবিতা ছলকে ছিটকে পড়ছে মাঠেমাঠে, দূর বনে, অচেনা যত নদীর তটরেখা জুড়ে-

১০
অন্যান্য উপসর্গ

একটা সমগ্র আঙুরবাগানের মধ্যমতীব্র বিকেল ও তার বর্ণিল স্বপ্নমূর্ছনা খুব পরিপাটিভাবে বসে আছে রাত্রির টেবিলে; আর ভায়োলিনের কান্না ভেসে আসছে আমার পাঠকক্ষ থেকে। কবিতার মুখোমুখি দাঁড়াবার পক্ষে যথেষ্ট উপযোগী আজ রাতের বাতাস এবং স্বল্পালোকিত ডাইনিং টেবিলের নির্জনতা। কে একজন গোথিক ভাষায় গেয়ে যাচ্ছে ওইসব গান-  প্রণয়িনীর মহত্ব ও বিশ্বাসঘাতকতার যৌথবিবরণীর মতো যার বাণী-

যুদ্ধের, স্মৃতিকাতরতার, দেশপ্রেম ও উদ্বাস্তু হয়ে যাবার সংগীতগুলো বরাবরই আমাকে দিয়েছে বিষণ্ণতা ও একাকিত্বের অনির্বচনীয় সুখ; এবং অভূতপূর্ব কবিতার দুর্বোধ্য সব চিত্রকল্পের আনন্দ। আর ভালোবাসার সস্তা গানগুলো দিয়েছে বাচাল গণিকার ব্রণভরা অমসৃণ গালে আসন্ন চুম্বনের অস্বস্তি। কেবল বিচ্ছেদই বলে দেয়- প্রণয় কীভাবে মহত্ত্ব দিতে পারতো মানুষকে!

তথাপি, কোনও কোনও হালকা সংগীতও মাঝেমধ্যে এনে দেয়- মিষ্টি কোনও স্বপ্ন দেখার স্নায়বিক অনুভূতিময় প্রশান্তি। যেন খুব শৈশবে- কিশোরীর ফ্রকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিচিত্র সব ফল, এতোগুলি বছর পেরিয়ে আবারও উন্মোচিত হচ্ছে একই কৌতূহল আর উত্তেজনা নিয়ে-  কেননা, প্রতীকবাদী কবিতার মতই, আমারও ছিলো: দুর্বোধ্য, জটিল-আনন্দয়, বর্ণাঢ্য শৈশব-

দূর শৈশবের ধূলিপথ থেকে তুলে আনা লঘুঘরানার তেমন কিছু গান, আজও আমি বহন করে চলি; এবং না বুঝেই মুখস্থ করে রাখা নির্বাচিত কবিতাগুলো বারবার পড়তে পড়তে একদিন জেনে ফেলি- বিরহপ্রধান বাণীগুলোই, বস্তুত, প্রণয়ের গান!

১১
প্রয়োজন একটা টেকসই যুদ্ধকৌশলের

তখনও ওদের হাত দুটো ডানায় পরিণত হয়নি। তখনও দুহাতে বাতাস কেটে দ্রুতগতিতে হাঁটতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো ওরা। মানুষ বা অন্য কোনও প্রাণি দৌড়েও পরাভূত করতে পারতো না সেই গতিকে। তারপর শুরু হলো অনুশীলন আর প্রতিযোগিতা। হেঁটে বা দৌড়ে পাখিদের ধরে ফেলাটাই যেন জগতের সকল প্রাণির একমাত্র লক্ষ্য। ক্রমশ সাফল্য আসছিলো আর উৎসাহিত হচ্ছিলো প্রাণিসম্প্রদায়।  শুরুতে, এ ছিলো এক খেলা-

সর্বপ্রাণি পক্ষিভূক নয়- ফলে, পরাজিত হলেও বিপন্ন হয়ে ওঠেনি পাখিরা। কিন্তু কালক্রমে পাখিখোর বেড়ে যাচ্ছিলো। টিকে থাকার অদম্য বাসনায় ওদের হাতদুটো ডানায় পরিণত হতে থাকলো-  শিখে ফেললো উড়াল-  পক্ষিভূকেরা ব্যবহার করতে লাগলো কৌশল ও হাতিয়ার। পাখিদের ডানা এখন আর যথেষ্ঠ প্রতিরক্ষা নয়। প্রয়োজন হাতিয়ারের ব্যবহার শেখা।

এলোমেলো আর অনৈক্যের দিকে হারিয়ে যাওয়া পাখিসম্প্রদায়কে বলছি: ‘সমবেত হও! ছলনার ধূম্রজাল নয়- প্রয়োজন একটা টেকসই যুদ্ধকৌশলের’-

১২
জ্যামিতিবিদ্যা ভয়ঙ্কর

অনেকগুলো উপপাদ্য এবং স্বতঃসিদ্ধ জানা থাকবে আমাদের। ফলে, কোনও কিছুইকেই অনিয়ম মনে হবে না; কেননা, জ্যামিতিবিদ্যাকে রক্ষা করতেই হবে। অতএব একটা অসমস্যাকে আমরা বৃত্তের বাইরে থেকে টেনেহিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে আসবো। ভাবতে বসবো: এর সমাধান কী?

তারপর, অনেকে মিলে গোল হয়ে বসে পড়বো তার চারপাশে। উচ্চৈঃস্বরে সমাধান ভাবতে ভাবতে আমাদের প্রত্যেকের জিহ্বা পঞ্চাশ হাত লম্বা হয়ে যাবে। কেউ বলবে এটা অজ্যামিতিক, কেউ বলবে জ্যামিতিক। নিজেদের মধ্যে হৈ হট্টগোল শুরু হলে, বৃত্তের বাইরে থেকে ভেতরে ঠেলে দেওয়া সেই অসমস্যাটি বিরাট এক সমস্যা হয়ে উঠে দাঁড়াবে।

তখন, আবারও, ছোট হতে হতে আমাদের জিহ্বা আলজিভের সমান হয়ে যাবে। মুখ নড়বে; কিন্তু কথা বেরোবে না। নিজেদের কণ্ঠস্বরগুলো যখন আমরা নিজেরাই আর শুনতে পাবো না, তখন আমাদের ঘুম এসে যাবে-

কাজেই, অসমস্যাও যে আসলে এক বিরাট সমস্যা-  এই উপলব্ধির ভেতর দিয়ে, প্রকৃত প্রস্তাবে, আমরা এটাই প্রমাণ করবো যে, অজ্যামিতিক বলে কিছু নেই, সবই জ্যামিতিক; কিন্তু প্রমাণের পদ্ধতিটাই কেবল ভয়ানক হবে এবং খরচবহুলও-

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E