৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
নভে ১৪২০১৬
 
 ১৪/১১/২০১৬  Posted by
কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তের কবিতা এক সুরেলা নদীর মতো, কুলকুল বয়ে গেছে সমুদ্র মন্থনে
– কামরুল বাহার আরিফ

কবি কামরুল বাহার আরিফ

কবি কামরুল বাহার আরিফ

‘কবিতা সজল চেতনার অসম্পূর্ণ ইতিহাস অথবা একটি কল্পিত ড্যাশবোর্ড- যেখানে নিমজ্জমান যাত্রাজ্যামিতির প্রতিফলন দৃষ্টি গ্রাহ্য।’ অথবা, ‘বিষাদ বেদনার অপ্রতিম শিল্পাবয়ব অচিন্ত্য বলে রচিত হয় আয়ুবিনাসী পঙক্তিমালা।’ কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর’ থেকে শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘ট্রোগনের গান’ এমনই বিশ্বাস আর ভাবধারায় এগিয়ে নিয়েছেন। তবে তাঁর কাব্য নির্মাণে অন্যদের থেকে নিজেকে একটু আলাদা করবার চেষ্টা করেছেন। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ত্রিশ, চল্লিশ দশক পেরিয়ে অর্থাৎ বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণুদে, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জীবনানন্দ দাশকে পেরিয়ে, তাদের কাব্যশৈলী, বাক্যবিন্যাস, পদ্যরীতি ও ভাবধারাকে পেরিয়ে বাংলা কবিতার চড়াই-উৎরাই শেষে আজ যেখানে এসে কবিতা দাঁড়িয়েছে সেখানেও আঙ্গিকতার পরিবর্তন ঘটলেও সুক্ষ্মভাবে তাঁদের ছায়াকে অতিক্রম করতে পারেনি। তবে বিশাল গৌরবান্বিত এক ইতিহাস, দেশভাগ থেকে ভাষা আন্দোলন হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের কাব্যকে করেছে শক্তিময়, বৈচিত্রময়, প্রাণময়। সেই প্রাণের বৈচিত্রের শক্তি নিয়ে কবি শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ, নির্মেলুন্দ গুণ, রফিক আজাদ, হেলাল হাফিজরা বাংলা কবিতার প্রাণে যে ঝংকার, দেশপ্রেম আর চেতনার নৈবেদ্য দেখিয়ে গেছেন তারই পরম্পরায় কাব্য বুনে যাচ্ছেন আজকের কবি গৌরাঙ্গ মোহান্তরা। তবে সময় আর ভাষা বদলে যাচ্ছে, আধুনিক পৃথিবীর আঙ্গুলে আঁকা নতুন নতুন দৃশ্য আর পৃথিবী জয়ের ভাষায়। আজকের কবিদের কবিতার ভেতরে তাই সীমানা অতিক্রম করবার প্রচেষ্টা কিংবা স্বভাবতই সীমানা পেরিয়ে গিয়ে যুক্ত হয়ে যাওয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা কবিতাকে ভিন্নস্বাদ এনে দিচ্ছে। এটা সময়ের আবেদনও বলতে পারি। মানুষের ভেতরে কাঙ্ক্ষাকে কবিরাই সর্বাগ্রে ফুটিয়ে তুলবেন তার কবিতার পঙক্তিতে এটাই তো স্বীকৃত।

‘পানকৌড়িবোধ নিয়ে নিমজ্জিত থাকি; একটি মাছের উজ্জ্বলতার পাশে দেখি জলজ রাজ্যপাট।… আমার কৃষ্ণতা পানকৌড়ির ঐশ্বর্যে রঞ্জিত। আমার প্রার্থনার ভেতরে মাছের অলৌকিক পুচ্ছের অবিকল্প বিকরণ।’
– (পানকৌড়িবোধ, ট্রোগনের গান)

এমন এক ঘনঘোর মায়ামগ্নতায় ঘিরে থাকা পদবাচ্যের ইমেজকল্প দিয়ে কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত নাড়া দিয়েছেন পাঠককূলকে। কবিতার এই শিল্পিত প্রকাশ কাব্যাংশ জুড়েই। সেকেলে কাব্য উপস্থাপন থেকে বেরিয়ে এসে সমকালীনতাকে ধারণ করে নিজেকে পাঠকের কাছে এক নব উচ্চতায় নিতে চেয়েছেন কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত। কবির সবচেয়ে উল্লেখ্য বিষয় হচ্ছে, তার সঞ্চিত শব্দভাণ্ডার। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার ডালি থেকে এতো শব্দের ব্যবহার করেছেন যা ভাবিয়ে তোলে পাঠককে। কবি ভ্রমণ করেছেন দেশের আলপথ থেকে পৃথিবীর বহু প্রান্তে, সাগর নদী জল পেরিয়ে, পাহাড় বন মরু পেরিয়ে, শহর নগর বন্দর পেরিয়ে কুড়িয়েছেন শব্দ আর শব্দ। তা দিয়ে কবিতার শরীর অলঙ্কৃত করেছেন নিপুণ শিল্পীর মতো। কবিতাকে বানিয়েছেন দেবী। পাঠকেরা সেই দেবী আরাধ্যে দেবীমঞ্চে।

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত’র কবিতায় নিবিড়ভাবে লক্ষ করলে দেখা যায় যে, তার ভ্রমণজনিত অভিজ্ঞতালব্ধ শব্দগুলো বেশিরভাগই বিদেশী শব্দ, প্রকরণ, মিথ বা স্থান দ্বারা প্রভাবিত বা ব্যবহৃত। কিন্তু সেইসব প্রকরণকে উপমায় ব্যবহার করে ভারি মুন্সিয়ানায় মিলিয়ে নেন নিজের ভাষা বা ঐতিহ্য-ইতিহাসের সাথে। তিনি যেমনভাবে অন্য সংস্কৃতিতে মিলেছেন ঠিক তেমনভাবে নিজেকেও নিজের সাথে মিলিয়েছেন।

সুরক্ষিত হান নদীর গভীর মৎসগান তরঙ্গে মেশায় নিবিড় গন্ধতৃষ্ণা। হান ব্রিজের কাছে ক্যাফে চত্বরে বসে একদিন উজ্জ্বল ঘাসফুল মাঠে উদ্দাম কবুতরদলকে বুনে যেতে দেখেছি স্বপ্নের প্রসন্ন বীজ। (হানকূলে স্বপ্নবীজ, ট্রোগনের গান)

আবার,

দূর সৈকতে আজ জেগে ওঠে উন্মন ঢেউ। হিজলগন্ধহীন জলে ভিজে একবার তুমি গেয়ে ওঠো সুরমাশিহরিত সঞ্চারী!
কবি এক সুরেলা নদীর মতো। কুলকুল বয়ে গেছেন যিনি সমুদ্র মন্থনে। যার আলোকপ্রবণ মাছের প্রাত্যহিক উৎসবে নক্ষত্রনাম কীর্তিত হয়। কবি বিশ্বাস করেন- সূর্য মৃত্যুকে ঢেকে রাখে। আলোর কীর্তিই হচ্ছে আলোকিত করা। অন্ধকারকে তাড়িত করা। অন্ধকার মানেই এক দাহ বা দহন অনুভব। মৃত্যুসম। তাই তো কবি তাঁর ‘অন্ধকার ও দাহস্মৃতি’ কবিতা একটি নাম যে নামটা তার কাছে সূর্যসম। সে নামের স্মৃতিতে ঢেকে রাখতে চান অনন্ত দাহস্মৃতি।

‘অন্ধকার ও ট্রোগনের গান’ বলা যায় ট্রোগনের গান কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতা। এই কবিতার পরতে পরতে কবি তার নিজের দর্শনকে ফুটিয়ে তুলে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছেন। ‘প্রস্থানবিন্দু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হবার আগে কালকরবীর অনন্য আভায় পথরেখা চিনে নেয়া জরুরি।’ সতত এক আনন্দের অনন্যায় নিজেকে সবটুকু উজাড় করে দিতে হয় মৃত্যুকে পিছে ফেলে। এ জীবন অর্জনের, অনুভবের, উপভোগের। পৃথিবীর পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং যা-কিছু সৃষ্টি ও সৌন্দর্য তা মৃত্যু কেড়ে নেয়। এখানে কবি তার ইন্দ্রিয়ে মৃত্যুর প্রস্থানের আগে তাই কালকরবীর পথরেখা চিনে নিতে চান। যদিও ‘আবির্ভাবের চেয়ে প্রস্থান নিশ্চিত- এ ঘোষণা পানকৌড়ির অন্ধকার পাখায় প্রতিধ্বনিত হয় বারবার।’ নশ্বর এই জীবনের আবির্ভাব যেমন এক কথায় নিশ্চিত নয়, প্রস্থান কিন্তু নিশ্চিত। দ্রুতই সময় এগিয়ে আসে প্রস্থানের। কবি এখানে পানকৌড়ির অন্ধকার পাখার সাথে যে চিত্রকল্প এঁকেছেন তা অনন্য এক সত্যশিল্পে প্রকাশ পেলো তাঁর কাব্যিকতায়। জীবনকেই মানুষ ভালোবাসে। আঁকড়ে ধরতে চায় সেই ভালোবাসায়। যদিও জীবনের বাঁকে বাঁকে আছে বিরোধ ও যুক্ত হওয়ার বৈপরীত্য। মৃত্যু এক চির অবসানের গান। এই গান শোনা যায়, কিন্তু গ্রহণ বড়ই দহনের, বড়ই শূন্যতার। শূন্যতা মানে ক্রন্দনধ্বনি, অশ্রুপতন, কষ্টের পাথর পাহাড় স্থবিরতা, দিকশূন্য ধু-ধু মরুভূমি।

কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত বলেন,

‘মৃত্যুপ্রবণ মানুষের সংরাগী হওয়া সাজে না।’ তাই তো তিনি তার অনন্য দর্শন কাব্যের ভেতরের অন্তঃস্থল থেকে তুলে আনেন এভাবে,
জীবিতের জন্য জীবন এবং মৃত্যু- দু-ই মনোভাবের কারণ। আমার জানালার পাশে সবুজ কাঁঠালপাতা একদিন ভুলে যাবে নৃত্যের সরল মুদ্রা; দুপুরে ঘুঘুর মায়াময় সরলতা মিশে যাবে দেয়ালের শ্যাওলা নির্জনতায়, ধূসর আকাশে নিঃশ্বাস ছুঁয়ে ক্লান্ত বলাকা ফিরে আসবে না বৎসলা বাঁশবনে।
– (অন্ধকার ও ট্রোগনের গান’, ট্রোগনের গান)

তিনি একই কবিতায় নিজেকে প্রশ্ন করবার মধ্য দিয়ে সকলের কাছে প্রশ্ন করেন, স্পর্শানুভূতিহীন জীবন কি মৃত্যুর সমান? আবার নিজেই সে প্রশ্নকে ভেঙে উচ্চারণ করেন, ‘উৎস ও অনিবার্যতার মধ্যকালে সংবেদনার প্রাকৃত রূপায়ন মানুষের শ্রেষ্ঠ কীর্তি।’ তবুও ‘অন্ধকার মৃত্যুর ধ্বনি তোলে, আলোয় জাগে কার প্রতিধ্বনি।’
কবি তাঁর কাব্যজুড়ে যে মেটাফর বা রূপকল্প চিত্রিত করেছেন তা যেনো আধুনিক কবিতার এক বড় উপাচার।

দিনের আবিল জল রাতের শুদ্ধকল্যাণে পরিস্রুত হলে
স্রোতে ভেসে চলে সহস্য সুবাসিত শ্বেতকমল;
সমস্ত ফুলদলে বিম্বিত হয় শঙ্খফণা।

ছায়াশীতল জলে তখন স্নান করে যুথবদ্ধ মানুষ ও ঈশ্বর।
– (নিরঞ্জন মানবের সৌর হৃদয়, আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর)

কবির পঙক্তিরাশি জুড়ে যেনো এক মায়ার খেলা। তাঁর প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ গভীরতা সমকালীন অনেককেই ছাড়িয়ে যায়। শব্দ সচেতনতা, কাব্যিক মায়াজালের বিস্তারী কবি গৌরাঙ্গ মোহান্ত এঁকে গেছেন জীবন ও জীবনের অনুষঙ্গ তার নিজস্ব নির্ভেজাল বাকভঙ্গিমায়। তাঁর কবিতায় ইতোমধ্যে তিনি যে প্রজ্ঞায় প্রদীপ্ত আলো ছড়িয়েছেন নিশ্চয়ই তা বাংলা কবিতার হাত ধরে আরো অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করি। একইভাবে কবি সমাজের দায় থেকে নিজস্ব উর্বর চেতনাকে ছড়িয়ে দিয়ে পাঠককে আরো বেশি কাব্য উপহার দিয়ে প্রাণিত করবেন এ প্রত্যাশা করছি।

১৪.১১.২০৬

 

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E