৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ডিসে ২০২০১৬
 
 ২০/১২/২০১৬  Posted by

আরিফ শামসুল এর ২৫টি কবিতা টানাগদ্যে

১ *
উন্মাতাল মেঘচোখ

দুর্লভ গা‌ছের সা‌থে পিঠ ঠেকাই না, এ অক্ষমতা চিত্তকে কাবুও ক‌রে না। গণতা‌ন্ত্রিক সূর্যা‌লো‌কের দি‌কে এগিব‌য়ে যাই, সমুদ্রগামী উড়ন্ত ফ‌ড়ি‌ঙের পাখায় পাই সূর্য আর পা‌নির কারুকাজ।

তাই চো‌খের পা‌নির ম‌তো পৃ‌থিবী‌কে যুম-আউট ক‌রি না। বরং বিখ্যাত পাহাড় আর মৌমা‌ছির আবাস দেখ‌লে উল্টো  দৌড় দিই।

সক‌লে উপ‌দেশ দেয়, আমি। যেন আকাশ পথ ছা‌ড়ি, আকাশ না‌কি শুধু কুয়াশাময় মাকড়সায় ধু ধু। রাজগ‌দ্যের গ‌লি দি‌য়েও দে‌খে‌ছি, বই আর ম্যাগা‌জি‌নের পাতা উল্টা‌লে শুধু কুয়াশাময় মাকড়সার রাজত্ব।

আমিা ভে‌সে চ‌লি আমার এই একান্ত অভিড়মা‌নি আকা‌শে; কো‌নো নক্ষ‌ত্রের দা‌মি পোশা‌কে গা ঘেঁ‌ষি না।

আমিা তো গাছ বে‌য়ে চলা বিষ‌পিঁপ‌ড়ে, শী‌তের আবির্ভাব টের পে‌য়ে পি‌ঠে বোঝাই ক‌রি হী‌রের স্বপ্ন। মাস্তান‌দের ম‌তো জুল‌ফি রা‌খি না, সেল‌ফি বু‌ঝি না। নিজ ক‌রে ক’রে শস্য উৎপাদ‌নে এক উন্মাতাল চোখ খুঁ‌জি।

২ *
কবিতার ফলি

চড়ুইয়ের আজ গৌতমী জ্বর।

কবিতার বনে পথ হারিয়েছে পাখিপ্রাণ।

যদিও অচেনা পথ আবগারি-গম্ভীর; বিড়ালের চোখ চিনে গেছে সাধ্যমত কবিতাপথ। কবিতার পথচলা ঝুমঝুম অথচ নির্ভয়। অচিন রথই একমাত্র গন্তব্য কবিতামেয়ের।

সময় থামিয়ে চড়ুই কবিতার পিছু ছোটে― দশদিকসহ বাইরের হাজার গলি, নিরেস মিনারের মাথা বরাবর দিয়ে। কবিতা লাফিয়ে চলে, চড়ুই হুবহু এগোয়, দেখাদেখি থামে, দেয় পাখসাট আর ফিঙে-লাফ।

চড়ুইয়ের উন্মাদনাই পরের দিন ইতিহাস হয়। সব পথ মিলে আজ খুঁজতে এসেছে চড়ুইয়ের অভিমান। মূলত, ফলিশিল্পীকে ক’জনাই আর মনে রাখে!

৩ *
ও যদি

নাম-পুরুষের পাশ ঘেঁষা কী বিপজ্জনক! গাছবাওয়া তো ছেড়েছি মাঘেই। পুনরায় গণনাযন্ত্রের শরণাপন্ন হয়ে দেখব? থাকগে। যে বয়সে হিজলপাতার জিহ্বায় ছিল বিকেলের রঙ, চড়ুই ভেগে গেল দুখপাখির ঝাঁকে।

পাতার আড়ালে কমলা-অতীতকে সাজতে দেখেছি গো আজ। শাবকসহ তবে কোত্থেকে এল গুঁই-মেয়ে! দিনের ল্যান্ডস্কেপে প্রতিদিন হাত বাঁধি, মাজা বাঁধি, চোখ বাঁধি গো চশমায়। তথাচ লেবুবনের অসংখ্য হলদে বাতি ধরিয়ে দিয়ে যায় পূর্বাভাসের খাম।

সব-পাওয়ার-দেশেও যেন অন্য স্বর্গের চিত্রকল্প আকাঙ্ক্ষা জাগায়। ও যদি মেঘ হয়, আমি ঘরের সব ঘটি-বাটি-গামলা-বালতি নিয়ে বেরিয়ে পড়তে প্রস্তুত। কফিনে শুয়ে দেখতে পাই, হলুদ নক্ষত্র এসে পড়ে কবিতার সুরভি বইয়ে। রাতের মাকড়সা ভাবার ছলে কি তবে হলুদ নক্ষত্রের দিকে আরেকটু তাকাব? থাকগে।

৪ *
বাবার ছাতা ও সরলরেখা

সরলরেখার শেষবিন্দু পর্যন্ত বাবা জোর কদমে চলতেন। তারপর আর বক্ররেখায় এগিয়ে কারো ঘরে আশ্রয় চাইতেন না। অথচ মাথার আধাহাত উপর দিয়ে যে ছাতাটা বয়ে বেড়াতে দেখেছি, তার ছায়া কখনোই দীর্ঘতর হত না।

বছর বছর আমাদের জামা-কাপড় ছোট হয়ে শরীর থেকে নেমে যেত, দুই পা কামড়ে ধরত পুরনো জুতো। আমরা বাবার পা কামড়ে গুটিসুটি হয়ে পড়ে থাকতাম ছাতাটির ক্ষুদ্র ছায়ায়।

সেই থেকে অন্তত একটা বড় আকারের ছাতার প্রয়োজন ছিল। যেটির ছায়ায় ছোটখাট রাজসিংহাসন থাকবে বাবার জন্য। আমরা সবাই সেখানে ঘিরে দাঁড়াব।

কেবল একটিমাত্র বড়ছাতা বছর বছর খুঁজে বেড়িয়েছি স্কুলের কক্ষে কক্ষে, খেলার মাঠে আর মহাবিদ্যালয়ে। সাথে বাবার ছাতার মাপ থাকত টুকরো-কাগজে। এবড়ো থেবড়ো কিংবা পিচপথে শক্ত জুতোয় ভর করে, বাসে ঝুলে ঝুলে গিয়ে তকতকে সাহেবদের সামনে ঘর্মাক্ত মুখ নিয়ে আনাড়ি চোখে এদিকওদিক ছাতা খুঁজেছি, শুধু একটি বড় ছাতা।

বৃষ্টি চেয়ে আষাঢ়ের আকাশের নিচে গিয়ে বারবার সৌরসেদ্ধ হই। ঘরকুনো ইঁদুরের মতো বাবার ছাতার নিচে ফিরে আসি ফের। প্রতিবছর এরকম ছলনার আষাঢ় আসে। সংকল্পবদ্ধ রোদ আর নির্বোধ ভারী বর্ষণ আকাশ ছিঁড়ে নামে; ছাতার দেখা কিন্তু মেলে না।

এযুগে ছাতাগুলো সব মায়াহরিণ। সেকেন্ডে সেকেন্ডে জোরকদম এগিয়ে চলি সরলরেখা বরাবর; শেষবিন্দু মেলে না, মেলে না। বক্ররেখার আধিপত্যের যুগে দৈনিক পত্রিকায় নতুন নতুন জ্যামিতিক সমাধান ছাপা হয়। কেবল সরলরেখা আজো অতীত অথচ কী অস্পৃশ্য! বাবার সরলরেখা কী অদ্ভুত অস্পৃশ্য!

৫ *
ব্লাক হোলে বেড়াই তো হারাই না

চোখ উপেক্ষা করে ছবি খরগোশ সাজতে পারে না। আনমনা হলে লাফিয়ে পালায়। এখান থেকে ঢের টের পাই। কতগুলো সৌরজগতের আনাগোনা, গোনার সুযোগ নাই। তাই বলে নিজে হারাচ্ছি? না, নিস্তার নাই।

পাড়ায় আকাশ না থাকলে টিনাকে পাওয়া যাবে না, নিশ্চিত। রনি তো সব আকাশ নিয়ে দুবাই থাকে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে রনির আত্মা বদলে নিয়ে চলি। রনি তা করে না, আত্মবদলে সে ওস্তাদ। লোকমুখে রেডিমেড সমাধানের পাশ ঘেঁষে গিয়েও মেলে না হলুদ পাখির ত্রিভুজঠোঁট।

চকচকে তাওয়ায় জ্ঞান ভাজা হচ্ছে। ডেকে ডেকে খাওয়ানো হচ্ছে— ফ্রি। না খেতে চাইলেই হাতকড়া।

দহনযোগ্য কবিতার মতো শাবকদেরকে তিনমাত্রা যোগ করে পালতে চাই— ফল নাই। হিজলের ছায়ার কোলেই শেষমেষ দিয়ে দিতে হবে। চিত্তের কপালে পট্টি লাগিয়ে চিন্তার জেগে থাকার প্রয়োজনীয়তা কী?

৬ *
মা-পুত মিলে ছিলাম ছায়ার মুরিদ

ঘরে সময়মাপক ছিল না বলে বারান্দার ছায়া মাটিতে প্রথম পড়লে ‘বিহান’ ও সোয়া হাত লম্বা হলে হতো ‘নাস্তাবেলা’। সাঁঝ-আলোর পিছু নিয়ে, দিনের শেষ মিম্বরে কেতাবি চুমু খেয়ে আমরা হাম্বাস্নাত হতাম।

সময়-হরিণের গতিচাতুর্য্য ধারণ করতে একে একে এলো যন্ত্র, সংখ্যা আর আপেক্ষিকতার ব্যবচ্ছেদ বাক্স। তবু পুরনো অন্ধকার সাঁতরে বেড়ায় জাতীয় অ্যাকুরিয়ামে; শ্যামা-ঘাসের ফিঙেটা আজও বুঝলো না- ছায়াত্যাগী হলেই পৃথিবীর তিন ভাগ জল পার হওয়া যায়।

মায়ের চোখ ভালোবাসি বলে তার রেটিনায় ঝুলে থাকা বাদুড়দের প্রতি আমার অভিযোগের গ্রাম-আদালত নেই। চতুর্থ প্রহরের নিরবতায় ঝিঁঝির শব্দদূষণে আমার মগজের চাররঙা দ্যুতি হয়তো বিলীন হতে বাধ্য হবে। তখনও ভিটামিন সমৃদ্ধ নক্ষত্রদের খুঁজে এনে অলিগলিতে করব বাতি-মিছিলের চড়ুইভাতি।

৭ *
আংকেল, এগুলি কী প্রাণী বানালেন

সমরক্ষেত্রে কেবল লেজ আর লেজ, প্রতিটি প্রাণীর নাক অস্ত্রের কাজ করে!

এই তপ্ত মরুশ্বাস কার কল্যাণে নির্মিতব্য! আমাদের চটপটি-বিকেল গ্রিলবদ্ধ বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছে। চশমাঢাকা চোখে দুঃস্বপ্নের ফোড়ায় শীতের সূর্যও রচনা করে যন্ত্রণাপ্রবাহ। আমরা দেখি কেবল আমাদের চিরায়ত মূক মুখ।

লেজ ছাড়া কি কিছুই হয় না, আংকেল; প্রাণীর নাকের উপর অত বড় শিং না থাকলে কী এমন ক্ষতি হয়। লেজঅলা প্রাণী তৈরি করার ক্ষেত্রে আপনার ডিগ্রি-সনদ থাকতে পারে- জানি গবেষণা-জ্ঞান নেই।

দূর্বাদলের এই সবুজ কার্পেট গুটোর ছাই দিয়ে ঢেকে দিতে পারেন কিভাবে! নাল-জমিও বণ্টনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। সারাজীবন এসব কী প্রাণী বানিয়ে যাচ্ছেন? যোগ্যতা থাকলে কিছু মানুষ বানিয়ে দেখান তো।

৮ *
শুধু নিজে

এ মাসে কাশফুলের দরকারিতা ছিলো খুব; এবার সোজা ছেঁড়া কাঁথার যুগে চলে যাবো ভেবে। পায়ের রগ ফুলুক, না ফুলুক মেঘের পিঠে হাঁটার বয়স এখনো আছে।

কোন লোভে মন তবে মেঘাতুর হলো— ছুট দিলাম দড়ির গিঁট বরাবর !

আমি তো ঝোপের আড়ালের সৈনিক !

সংকটে ফেলে কেউ কেউ চোখ খুলে দিলো। খুলে গেলো তো গেলোই— মাটি বরাবর গড়ালো।

এই যে দেয়াল ঘেঁষে হাঁটাহাঁটি; কাশের সাদা কিনতে বাজারে যাবো; ময়লা ব্যাগ হাতে ! মৌসুম তো ফুরলো। বিরক্তিকর মাছির পিঠে উড্ডীয়মান মন কি ফিরে যাবে মোমের জগত !

৯ *
আহা কত সবুজ

না হয় ধরেই নিই ভদ্রলোক ঘরে আছেন; দরোজায় আঁকা দানব-চোখের পাশ কাটিয়ে চলেছি কাশের আমন্ত্রণে। সুপারিগাছের হাঁটাহাঁটি দেখে অবাক হই না; কেননা প্রাণীর বদলে মানুষ কেটে সমাজ শুদ্ধ করা হয় এখানে। আখের লগি নিয়ে নৌকায় চড়ার অধিকার সবাই পাবে না, তা ভেবেই চোখে এসে পড়ে স্বর্ণের বিশুদ্ধ ফোঁটা

জড় শরীর কতটুকু মেটাতে পারে প্রাণীর আবদার! এদিকে সাদা নদী কণ্ঠে পেঁচিয়ে জোশে আছে কিশোর কাশের চর। চার মানিকজোড়। এক বিন্দুতে মিলে যায় চার গ্রহের ধ্যান।

১০ *
মাছির চোখ

কেবল চোখ দেখে মাছির পথের আকৃতি বলে দেয়া যায়। যৌথ উড্ডয়ন ছেড়ে তাই রোদের দিকে মুখ এগিয়ে দিই। স্থির পানির ধৈর্য্য আমাকে জীবন্ত করে।

মাছিরা পেয়ে যাবে কাঁঠালের ঋতু। আমিও কাগজে পাব কেরোসিনের ঘ্রাণ — ফুলের চেয়ে মহান — মাছিদের চোখ চিনে নেয়ার চোখ।

১১ *
মাছির দল

মাছিরা দুঃখের মতো দল বেঁধে উড়তে পারে না। তবে সবার উড্ডয়নই নিজস্বতাহীন। দৃশ্যত তারা তৈরি করে উড়াউড়ির কোরিওগ্রাফি।

যতবারই মাছির ছদ্মবেশে উড়ি, ওজনস্তর থেকে ঠিক ঠিক আলাদা হয়ে পড়ি। মাছিরা কি অভিনয় বোঝে না?

১২ *
সরলরেখার শেষ বিন্দুতে থেমে পড়ি

চোখ বাদে সর্বস্ব নিবন্ধন করে দিয়ে দিলাম গো; গৃহপালিত ছারপোকারা তবু হানা দেয় ভোরের দরজায়। আমার চোখ কামড়াতে আসে গাঢ় রাতে। টবের পিছে লুকাই, আলোর ছদ্মবেশে হারাই; পাতি শেয়ালের চোখা মুখগুলি ঘড়ির কাটার বিপরীতে ঘুরে আমার বরাবর সরে সরে আসে; তসবিমালার ইন্দ্রজালে কুটি কুটি করে দেয় কোলের বালিশ।

আমার চোখই বা কেন তার চাই! ছয় প্রকৃতির বসতি এই তারারন্ধ্রে– রিপুদের দূরে ঠেলে। যন্ত্রণার পাখাদ্বয় আমাকে উড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় মহাশূন্যে চোখ হারানোর ভয়ে।

বায়তুল মুকাররমের সামনে এত আতর বেচি। পোকারা মানুষ হয় না। আবহাওয়া সাদা হয় না। বা হাত যতই মল ছেনুক, তাকে তো শরীরচ্যুত করতে গায়ে লাগে। পারি না। তবু থাকে ডান হাতের ছদ্মবেশে।

১৩ *
ও পোয়াতি মেঘ

ভুল বানানে না লিখে আর্টেমিসের কুকুরটাকে বিবশ করা গেল না। চন্দনচর্চিত শন-কেন্নোরা সাতশো পঞ্চাশ পায়ে লাথি মেরে সভ্যতার আকাশ ছেঁদা করতে গিয়ে ভিনগ্রহবাসী হয়; তাই হয়তো বোঝে না যে, উদ্ধৃতিহীন বিকেলযাপন অপটুতা না।

পিতামহের গলায় কালো জটুল ছিল। সেই সূত্রে পিতারও- আমারও। শৈশবে আমিও এলান দিয়ে ঘেটেল কাঁকড়ার ঘরে ঢুকে পড়তাম। সানন্দে শার্টের বোতাম হারিয়ে হয়ে যেতাম গোলাকার ভাজা চিংড়ি।

গণিতজি জটুলচক্র ভেঙে দিতেই কেউ কেউ কটিসূত্রমুক্ত হলাম। আলপিন দিয়ে ব্যানার লাগানোর সময় মনে হয়, ব্যানারের নিজস্বতা আছে; না হলে বেগারখাটা মেঘদল আঁতুরঘরে না গিয়ে কেন অন্যদেশে হারায়!

মেঠো সবুজের কোনো আলফা স্টেশন না থাকলেও আমাদের ক্রোধ কিন্তু বাকাবিল্লায়। সুহৃদ, এবার তুমি হিমোগ্লোবিন হও; ভাঙা দরোজায় পরমাত্মার খিল না দিয়ে, ব্যাকরণহিমানি ভেঙে ভেঙে ফুটপাতের থালায় নামো।

১৪ *
কৈ মাছের আষাঢ়োদ্বেগ

১. হাত ধরো, উঠে এসো। ডাঙায় শূন্যতা আছে—ভালোবাসা আছে!
২. তোমার ক্ষতের সমানুপাতিক অশ্র“ও এ স্বার্থের পৃথিবীতে নেই।
৩. অনেকেই ধরা পড়ে গেছে। এখনও সময় নিয়ে ভাবতে পারো—ধরাপড়ার লোভ তোমার আছে কিনা!


আশৈশব কাশবন দেখেছি, উপকূল কৈশোরজুড়ে। ভুলে ভুলে ভুলের সাগর পেরিয়ে, ভুলের পাহাড় ডিঙিয়ে এসে পড়েছি আবার এই ধানক্ষেতে। আমাকে অনেকেই গুঁইসাপ ভাবে।

শূন্যতার মায়াপাশ এড়িয়েছি বারো বছর আগে। আলোকোদ্ভাসিত ভালোবাসায় হাজারবার যতই চিৎকার করি, ‘পূর্ণ হও, যোগ্য হও’। শূন্যতা শুধুই গা ঘেঁষে বসে থাকে—বসন পরিবর্তন করে।

সবাই ভাবে, তলদেশে আমার স্থান।
আমি এখন অনেক গহীনে, অনেক গভীরে…
এখানেও খুব গভীর করে ভাবি, ‘ভালোবাসার জীবাণুগুলোই সার্থক’।


পৃথিবীতে অশ্রুর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। রক্ত বিক্রি হয় অশ্র“র দামে। একবিন্দু নতুন আলো দেখে তেমন কেউ নিজস্ব আলো হাতে এগিয়ে আসে না। সব আলো লুট হবার জন্য জন্ম নেয়। আলো নিয়ে ইদানীং বাণিজ্য বেশ জমে।


পৃথিবীকেন্দ্রের আকর্ষণে সবকিছু ধরা পড়ে আছে।

যতবার জানালা খুলে দাঁড়াই, চেতনায় লোডশেডিং ঘটে। একবার একটা বাচ্চা সাপকে ঢুকতে দেখেছি টাকিমাছের পেটে; মুরগিছানা ধরে খেয়েছে কুনোব্যাঙ। সবকিছুই পৃথিবীর সূত্র মানে।

সব সূত্রের বাইরেও আছে আকাশ, নদী…। রক্তাক্ত আকাশ, হলুদ নদী… খেয়ালখুশিতে তুলিতে ফোটাবার মতো প্রকৃতি। এ-জলাধারে ডুব দাও, ‘স্বপ্ন’ দেখতে পাবে। রাতের আকাশ নিজেকে ব্যাখ্যা করে তোমার কাছে। দেখে দেখে মুগ্ধ হও; পথের চাবি মিলে যাবে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তোমার পিছু নিয়েছে। রক্তাক্ত হও; মিলে যাবে চরম মুক্তি।

১৫ *
বোতলের পানিতে প্রিয়ফুল

১. তোমাকে দেখে নিয়েছি শাদাশাপলার দেহে।
২. উভয়পক্ষে পক্ষপাতিত্বেও ত্বরান্বিত করেছি বিবাদ।
৩. পাখিরা হাজারবার জলের ধারে নেমে এলেও পাথরের ডানা গজাবার সম্ভাবনা কম।


যা থাকে কাছাকাছি—চেতনার পথে পথে
যেখানেই সবুজ আলস্য, মেঘেদের ঘেঁষাঘেঁষি;
সে-সর্বত্রে চলে আসে ‘তুমি’ সম্বোধন।

এই পেন্সিলটি লেখার অনুপযোগী; তবু তাকে বলি: একটা রাতের ধর্ম-পরিবর্তনে সহায়তা করো তো। মৃত-অমৃত, বিশ্ব-বহিঃবিশ্ব—সব সারাবেলা আড্ডা দেয় আমার পড়ার টেবিলে। হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে আমার পৃথিবী সারাক্ষণ। সময় পেলেই সব প্রাণী-অপ্রাণীদের ডেকে বলি: ভালো আছ তো সব!

শাদাশাপলা—শাদাভোর—শাদামন…
আমার একজন প্রিয় মেয়ে-বন্ধুকে ডাকতাম ‘শাদাশাপলা’। যখন সে কষ্টের গলাপানিতে দাঁড়িয়ে থাকে—উত্তর আকাশ অন্ধকার করে আমি তখন ডোবার পানিতে শাদাশাপলার দেহে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, আমার প্রিয় পৃথিবী আমার বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ডোবার পানিতে দাঁড়িয়ে রোরুদ্যমান।

সর্বভুক এই মানুষেরা মানুষ ভক্ষণেও দমে না।
আমার মানবপ্রীতি প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকে শাদাশাপলা হয়ে ডোবার পানিতে।


নদীর এপারে আমাকে সবাই ‘পানি’ বলে ডাকে;
নদীর ওপারে আমার নাম—‘জল’।
নদীটা বাবা আমার নামে রেজিস্ট্রি করেছেন;
তাই কূল ছেড়ে দিয়েছি। ঢেউয়ে ঢেউয়ে আমার বসতি।

ভাসতে ভাসতে এককূলে গিয়ে নিজেকে ‘জল’ বলে পরিচয় দিই।
কূলের স্রোত আমাকে সাদরে নিয়ে যেতে চায় গঙ্গায়।
অন্যকূলের ঢেউ-পরীরা টানাটানি করে আমার অপর বাহু…

স্নান শেষে ফিরে দেখি, ঘরে কোনো শার্ট-প্যান্টে
একটি বোতামও অবশিষ্ট নেই।


আমি এখন হাজার রকমের পাখি হতে পারি—সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে খেলি সারাবেলা ‘কপালটুনি’।

আমার মা ডাহুক ছিলেন,
তাঁর মা ছিলেন দুর্জ্ঞেয় অরণ্য!
আমি এখন রাত জেগে পড়তে পারি,
আমার মা রাত জেগে জেগে
আর্তনাদ করে গলা দিয়ে রক্ত উদ্গীরণ করতেন—বৃথাই।

আমার পাথর-বন্ধুরা না-নামে জলে না-ওড়ে আকাশে। প্রতিদিন হাজার হাজার অতিথি পাখি হয়ে আমরা পাথরের কানে কানে ঢেউয়ের শব্দ ব্যখ্যা করি। আমার পাথর-বন্ধুরা ‘কুম্ভকর্ণ’ চিরকাল।

১৬ *
সরলরেখার ঘুম

যতিচিহ্নের মতো চোখ নামিয়ে তোমার, টিনা
পথের আর্তি জেনে নাও, রোদের ভাষা শিখে নাও; নূপুর পরাও, ছন্দ শেখাও ঘড়ছাড়া মেঘকে ডেকে। প্রকৃতির সন্ধানে বের হও, ঝোলা কাঁধে নাও অভিজ্ঞতার। তথাপি ভোর হতেই মানুষ পৃথিবী ঝেড়ে পরিষ্কার করবে, ঘরবাড়ি খালি হয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে রাস্তাঘাট। রঙে রঙ মেশাও, জানা থাকলে কাক্সিক্ষত রঙ মিলতে পারে।

অথচ তুমি বারোমাস গা এলিয়ে বসে থাকো- সরলরেখার নিমিত্তে। মানুষের চোখমুখে একই রঙ পেতে চাও সারাদিন। গা সরাতে সরাতে যে সরু হয়ে যাচ্ছ নিজেই। গৃহপালিত পোকাদের ঘাড়ে চাপাতে চাও তিরস্কৃত ব্যর্থতার পুঁজি! কথা না বাড়িয়ে চলো ঘুমোতে যাই; সরলরেখারা এ জনমে ঘুমের বর পেয়ে এসেছে।

১৭ *
আদি-অন্তের সমীকরণ:
কবি লতিফ ভূঁইয়ার সাথে রনি ও আমি

– ভোরের আর্দ্রতায় গত বিশ বছরের উষ্ণতা ভুলে ছিলাম। তোদের আদি- আমার অন্ত, আমার বছরের শেষে অলীক বসন্ত। কতগুলো ছন্দহীন জোয়ার-ভাঁটা সত্তর বছরের নম্র ভোর মাড়িয়েছে… চল কিছুদিন বর্ষায় গা ঢাকা দেয়া যাক।

– আপনি বয়স্ক তরু রূপে আমাদের মত বীরুৎ লতাকে গা বেয়ে উঠতে দেয়ার স্পর্ধা দেখিয়েছেন… আমরা সূর্য ওঠার আগেই আলো দেখতে চাই।

– আমার ইচ্ছেগুলোতে উঁই ধরেছে, এদিকে কলমের অভিমান কুসুমিত প্রচ্ছদগুলো শুষে নিতে চায়। চল জসীমের বন্দনায় মুখর হই। গতবার নজরুলের জন্য তো তোরাও নজরুল হয়ে উঠেছিলি।

– আপনার রাস্তাগুলো পুনঃনির্মাণ করতে গিয়ে প্রতিদিন গায়ে আলকাতরা লাগে। লোকের কটাক্ষকে এড়িয়ে আয়নায় কালোর মধ্যে আলোর নাচন দেখি। তারকা ও উঁই পোকার পার্থক্য শিখেছি বলেই তো এ পদ্মবিলকে স্ত্রী ভেবে নিয়েছি।

– বয়স বারবার ঘণ্টা বাজায়। ২০০৪-এ যা বন্যা গেল… সেবারের শীততো উড়িয়েই নেবে। গ্রীষ্মের ঘর্মাক্ত দেহও বুঝি মাটিকে মা ভেবেছিল বলে… সংসারের বোঝাতো ঝেড়েছি কবে, তবু ধূসর ভাবনাগুলোর বারবার ছন্দপতন।

– আমরা সবেমাত্র কোমরে গামছা বাঁধা শিখেছি, এখনো আপনার অনেক উদ্বোধন বাকি। বাঁচার তাগিদে যখন বাঁচতে শিখেছি- আমাদের শেষ আয়ুষ্কাল পর্যন্ত আপনাকে পদ্মাসনে রাখব।

– আমার উপদেশগুলো ফ্রেমে বাঁধাই করিস, আর গোধূলিবেলায় সমুদ্র সৈকতে যেতে যেতে তোদেরকে সাথে দেখতে চাই। সেতো অনেক দূরে। বয়সের খেমটা নাচে পায়ের নিচের মাটিতেও ফাটল ধরেছে।

১৮ *
রাতে মা এসেছিল শিয়রে

রাত বলতে মূলত কৃষ্ণপক্ষ বুঝি, রাত সম্পর্কিত বর্ণ ও চিত্রকল্প উভয়েই কালো, রাতে জোছনা নামলে তাকে নাম দিই স্বর্গ। দিনেও রাত ঘনাতে পারে; ঘনাতে পারে কাজে কর্মে, চিন্তায়, আকাক্সক্ষায়, মগজে। আপনা ছাড়া অন্য কাউকে উপজীব্য করে কবিতা রচি না। এসব রাত আমাদেরকে ঘিরে রাখে দিনে রাতে।

মা বলতে আমার জন্মদাত্রীকে বুঝি, আমরা দেশকে বুঝি, সবাই পৃথিবীকে বোঝে। এসবের আড়ালেও অনেক মা থাকেন। ধার্মিক বন্ধুরা ভাবতে পারেন বোধহয় দশভূজা, মাতঙ্গী, মেরি, ফাতেমা ইত্যাদির কথা বলছি। যতই গলাবাজি করি না কেন, জীব কিংবা জড়- সবারই স্ব স্ব ধর্ম থাকায় প্রকৃতপক্ষে কেউই বিধর্মী নয়। সবারই মা থাকে- বহু মা থাকেন, পৃথিবীর সকল মা সকলের।

রাতে আমাদের অসুখ হয়েছিল, দলে দলে মায়েরা এসেছিল আলো নিয়ে, সেবা নিয়ে, স্নেহ নিয়ে, বিদ্যা নিয়ে, আঁচল নিয়ে।

১৯ *
প্রেমহলাহলপদ্য: সড়কের প্রতি

এ সড়কে স্রষ্ঠা রয়েছেন, যদিও আমি দলপ্রধান। নর্দমা রয়েছে এ সড়কে খুব, কাছেই মসজিদ-মন্দির। একই ভরের মানুষ ও পশুর হৃদয় মেলে এ সড়কে। এখানকার রাস্তা-ঘাট বৃষ্টির পবিত্র ধারায় ধোয়া; অথচ, ইতর প্রাণীরাও নির্দ্বিধায় হাঁটতে পারে নোংরা পায়ে। পৃথিবীর সব জাতের ফুলই রয়েছে এখানে, অথচ বিবর্ণ হয়েছে রোদের আবরণে। এ সড়কে সানন্দে পোকারা আছে প্রাণী রূপে, ডোবাকে সমুদ্র বলানো হয় জালিয়াতির বলে।

কাগজের ফুলগুলিতে নিয়মিত ঢালা হচ্ছে কৃত্রিম সুবাস। পক্ষিটির পায়ের ঘুঙুর হয়েছে তার সোনার শিকল। আমি হৃদয়কে করেছি কামারবাড়ি, ফুসফুসে ঢুকিয়েছি হাপড়ের হাওয়ার আগুন।

২০ *
প্রেমহলাহলপদ্য: বর্ষার প্রতি

একমাত্র বিষয়বস্তু ‘টিনা’ এখন পাখির মত উড়ে বেড়াতে পারে! অথচ প্রায়ই ওকে ভেজা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে হাঁটতে দেখি; অভিমানে না আনন্দে ঠিক বোঝা যায় না। ঝড়ো হাওয়া বন্ধ করে তার জানালার কপাট, বৃষ্টিধারা আড়াল করে তাকে; অনিচ্ছায় না ছলনায় বুঝতে পারি না। বোধের সেতারে ইদানিং সঠিক সুর ওঠে না হয়ত; টিনার মত, সাপের মত এঁকে বেঁকে পথহারা হয় ষড়রিপু।

যে বর্ষা ঘুম পাড়াত, কবিতা ভাবাত, বৃষ্টিতে ডাকত সেও আজ দেখিয়েছে বন্ধ কপাট, টিনাও ভেসে যাচ্ছে দূরে- বর্ষার জলে- শুকনো পাতা হয়ে- অভিমানে।

২১ *
প্রেমহলাহলপদ্য: কীটের প্রতি

আমলকিগাছের ছায়া দ্বিগুণ হয়েছে। তবু কীটের সংজ্ঞা থেকে ভিন্নদিকে সরে গিয়ে ভুলগুলোকে কাটছাট করে স্নানে যাই চলো। কুয়াশার আক্রমণ সত্বেও শীত-বসন্তের বিভেদ মিলছে না। দুঃখগুলোর স্বার্থ আজও ঠিক বোঝা যায়নি বলে প্রকাশভঙ্গিটাও দুর্বোধ্য হয়ে যায় সময় সময়। অনেক বছর পশু দেখতে চিড়িয়াখানায় যেতে হয় না… কতগুলি উপাসনালয় ইটভাটা হয়ে গেছে পরিসংখ্যান মেলেনি তারও। অনেক অপরাধী ইতোমধ্যে ক্ষমা পেয়ে গেছে ঈশ্বরের রূপ ধরে, ঈশ্বরের রূপও বয়ে গেছে কখনো শয়তানেশ্বরের মোহনায়।

আমি চাষী। সারা বছর বাদাম উৎপাদন করি, তাতে সারাদেশ ছেয়ে যায়, মানুষের ব্রেন ভালো থাকে। কেউ স্বীকার করুক না করুক, পৃথিবীতে যতই মানুষের সংখ্যা এভাবে বাড়বে, ততই আমার এ গ্রহ পৃথিবীর মতই অপরূপা হবে। অথচ শীতের কীটে বারবার ছেয়ে যায়; ক্ষেত নয়, মাটি নয়, দিক নয়, চিত্রকল্পে নয়- মস্তিষ্কে।

২২ *
প্রেমহলাহলপদ্য: ঘরের প্রতি

ঘরের আশায় ঘর ছেড়েছি (নতুন করে পুরোন কথা), ব্যাকরণজাত অন্তঃকরণ পথ ভুলেছে পথের ধাঁধায়। বাল্যকালের স্মৃতির ছায়ায় যাচ্ছে লেগে সূর্যগ্রহণ…

সবার মত আমিও সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছি, মাটির খাঁটি ঘ্রাণ উপেক্ষা করে খাঁটি জল পরীক্ষায় নিমগ্ন আছি। ঢেউ থেমে গেলে পানির উপরে নিজের প্রতিবিম্ব স্পষ্ট হবে।

সূর্যালোকে যাচ্ছে মিশে বাল্যকালের স্মৃতির ছায়া। ব্যাকরণজাত অন্তঃকরণ পথ ভুলেছে পথের ধাঁধায়।

২৩ *
প্রেমহলাহলপদ্য: সঙ্গীদের প্রতি

ঘরগুলোতে রোদ নেমেছে ঠিকই, বসন্ত আসেনি। ‘পরাবাস্তব বিশ্লেষণে সময়কে লম্বচ্ছেদ করে মাল্লাসহ পাল্লা দেয়া আবশ্যক।’ এসব তত্ত্ব চুপি চুপি উদ্ভিদদের নিকট গিয়ে বুঝাই- তারা চলমান নয় বলে। ওদিকে গায়ের বসন, হাতের কলম মুড়ির মোয়া হয়ে যাচ্ছে নাতো…

স্বপ্নেরা এখানে দাতব্য চিকিৎসালয় গড়ে তুলেছে।

আমার কৃতিত্ব কোথায়। ঘরের জানালাগুলো ঝড়োবাতাসে বন্ধ হয়- সকালবেলা রোদের ডাকে আকাশ দেখায়। একালের মিথ্যেবাদীরা পৌরাণিক প্রদীপগুলোর চেয়েও সৎ সেজেছে আজ। গৃহপালিত পোকারা খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়েছে। আর আমি ধ্যানে ধ্যানে আশ্রয় খুঁজে ফিরছি।

কোনরূপ অস্তিত্বের বিতর্কে যেতে চাই না, ইতিহাস আঁকবার ইচ্ছে নেই ঘটনার তুলিতে। দেউলিয়া স্বপ্নদের হাড়ে কম্পন জাগুক; বিদ্রোহী ঘাসেদের গায়ে পড়–ক সূর্যের প্রতিচ্ছবি।

২৪ *
প্রেমহলাহলপদ্য: কুয়াশাবাতাসের প্রতি

সমুদ্র, ঢেউমালা অপরূপ- দেখে সবাই, লেখে সবাই; অথচ আমি লবণাক্ততাই প্রধান বলে ভবি। সঙ্গোপনে সব বেলাকেই অবেলা ভাবি হতাশাবাদী দর্শনে। নিরেট আঁধার গুহার পুরুত্ব মেপে কীটের মতো উঠে আসতে পারি বিধায় বহ্নিজলেও ডুবে যেতে পারি দ্বিধাহীন চিত্তে।

প্রায় নক্ষত্রপুঞ্জই রক্তে ভিজে গেছে। কুয়াশাপাখিরা ক্ষেত নষ্ট করতে নেমেছে আলোর অলক্ষ্যে। শ্রেষ্ঠ নদীরা বয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র বৃক্ষের কান্নায়। বীরুৎ ও গুল্মরাও মারণাস্ত্র নিয়ে নিমেছে তাদের পিছু পিছু।

কালের ক্রন্দনস্নান শেষ হয়নি আজও বিশ্বাসের আশীর্বাদে…

শীতের কুয়াশা, গ্রীষ্মের কুয়াশা, সারাবছরের কুয়াশা বিভিন্ন যৌগিকবর্ণে রঙিন হয়ে ছেয়ে গেছে… দিনের শেষ সূর্যটাও তুলোর মত উড়ে উড়ে পালাচ্ছে সমুদ্র ছেড়ে। বাতাসের তাড়া খেয়ে আজ কুয়াশার কবলে, কুয়াশা দেখে ভয় পেয়ে কুয়াশাবাতাসের কবলে আছি বেশ প্রাণী হয়ে- পরজীবী হয়ে।

২৫ *
প্রেমহলাহলপদ্য: পৃথিবীর প্রতি

মৃত্তিকা, পরিশ্রমী বিছাদের ঘাড়ে তুমি পাথর চাপিয়েছ। পৃথিবীর সব সংজ্ঞা তাই থেমে গেছে এখানে কেন্দ্রবিন্দু হয়ে। দুধের পেয়ালায় বিষ ঢেলে সন্তান লালন করতে চেয়েছ হে পৃথিবী! সমষ্টি ‘ব্যক্তি’ না হয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ সমষ্টিকে তাই তাড়া করে ফিরছে।

হৃদয়ই জোয়ার-ভাঁটার জন্য শ্রেষ্ঠ সমুদ্র।

এখানেই সব দুঃখী জলজ প্রাণীরা দিনাতিপাত করে গানের সুরে, কবিতার আবেগে। মানুষের প্রতিটি সুন্দর-কদর্য মূর্তির উৎকৃষ্ট প্রতীক রয়েছে তোমার, যা থেকে মানুষ শিক্ষা নিতে পারে। অথচ আমরা তোমার কুখাদ্য গিলে গিলে রোজ হারিয়ে ফেলছি চোখের বর্তনী।

আবার বুকের উপর পাথর চাপিয়ে দেওয়া হোক। সব অনুভূতির কারখানার ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়া হোক। কেননা চিরকুমারেরা গায়ের বসন পুড়িয়েছে তোমাকে তাচ্ছিল্য করে। পেশাজীবীরা স্বার্থটুকু রেখে পতিতার মত সব জলাঞ্জলি দিয়েছে তোমার হাসিতে। প্রতিদিন সকালবেলায় তোমাকে যথাসম্ভব ঝেড়ে নেয়া হয়। তাই সব সুর ভয়ে ভয়ে অতীতে যাচ্ছে মিশে। বিষয়গুলো গাঢ় অন্ধকার আর বন্ধুরতাকে ভালোবেসে বেসে আমাকে, আমার পিতাকে, পিতামহকে ঠেলে দিচ্ছে অতীতের আঙিনায়।

তোমাকে মিছেমিছি অপ্সরা ভেবে কিংবা সেরূপ গড়তে চেয়ে নিছক মনীষী সাজার অভিলাষ নেই। প্রজাপতিরা হাতের ডগা দিয়ে উড়ে গেছে ভবিষ্যতের পথে, শুধু তোমার বিস্ময়ে।

রাতের ছোবলে ক্লান্ত শরীরগুলো যখন চোখের বিরতি ঘোষণা করবে তখন তোমাকে মিছেমিছি খাজনা দিয়ে সব ব্যর্থতা স্বীকার করে গাঢ় অন্ধকারকে ভেবে নেব মায়ের কোল।

………………………………

আরিফ শামসুল

আরিফ শামসুল

আরিফ শামসুল। জন্ম- ৯ মে, ১৯৮৭। স্থায়ী: পাংশা, রাজবাড়ি। বর্তমান- ভাঙ্গাপ্রেস, যাত্রাবাড়ি, ঢাকা।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: ১. প্রেমহলাহলপদ্য (২০০৯)   ২. ঘরের পথ (২০১০)।
সম্পাদিত ছোট কাগজ: টান।
ফেসবুক আইডি- fb.com/arifsamsul87, মোবাইল নং- ০১৯৭৩-৬৫০৮০৮, ০১৭২৩-৬৫০৮০৮।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E