৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ১৬২০১৭
 
 ১৬/০১/২০১৭  Posted by

কবি পরিচিতি

রহমান হেনরী

রহমান হেনরী

রহমান হেনরী। কবি, বিশ্বকবিতার বাঙলায়নকর্মী; বাংলাদেশ সরকারের নির্বাহী বিভাগে কর্মরত। জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯৭০, নাটোর। কবিতাগ্রন্থ ১৭টি, বাঙলায়নকৃত কবিতাগ্রন্থ ৪টি। ২০০৮ সাল থেকে, পোয়েটট্রি নামক একটি অনিয়মিত কবিতাকাগজ সম্পাদনা করেন। বাঙলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় কবিতাচর্চাকারী হেনরী বর্তমানে স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করছেন।

উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ:
প্রকৃত সারস উড়ে যায় [২০০০];  সার্কাসমুখরিত গ্রাম [২০০১, পুনর্মুদ্রণ ২০০৪]; খুনঝরা নদী [২০০৫]; শ্রেষ্ঠ কবিতা [২০০৮]; গোত্রভূমিকাহীন [২০০৮]; দুঃখ এবং আরও কিছু আনন্দ [২০০৯]; ব্রজসুন্দরীর কথা [২০১২]; প্রণয় সম্ভার [২০১৪]; শতরথগুঞ্জন [২০১৬]।

বাঙলায়নকৃত কবিতাগ্রন্থ:
অধিকৃত ভূখণ্ডের কবিতা (ফিলিস্তিনী কবিতা) [২০১২]; কবিতার ত্রিভুবন (টোমাজ ট্রান্সট্রুমার, আদোনিস ও কো উন এর নির্বাচিত কবিতা) [২০১২]; নোবেলজয়ীদের কবিতা [২০১৪]

একমাত্র সম্পাদনাগ্রন্থ:
বিশ শতকের বাঙলাকবিতা [২০০৯]

রহমান হেনরী’র কবিতা-ভাবনা:

চিন্তনবিভা এবং নতুন ও বাস্তবতার উদ্ভাবন বা উদ্ঘাটন ছাড়া কবিতার আর কিছুই নয়; আর এর ভাষা যতটা হৃদয়গ্রাহি ও সহজবোধ্যতা পায়, ততই ভালো। কবিতাভাষার নান্দনিকতা ভাষাতাত্ত্বিক উৎকর্ষের ভেতরে নয়; বরং উদ্ঘাটিত উপলব্দি, প্রতিসত্য এবং প্রতিবাস্তবতার আকস্মিক হোঁচটের মধ্যেই নিহিত; অর্থাৎ চিন্তার সৌন্দর্যই কবিতার সৌন্দর্য।

কবিমাত্রেই ইশারাভাষি গল্পকথক (storyteller), যিনি শুধু সূত্র ও ইঙ্গিত তুলে ধরেন, গল্পটা বানিয়ে নিতে হয় রসগ্রাহী পাঠককেই।

কবিতা একটি ইশারাভাষা, যা উদ্ভাবিত কল্পনা ও নান্দনিক মিথ্যার ভেতর দিয়ে যাত্রা শুরু করে এবং নবতর উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার উদ্ঘাটনের মাধ্যমে পৌঁছে যায়: সত্যের সবচে’ নিকটতম বিন্দুতে।

তা সত্ত্বেও, যে কোনও কবিতাকে, তিনটি মানদণ্ডের সমন্বয়ে মাপা যায়; তিনটির প্রতিটি নিক্তিতে যখন কোনও একটি প্রস্তাবিত সত্য বা অভিজ্ঞতার উদ্ভাসঋদ্ধ সৃজনীরচনাকে ওজনদার হিসেবে পাওয়া যায়, তখনই বলা যাবে, এটি কবিতা; নিক্তি তিনটি হলো:

১. জীবন সম্পর্কে এর কি কোনও নতুন বা উদ্ভাবনি দৃষ্টিভঙ্গি আছে?
২. শিল্প সম্পর্কে এর কি কোনও নতুন বা উদ্ভাবনি দৃষ্টিভঙ্গি আছে?
৩. সত্য বা উপলব্ধি কিংবা অভিজ্ঞতার জগতে এটি কি কোনও নতুনত্ব বা উদ্ভাবন অথবা পুনরাবিষ্কার যুক্ত করছে?

একটি কবিতার ক্ষেত্রে সবকটি অথবা অন্তত দুটি জবাব হ্যাঁ-বোধক হওয়া চাই।

অলিখিত ও অব্যক্ত বক্তব্যের প্রস্তাবনাঋদ্ধ প্রাথমিক ও রূপকাশ্রিত এক প্রকার উপস্থাপনই কবিতা, যা এর পাঠকের সামনে কিছু প্রস্তাবিত সত্য হাজির করার উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত ও অভীষ্ট টেক্সটি পাঠ ও উদ্ধারে প্ররোচনা জোগায়। লিখিত টেক্সটি, আসলে, কবিতার অভীষ্ট টেক্সটে পৌঁছাবার একটি মাধ্যম ব্যতিত আর কিছু নয়। এ কারণেই কবিতা তাত্ত্বিক ও সাহিত্যের নন্দনতাত্ত্বিকগণ বলে থাকেন: কবিতার প্রথমত দুটি অর্থ থাকে। প্রথমটি হলো উপস্থাপিত শব্দ সমবায়ে সৃজিত চরণগুলোর প্রতীয়মান বা আক্ষরিক অর্থ এবং এ থেকে খুঁজে পাওয়া ব্যঞ্জনার্থ। একই কারণে, বলা হয়ে থাকে, কবিতা যতটা বুঝবার বিষয়, তারও চে বেশি উপলব্ধি ও অনুভব করবার জিনিস।

কোনও একটি কবিতা যত বেশি ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনার্থ নিয়ে রসগ্রাহী পাঠকের অনুভব ও উপলব্ধিতে ধরা দেয়, সে কবিতা ততবেশি বহুরৈখিক। বাঙলায় ও বিশ্বসাহিত্যে এমন কবিতা বিরল নয়, যার ব্যঞ্জনার্থ যুগের পর যুগ পরিবর্তিত হতে হতে নিত্য নতুন আলোয় তার পাঠকবর্গের কাছে হাজির হচ্ছে।

সর্বত্র অসহায় হয়ে পড়া নিরাশ্রয় মনের কাছে যে কবিতা শেষ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে, সেটাই ধ্রুপদী ও কালজয়ী কবিতা।

কবিতা বিষয়ে এসকল ভাবনার পক্ষে আমার ঐকমত্য ও সায় রয়েছে। তবে, কবিতাকে অবশ্যই সমকালীন বিশ্বপ্রবণতার অনুগামী হয়ে, মহাকালে উড়াল দিতে হয়; আর নিজের কবিতা বিষয়ক বিশ্বাস-অবিশ্বাস, আমি, ব্যক্তিগতভাবে, কবিতার প্রাথমিক টেক্সটেও গুঁজে রাখি।

আরেকটু চিত্রিত করা যাক কবিতাকুমারিকে: কবিতা আমার মতে, নিভৃত-রতন। তাকে কোলাহলমুক্ত রাখাই শিল্পের সততা। কবিতা নিয়ে কোনও প্রভাষণা, ধারাভাষ্য, হৈহৈ-কোলাহল পছন্দ নয় আমার। তবে গুঞ্জন চলতে পারে; কবিতা নিয়ে গুঞ্জন চলবেই। চলাই উচিত। তাকে দেখলেই মনে হবে, আহা, এই রূপসী কাদের কূলবধু গো? তারপর আবার দেখতে মন চাইবে তাকে। আবার এবং আবার। কিছুতেই তৃষ্ণা মিটবে না। ছিমছাম, নির্মেদ, ময়াবী; অতিসাধারণ অথচ মনপোড়ানো রূপ তার। সেটাই কবিতা। প্রথম দর্শনেই মনে হবে সামগ্রিক উন্মোচনে ধরা পড়লো। কিন্তু যতবার দেখা, ততবারই নতুন তার আচরণ। কোনও জটিলতা নেই, সারল্যের স্বচ্ছতায় উদ্ভাসিত সেই সুন্দর। চিরচেনা, চিরজানা এবং সেই সুপরিচয়ের কারণেই চিরদিন অচেনা থেকে যাবার সকল সম্ভাবনা জারি থাকে কবিতায়। নিরীহ। সরলে উপস্থাপিত এক জটিলতম সুন্দরই কবিতা। তাকে নিয়ে অভিসন্দর্ভ যে লেখে লিখুক। কবি লিখবে না। সেটা তার কাজ নয়। কবির কাজ তার প্রিয়তমা কবিতাকে রূপসী থেকে রূপসীতম করে তোলা। জীবনের দিকে, জীবনের মৌন আঙিনার কাছাকাছি তাকে টেনে আনা। যতই সে জীবনের সন্নিকট হবে, গুঞ্জন বাড়বে ততই। কিন্তু কোলাহল আমি অনুমোদন করি না। এতেই কবিতার জয়। এভাবেই জয়ী হন প্রকৃত কবি।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E