৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মার্চ ০৬২০১৭
 
 ০৬/০৩/২০১৭  Posted by

পৃথিবীর কবিতা, মানুষের কবিতা

– বারীন ঘোষাল

কবি বারীন ঘোষাল

কবি বারীন ঘোষাল

দাঙ্গা ও দেশভাগ হেতু স্বাধীনতার ঘটনাটি বাঙালির জীবনে যে দুর্বিসহ চাপ তৈরি করেছিল তার তুলনা আর কখনো ছিল না। শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমে তার ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার স্বাক্ষর সোচ্চার হলেও ঘনিষ্ঠভাবে লক্ষ্য করে বাংলা কবিতায় সেই প্রকাশ দেখা গেল না। আমি নিজেকে সেই সময়ে সিচুয়েট করাতে পারবো না। তবে আবহমান বাংলা কবিতার কালোত্তীর্ণ ধারাটি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সেই সময়ের, অর্থাৎ পঞ্চাশ দশকে বাঙালি কবির পছন্দ অপছন্দ প্রেম অপ্রেমগুলো জড়িয়ে ম্যাক্রো লেভেলে দেখা যাবে গুটিকয় নাম — অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। রাজনৈতিক মতাদর্শ ও কবিতা কলাকৌশল নিয়ে রেষারেষিমূলক বিবৃতি প্রবন্ধ এবং সম্পাদকীয় লিখে এই এলিটিস্ট কবিরা তখন বিদ্যসমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেও সাধারণ পাঠকের ধরাছোঁয়ার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরূপে বিরাজমান, স্তম্ভের মতো, এত উঁচু যে সাধারণ পাব্লিকের নজরে পড়ে না, এবং সাধারণ পাঠকের উলঙ্গ মাথা কবিতার দুরূহতাকে দুর্বোধ্যজ্ঞানে আপসে নিচে নেমে যায়।

    ‘পরিচয়’, ‘কবিতা’ ও ‘সাহিত্যপত্র’ পত্রিকা ঘিরে যে চুলোচুলি তা আমার ‘অতিচেতনার কথা’ গ্রন্থে ’২৬ দফা প্রতারণা’ প্রবন্ধে অধ্যাপকরা কেন কবিতার শত্রু তাতে বলা আছে। এটা ছাড়া আরো যারা সে সময় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন তারা হলেন স্লোগানীয়ার বা টাইম সার্ভার এবং ধোপে টেকেননি। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা বীরেন চট্টোপাধ্যায় আরো কিছুদিন। ওপরের নাম করা কবিদের ভাষা ছিল প্রায় রবীন্দ্রনাথের। তারা কেউ কেউ মানুষের কবিতা লিখতেন, কেউ বা পৃথিবীর কবিতা। আরো একজন, প্রেমেন্দ্র মিত্র গান গল্প আর সিনেমা করতেন, মিডিয়া প্রসাদ পেতেন বলে ঐ সময়েরই বৃহৎ নাম।

    আরো একজন গোপনে বেড়েছিলেন। জীবনানন্দ দাশ। ‘কবিতা’ পত্রিকা তাকে ত্যাগ করার পরেও সঞ্জয় ভট্টাচার্যের সাহচর্যে কিছুদিন টিকে ছিলেন ‘পুর্বাশা’ ঘিরে, ১৯৫৪ পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে একমাত্র জীবনানন্দের কবিতা কালজয় করতে পেরেছিল, রবীন্দ্রনাথের মতো, এ নিয়ে প্রচুর গ্রন্থাদি পাওয়া যায়। জীবনানন্দের ভাষা ছিল সর্বৈব নতুন, আঙ্গিকে ছিল অমনযোগ। শুদ্ধ বাংলা ভাষা, ডায়াক্রোনিক, যেন একজন মানুষ স্বগতোক্তি করছে ধরাছোঁয়ার মধ্যে — ব্যবহার করতেন জীবনানন্দ। এই ছিল পঞ্চাশ দশকের মূল অংশ, তখনকার তরুণদের সামনে। টাইম সার্ভার বলতে বলা হচ্ছে সেই কবিদের কথা যারা যূগের উপযোগী কবিতা লিখতে গিয়ে স্বাধীনতার বেদনা ও ক্ষয়ের চেয়ে বড় করে দেখেছিলেন বঞ্চনা ও স্বপ্নের হাতছানি। ‘এ আজাদী ঝুঠা হ্যায়’ বলা যত সহজ, আজাদীকে সত্য করে তোলা ততটাই কঠিন বলে স্লোগানেই আবদ্ধ থেকে গেলেন তারা। এলিটিস্টরা লিখতেন মানুষের সম্পর্ক রহিত পৃথিবীর কবিতা। টাইম সার্ভাররা পৃথিবী ও প্রকৃতিকে ভুলে লিখেছেন মানুষের কবিতা। একমাত্র জীবনানন্দ মেলাতে পেরেছিলেন দুই প্রান্তকে।

    তরুণদের চোখের সামনে ঐসব ঘটছিল। তরুণরা ‘কবিতা’, ‘পরিচয়’, সাহিত্যপত্রে’ ঝাঁক না বেঁধে নিজেরাই শুরু করে দিলেন ‘শতভিষা’, কৃত্তিবাস’, ‘দৈনিক কবিতা’ প্রভৃতি পত্রিকা।

    সে সময় আরো একটা ঘটনা ঘটছিল। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন একজন সফল সম্পাদক এবং তরুণ কবিদের ভরসা স্থল। জীবনানন্দকে কলকাতায় প্রাথমিক প্রশ্রয় দিয়েছিলেন তিনি। অধ্যাপকরা আবার ইংরাজির অধ্যাপক ছিলেন, ইংরাজির মাধ্যমে বিদেশী কাব্যসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত ও অনুরাগী ছিলেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আধুনিক কবিতার মঞ্চে মেঘদূতকে প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে লিখলেন — মেঘদূতের মধ্যেও বিশিষ্টভাবে দাবী করে শুধু আমাদের কর্ণেন্দ্রিয়কেই নয়, আমাদের স্নায়ুতন্ত্রী সমন্বিত চৈতন্যকেও। এ যেন সেই পংক্তি যা আমাদের দেহকে রোমাঞ্চিত করেই চিত্তশুদ্ধি ঘটাতে পারে। যার কোন আধেয়বস্তুর আর প্রয়োজন নেই — সেই পংক্তি, যাকে হয়তো আমরা মালার্মের ভাষায় বলতে পারি —“শূন্য, একতাল ও ধ্বনিময়”।

    এই মালার্মের নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে প্রবন্ধটিতে বজ্রের নির্ঘোষ শ্রুত হয়। বুদ্ধদেব আরো একটি মহৎ কাজ করেছিলেন, তা হল, বাংলা কাব্যপ্রেমীদের কাছে শার্ল বোৎলারকে উপস্থিত করা, তার প্রথম শ্রেণীর অনুবাদে জীবন আলেখ্য ও তৃতীয় শ্রেণীর অনুবাদে কবিতাগুলির মাধ্যমে। বুদ্ধদেবের কথা একটু বেশী হচ্ছে বলে আরো একটু বলি। তার কবিতা ছিল নাটক ও গল্প ঘেঁষা, বর্ণনাধর্মী, ডিটেইলিংকে বাস্তবতা মনে করতেন তিনি। আর কখনও ছন্দ ছেড়ে বেরোননি। যেখানে উপমান ও উপমেয় স্থান পরিবর্তন বা জাক্সটাপোজ করে কেবল সেই উপমাই আধুনিক কবির কাঙ্খিত। আরো ভাল হয় যদি উপমাই একমাত্র বর্ণিত হয়, উপমানের উল্লেখ না থাকে। একটা সাধারণ সূত্র হল ‘মতো’ শব্দটি ব্যবহার করা। এই ব্যবহারে উপমাকে সার্থক করে তুলতে পেরেছেন একমাত্র জীবনানন্দ। বুদ্ধদেব বসু প্রচুর ‘মতো’ ব্যবহার করেছেন যা উপমাটিকে স্থির ও জড় করে দেয়। এ নিয়ে সুধীন্দ্রনাথের সরস ব্যঙ্গ আছে। বুদ্ধদেবের কবিতা রচনার পারদর্শীতা যাই হোক, কবিতা সম্পর্কে তার মতামত ছিল অনেক র‍্যাশনাল এবং প্রখর, যে কারণে পঞ্চাশ দশকেও তাকে অগ্রগণ্য বিবেচনা করা হতো।

    একটু পিছিয়ে যাই। ১৯৩৫ সালে কবিতা পত্রিকার প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে তখনকার কবিতার প্রথম বিঘ্ন নিয়ে ‘কবিতার দুর্বোধ্যতা’ শীর্ষক গদ্যে লেখেন  — “ভাল কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা বোঝা যাবে না, বোঝানো যাবে না। যে কবিতা বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে বোঝা যায় তাতে আর সবই আছে, কবিতা নেই। যে কবিতা পড়বার সঙ্গে সঙ্গে নিতান্তই বোঝা গেল, স্কুলের পাঠ্যকেতাব তার পরম গৌরবময় কবর। যা বুঝবার জিনিষ, বোঝার সঙ্গে সঙ্গেই তা ফুরিয়ে যায়। কিন্তু বুদ্ধির অতীত, বুদ্ধি-পলাতক যে বিরাট উদ্বৃত্ত, যে জ্বলন্ত তারামন্ডল — যেখানে অপরূপ ধ্বনির আর অলৌকিক ইঙ্গিতের সীমাহীনতা — কবিতা তাই, তা ছাড়া আর কী ? কবিতা লিখতে হলে যেমন বিশেষ একটি ক্ষমতা নিয়ে জন্মাতে হয়, বিশুদ্ধ কবিতা উপভোগ করতে হলেও তেমনি একটি জন্মগত ক্ষমতার প্রয়োজন। অধিকাংশ পাঠকই চায় যে, কবিতা হবে স্পষ্ট সুনির্দিষ্ট সঙ্কীর্ণ একটি বিষয়ে আবদ্ধ। যা ধরাছোঁয়া যায়, যা বোঝা যায় — যেমন করে ও মনের যে বৃত্তির সাহায্যে আমরা বুঝি গণিত ও দার্শনিক প্রবন্ধ … অবশ্য তার সঙ্গে থাকবে ছন্দের সুখদ ঝংকার”। কবিতা পত্রিকার ঐ বছরেই চতুর্থ সংখ্যায় ‘কবিতার পাঠক’ শীর্ষক গদ্যে লেখেন … “পৃথিবীতে ভাল কবিদের সংখ্যা অল্প, ভাল পাঠকের সংখ্যাও খুব বেশী নয়। কবি হয়ে জন্মাতে হয়, কবিতার পাঠক হয়েও জন্মাতে হয় হয়তো, এটা মনের এক বিশেষ বৃত্তি, যার থাকে না তার থাকে না। যেমন অনেকে বর্ণান্ধ হয়ে জন্মায় তেমনি অনেকে জন্মায় কবিতা-বধির হয়ে …”। এই অংশগুলি তুলে দেবার অর্থ হল বুদ্ধদেবের একটা কেজো লড়াই ছিল, অনেকটা রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের বিরুদ্ধে, খানিকটা সজনীকান্ত দাশের বিরুদ্ধে, এবং সমসাময়িক কল্লোলের তরুণতর কবিদের সমর্থনে, যা তাকে পঞ্চাশ দশকে এক অনিন্দিত আসনে প্রতিষ্ঠিত করে।

    অবনীন্দ্রনাথের উপর ভক্তি, নন্দলাল বসুর প্রতি স্নেহ  এবং যামিনী রায়ের সঙ্গে সখ্যতা বিষ্ণু দে’র কবিতা প্রকরণে চিত্রকল্পপ্রধান ও মিথ-সমান কাব্যকল্প হাজির করে, এলিয়টের ভাষাশিষ্য রূপে। কিন্তু চিত্রকল্পে এবং উপমায় তিনি এলিয়টের ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেননি সাধুভাষার সীমায়। কবিতার বিশুদ্ধতা ও মার্ক্সবাদের ইন্টারপ্রিটেশন নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকতেন তিনি। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত প্রতীকবাদ ও সাঙ্গীতিক উচ্চারণ বিশিষ্ট কবিতা লিখতেন সাহেবী পরিবেশের ঘেরাটোপে থেকে। জীবনানন্দ দাশ বন্ধুদের কাছে উচ্চস্বরে হেসে থাকলেও সাধারণত গোমড়ামুখো, সাংসারিক চাপে ব্যস্ত, নির্জন ছিলেন এতটাই যে তরুণরা তার কাছে ভিড়তো না। প্রেমেন্দ্র মিত্র তরুণদের প্রশ্রয় দিতেন বুদ্ধদেবের পরেই। এমনকি আমরা দেখবো প্রতিষ্ঠান কি ভাবে বাংলা কবিতার উজ্জ্বলতম সম্ভাবনাকে গ্রাস করে বশংবদ করে তোলে প্রেমেন্দ্র মিত্রকে ব্যবহার করে।

    তো এই গেল বিশুদ্ধ জীবন যাপন, বিশুদ্ধ কবিতা এবং বিশুদ্ধ কাব্যবার্তার মধ্যকার ফারাক। স্বাধীনতার পরবর্তী পঞ্চাশ দশকের তরুণরা সীমানা ভাঙলেন প্রথম। আধুনিক জীবন যাপন না করলে আধুনিক কবিতা লেখা যায় না বলে তারা প্রথমে বোৎলার, র‍্যাঁবো প্রদর্শিত পথে, পরে বীট জেনারেশনের বোহেমিয়ানিজম আত্মসাৎ করে ছড়িয়ে দিলেন কবিতাকে। এই আক্ষেপ ছিল বুদ্ধদেবেরও। আমেরিকার বীটদের সঙ্গ পরিচয়ের পরে দুঃখ করেছিলেন বয়সে আর তত তরুণ নন বলে। বাংলায় প্রগতিবাদীরা এবং কমিউনিস্টরা সর্বহারাদের মধ্য থেকে উঠে তো আসেনইনি, সর্বহারার ভূমিকায় অভিনয়ও করেননি, কী রাজনীতিতে, কী কবিতার এরেনায়। লেখক শিল্পী সংঘ তৈরি হলেও হিন্দী বলয়ের মতো বাঙালি প্রগতিবাদীরা প্রয়োগবাদী হয়ে উঠলেন না। এই হয়ে ওঠাটা অবশ্য একটা রিভার্স অর্ডার, শুধু টেস্ট করার জন্য প্লাস থেকে মাইনাসে যাওয়াকে অপ্রগতি মনে করা হল, অগ্রগতি নয়। পঞ্চাশের তরুণরা দলবদ্ধ হয়ে প্রায় ব্যাপারটাকে ভেঙ্গে দিলেন। ভাষাকে মুখের কথায় (সিনক্রোনিক) নামিয়ে আনলেন, আঙ্গিক বোধ আর বিষয়ের ভাবনাকে তুচ্ছ করলেন। অগ্রজরা এদের বললেন উন্মার্গগামী। জীবনানন্দ বললেন — ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। তখন জীবনানন্দকে কেউ প্রতিবাদ জানাননি। পঞ্চাশের শক্তি চট্টোপাধ্যায় নব্বই দশকে পরিণতির শেষ পর্যায়ে, যিনি মূলধারা কবিতার মধ্যমনি ছিলেন তখনও, তিনি ফস্‌ করে বলে বসলেন — ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি, তবে এত কবি কেন ?’ অগত্যা তরুণ কবিদের বাক্যবাণে বিদ্ধ হলেন প্রাজ্ঞ কবি। প্রাজ্ঞতাকে মুছে দিয়েছিল দম্ভ।

    বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাস সবারই জানা। তবে ভিন্ন ফিলটার যোগে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা ও বলা কথা ভিন্নতর হতে বাধ্য। উপরে পঞ্চাশ দশকের পরিপ্রেক্ষিতটি বোঝানো হয়েছে। পঞ্চাশ দশকের কবি তাদের বলা হয় যারা পঞ্চাশে লেখা শুরু করে সত্তর আশিতে পরিণতি পাচ্ছেন। প্রতি দশকেই এটা খাটে। কেউ কেউ কিছুদিন আলোড়ন তৈরি করে থিতিয়ে বা থেমে যান। দীর্ঘায়ু কাব্যজীবনে গতানুগতিক, পারম্পরিক, আবহমান আদর্শে কবিতা লিখে যান অনেকে যেটাকে মূলস্রোত বা মূলধারা বলে। তাতে উপনদী অনেক হলে মূলধারা শক্তিশালী এবং প্রাণবন্ত হয়। শাখানদী বেশি থাকলে মূলধারা দুর্বলতর হয়ে পড়ে। টাইম সার্ভাররা সংবাদপত্রের মতো ঘটনার পর ঘটনার বাণী টপকাতে থাকেন। তারা বাক্যবন্ধ তৈরি করতে ব্যস্ত থাকেন, এবং ক্যাচি ছন্দময় বা ছন্দহীন কথাকে কবিতা বলে চালান। আবৃত্তিকাররা ধুয়ো ধরেন। পঞ্চাশের তরুণরা, অগ্রজ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও শঙ্খ ঘোষ সহ দীর্ঘকাল কবিতা লিখতে পেরেছিলেন যারা, তাদের মধ্যে নাম করা যায় আলোক সরকার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, অলকরঞ্জন দাশগুপ্ত, উৎপলকুমার বসুর যারা খ্যাতির শিখরে উঠেছিলেন। পঞ্চাশ দশক প্রথম শেখালো কবিতা বুদ্ধি দিয়ে নয়, ইন্দ্রিয় দিয়ে গ্রহণ করতে হয়। যেভাবে গ্রাহ্য হয় তা-ই কবিতা। যে অব্যক্ত অলীক মায়ার তরঙ্গজাল কবিতাকে ট্রান্সেন্ড করায় তা থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের মধ্যে, প্রকৃতির মধ্যে কবিতা খোঁজা চলল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় বিশেষ করে চমকপ্রদ উপহার দিলেন। কিন্তু কম বয়সেই বীটদের সঙ্গে মেলামেশা তাদের জীবনযাপন বদলে দিলেও তা ছিল শুধু দেখানোর জন্য। ভেতরে ভেতরে সবাই ছিলেন পাকা সংসারী, খ্যাতির পূজারী এবং সমাজের শ্রেষ্ঠ আসন লাভের জন্য কান্ডারীর সাজে। ষাট দশকের মাঝামাঝি প্রেমেন্দ্র মিত্রর ডাকে দলে দলে সাহিত্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়লেন সবাই। ফলে গদ্য গল্প উপন্যাস লেখার চাপে কবিতা ছেড়ে গেল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, আলোক সরকার, খানিকটা উৎপলকুমার বসু জীবনানন্দ প্রভাবিত হয়ে পড়লেন। বাংলা কবিতার মূলধারায় জীবনানন্দ যে বাঁক তৈরি করেছিলেন তাতে প্রাথমিক উপনদী হিসেবে এরা মিলিত হলেন। আর কোন টার্নিং পয়েন্টের অভাবে মূলধারাটি শুকিয়ে গিয়েছিল যদিও সত্তর দশকের কবি জয় গোস্বামী একবিংশ শতাব্দীতেও মূলধারাটি কোনরকমে টিকিয়ে রেখেছেন। সঙ্গে অবশ্যই মিডিয়া লালিত তরুণরা।

    জীবনানন্দ প্রদর্শিত পথে গ্রাম বাংলা এবং আঞ্চলিকতার মতো মাইক্রো অনুভুতি এল পঞ্চাশ দশকের বাংলা কবিতায়। অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় ষাট দশকে এবং কমল চক্রবর্তী ও অরুণ চক্রবর্তী সত্তর দশকে এই মূলধারায় উপনদী হিসেবে সম্মিলিত হয়ে প্রাণদান করেছিলেন। আর একজন, স্বদেশ সেন, যিনি নির্জনে নীরবে লাইম লাইট থেকে দূরে সাধকের মতো একটি বাঁকের উপস্থাপনা করে অঘোষিত ভাবে অভ্যাস করে গেছেন কবিতার এবং তরুণতর অনেক কবিকেই প্রভাবিত করেছেন নিজের অগোচরেই।

    ষাট দশক হল আন্দোলনের দশক। পঞ্চাশ দশক পর্যন্ত বাংলা কবিতায় নানা পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলেও কোন আন্দোলনের ঘোষণা শোনা যায়নি বিশ দশকের মাঝামাঝি এক ‘কল্লোল’ ছাড়া। সদ্য পঞ্চাশে আপামর কবিরা এলিটিস্টিদের হাত থেকে কবিতার হাল ছিনিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু সেই পীড়িত সময়ের বেদনার স্পর্শ কোথাও দেখি না। সেটা শুরু হল ষাটের দশকে। পঞ্চাশ দশকের আগে পর্যন্ত বাংলা কবিতার ভাষা ছিল ডায়াক্রোনিক, অধ্যাপনার ভাষা। রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত অনেক আকাড়া শব্দ ব্যবহার করেছেন ঘুরিয়ে মুখে মুখে ললিত করে। জীবনানন্দ পরবর্তী পঞ্চাশের কবিতায় এল মুখের সিনক্রোনিক ভাষা, এবং তা লিরিকধর্মী, ছন্দবদ্ধ, মুক্ত পয়ারে। ষাট দশকের শুরুতেই মলয় রায়চৌধুরীর নেতৃত্বে ‘হাংরি জেনারেশন’ নামে ম্যানিফেস্টো সহ সাহিত্য আন্দোলন শুরু হয় যার ভাষাটি ছিল সাব-অলটার্ন। বাংলা কবিতার ভাষা যেন রাতারাতি পালটে গেল। কবিতার কাব্যগুণের আর রূপের বদলে এল চিৎকার, সমস্ত পীড়নের বঞ্চনার, অবহেলার, ক্ষুধার অপমানের ও যৌনতার কথাগুলো উপযুক্ত ভাষায় বর্ণিত হল। এ পর্যন্ত ঠিক ছিল এবং একটা কাজের কাজ হয়েছিল যাতে বিবি বাবুর বাংলা ভাষার বদলে নিচুতলার লংঘিত বাংলা ভাষা এল কবিতায় এবং প্রভাবিত করল ভবিষ্যতের বাংলা কবিতাকে। কিন্তু এরা গদ্যে পদ্যে বুলেটিনে চিৎকারে রক্ষণশীল ও অভিজাত বঙ্গসমাজকে আক্রমণ করে বসলো, ছুঁড়ে দিলো ঘৃণা, অপমান, অমর্যাদা। প্রচার যে কখন অপপ্রচারে বদলে যায় তার সীমাকে পরোয়া করলেন না এরা। থানা পুলিশ হল, শাস্তি হল, নিষিদ্ধ হল হাংরি জেনারেশন। কীলককে কিল মেরে থামিয়ে দেবার মতো দুঃসময় দেখলেন বাংলা কাব্যজগৎ ষাট দশকের শুরুতেই। মানুষের ভিতরের ক্ষুধার কাতরতাকে কবিতা মনে করলেন এবং প্রবেশ করলেন এক কবিতা-বঞ্চিত জীবনে। যা করতে চেয়েছিলেন তার গুরুত্ব খর্ব করলেন নিজেরাই। আজো এদের ঢক্কা শুনলে মনে হয় হাংরি কিংবদন্তী ছাড়া ষাট দশকে আর কিছুই হয়নি। কিন্তু তা তো নয়।

    হাংরিদের পিঠোপিঠি শুরু হয় প্রতীকবাদী বা কংক্রিট কবিতার চর্চা, তারপর শ্রুতি আন্দোলন, থার্ড লিটারেচার, ছাঁচ ভেঙ্গে ফ্যালো, শাস্ত্রবিরোধী, ধ্বংসকালীন কবিতার আন্দোলনগুলি একের পর এক চর্চিত হতে থাকে বাংলা কবিতায়, ম্যানিফেস্টো সহ, কিন্তু সবই ছিল ক্ষণস্থায়ী। পাশাপাশি ষাট দশকের কিছু কবি এবং পঞ্চাশের মূল কবিরা জীবনানন্দ প্রদর্শিত পথে রোমান্টিক আধিভৌতিক সুররিয়াল কবিতাকেই মূলধারা হিসেবে চালিয়ে গেলেন। ষাট দশকের প্রতীকবাদী কবি অশোক চট্টোপাধ্যায় লিখে জানালেন — তোমার ভাষা তোমার ভাবের বাহন নয়। তা তোমার ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাবার উপায়। প্রয়োজনের বাইরে অর্থাৎ সীমা ছড়ালেই বাক্য হয়ে যায় ভাষা; বিষয়ের ভাষা, ঘটনা ও অবস্থার ভাষা; কবিতার ভাষা। মালার্মে প্রভাবিত ফরাসী প্রতীকবাদ বাংলা কবিতায় এল কংক্রিট কবিতা হয়ে। বর্ষাকালেই বৃষ্টি পড়ছে বোঝা যায়। কিন্তু পড়ন্ত বৃষ্টিতে কেউ ছাতা ধরেছে — দৃশ্যটি এঁকে দিলে সর্বসময়েই টের পাওয়া যায়, এবং সবটাই শব্দ সাজিয়ে। আমাদের কনভেনশনাল ভাষার শব্দসজ্জাকে কিঞ্চিৎ বদলে দিলেই কংক্রিট কবিতা হতে পারে। ক্ষুৎকাতরতার পরে আমরা শিখলাম প্রতীককে রূপক-এ পরিণত করে তোলার কৌশল। শব্দপ্রতীক ও প্রতীকশব্দ সম্পর্কে সচেতন হলাম। বস্তু ও বাস্তবতা যে দুটি আলাদা ভাবাবস্থা তা নিয়ে ভাবলাম। ‘স্বকাল’, ‘ফু’, ‘জিরাফ’ ইত্যাদি হাংরি পত্রিকায় বলা হতো তারা ছাড়া আর কোন সাহিত্য হয় না। কিন্তু প্রতীকবাদীরা ‘সম্প্রীতি’ পত্রিকায় একই সময়ে জড়ো হয়ে পৃথক কাজ করেছিলেন আঙ্গিক নিয়ে। ১৯৬৫-তে হাংরি আন্দোলন অবসৃত হবার আগেই পুষ্কর দাশগুপ্তর নেতৃত্বে একটি গোষ্ঠি শুরু করে আর এক আন্দোলন যাকে বলা হল শ্রুতি আন্দোলন। আবারো ফ্রান্স থেকে আমদানী হল তা। শ্রুতির কবিরা শ্রাব্যতা এবং দৃশ্যকে পৃথক করতে চাইলেন। সোচ্চার বিবৃতিধর্মীতা ও দার্শনিক তত্ত্বভারাক্রান্ততা এবং নির্দিষ্ট অবয়ব থেকে কবিতাকে মুক্ত করলেন। তাতে নম্র মৃদু উচ্চারণের মন্ত্রময় অনুরণনে , স্বপ্ন-রহস্য-কুহকের আলো-আঁধারি-রাজ্যে অভিযাত্রাকে সাংকেতিক করে তুলতে চাইলেন। দৃশ্যতা এবং শ্রাব্যতাকে পৃথক করার পরে যুগপৎ উপস্থিত করার কৌশল শেখালেন আমাদের। তারাই প্রথমে বললেন ভাষার আবেগকে মুছে ফেলার কথা, ব্যাকরণকে না মানার কথা। কাটা কাটা অসম্পূর্ণ বাক্য ব্যবহারের কথা। অতিরেক কি চেনালেন আমাদের তা। কবি সজল বন্দোপাধ্যায় প্রকৃয়াটি বহুদিন পর্যন্ত বজায় রেখেছিলেন, যা থেকে আশির দশকে জলপাইগুড়িতে সংহত কবিতার উন্মেষ হয় শ্যামল সিংহের হাতে। বাকিরা অবশ্য মিডিয়ার কল্যাণে শ্রুতি আন্দোলন থেকে সরে যান।

    ষাট দশকের মাঝামাঝি সময়েই পশ্চিম বাংলায় একটি নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষায় নতুন সমীকরণ শুরু হয় যেটি ট্রিগার হয় ১৯৬২’র চীনের আগ্রাসনের পরে। নানা স্টাডি সার্কেল গজিয়ে ওঠে যেখানে চর্চার বিষয় ছিল পুঁজিবাদ থেকে মাওবাদ পর্যন্ত কমিউন গড়ে তোলার কারণ ও উদ্দেশ্য এবং উপায়। বাংলা কবিতা এবং অন্যবিধ সাহিত্য অঙ্গে এর ঢেউ উঠেছিল ‘থার্ড লিটারেচার’ নামে। পবিত্র মুখোপাধ্যায় তাদের মধ্যে একজন যিনি এখনো লেখেন খেই হারিয়ে। স্টাডি সার্কেলগুলো নকশাল আন্দোলনের জন্ম দিতে তার ভীষণ রূপ দেখে ছত্রভঙ্গ হয় এই আন্দোলন। ‘ছাঁচ ভেঙ্গে দাও’ আর একটি আন্দোলন ষাট দশকের শেষের দিকে  যেখানে ডিস্ট্রাকচারাইজেশন এবং ডিকন্সট্রাকশনকে এক করে দেখানো হয় কবিতায়। ব্যাপারটা ভুল হলেও এই চর্চা থেকে কবিতার অবয়বে হাস্যকর বিধিবদ্ধতার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়। কাঠামো কেন ভেঙ্গে ফেলতে হবে অন্তত সে সম্বন্ধে সচেতন করে তোলার চেষ্টা চলে। ১৯৬২ সালেই ‘শাস্ত্রবিরোধী’ আন্দোলনের বুলেটিন শুরু হয়। পরে যা ‘এই দশক’ ও ‘অব্যয়’ পত্রিকায় বদলে যায়। তবে এরা গদ্যচর্চাই বেশি করেছিলেন, কবিতার চর্চা ততটা নয়। ষাট দশকের সবগুলি আন্দোলনই ছিল ক্ষণস্থায়ী কিন্তু সুদূর প্রভাবী। বোঝা মুশকিল, একটি আন্দোলন ও চর্চা যা ভবিষ্যতে প্রভাব বিস্তার করবে তা বর্তমানে এত সন্দেহপ্রবণ ও ক্ষণায়ু হয় কেন। ষাট দশকেই আরো একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। হাংরি জেনারেশনের শুরুতে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও উৎপলকুমার বসু কিঞ্চিৎ হলেও মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গী ছিলেন বলে, ১৯৬৫-তে মলয়ের শাস্তি ও হাংরি বা কবিতা লেখার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলে উৎপলকুমারও অধ্যাপনার চাকরি খোয়ান এবং দীর্ঘদিন ইওরোপে বাস করে নতুন উৎপল হয়ে ফেরেন। ১৯৬১ সালেই বিনয় মজুমদার মানসিক হাসপাতালে যাতায়াত শুরু করেন। স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় মানসিক সন্তুলন নষ্ট হয়ে যায় তার প্রায়ই। প্রবলেমটা শারিরীক। ১৯৭০ সাল থেকে আবোল তাবোল ছাড়া কিছুই লেখেননি প্রায়। সেইসব গণিতের দাগ এবং তার সাংসারিক ও শারিরীক দুরবস্থার মধ্যে কাটিয়ে শেষ হয়ে যান। বাঙালী বড় মিথ ভালবাসে। হাংরি-নিনাদ এবং বিনয়-অবসাদ মিথের বাজারে একই দরে বিকোয়।

    এসে গেল মুক্তির দশক নামে সত্তর দশক। কথাটা উঠেছিল নকশালবাড়ির লড়াই থেকে। সেটা ছিল সর্ব অর্থে একটা আব্দোলন। সত্তর দশক দুটো আধখানা হয়ে গেল। একটা অর্ধেক থাকলো বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, মনিভূষণ ভট্টাচার্যের প্রভাবে প্রভাবিত টাইম সার্ভার বা স্লোগানীয়ার। এমার্জেন্সি এসে মুখে কুলুপ দিলে তারা হো চি মিন, চে, কাস্ত্রো, পল রোবসন, নাজিম হিকমত করতে থাকলো এবং সময় চলে গেলে শান্ত হয়ে গেল। বাকি অর্ধেক জীবনানন্দের ছায়ায় লুকোনো শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে এগোতে থাকলো। আমরা যারা গদ্যনবীশ তারা এদিক ওদিক চাইতে থাকলাম। দেখা গেল সময় ফুরিয়ে গেলে প্রথম দলের কথা কারো মনে পড়ে না। দ্বিতীয় দলে জয় গোস্বামী, রণজিৎ দাশ, মৃদুল দাশগুপ্ত, কমল চক্রবর্তীর কথা মনে পড়ে। এদের মধ্যে জয় গোস্বামী আজো জীবনানন্দের পথে হাঁটছেন, সেটাই মূলধারা জ্ঞানে। কমল চক্রবর্তী আজো গদ্য লেখার চাপ এড়িয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রোমান্টিক কবিতা লেখেন। জয় গোস্বামী সাহিত্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে ঢুকে প’ড়ে আর পথ পরিবর্তন করতে পারলেন না। তবু বলা যায় সত্তর দশকের মধ্যে একমাত্র তিনিই, এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরে অবশ্যই, মূলধারা বাংলা কবিতার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু কোন টার্নিং পয়েন্ট বা বাঁকের অভাবে, উপনদীর অভাবে মূলধারা কবিতা, যা এতদিনে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও স্বীকৃতি পেয়েছে তা শুকিয়ে যাচ্ছে। তাই শুরু হয়েছে রিমেক রিমিক্স। এটা আমরা নাটকে সিনেমায় গানে দেখেছি আকছার। খ্যাতির মোহে বা প্রাতিষ্ঠানিক দাক্ষিণ্যের লোভে কবিদের মেজর অংশ তাই করে যাবে বৈকি। ইদানীং ফেসবুকের বেনোজলে নিয়ন্ত্রণহীন সেটাই তো প্রতিপন্ন হতে দেখি।

    ষাট দশক থেকে আরো একটা ব্যাপার পরিলক্ষিত হতে থাকে। সরকার নিজের প্রয়োজনে কিছু আমলা তৈরি করে।  তাদের মধ্যে যারই একটু লেখার বাতিক আছে সে-ই বিখ্যাত কবি গল্পকার বা ঔপন্যাসিক হয়ে যায় ব্যবসায়িক মহলে। রিটায়ার করার পরে দ্রুত অবসৃত হন তারা। বাংলা কলা বিভাগে অথবা ইংরেজিতে শিক্ষিত কবিরা অধ্যাপনা এবং অন্যান্য পেশায় জড়িয়ে থাকতেন পঞ্চাশ দশক পর্যন্ত। এই নমুনা ষাট দশকে কমে যায় এবং সত্তর দশকে প্রায় অন্তর্হিত হয়। সত্তর দশকে বিভিন্ন পেশার লোকেরা কবিতা লেখেন বলে হঠাৎ বাংলা কবিতায় ভোকাবুলারি বেড়ে যায়, যেমন একবার হয়েছিল হাংরিদের আমলে। সত্তর দশকে প্রান্তিক শব্দ, আঞ্চলিক শব্দ, সংসার এবং যৌনতার শব্দ প্রচুর এসে জোটে কবিতার এরেনায়। ১৯৭১ সালে জামশেদপুরের ‘কৌরব’ পত্রিকার প্রাথমিক লেখক ও পরিচালকরা সবাই ছিলেন ইঞ্জিনীয়ারিং পেশার সঙ্গে যুক্ত। কমল চক্রবর্তীর সেসব লেখা নতুন স্বাদ এনেছিল কলকাতার বুকে। লেখকদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ডাক্তার, অনেকে সৈনিক, অনেকে বিপ্লবী। মোট কথা বাংলা কলা বিভাগকে বিদায় জানাতেই কবিতার ভাষায় নতুন স্বাদ গন্ধ এল। কিন্তু সবটাই প্রায় রোমান্টিক। আশ্চর্য যে ষাট দশকে অতগুলো আন্দোলনের পর সত্তর দশকে কোন কাব্য আন্দোলন গড়ে উঠল না। ভাষা আর আঙ্গিক নিয়ে কৌরবের পরীক্ষা নিরীক্ষা ছিল নিঃশব্দ, চিৎকার বিমুখ, জীবনযাপনে পঞ্চাশের পন্থী, আধুনিক হয়ে উঠতে চাওয়া। কিন্তু টাইম সার্ভার নয়। টাইম সার্ভার ছিল ‘অনুষ্টুপ’ ও ‘পরিচয়’। এখন যারা নেই তাদের নাম করব না। রোমান্টিক মহলে ‘কৃত্তিবাস’ ফিরে এল নতুন রূপে, ‘শতভিষা’ চালুই ছিল, ‘এক্ষণ’ আর ‘প্রমা’, যারা সবাইকে স্থান দিতো গোষ্ঠিবদ্ধতার ঊর্ধে।

    সত্তর দশকের শেষাশেষি বাংলা কবিতার মূলধারার শুকনো অবস্থা দেখে অতৃপ্তি শুরু হল। জীবনানন্দ প্রভাবমুক্ত বাংলা কবিতা নিয়ে কল্পনা শুরু হল। সংজ্ঞাহীন, পরিমাপহীন, এবং আদর্শ-মানকহীন কবিতা নিয়েও নতুন করে ভাবনা শুরু হল। পুনরায় চিন্তা শুরু হল পদ্য-শ্লোকের দিনগুলি থেকে কবিতার গতি প্রকৃতি নিয়ে। কবিতা এক বা নানা পথে গিয়েছে এবং দীর্ঘকালে নানাবিধ রূপগ্রহণ করে আজ এইখানে বা বিবিধ স্থানে। যাত্রা শুরুর কালে যে শর্ত ছিল অনিবার্য তা আজও প্রযোজ্য কিনা ভাবা হল। বিভিন্ন সময়ে যে পরিবর্তনগুলো ঘটেছে তা লিপিবদ্ধ করা হল। এ সম্পর্কে একটা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী কলাকৈবল্যবাদীদের চেয়ে অনেক বেশি উপযোগী মনে করা হল। ইংরেজের কাছে গদ্য লেখা শিখলো বাঙালিরা। দেখা গেল পদ্য-মধ্যকার গল্প উপন্যাস নাটক আখ্যান অনেক সাবলীলভাবে গদ্যে প্রকাশ সম্ভব। পদ্য থেকে ধীরে ধীরে সেসব মুছে গেল তাই। মুদ্রণ ব্যবস্থা সামনে আসতে স্মৃতির প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পেলো। তাই কথা উঠলো — ব্যাকরণ মানি না, শাস্ত্র মানি না, কৃত্রিম ছন্দ মানি না — এসবের। মূলধারা কবিতা কাজে কাজেই অপাংক্তেয় হয়ে উঠলো, এবং — তাই কেন করে যাবো — এ ভাবনা এল। তাহলে কি করবো ? প্রতিক্ষণে মনে হল কবিতা বোধহয় এরকম না ওরকম। ধারামুক্তির প্রয়োজনীয়তা ও বিকল্পবোধ চর্চিত হল কৌরবের পাতায়। আশি দশকে শুরু হল কৌরবের কবিতার ক্যাম্প। বিকল্পবোধে অপর কবিতা প্রকাশ প্রণালী আবিষ্কার করা কষ্টসাধ্য ছিল। কতশত বছরের কবিতা গঠন প্রণালী ও কবিতা গঠন অভ্যাস ও বিশ্বাস থেকে এক আধজন নয়, সমূহ সমাজকে বার করে নেওয়া সহজ ছিল না। এসবেরই উপায় ও উদাহরণ নিয়ে চর্চা চলল ক্যাম্পগুলোতে। শুরু হল কৌরবের বিখ্যাত পরীক্ষা সাহিত্য ও প্রতিকবিতা লিখন। যেন এরই অপেক্ষা করছিলেন সবাই। শুরু হয়ে গেল অ্যান্টিপোয়েট্রি বা প্রতিকবিতা লেখার চল। কবিতা নয়, কবিতার প্রায়। অমোঘ নয়, অলীক ভার্চুয়াল কবিতা। তখন রীতিই হয়ে দাঁড়ালো — কৌরবের মতো কবিতা লেখা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রাও জানতেন কৌরবের মতো হচ্ছে না বা লিখতে পারছি না কবিতা। প্রতিকবিতা লেখাটা পুরনো ধরণের কবিতা লেখা থেকে বা মূলধারা কবিতা থেকে একটা ডিপার্চার মনে করা হল। এই নিয়ে কৌরবের পাতায় অনেক গদ্যও লেখা হল।

    আশি দশকের কবিরা পরিষ্কার ভাবে দু’দলে ভাগ হয়ে গেল। একদল মূলধারা কবিতার রিমেক রিমিক্স করে প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি থাকতে চাইলো। আর একদল পরীক্ষা নিরীক্ষায় মনযোগী হয়ে বিকল্পবোধ থেকে অপর কবিতার সন্ধান চালালো। জীবনানন্দের ছায়া আশি পেরিয়ে নব্বই দশকেও বিস্তৃত হল, শুধু তা হয়ে পড়ল ফিকে, দুর্বল। আশির শেষ দিকে কলকাতা ও হাওড়ার কয়েকটি পত্রিকা অ্যামালগেট করলো ‘কবিতা ক্যাম্পাস’ ব্যানারে এবং ঐ নামের পত্রিকায়। এরা একাদিক্রমে কৌরবের ক্যাম্পের অনুসরণে কবিতার ওয়ার্কশপ চালু করলো। কৌরবের ক্যাম্পগুলো হত আউটডোরে। জঙ্গলে, পাহাড়ে, নদীর ধারে, সমুদ্রে। দু তিনদিনের জন্য সংসার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিবিড় অনুসন্ধান ছিল সেগুলো। ওয়ার্কশপগুলো হতো ইনডোরে, সমাজ সংসারের পরিবেশে, প্রাত্যহিক বাধার মধ্য দিয়ে। তখনো শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধায়ায় প্রতিষ্ঠানের মধ্যমনি। এত নিরঙ্কুশভাবে খ্যাতির শিখরে অবস্থান এবং প্রসাদ বিতরণের ঘটা ও প্রচার চলতো যে সবার চোখ ঘুরতে বাধ্য। কিন্তু কবিতা ক্যাম্পাসের ওয়ার্কশপগুলোতে পূর্ববর্তী দশকগুলির অবস্থান ছেঁকে বার করে নেওয়া, ষাট দশকের আন্দোলনগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, সেসব আহরণ থেকে প্রয়োগের উপায় চিন্তা, এসব চলতো। বলা হল পুরনো কবিতাকে আইডেন্টিফাই করে কবিতা গঠন প্রণালী থেকে বাদ দাও। বাদ দাও তার সব কিছু — ছন্দ ব্যকরণ ভাষা রূপ রূপক প্রতীক উপমা শব্দালংকার সব বাদ দাও। তাহলে তুমি যা লিখলে তাকে বলো ‘নতুন কবিতা’। এই পরীক্ষা নিরীক্ষা যা কৌরবে শুরু হল আশির দশকে এবং শেষ হল ‘কবিতা ক্যাম্পাস’-এ, নব্বই দশকের মাঝামাঝি, এবং অনুপালন করা হল নব্বই দশক জুড়ে। নতুন কবিতার পন্থা আবিষ্কার হল ১৯৯৩ সালে এবং অভ্যাস করা হল পরবর্তী কয়েক বছর ধরে। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সে সব গভীর বিস্ময়ে লক্ষ্য করছিলেন মূলধারার বিরোধী কবিরা। এভাবে নানা রকমের নতুন কবিতা একটা বন্যার অবস্থাকে প্রোভোক করলো। দারুণ উৎসাহে বাংলার নানা প্রান্ত থেকে নতুন কবিতা চর্চা শুরু হয়ে গেল। কৌরব এবং কবিতা ক্যাম্পাসে লেখা হল নতুন কবিতার সমর্থনে একের পর এক গদ্য। ক্রমে আরো অনেক পত্রিকা নতুন ব্যাপারটিকে প্রশ্রয় দিলো।

    নব্বই দশকেই ঘটলো আরো দুটি ঘটনা যা উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে ইতিহাসে। (১) — ‘নতুন কবিতা’র প্রচার ও প্রসারকে কাউন্টার করতে কবি জয় গোস্বামীর নেতৃত্বে তারই হাত ধরে ‘বিজল্প’-এর ব্যানারে তরুণ কবিরা কবিতা ত্যাগ করে ছন্দচর্চা করতে করতে দলে দলে প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়লো। নতুন কবিরা প্রতিষ্ঠানের বিপদ ডেকে আনছিলই। তাদেরকে রুদ্ধ করা যেমন প্রতিষ্ঠানের কাজ, তেমনি মূলধারাটিকে অব্যাহত রাখতে বাঁকের অভাবেও প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল তরুণ ঘাম রক্ত বুদ্ধি বিবেচনার। নতুন কবিতাকে প্রতিষ্ঠান কখনো পাত্তা দেয়নি, এবং নতুন কবিতা লিখিয়েরাও কখনো প্রতিষ্ঠানের ধার ধারেনি, এ-ও সত্য। ওই কাউন্টার কালচারের কারণে নব্বই দশক ফুৎকারে নিভে যাবার উপক্রম হল। (২) — তখন আবার কাউন্টার-কাউন্টার কালচার শুরু হল বাংলায়। তা হল পঞ্চম শতাব্দীর স্পেন ও আমেরিকার, ষষ্ঠ শতাব্দীর ফ্রান্সের পোস্টমডার্ন সময়ে বিশ্বায়নের হাত ধরে নব্বই দশকের মাঝামাঝি ভারতে ও বাংলায় উপস্থিত হওয়া। এ বিষয়ে কলিম খান, সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, প্রভাত চৌধুরী, জহর সেন মজুমদার, রুদ্র কিংশুক যথেষ্ট প্রচারকের ভূমিকা নিয়েছিলেন তাদের পত্রিকার মাধ্যমে। তাদের বক্তব্য ছিল — ‘নতুন কবিতাও পোস্টমডার্ন কবিতা’। নতুন কবিতার অনুসারীদের বক্তব্য ছিল — ‘পোস্টমডার্ন কবিতাও নতুন কবিতা’। পোস্টমডার্নদের ছিল অনুসরণযোগ্য মডেল কবিতা। নতুন কবিতার বক্তব্য ছিল পুরনো মূলধারা কবিতার চিহ্নহীন কবিতাই নতুন কবিতা। অপর হলেই হল। এ নিয়ে ভবিষ্যতই বিচার করবে। আমরা শুধু ঘটনা দুটোর উল্লেখ করলাম। মূলধারা কবিতা আবার ডুবলো, আরো শুকোলো, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের রস। নিতান্ত ব্যবসার কারণে, কবিতার বইয়ের বিক্রয় বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান লালিত আবৃত্তির বাড়াবাড়ি দেখা গেল এই সময়ে। কবির চেয়ে আবৃত্তিকারের সুনাম বেশি, উপার্জন বেশি বলে রেষারেষির উৎসাহ দেখা গেল। শুকনো মূলধারা কবিতায় এভাবে রস সিঞ্চন শুরু করল প্রতিষ্ঠান। আবৃত্তিকারদের উপার্জন দেখে কবির মাথায় হাত ওঠার জোগাড়। হায় !

    আমাদের বাংলা কবিতার কি হল ? নতুন পরিসরে উপস্থিত হল একটা টার্নিং পয়েন্ট, কোন বাঁক বদল ছাড়াই, আন্দোলন ছাড়াই। খ্যাতির মোহ, পুরস্কারের লোভ আর হাতছানি দিতে পারলো না নবীন কবিকে। কোন ঢাক বাদ্যি ছাড়াই নতুন কবিতা চর্চাই মুখ্য হয়ে উঠল বাংলায়। দেখা গেল ষাটের দশক যেমন প্রচারিত আন্দোলনের কাল, আশির দশক তেমনি প্রচারিত কবিতা ভাবনার কাল। একটিতে বিদেশী আবহাওয়া আর অন্যটিতে দেশী প্রজ্ঞার পুনর্মূল্যায়ণ। ষাট দশকের ভাবনাগুলো ছিল ক্ষণায়ু, আশি দশকের ভাবনাগুলো হল দীর্ঘায়ু। কৌরব পত্রিকা এখনো ছাপার অক্ষরে তো বটেই, গত আঠারো বছর যাবৎ তা ইন্টারনেটের মাধ্যমে হাজার হাজার পাঠকের প্রিয় হয়ে উঠেছে সারা বিশ্বে। আবার হয়তো একদিন আসবে যখন বর্তমান ‘নতুন কবিতা’-কে বলা হবে পুরনো কবিতা এবং তা বর্জনের উদ্যোগ হবে কোন নবীনতর নতুন কবিতার জন্য। এখনই তার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তার কারণ দুটি। (এক) – নতুন কবিতার কোন মডেল নেই। পুরনো কবিতার চিহ্নবর্জিত কবিতাই নতুন কবিতা। তা চিরনতুন হবার সম্ভাবনা যুগে যুগে। (দুই) – নতুন কবিতাকে প্রতিষ্ঠান কোনদিন মূলধারা বলে স্বীকার করবে না, তাই তার বিরোধিতার প্রশ্নও নেই। অবশ্য ইতিহাসে পরিবর্তন সর্বদা কাম্য। স্থাবিরোধী প্রকৃতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বলতে হবে পৃথিবীর কবিতা আর মানুষের কবিতা এক করে দিতে হবে জীবনানন্দের মতো। দুটো যেন আবার আলাদা হয়ে না যায়।

    আমার বিশেষ অবজার্ভেশন হল, বাংলা কবিতার কোন আন্দোলনেই কোনদিন কোন মহিলা কবিকে দেখা গেলনা অংশগ্রহণ করতে, একসাথে হাঁটতে, স্বপক্ষে কথা বলতে। ব্যাপারটা আজগুবী নয় কি ?

                                             ————-

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E