৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ১৫২০১৭
 
 ১৫/০১/২০১৭  Posted by

ফেরদৌস মাহমুদ -এর একগুচ্ছ কবিতা টানাগদ্যে


কবি ও নতুন সক্রেটিস  

ঈশ্বরের মৃত্যু ঘোষণা করেছিলেন মহান নিটসে। আমি তার ছাত্র। দূরবিন হাতে জাহাজের ছাদে দাঁড়িয়ে দেখি আকাশগঙ্গা। নক্ষত্র চেনার বই আমার হারিয়ে গেছে বালকবেলায়। মহাদেশের উপর মহাসাগর চালায় অভিজান, অজ্ঞতারে উপভোগ করতে করতে নতুন সক্রেটিসের জন্য সাজানো হয় হেমলক! নীল নাস্তিকের হঠকারিতায় ডিগবাজি দেয় এক ঝাঁক হরিয়াল!

আমি হয়ে যাই বটগাছ, ভোররাতে স্বপ্ন দেখি বটফল। কবি হয়ে যান দু-খণ্ড মেঘ, মায়ের কবরে দুফোটা বৃষ্টি হয়ে ঝরতে চান।

নতুন সক্রেটিস বলেন, তোমরা হারানো জেনারেশনের কবি-সাহিত্যিক। তোমাদের কোনো টেক্সটই টিকবে না! ভুতুড়ে জগতে নিজেদের জীবন্ত দেখো, তর্ক করো, চমক আর চটকের গাড়িতে যাও লং জার্নিতে। প্রযুক্তি তোমাদের বাঁচাতে পারবে না। ফিরে আস নিজের ভেতর।

কবি পায়চারী করেন বিমানে, বাসে, স্টিমারে। পায়চারী করেন আকাশে-মাটিতে-পানিতে। কবিতা হয়ে ওঠে বৃদ্ধ বসন্তে আচমকা জেগে ওঠা কোকিল। যেন একগুচ্ছ হাঁসের মধ্যে বোকা বক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বালক।

কবিকে নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তারা জেনে যান– কবির বউটি ১দিন ইঁদুর হয়ে কেটে ফেলেছিল জংলীফুল আঁকা হাজারো প্রেমপত্র। কবি কিছুই বলেননি বউকে, বাড়ির প্রাচীন আলমারির মত দাঁড়িয়ে ছিলেন। গোপন সিন্দুকে লুকিয়ে রেখেছিলেন কিছু চকচকে স্মৃতি। বউটি একদা ছিল তার প্রেমিকা !

কবিকেই বলি, বাঁচার জন্য খাঁচার ভেতর নত হয়ে আর কত সময় হবে হত্যা? মৃতদের গণিকালয়ে আর কত চলবে বাল্মিকীর মৃত্যুর অভিনয়? এখন সময় মহাকাব্যে মহাযান ভাসানোর, এখন সময় গ্রহণ করার হারিয়ে যাবার সব পথের নিমন্ত্রণ।

নতুন সক্রেটিসের সামনে জটপাকানো রুপালি সিল্কের ফিতের মতো খুলে যায় নদীর পর নদী। সবুজ হয়ে ওঠে রক্তের বোতলে ভাসমান মহাপাড়া।


বুলগেরিয়ান সাইকেল

আমাদের সিনেমা হলে মুক্তি পেল ওয়েস্টার্ন মুভি ‘গুড ব্যাড অ্যান্ড আগলি’।আমি মাটির পিস্তল নিয়ে দেখতে গেলাম। নিজেকে মনে হল খোঁচা-খোঁচা দাড়ির ওয়েস্টার্ন নায়ক। ইচ্ছে হলো ১টা লাল ঘোড়া কেনার।

পাহাড়প্রেমী বাবা কিনে দেননি। বলেছিলেন আজকাল কেউ ঘোড়া পালে না। ঘোড়ার প্রয়োজনীয়তা যেভাবে কমছে, একসময় হয়ত ঘোড়াই থাকবে না। মানুষের কাজে না লাগায় বহু প্রাণীই ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমি চিড়িয়াখানায় গিয়ে বিশাল কালো হাতি আর দুর্বল এক ঘোড়ার পিঠে চড়লাম। আমার ঘোড়া কেনার শখ দূর হলো না। রাগে-দুঃখে বন্ধ করে দিলাম ওয়েস্টার্ন মুভি দেখা।

বাবা আমাকে ১টি বুলগেরিয়ান সাইকেল কিনে দিলেন। সাইকেলটিই হয়ে উঠল আমার ঘোড়া। ঘাসভর্তি সবুজ মাঠ আর কালো পিচের রাস্তায় রোজ সাইকেল নিয়ে মেতে থাকতাম। আমার পেছনে দৌড়ে বেড়াত ‘ভুলু’ নামের সুইস-কুকুর। মাঝে-মাঝে তালের কালো বোটে চড়ে সাইকেল নিয়ে নদীর ওইপারে যেতাম পাখি শিকারের বনে। পাখিরা আমাকে দেখে একদম পালাত না, পাখিদের আনন্দে গুলি করতে মায়া হতো। সাইকেলে ক্রিং-ক্রিং শব্দ তুলে দেখতাম প্রজাপতির নাচ, শুনতাম পাখিদের কিচির-মিচির।

গতকাল রেলের ধারে ব্রেকফেল করে এক সাইনবোর্ডে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলাম ঘন ঘাসের ঝোপে। পুরনো লোহার খোঁচায় সাইকেলের টায়ার পাংচার হয়ে গেল। সাইনবোর্ডে লেখা ছিল  : উড়ন্ত পাখিরা সব দশ টাকার ছেঁড়া নোট, তারারা রঙিন ছেঁড়া কাগজ। নিজের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে আমরা কেউই থাকি না।’

প্রিয় বুলগেরিয়ান সাইকেলটি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, নিজের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে আমাদের সকলেরই থাকা উচিত!


জাদুকরের কথা

তোমরা কি ভুলে গেছ সেদিনের কথা, এ শহর ঢেকে গিয়েছিল অন্ধকারে। তোমরা পালাতে চাচ্ছিলে কিন্তু পালাতে পারছিলে না, কেননা তোমরা দেখতে পাচ্ছিলে না কিছুই। জগতের সব তার ব্যবস্থা তখন ছিল অকার্যকর। দিনের সূর্য মেঘ দিয়ে ঢাকা প্রায় ৭ সপ্তাহ। ঠিক তখনি তোমাদের শহরে প্রবেশ করেন শেষ জমানার ১ জাদুকর, ১ স্বপ্নবাজ আদম।

… ওই জাদুকর, যিনি ছিলেন তোমাদের মুক্তিদাতা।

তিনি এসে তোমাদের শহরটা প্রথমে চোখ বুজেই প্রদক্ষিণ করলেন। নিজস্ব ঝোলা থেকে বের করলেন ১ মুঠো ধুলো, ছড়িয়ে দিলেন শূন্যে। তারপর বাজালেন ১ টি তুড়ি… সমস্ত শহরই হয়ে উঠল আলো-ঝলমল।

তোমরা যারা কিছুই দেখতে পাচ্ছিলে না, তারা প্রথমে অবাক হলে, পরে যখন বুঝলে এটা ওই জাদুকরের কাজ, তখন তাকে ঘিরে ধরলে, পূজা দিতে চাইলে। এমনকি তোমাদের শহরের সব তরুণী চাইছিল জাদুকরকে কাছে পেতে কিন্তু জাদুকর ওই পূজা, ওই সমস্ত নারীকে প্রত্যাখান করলেন। জাদুকর বাঁশি বাজালো, জাদুকরের মুখমণ্ডলে দেখা দিল স্বর্গীয় পবিত্রতা।

তোমরা এ প্রত্যাখানে শেষ পর্যন্ত ক্ষুব্ধ হলে এবং তাকে হত্যা করলে। আর তখনি তোমাদের শহর পুনরায় অন্ধকার হয়ে গেল, কিন্তু তোমরা বুঝতেই পারলে না। কেননা, এবার অন্ধকারের মধ্যে তোমরা দেখতে পাচ্ছিলে সবই। তবে তোমরা একটুও বুঝতে পারোনি তোমাদের এ দেখা পুরোপুরি ছিল ভুল।

নিশ্চয় তোমরা সেদিন ভুল বুঝেছিলে, অন্যায় করেছিলে জাদুকরকে পূজা দিতে চেয়ে। অন্যায় করেছিলে জাদুকরকে হত্যা করে, তার লাশকে ফুলে ফুলে ঢেকে দিয়ে।

তোমরা বুঝতেও পারলে না এরপর থেকেই তোমরা হয়ে উঠবে একে-অপরের ঘাতক!


সূর্যাস্তের আড্ডা

তুমি আর আমি বন্ধু আবার বন্ধু নই। লাল ব্রিজে দাঁড়িয়ে পাই আউশ ধানের গন্ধ। সূর্যডোবার রঙ নিয়ে চালাই গবেষণা। মনে হয় এ শহরে সব বিদেশি ঢঙের বাড়ি। দেশের ভেতর আমরা বিদেশে করছি বাস। পাগলা ঘোড়ার লেজে জোনাক জ্বলে একা। পানিতে মোমের বালিশ গলে গলে ভাসে। সমমত আর ভিন্ন মত সাধ্যমত যায় রঙধনুর দিকে। শূন্যতা লেখে আত্মজীবনী দিনপঞ্জির কালিতে: বাতাস যদি দেখা যেত তবে পৃথিবীতে শুরু হতো বায়ুযুদ্ধ’।


সময় বিষয়ক সেমিনার

সময় তো মেকি ভাবনা, নিহত বাউলের কণ্ঠের সুরের মতো পথ হারানো ধারণার নাম!

যদি সূর্য না ঘোরাতো ম্যাজিক্যাল আলো, চাঁদ না ওড়াতো জ্যোৎস্না তাহলে হয়ত এই বিষয় জানতই না কেউ। বলা যায়, সময় বাতাসের অনুভূতিতে ঠান্ডা-গরম ধাক্কা দিয়ে চলা অনির্দিষ্ট জার্নি; আমরা সকলে এই যাত্রার যাত্রী ও জাহাজ। আমাদের যে বাৎসরিক কিংবা ব্যক্তিগত উদযাপনের দিন, তারা এক-একটা উল্লাস আর বিষাদ জাগানো স্টপেজ। যেমন– ১ বৈশাখ, ১ জানুয়ারি, ২১ ফেব্রুয়ারি কিংবা ১৬ ডিসেম্বর…

এসো, এই স্টপেজগুলো থেকে সুদূর যাত্রার  জাহাজের তেল-খাদ্য-পানীয় নেয়ার মতো নেই নতুন প্রেরণা। জানতে চাই, আমাদের জন্মের কয়েক লক্ষ বছর আগে মরে গিয়েছিল যে সকল তারা, তাদের কাউকে না কাউকে কেন পাচ্ছি দেখতে প্রায়ই সন্ধ্যায়! এই সব সন্ধ্যাতারা কি প্রমাণ করে না মৃত্যুর সাথে হ্যান্ডশেকের পরও আমাদের কাউকে না কাউকে দেখা যাবে অনেক অনেক দিন।


বৈজ্ঞানিক কল্পকবিতা

জীববিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি নম্বর পাওয়া জলমানব সে, কয়েকটা পোষা ডলফিন আছে; ডলফিনের সাথে তার কথা হয় রোজ প্রাচীন আত্মীয়ের ভাষায়। সে সমুদ্রের মাছ, লতা-পাতা খায়। হাঙর শিকার করে, নীল তিমির দুধ দোয়, নীল তিমির চর্বি থেকে তৈরি করে জ্বালানি তেল কিংবা সামুদ্রিক শ্যাওলা থেকে কাপড় বুনে করে পরিধান। হাঙরের দাঁত দিয়ে মালা বানিয়ে দেয় উপহার স্থলজীবন ভোলা সমুদ্র-বান্ধবীদের।

হে দুঃখী কবি হে অসুখী বিজ্ঞানী তোমারা কেন তাকে বারবার প্রদর্শন করতে চাও স্থলমানবের অট্টহাসিমাখা ২২২৪ সালের অন্ধ অ্যাকুরিয়ামে?

দেখো আমি আর সে ডলফিনের মতো ডিগবাজি দিয়ে পান করছি বাষ্প হয়ে চাঁদে যাওয়া সমুদ্রের নোনা পানির হাসি।

……………………
কবি পরিচিতি :

ফেরদৌস মাহমুদ

ফেরদৌস মাহমুদ

ফেরদৌস মাহমুদ। জন্ম :  ২৩ অক্টোবর, ১৯৭৭; চরডিক্রি, মুলাদী, বরিশাল [নানা বাড়ি]। শিক্ষা : স্নাতকোত্তর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান। কাব্যগ্রন্থ : সাতশো ট্রেন এক যাত্রী (২০০৬), নীল পাগলীর শিস (২০০৯), ছাতিম গাছের গান (২০১২), আগন্তুকের পাঠশালা (২০১৬)। জীবনীগ্রন্থ : সত্যজিৎ রায় (২০০৯),  ছোটদের বই : সন্ধ্যা তারার ঝি [ছড়া ও কবিতা] (২০১৬), রোদসীর পাখি উৎসব [গল্প] (২০১৭), ড্রয়িংখাতায় ফুলের গন্ধ [গল্প] (২০১৭), ইতিহাস : বিশ্বযুদ্ধ (২০১৭)

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E