৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ২৪২০১৬
 
 ২৪/১২/২০১৬  Posted by

রাহমান ওয়াহিদ এর টানা গদ্যের কবিতা

০১.
মৃত নক্ষত্রের শহরে

কারো কারো চোখে প্রজাপতি বসলে কারো কারো চোখ থেকে পিঁপড়ের বিষ উপচে পড়ে-
যেন দহনে কালো হোক প্রজাপতির পেলব ডানা। আমার পাঁজরের খোলেও এক আদিম জিঘাংসা কার যেন বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে আর ক্ষরিত রক্ত ঝরে জমাট বাঁধে আমারই হৃদপিন্ডে।
অথচ আমার জন্মই হয়েছিল কি চমৎকার পারিজাত বাগানে,আশ্বিনের জোনাকি সন্ধ্যায়,হ্যারিকেনের  টিমটিমে আলোয়। এখন চারপাশের আয়নায় এত যে আলোর আলিম্পন-সেখানে মানুষেরই চেহারা নেই,নিজেকেও দেখি এক উদ্ভট ইতরের বাচ্চা যেন। একদা ভরাট জরায়ু চিরেই তো সুন্দরের নগ্নতা দেখেছি আমি। তবুও কি করে যেন ভুলে যাচ্ছি শৈশবী সাঁতারি পুকুর,ভুলে যাচ্ছি রোদ জোছনার সমুদ্র বিহার,ভুলে যাচ্ছি হৃদিপদ্ম শিরিন-তোমাকেও।
এত বিষ, এত জিঘাংসা, এত বমন নিয়ে কি করে তাহলে বানাবো কবিতার প্রতিমা মুখ,কি করে বলবো যে-ভালোবাসা তোমাকেও একটু নমিত হতে হবে মৃত নক্ষত্রের বিপন্ন এই শহরে।

০২.
যে দেশটা পুনর্বার আমাদেরই হলো

আমরা তো আমাদেরই ছিলাম, আর যেমনটা ছিল সবাই। এই তামাটে মাটিও আমাদেরই ছিল, পুনর্বার আমাদের হওয়ার আগেই।
সে গল্প ছিল বহু পুরোনো। সুপুরুষ পিতামহও জানতেন। শুধু জানতেন না মামুলি ভূমিচাষ। শহুরে পিতামহী তাঁর ছায়া ধরে হাঁটতেন, সেখানেই ছিল তাঁর যাবতীয় চাষবাস। ভূমিচাষ আটকায় নি তাতে। কিন্তু আটকে গেলেন তিনি অন্য এক কর্ষণে।
যৌবনের যুদ্ধটা তো কর্ষণেরই। কামান বারুদের ধোঁয়াশে হলকায় নির্জীব মানুষেরা যখন টপাটপ ডুবে যাচ্ছে মাছেদের পুকুরে, পিতামহ এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেললেন ফতুয়ার সবুজ, একটানে ছিঁড়ে নিলেন পিতামহীর লালঠোঁট ব্লাউজ, আর টুকরো সবুজের ওপর বসিয়ে দিলেন লাল টিপের গোলাপ।

তারপর বাঁশের ডগায় সেই দু’রঙা কাপড় উড়িয়ে ছুটলেন গ্রাম থেকে গ্রামে, শহর থেকে গঞ্জে,জনপদ থেকে প্রান্তিকে-গলা ফাটিয়ে বললেন-কেন এই যুদ্ধ? কেন তোমরা এই ডালভাত শালিকের বাংলায়? হঠ্ যাও, হঠ্ যাও। এ আমাদেরই রক্তমাংশের মাটি ও শরীর..। তারপর? গল্পটার ইতি হলো। শৌখিন পিতামহও মিশে গেলেন লাল পানি মাছেদের ভিড়ে।
দেশটা তো আমাদেরই ছিল,পুনর্বার আমাদেরই হলো।

০৩.
ভাবুক বিড়াল

না হয় শূন্যই থেকে যাক এ দু’টি হাত, যেহেতু খেলে না এখন আর নাচুনে মুদ্রা কোনো। দু’কলস ভরা যে কোমল নদী ছিল-এক পোড়ামুখির বুভুক্ষু চোখে তা ঢেলে দিতে হলো।
সকাতর কিশোরী এক বুকের বেলুন খুলে এসে দাঁড়ালো যখন তোমারই মতো করে-তাকেও ভরিয়ে দিতে হলো শীতোষ্ণ নি:শ্বাসে। পাঁজরের কূয়োতলায় জন্মেছিল যে ভ্রমণের ঝাউবন-
এক নীলাভ নারীর বিমল কান্তিতে তা-ও…।
এখন দু’হাতের তালুতে কেবলি ঘুমায় এক ভাবুক বিড়াল।

০৪.
বন্ধকী জমিন

কোথাও তো থাকি না আসলে। নাগরিক ড্রেনে যে পাঁড় শূয়োরটাকে পড়ে থাকতে দ্যাখো-
সে আমারই থ্যাঁতলানো শরীর বই কিছু নয়।
জলতেষ্টায় কখনো যে জলধারা নারীর কাছে যাই-সে-ও তো সেই নীলাম্বরী আমসত্ত্বই।আর যারা ছাইভষ্ম লিখে লিখে উড়োচিঠি পাঠিয়েই যাচ্ছে বেওয়ারিশ মোকামে-
তারা কি জানে না-সেই সবের একটি বিন্দুও আমার কোন পাঠোদ্ধারে লাগে না? লাশ গন্ধের নির্জনতায় যে একটু দেখে নেব ভেতরের ছেঁড়াফাটা ইচ্ছে ও নষ্টামী-তা-ও তো পারি না।
ধেই ধেই তেড়ে আসে শহুরে বেতাল গবেষক।
অথচ কে না জানে-গুহাবাসী মানুষেরাও বনসাঁই বৃক্ষ হয়ে ইঁদুরের লেজ ধরে হাপুস হুপুস বাঁচে।
আর আমি যে নৈসর্গিক প্রান্তরের অন্বেষায় একটু ডুব দিয়েছি শিরিনের নাভীতলে-
সেখানেও কি পাবো না হারানোর মতো এতটুকুন বন্ধকী জমিন?

০৫.
স্বপ্ন শিশির

ক্ষরিত ঘামের তরল মুদ্রায় শুধিয়েছি যাবতীয় রক্তঋণ।
সেরেছি জীবনানন্দীয় লেনদেন আনন্দহাটে।
যে একটি কোমল নদীকে পাশে রেখে নির্ঘুম শয্যায় যেতাম যে কোন নারীর
সেটিকেও ফিরিয়ে দিয়েছি নদীহীন এক মন মোহনায়।
তোমার তুমিকে যে সবটুকু দিয়েই নত হতে হয়েছিল কুমারী প্রেমের পূজায়
তা কি যথেষ্ট ছিল না বিনম্র পূজারীর?
আর আমার আমিকেও তো ডুবিয়েছি এক চিহ্নহীন অতলান্তে
যেখানে কোন নক্ষত্র আকাশও ছিল না। তবুও অফুরন্ত স্বপ্ন শিশির ছড়িয়েছি
মাছ চক্ষু মানুষের অজস্র চোখের কর্ণিয়ায়।

০৬.
হে প্রজন্ম সময়

মহাকালের চলিষ্ণু ভাষার অনুগত ছাত্র আমি শিখছি জলের লোনা দাগ
বৃক্ষের অমূর্ত স্বভাব আর চমৎকার পাঠ নিচ্ছি ধূপদস্তুর কাকতাড়–য়ার।
শিখছি নন্দিত প্রেমজ অনুভবে কামান্ধ শরীরের শিল্পিত কারুকাজ
যেমন নাড়িছেঁড়া শিশুটির কাছ থেকেও শিখে নিতে হচ্ছে আজ
শালদুধ চেটে নেয়ার ঐশ্বরিক মাদকতা।

এতকাল যা জেনে এসেছি তা কোন জানা নয়,জানার মোহিত চিৎকার শুধু।
বরং নতুন গন্তব্যে যে যেতে বলেছ হে প্রজন্ম সময়-
সেদিকেই যাচ্ছি, যাবো। যে নারী নারীই নয়,তাকে তুমি বানিয়েছ উর্বরা ভূমি
যে নদী ঘাম রোদে পোড়াচ্ছে জলের শরীর-
তাকে তুমি দেখতে বলেছ নীল শাদা মাছের মিছিল।
দাও হে প্রজন্ম সময়,দাও নতুন দীক্ষা ও পাঠ ক্ষণজন্মা এ জীবনের।

০৭.
অন্য এক ঝড়

একটা ঝড় উঠবে এক্ষুণি। ঝড় তা জানে না।
ভেতরের রঙমহলে মগ্ন মাকড়সা, সূতোর বুননে স্বপ্নের দালান
মেঘেদের কালো চোখে বিচ্ছুরণের  দ্যুতি। ঝড় তা জানে না।
আমি বোশেখি রগড় থেকে সবুজের তান্ডবে যাবো
নদীর নগ্নতা থেকে জলজ স্বচ্ছতায় যাবো। ঝড় তা জানে না।
 জানাটা বড় নয়। কিন্তু ঝড়টা উঠবে এক্ষুণি।  
অন্য এক সেই ঝড় কিছুই দোলাবে না, উপড়াবে না লতাগুল্ম
ভূমিষ্ট শিশুদের নাড়িও ছিঁড়বে না; শুধু চিৎকারে মথিত হবে চৈতালী মাঠ
আর প্রাচীন কবর থেকে উঠে আসবে কিছু ভাঙা খুলি,হাড় মজ্জা, নাভীমূল-
যাদের দেহ থেকে নন্দিত হৃদয় কখনো আলাদা ছিল না।

০৮.
এস্কেভেশন

একটি পাহাড়কে খোঁড়ো। পাবে প্রত্ন মাটিসহ মগ্ন পাথর।
একটি নদীকে খোঁড়ো। পাবে মৃত জলের সাথে জোছনা পালক।
আমাকে খোঁড়ো। পাবে ধুকপুক হার্টের সাথে মাকড়সা সূতো।
পাবে মন্থিত কর্ষিত ঘূর্ণি হৃদয়।
তোমাকে যখন খুঁড়ি-শাদা মাংশের সাথে আশ্চর্য উঠে আসে
চর্বিত ঘাস ও ললিত কঙ্কর, উঠে আসে স্বপ্ন শামুকসহ নারীর খোলস।

০৯.
আঁধারির জল

করতলে পদ্ম দিঘি হৃদি-কল্লোল। স্ফূরিত মেঘের ডানায় ফুল্ল কলরোল। দুলে ওঠে দুরন্ত শৈশব স্মৃতি,কলাপাতা ভাঁটফুল বনলতা প্রীতি। চোখ জুড়ে পায়রা নদীর শস্যময় তীর, দুলিছে বোশেখি মেলার উৎসবী ভীড়। খুঁজিতেছে কাহারে যেন এক বাউল ভাবুক,হয়তো বা কাঁচা রোদ, অপক্ক চিবুক। নেই তো সে নেই গ্যাছে অনন্ত নাইয়রে, সে খবর মিলেছে গাঙের সান্ধ্য জোয়ারে। এ পারে জমেছে নীল আঁধারির জল, আর তার ধূপছায়া কান্তি অতল। তার সাথে মিশেছে আহা হিম জাফরান, ছড়াইতেছে কিশোরীর কিংশুকী ঘ্রাণ।

১০.
খন্ডিত আকাশ

বোধের অপূর্ণতা নিয়েই বৃষ্টির কুয়াশায় উঠে এলো রোদ মেঘের ঢাকনা।
শেকড়ের স্পর্শ ছাড়াই খুলে গ্যালো পাঁজরের খোলস।
অনিবার্য বিচ্ছেদের বিবরে জেগে ওঠে দ্বিধান্বিত ঝাউবন।
তোমাকে আর খুলে দেখা হলো না।
দু’টুকরো সময়ের ভেতরে আজো নির্লিপ্ত ঝুলে আছো তুমি খন্ডিত আকাশ।

১১.
তিন পাঁচ সাত

ছাড়াছাড়ি শব্দটার ব্যবচ্ছেদ করেও তুমি অন্তত তিনটিবার ভলোবাসাকে ভুল নাম ধরে ডেকেছিলে। চৌকাঠে পা রেখেও অন্তত পাঁচবার ভেবেছিলে-বোঝাপড়ার সাঁটবুনটে সূতো ছেঁড়ার কোন গল্প ছিল কিনা। সবুজ কর্ণিয়ায় যে কাঁচভাঙা নদীটা খেলা করে তার সাথে সাঁতারের পাল্লা দিয়ে অন্তত সাতটিবার পেছন ফিরে দেখেছিলে- যাওয়াটা আসলে যাবার ছল করে তুমুল ফিরে আসছে তোমার দিকেই।

১২.
শূন্যতার মার্বেল

বরফ হিমেও তাকে আমরা মিঠে রোদ নামাতে বলি না। বিপদ হয়।
রোদের অহংকারে গোটা শহরকে পুড়িয়ে সে তখন প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় পূর্ণিমা আকাশের। তাকে আমরা কাছে থাকতেও বলি না। কাছে থাকার মানেটা সে বোঝে-আঁচলের সূতো হয়ে থাকা। তাতে বিপদ হয়।
নারীরা আঁচল ছিঁড়ে অরণ্যে হাওয়া খেতে গেলে সে-ও যত্রতত্র নক্ষত্রদের ছিন্ন ভিন্ন করে।
তাকে আমরা দূরে থাকতেও বলি না। তার দূরে থাকা মানে উর্বর সময়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকা। তাতে বিপদ হয়। তখন  কর্ষণ ছেড়ে বসে বসে শূন্যতার মার্বেল ছুঁড়তে থাকে সে অঙ্কুরিত স্বপ্নের স্তম্ভের দিকে।

১৩.
একটি তরল গদ্য

এই গদ্য কথনটির বয়ান আমার মুখে সাজে না। আমি মুখ্যু সুখ্যু। খাওনের দানা ফলাই। বউরে সাজাই। বাচ্চা দেই। বড়ই সুখ। ডাগর মাইয়ারা ক্যান জানি আমারে দেইখ্যা খালি হাসে আর ডাকে। আমি যাই না। যামু ক্যান্? আমি কি রতন ঘরামি না কি? রতনডা কেমুন য্যানো। কাউরে মান্যি গন্যি করে না। তয় তাহার কথাটি বলিতে খুব সাধ হইতেছে।  রতন ঘরামির ঘরখানা যেমুন,বউও আছিলো তেমনি। বড়ই সোন্দর। সেই রতন এক জাউরা পোলার মা’র খাওন দেখিয়াই তাহার মাথায় আগুন উঠিল। (আহা! জাউরার জন্য কি দরদ!)দিলো পাছায় দুইখান লাত্থি মোড়ল বুইড়াটাকে। ইহা কি কোন জায়েজ কাম হইলো? কিন্তু রতনের সোজা কথা-‘লাত্থি মারাটা ফরজ আছিলো।’ কিন্তু ফরজ কামের মাজুনডা যে কেমুন-রতন তো তাহা জানিত না। তাহার পূর্ণিমা ঘরে কৃষ্ণপক্ষ নামিল। অসূর নামিল। বজ্র নামিল। আর বউটির নাভীতলে কত সীসাই না ঝরিয়া পড়িল। আহা! এমত বয়ানে চক্ষু ভরিয়া জল আসিয়া পড়ে। কিন্তু পোড়া কপাল্লিয়া রতন কয় কি জানেন? কহিল,‘যাউক গা। রতন কাউরে ডরায় না।’ হায় আল্লাহ,কয় কি শয়তানডা? তো রতন ঘরামির আবারো ঘর উঠিল। পূর্ণিমা ভাসিল। চাঁন্দের মতোন  বউ আসিলো। তা আসিলে কি হইবে-বউ এর তলপ্যাট তো আর রতনের জন্যি খাঁ খাঁ করিতো না। রতন ঘরামিরা আসলেই হারামির বাচ্চা হারামি। তাহারা ক্যান্ যে বান্ধা জলে ঘর না বাঁন্ধিয়া মাইনষের কোলে ঘর বান্ধে-তাহা এই অধমের কিছুতেই বুঝে আসে না।

১৪.
কার্তিকে কালো নদী

ঝিম ধরা পাতার শুকনো ডানায় ঝরে পড়ে ঝুমকো বকুল। দুপুরের শাদা চাঁদ গিলে খায় হেমন্তি কাঁচা রোদ।  আমি এ ঘর থেকে ও ঘরে যেতে চাই,যাবো একটুখানি। হাজারটা ঘর নাকি উঠেছে ঘরের ভেতর। ভাতগন্ধ বিকেল আজ ও ঘরে জ্বালাবে নবান্ন ময়ুখ। যাবো আমি একটুখানি শিশিরের গন্ধ ছুঁয়ে। কোথা পথ? এই কার্তিকেও পথের আদলে আশ্চর্য শুয়ে আছে দেখি মেঘ কালো নদী!
 

১৫.
শিমুলে দুধেল শিশির

পুরো আকাশটাই নেমে এসেছিল শোকার্ত নদী হয়ে। যূথবদ্ধ আকাশ নদী একই সমতল ছুঁয়ে দেখেছিল-উচ্ছলিত মাছেদের চোখের কার্নিসে অসম্ভবের ঝিনুকি চাঁদ। তালুবন্দি হয় না তো কোন জোছনা সুখদ। শুধু অযাচিত টান পড়ে প্রাচীন সংসারে। তখন এক বোতাম ছেঁড়া কিশোরীর বুকের তলে যে ছন্নছাড়াটি ডাংগুলি খেলেছিল-তাকে আর ঘুম গানে জাগাতে পারে নি কেউ মাঘী পূর্ণিমায়। হয়তো বা সেই শূন্যতায়-আসছে শীত কিংবা বসন্তে শিমুলে শিমুলে নেমে আসবে ভালোবাসার দুধেল শিশির। ফিরে যাবে নমিত আকাশও তার নীলাভ আকাশেই।

১৬.
বুনো বোবা রাত

আঁজলায় জমানো ছিল ভোরের কাজল, হৃদি কল্লোল, দিঘিজল ছোঁয়া ধুলিওড়া লাবণ্য মেঠোপথ। থাকে নি সেইসব ঐশ্বর্য অপার। তারপর কে যেন কবে বলেছিল,‘দাঁড়াও সুপান্থ, পশ্চাতে নদী.এনে দেব দু’হাতে তোমার বিহঙ্গ জোয়ার। কবে কোন্ দেবদারু সবুজ রাতে ডেকেছিল রোদ রাঙ্গা চাঁদ, পেতেছিল শুদ্ধ জলের ছায়ায় শয্যা শোয়ার। আহা! কার যেন রিনিঝিনি হাত ছুঁয়েছিল নষ্টনীড় কাঁধ। অত:পর সেই আঁজলা, নদী, চাঁদ, সেই রিনিঝিনি হাত ঝুলে আছে দ্যাখো, দ্যাখো একলা হাওয়ায়। সাথী হয়ে জেগে আছে শুধু বুনো বোবা রাত।

১৭.
শব্দের কৌলিন্য ও মানুষ

কতিপয় কুলিন শব্দ এখন যাচ্ছেতাই। বিবস্ত্রও বলা যায়।
ধরা যাক্ ‘ভালোবাসা’র আদিম শব্দটি। সেই কবে কৌলিন্য হারিয়ে বসা এই শব্দটি এখনও নিষ্ফল ওম্ দেয় নষ্ট সব বিশ্বাসে। চোখের ভূপৃষ্ঠে জলজ হামাগুড়ি দিতে দিতে শব্দটি এখন না টানে কৃষ্ণচূড়া, না টানে নারীর আঁচল।
‘স্বপ্ন’ তো এখন কেবলি বদ্ হাওয়া। রাত কিংবা দিন এ সে শুধু ঘুমই পাড়ায়, যদিও তার তাড়াবার কথা ঘুমকেই। ভীষণ রাক্ষুসে ‘ক্ষুধা’ শব্দটি সমস্ত সৌন্দর্য খেতে খেতে এমনই ঢাউস যে, তার এখন সুগারের ঘনত্বে ঘন ঘন পেচ্ছাব পায়। অথচ এই ‘ক্ষুধা’ই অমোঘ সৃষ্টির চমৎকার একটা প্রতিশব্দ হতে পারতো।
কিন্তু ‘সৃষ্টি’র সাথে যে জড়িয়ে ‘বন্ধ্যাত্ব’ তাকে খন্ডাবে কে? এইখানে ‘মানুষ’ শব্দটি খুব প্রাসঙ্গিকতা পেয়ে যায়। কিন্তু মানুষের অসম্পূর্ণতা নিয়েও তো ঢের প্রশ্ন। বন্ধ্যাত্ব তাকেও গিলে খাচ্ছে অবিরাম। তবে ‘মানবিক’ শব্দটি অর্থবহ হলে কাকধোয়া বৃষ্টি তার অনুষঙ্গ হতে পারে এবং তাতে ‘মানুষ’ও একটি সম্পূর্ণ শব্দ হয়ে উঠতে পারে এখনও।

১৮.
অদৃশ্যের কাঁধে হাত

সুখ ছুঁয়েছে বনভূমি মন, নদী ছুঁয়েছে জলে ভেজা রোদ,
তবুও সংশয়ী অবসন্ন বোধ-
পাখির ভাষায় ভিন্ন কথা কয়, যেন বা পরাজয়।
জয়ের নির্মাল্য গেঁথে গেঁথে হাতখানি তার রেখেছে পেতে অদৃশ্যের কাঁধে। অথচ অবাধে-কে কাহারে ছোঁবে
ডুবিবে ডোবাবে, কে বা কাহারে বুঝিবে  বোঝাবে- সেই প্রশ্নের নেই উত্তর।
ক্ষয়ের ভেতরে ক্ষয়,মিলিতে মেলাতে ভয়, দুর্বোধ্য বাতাসে ভাসে মেঘ।
হয় না তো কিছুতেই কিছু হয়ে ওঠা, শূন্যে খেলা করে শুধু আনন্দ আবেগ।

১৯.
লুকোনোর কিছু নেই

লুকোনোর মতো কিছু নেই। দ্যাখো-করতলে ধু-ধু মাঠ, বৃক্ষের মৃত পাতা। ত্বকে অস্থিমজ্জায় পাঁজরের ঘুণিত ফ্রেমে খুঁজে দ্যাখো-হননের কোন জারিত ইচ্ছে কোথাও পুঁতে রেখেছি কিনা। শুধু নেশাহীন সাদা চোখ নির্মেঘ খোলা ছিল,যেন উদ্বাস্তু প্রেম এ ঘর ও ঘর করে খানিক জিরোতে পারে নৈসর্গিক নিভৃতে।
লুকোনোর মতো আসলেই কিছু নেই। দ্যাখো-পাথর শূন্যতাকেই ক্যামন মেলে রেখেছি ঘাসের শিশিরে। গিঁট খুলে খুলে দৃশ্যমান করে রেখেছি সম্পর্কের সমস্ত নষ্ট বাঁধন। এভাবেই একে একে ছাড়তে হলো সব ক’টি আচ্ছাদন, কেননা-যেতে যে হবে তুমিহীন তোমাকেই ছাড়িয়ে, দূরে।

২০.
রাত্রির নি:শ্বাসে একা

জল ধোয়া বিকেলটা পুড়েছে রোদের তৃষ্ণায়। রোদ্দুরটা মেঘের হাত ধরে লুকোতে চেয়েছিল পাহাড়ী গুহায়। তনু মেঘ ততক্ষণে রংধনু বিকেলের সাথে পরকীয়ায় একাকার । অত:পর আটপৌড়ে সন্ধেটাই যখন বিকেলের আদলে এসে দাঁড়ালো তোমার দিঘি চোখ নীলিমায়, আমি তখন ঘন রাত্রির নি:শ্বাসে একা।

২১.
নি:সঙ্গ শব্দটির পদযাত্রা

শব্দটি হেঁটে যাচ্ছে। নি:সঙ্গ। তার চক্ষু স্থির। নির্লিপ্ত। কিন্তু লক্ষ্যভেদী। শাপলা মোড় থেকে পল্টনে পৌঁছনোর আগেই তাকে খুবলে খেয়েছে কতিপয় ক্ষুধার্ত কাক। ত্বকে তার দগদগে ঘা। শুভার্থীরা ছুঁড়ে দিচ্ছে গামলা ভর্তি তরল সবুজ, ঝুড়ি ঝুড়ি রক্তজবা, রোদে ভেজা মেঘের মলম। কিন্তু ভনভনী মাছিরা তবুও নড়ছে না ঘা থেকে।
একুশের মাঠ থেকে শোক পাথরের রায়ের বাজার হয়ে বধ্যভূমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে শব্দটি যাবে আজিম নগরের শহীদ সাগরে। সেখানে তার শুদ্ধস্নান। কিন্তু দোয়েল চত্বরেই তাকে রুখে দিয়ে যে যার মতো করে বেছে নিচ্ছে নারী ও শয়ন,মগজ ও মনন,কেড়ে নিচ্ছে সুডৌল স্বপ্ন ও স্বজন।
অথচ শব্দটির মাথার ওপর অমিত বৃক্ষের সারি, চোখের নিম পাতায় ফুল্ল নারীর অপূর্ব কারুকাজ, হাতের মুঠোয় নাগরিক কাঠিন্যের মায়াবী কোমলতা। তবুও তাকে হেঁটে যেতে হচ্ছে নি:শব্দে। একাকী। ভনভনী মাছিরা দারুণ মজেছে ঘা‘য়ে। তার শরীর থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে গামলা গামলা সবুজ,ঝুড়ি ঝুড়ি রক্তজবা,আর রোদ বৃষ্টির হলদে মলম।

২২.
এপ্রিলের আট

যেতে যেতেই কথা হবে। যেতে যেতেই রেখে যেতে চাই সমস্ত অভিজ্ঞান। যেতে যেতেই দেখে নেব রাতের বুভুক্ষু শরীর। যেতে যেতেই আকন্ঠ তুলে নেব সবটুকু অপূর্ণ চুম্বনের স্বাদ।
ও ঘূর্ণি জীবন, ফেরাও আমাকে, না হলে যেতে যেতেই ছুঁড়ে ফেলে দেব স্বপ্ন ভ্রুণের সমস্ত সঞ্চয়।
যেতে যেতেই বুঝে নেব কে থাকে কার অপেক্ষায়,কতটা রক্তঘামে ভিজে ঈশ্বরের মতো মুচকি হাসে।
ও প্রিয়া, বাড়িয়ো না অসম্ভবের হাত। অনাবিষ্কৃত সন্ধ্যার নি:সঙ্গ আলোতেই খুঁজে নেব সপ্রেম আলিঙ্গন।
যেতে যেতেই এপ্রিলের আট এ এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়াবো,যেখানে
বিনা বজ্রে পতন হয়েছিল এক নক্ষত্র ভালোবাসার।

২৩.
রাত কালো বৃষ্টি

সন্ধ্যাতেই রাত্রি নামে। একাকী আকাশ । কিছু তারা ঝুলে থাকে এখানে ওখানে। বাতাসের শরীরে উষ্ণতার ছোঁয়া। তুমি কি ছেড়েছো কোথাও গোপন দীর্ঘশ্বাস? রাতের ভেতরে জেগে থাকে রাত। অপেক্ষার দেয়াল ঘড়ি বাজে অবিরাম। দরোজায় নি:শব্দে দাঁড়ায় কোন্ আগন্তুক? তোমার ক্লান্তির মতো বিষন্ন কি কেউ? চোখের পাতায় আটকে থাকে ঘুম। রাত কালো বৃষ্টিতে ভেজে কোন্ কিশোরী ? ধ্যানী পৌঢ়ত্ব নীরবে হেঁটে যায় কি তোমার দিকেই? অথচ কোথাও তুমি নেই। তবু কেন আছো প্রশ্ন হয়েই?

২৪.
জলের আকাশ

চেনা মুখ চেনা নৈসর্গিক পাখপাখালি,প্রাচীন আকাশ উল্টোপাল্টা অবয়বে নিত্য দৃশ্যমান আজকাল। পাওনা পয়সার মতো পাওনা বৃষ্টি জল চাইতে গেলে বেআব্রু আকাশ এখন মেপে মেপে জল ঢেলে দিচ্ছে মুখে। আবার কাঙ্গালের মতো হাত পাতলে ফর্সা মুখ থেকে নেমে আসছে কালো বর্ষা। বুকের তাপে গলে যেতে প্রস্তুত-এমন নারীর বুকেও এখন গলিত লাভার টগবগানি। অথচ একটা নিমছায়া বসতির জন্যে ভালোবাসার মতো খোলা জানালার জন্যে আদ্যিকালের চেনামুখ, চেনা পাখপাখালি এবং মেঘহীন জলের আকাশের খুব প্রয়োজন এখন এই ক্ষয়িষ্ণু সময়ে।

২৫.
ধূলোর প্রলেপ

যা দেখি তার চেয়ে বেশি দেখি ধূলোর প্রলেপ, ভাঙা রোদ, বিচূর্ণ ইচ্ছের স্বপ্নহীন মাতামাতি। রংধনু নকশা বলো আর জোছনা মাখা ছায়াই বলো-দৃষ্টিসীমায় পড়ে থাকে বন্ধ্যা জমিন,নদীহীন নদী। আরণ্যিক মেঘের চোখে যে বিচ্ছুরিত দ্যুতি, তাতেও দেখি লৌকিকতার অসার ফুল্ল ধ্বনি। আচ্ছন্ন হয়ে থাকা সমস্ত অভিজ্ঞানে জুড়ে থাকে নগ্ন ক্ষুধা, রক্ত মাটির বেদনার্ত ঋণ। পাঁজর ভেঙে আকুল ডেকে ওঠে যে সুন্দরের হাহাকার,তার জন্যে কোথাও কোন অধীর অপেক্ষা নেই। নি:শ্বাসের ঘ্রাণে সুগন্ধ গোলাপ তুলে দেয়ার নামে দেখি শুধু ভুলিয়ে রাখার শতেক বাহুল্য প্রকার।

………………………………
কবি পরিচিতি

রাহমান ওয়াহিদ

রাহমান ওয়াহিদ

রাহমান ওয়াহিদ। জন্ম: ছাপ্পান্ন‘র সতের জানুয়ারী বগুড়ার এক নিভৃত পল্লীতে। তবে বেড়ে ওঠা পাবনার রেল জংশনের শহর ঈশ্বরদীতে। লেখালেখি শুরু নব্বই এর শেষের দিকে। ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত দু’হাজার সাত এ। বাংলা সাহিত্যে সন্মানসহ স্নাতকোত্তর। এ পর্যন্ত প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থ- সাতটি, শিশুতোষ গ্রন্থ- সাতটি, উপন্যাস-দু’টি। সন্মাননা-মেলে নি। মোবাইল:০১৭১১-০৫৫২৮১
ইমেইল: wahid1956@yahoo.com

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E