৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ১৭২০১৭
 
 ১৭/১০/২০১৭  Posted by

গৌরাঙ্গ মোহান্ত-এর ‘প্রমগ্ন কবিতাবলি’ থেকে একগুচ্ছ কবিতা

 

আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর

আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর জিইয়ে রাখে আগুন ও অঙ্গার। টুকরো ম্যাকেট হতে উবে যায় যৌবনঘাম। প্রমগ্ন স্থাপত্য থেকে খসে পড়ে বিষণ্ণ ব্যালাসট্রেড। আমি অগ্নিমান অন্তর্গৃহে ব্যর্থ মেঘের দ্রবণ ঢালি। মোহনাবিহীন দ্রবণ-অগ্নি বিভাজিত সঞ্চারপথে যেন প্রস্তরময়, গ্যাসীয় গ্রহ। তবে অলাতচক্র দূরস্থ কোয়েজার আর উপস্থ ধূলিপুঞ্জে ফোটায় সমরূপী টংকারধ্বনি। ছায়াশরীর বিমূঢ় চেতনাকে কখনো করে না বিনির্মুক্ত।

অধিগ্রহণকাল

নির্বাক ঝরনাজলে কেঁপে ওঠে আহত স্থলপদ্ম। আমি তার সুনীল শেকড়ের দিকে চেয়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ি। শহরের নিষ্প্রদীপ ধূসরতায় ধান জন্মে না বলে উজ্জ্বল অরণ্যের গন্ধে ডুবে থাকি। বিশুদ্ধ বাতাসে ভাসে হর্নবিলের দুর্বোধ্য ভাষা। সন্ধ্যার স্থিরতায় মিশে থাকে অধিগ্রহণকাল; আমি প্রাগৈতিহাসিক গুহা-দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখি সময়ের সুরঞ্জিত ঝালর। প্রথম জেগে ওঠে পাহাড় -রাতের পাখির চোখে মূর্ত হয় ভূকম্প-বিভীষিকা। কোমল স্থলপদ্ম অস্তায়মান সূর্যের ফিকে আলোয় নিমগ্ন হতে চায়। প্রস্রবণ রেখার রহস্যগতি উন্মোচিত না হলে অন্তঃপুরে সঞ্চিত হয় শ্রাবণমেঘের ধূপছায়া ফটোগ্রাফ!

বৃক্ষবিভাস ও প্রলয়স্বপ্ন

নিদ্রায় বিকৃত হয় বৃক্ষের কাণ্ড-পত্র-বল্কল। বন্যার অস্থির জলে সাময়িক নিমজ্জনে বিক্ষত হয় বৃক্ষবিভাস। বৃক্ষ জেগে ওঠে – ঘাসে ঢাকা থাকে তার কর্দমাক্ত তলদেশ। দুর্বহ গন্ধ নিয়ে কর্দম নরম থাকে না অনন্তকাল। অগ্নিময় নক্ষত্র বিপন্ন বৃক্ষের বাগভঙ্গি বোঝে। কাদা-গন্ধ বৃক্ষের বোধিময় সত্তায় পাংশু মেঘের পাহাড় গড়ে তোলে। অধিকৃত সূর্য পাহাড় গলাতে পারে না। চন্দনঅরণ্য ঘোচাতে পারে না মেঘের পূতিগন্ধ। পরিযায়ী পাখির সংগীতময় প্রার্থনা বাতাসে নির্মাণ করে স্নিগ্ধতার সাঁকো; বৃক্ষের সাথে তার যোগসূত্র ছিন্ন হয় বারংবার। নিঃসঙ্গ বৃক্ষের শেকড়ে নেই পুনর্ভবী শিহরণ। বৃক্ষের রক্তে নিদ্রার বিষ; বিষে প্রলয়স্বপ্ন – বৃক্ষের শয়ন বেদনাবহ; মৃত্তিকাস্পর্শী কাণ্ড-পল্লব শানাই বাজাতে পারেনা। তাপিত ধুলো নিঃশেষ করে শেকড়-সুরক্ষিত জলকর। আকাশ বৈরী হয়ে ওঠে; রোদ কিংবা বৃষ্টি আনে না বয়ে সন্ত লিখিত সুসমাচার। বৃক্ষের ক্রন্দনবাহী মাধ্যম দূষণগ্রস্ত বলে বিষণ্ণ স্বরগ্রাম আঁকতে পারে না শূন্যতার অবিনাশী অন্ধকার।

তীরধস তাড়িত জল, নির্মলতা

তীরধস তাড়িত জল পরিশ্রুত নয় জেনেও জলকে বলো নির্মল হও। নির্মলতার সর্বাদৃত মানদ- নেই। বিশুদ্ধতা মেনে নেয় সূক্ষ্ম শিলাচূর্ণের প্রেম। শুকনো পাতার তুমুল উড্ডয়ন তোমাকে চিন্তাগ্রস্ত করে। যা সহজে ওড়ে না তারও ঘটে যেতে পারে পক্ষোদ্গম। গণিত চূড়ান্ত বিষয় নয়। চূড়ান্ত বিষয়ের অভিজ্ঞা কোন কালসারণী যোগে অধিগম্য নয়। নদীখাতের ক্রমিক বিবর্তনের সূত্র ধরে উদ্ভাসিত হয় চূড়ান্ত বিষয়ের প্রকরণজ্ঞান। ভবিষ্যৎ কমলারং ভোরের মতো স্পষ্ট নয়। শ্যামলা চাদরে ঢাকা থাকতে পারে কার্পাস কিংবা পড়েনের পরিত্যক্ত সুতো। বায়ুচঞ্চল মসলিনে ঢেকে রাখো বাসমতী সৌরভ; বাতাসের নেই কোন কলঙ্ককালিমা।

অলক্ষ্য লিথস্ফিয়ার
(পরম শ্রদ্ধাস্পদ ড. বিনয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিবেদিত)

অন্ধকারের অলক্ষ্য লিথস্ফিয়ারে পদযাত্রার প্রস্তুতি চলে। সূর্যের কোরিওগ্রাফি বৃক্ষের নিষ্ক্রিয়তা মোচন করে না, ক্লরফিলশূন্য সেই দুর্গমনীয় ভূম-লে নিঃসঙ্গ যাত্রার ক্লান্তি নিবারণের জন্য গুছিয়ে রাখি মেঘের শীতল ব্যাগ। উদ্ভাসউতল শব্দাবলি উদ্ধারপ্রার্থী – যাত্রার আগে তাদের শুভ্র শেল্ফে তুলে রাখা চাই। শালবাগান পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে একদা কিছু বৃষ্টিসিক্ত স্ফটিক লুকিয়ে রেখেছিলাম; সেগুলো চোখের জলে ধুয়ে রাখা দরকার। আমি গহন বোধিগৃহে কাটাবো কিছু কাল; অশ্রুকাতর চন্দ্রঘন্টার পদপৃষ্ঠে মাথা রেখে দর্শন করেছিলাম জীবনময়ূর। আমি একদিন সমুজ্জ্বল শাঁওডাঙি বনস্থলীর প্রাণপ্রৈতিরহস্য জেনে নিতে চাই আমার নিরহংকার আচার্যের কাছে; তাঁর মধুভাষণে জেগে ওঠে মাধবধারা – নিয়ত ধুয়ে দেয় তাঁর পারিজাতবর্ণ পথের ধুলো। আমার মুহূর্তগুলো হয়ে উঠছে ক্রিয়াসক্ত; গহিন স্রোতের বর্ণিল আভায় ডুবিয়ে রাখি অশান্ত ধূসর আঙুল।

মৃত্যুগানের শূন্যতা হতে

পত্রালিক্রন্দন মৃত্যুগানের শূন্যতা হতে ঝরে পড়ে তামাটে পাথরের উত্থানশূন্য বক্ষঃস্থলে। পাথরের ম্লান হাসি জন্মগন্ধ ছুঁয়ে আসে। অস্পষ্ট মাতৃমুখ স্বপ্নের জ্বালামুখ বেয়ে গড়ে তোলে গভীরসমুদ্র তলদেশ। বালিয়াড়ি অন্তরালে রাখে অথই সংলাপের সোনালি কংকাল। জ্যোতির্বলয়তাপে পাথর দৃষ্টি খোলে। বিপন্ন আলোয় জেগে ওঠে কালপেঁচা অন্ধকার। লালাক্লিন্ন রুমাল ঢেকে রাখে জ্যোৎস্নাময় বাতাসের ঝাঁজর। জন্মপূর্ব অস্তিত্বের আহ্বানে কেঁপে ওঠে পাথর ঃ হে অগ্নিনির্ভর পত্রালি, আদি ভস্মমেঘে ভাসাও অনন্তকাল।

খোয়ইজলে ভেসে যাওয়া

দরজা খুলে দাঁড়াতেই বাতাসে একটানা বাজতে থাকে পার্থিব ঝুমঝুমি। আমি পার্থিব শব্দের সৈকতে হেঁটে হেঁটে পর্বতে প্রতিধ্বনিত অর্ফিয়াসের গান শুনি। অথচ ঝুমঝুমির শব্দ দুঃসহ কেনো? যারা ঝুমঝুমি বাজায় তারা কি বৃন্দবাদনের দেয় নি মহড়া? দরজা বন্ধ করে সিডরতাড়িত হরিণের মতো পড়ে থাকি, নিশ্চুপ, আপাত চেতানহীন। দেয়ালঘড়িতে প্রতিশব্দিত হৃৎপিণ্ড অস্পৃশ্য তারাবাতির মতো জ্বলে ওঠে। সিলিংকেন্দ্রে চুনকামের আলোছায়া নির্মাণ করে রবীন্দ্রস্কেচ। আমি কাজুও আজুমার মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকি, নির্নিমেষ। রবীন্দ্রনাথের বেদনার গানে আমার ঘর ও পৃথিবী খোয়াইজলে পদ্ম-পাঁপড়ির মতো ভেসে যেতে থাকে।

 


গৌরাঙ্গ মোহান্ত

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

গৌরাঙ্গ মোহান্ত। কবি, গবেষক ও অনুবাদক। ১৯৬২ সালের ৭ জানুয়ারি লালমনিরহাট সদর উপজেলার দেউতি নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মা পারুল মোহান্ত এবং পিতা উপেন্দ্রনাথ মোহান্ত।

তিনি প্রধানত কবিতা, প্রবন্ধ ও অনুবাদকর্মের মধ্যে শৈল্পিক অনুভব সঞ্চারের পথ খোঁজেন। তাঁর কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালে। কৈশোরে লিখিত সমস্ত কবিতা বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছে। ‘আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর’ (২০০৯) তাঁর প্রথম কাব্য, দ্বিতীয় কাব্য ‘শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ’ (২০১২)। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘ট্রোগনের গান’, নির্বাচিত কবিতাসংকলন ‘জলময়ূরের শত পালক’, ‘প্রমগ্ন কবিতাবলি’ ও চীনা ট্যাং যুগের কবিতার অনুবাদগ্রন্থ ‘ঝলকে ওঠা স্বপ্নডাঙা’ ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রণিধানযোগ্য গবেষণাগ্রন্থ “Robert Frost: A Critical Study in Major Images and Symbols” ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ- ‘বেগম রোকেয়া স্মারকগ্রন্থ’ (যৌথ, ২০০৫) ও ‘পুথি রহিব নিশানী : হেয়াত মামুদ’ (যৌথ, ২০০৬)।

কর্মসূত্রে তিনি সরকারি চাকুরে; বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কর্মরত। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত, দু সন্তানের জনক। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গৌরাঙ্গ মোহান্ত বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বাংলাদেশ হাইকু সোসাইটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সক্রিয়। এ ছাড়া তিনি রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের আজীবন সদস্য।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E