৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
ফেব্রু ০৩২০১৭
 
 ০৩/০২/২০১৭  Posted by

‘প্রমগ্ন কবিতাবলি’

প্রমগ্ন কবিতাবলি

প্রমগ্ন কবিতাবলি

ক থা মু খ
একটি অল্পভার বইয়ের ভেতর আমার বেছে-নেয়া কিছু কবিতা প্রকাশ করবার জন্য প্রীতিভাজন সৈয়দ মহিউদ্দিন মাসুম উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ নামে একটি প্রচ্ছদও প্রস্তুত হয়ে যায়। ‘শ্রেষ্ঠ’ শব্দটি আমার কাছে ভয়ানক অস্বস্তিকর। মনে হয় অহমিকা ঘোষণার কিংবা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি মোক্ষম প্রকাশ। কবিতা নিয়ে আমার অহংকার করবার কিছু নেই; বাণিজ্য বাঞ্ছনীয় নয়। ‘নির্বাচিত কবিতা’ বাজার-চলতি শিরোনাম বলে প্রচ্ছদে ‘প্রমগ্ন কবিতাবলি’-র রাজত্ব মেনে নেয়া গেলো। বইটির অধিকাংশ কবিতা চলিষ্ণু গদ্যে নির্মিত। এখানে মেটনিমি ও মেটাফরের ভেতর দিয়ে জেগে ওঠে একটি ব্যক্তিগত ন্যারেটিভ যেখানে অন্তর্গত অস্তিত্বের সাথে অপর সত্তা বা প্রকৃতিপ্রবাহের সম্পর্ক যোজিত।
অনেক অ্যান্টিপোডাল প্রবণতা নিয়ে গদ্য কবিতা এগিয়ে চলছে। এতে নিশ্চিত হচ্ছে কবিতার প্রসারণস্বাধীনতা। বাক্যের শক্তি গদ্য কবিতাকে অনন্য করে তুলছে। বাক্যের উজ্জ্বল দিন কবিতাকে করবে প্রিয়তর।

গৌরাঙ্গ মোহান্ত
ঢাকা । ২৮ জানুয়ারি ২০১৭

পানকৌড়িবোধ

পানকৌড়িবোধ নিয়ে নিমজ্জিত থাকি; একটি মাছের উজ্জ্বলতার পাশে দেখি জলজ রাজ্যপাট। দেখার জন্য নিমজ্জনকে অত্যাবশ্যক ভাবি। মৎস্যমগ্নতা প্রতিনিয়ত ঘটায় শ্বাসপ্রকৃতির রূপান্তর। উজ্জ্বল মাছের ব্যক্তিগত আয়নায় প্রতিফলিত হয় পানকৌড়ি চিহ্নিত পথ। পানকৌড়ির সাথে মাছের অতিপ্রাকৃতিক যোগ প্রস্তুত করে গভীর রং। এ রং মৃত্যুপূর্ব প্রসারতার জন্য জরুরি। আমার কৃষ্ণতা পানকৌড়ির ঐশ্বর্যে রঞ্জিত। আমার প্রার্থনার ভেতর মাছের অলৌকিক পুচ্ছের অবিকল্প বিকিরণ।

দুর্ভিক্ষদিনে তোমার কৌশিক বস্ত্র

দুর্মূল্য দুধকলার গন্ধ ভেসে এলে তোমার দিকে তাকাই। মানকচুছত্রের ঔদার্যে শঠি-সোনালু পথে ভেসে আসা স্বাদ ও শব্দের  কাছে তুচ্ছ হয়ে পড়ে সিফুড কিংবা জীবনানন্দীয় চিত্রকল্প। আমার দুর্ভিক্ষদিনে তোমার কৌশিক বস্ত্র উড়ে আসে আমার ধূসর গৃহে। স্কাইট্রেন কিংবা বিমানএঞ্জিনের ক্রমাগত হুঙ্কারের ভেতর তোমার বাক্যদল ভেসে আসে উন্মাদ মেঘে। মেঘের উপস্থাপন শতভাগ অকৃত্রিম নয়; দ্রুতগতির সাথে মেঘ ছিঁড়ে যেতে থাকে আর তোমার উচ্চারণকে করে তোলে কিছুটা অস্বাভাবিক। তবুও শূন্যতার ভেতর মেঘের করুণাই বিস্ময়কর। সূর্যতপ্ত মেঘ স্মৃতিকে প্রোজ্জ্বল করে; মেঘ ও সূর্যের ভেতর তরঙ্গিত হতে থাকে তোমার অবিনাশী শরীর।

মাছের সৌন্দর্যছায়া

ইভাসকুলার লেক থেকে মাছ উঠে আসবে বলে আমি হিমার্ত প্রভাত থেকে বসে থাকি ধবল বার্চের নিচে। কাদার গহন আশ্রয় থেকে শরীর ভাসাতে সময় লাগবে জেনে আমি বনের দীর্ঘতার দিকে দৃষ্টি ফেরাই — বসন্তের অবসন্নতার ভেতর কুয়াশা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সূর্য লজ্জিত; কুহকী আঁধারে ডুবে আছে বন। আমাকে ভিজিয়ে যায় অতি শীতল সাহসী বৃষ্টি। উঁচু বৃক্ষরাজির দুর্বল শাখা শীতফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অবিস্তীর্ণ পার্ক ও পাহাড় পথে যুবক-যুবতীরা নেমে পড়ে —  লেকের গভীরে ঘন্টা বেজে ওঠে। মাছেরা জলবক্ষে সাঁতার দিয়ে যায়। আমি অজস্র মাছের ভেতর অনন্ত সৌন্দর্যের ছায়া দেখি; রক্তের উজ্জ্বলতার জন্য ছায়াকে জরুরি বলে চিনি।

কার্ল প্লেস পার্ক

আমার শূন্য অন্ধকারে তুমি ফিরে আসো, অর্থাৎ তোমাকে টেনে আনি। প্রলম্বিত অন্ধকারে মেঘকণা আয়না হয়ে ওঠে। আমার জন্যে নেমে আসা নক্ষত্রআলো তোমাকে প্রতিফলিত করে — আশ্চর্য  গতিময় প্রতিফলন খুলে দেয় সমস্ত দরজা। আমি সিঁড়ি বেয়ে নেমে পড়ি কার্ল প্লেস পার্কে। সবুজ লতায় বাক্সময় হয়ে ওঠে নক্ষত্রফুল; কর্তিত ঘাসের শরীর শোনায় নবজন্ম উপাখ্যান। অলৌকিক গন্ধে কেঁপে ওঠে পার্ক, বাতাস, বসবার কাঠবেঞ্চ। আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রার্থিত ফলের দীপ্তি। আমার সমস্ত কোষে তখন গন্ধদীপ্তির অদৃশ্য আলোড়ন।

অন্ধকার ও দাহস্মৃতি

অন্ধকারে জেগে থাকে দূর শহরের ক্ষীণ আলো। শহরদাহ নয়, দাহস্মৃতি আমাকে বিষণ্ণ করে রাখে। সারাদিন কোরীয় পাহাড়ের রক্তপল্লব আমাকে উদ্দীপ্ত করেছে, দাহ অনুষঙ্গ চেতনায় ছড়িয়ে দেয়নি হেমলক ছায়া। সূর্য মৃত্যুকে ঢেকে রাখে, অন্ধকারে সূর্যরেখার অদৃশ্য গতির দিকে চেয়ে থাকি। আমার দৃষ্টিপথে ভেসে আসে তোমার দীপিত বস্ত্রখণ্ড। একদিন অরণ্যসরোবর আলোকময় মাছে মুখর হয়ে উঠেছিলো। তোমার স্পর্শে  আমার আবরণধূলি নক্ষত্রপালকের লাবণ্য ধারণ করেছিলো। আলোকপ্রবণ মাছের প্রাত্যহিক উৎসবে তোমার নক্ষত্রনাম কীর্তিত হয়; আমার প্রত্যাশী পরিচ্ছদে লেগে থাকে বিরামপুরমৃত্তিকা। লাবণ্যকামনাময় ধূলি আমাকে অন্ধকারে উৎসাহী করে তোলে। আমি একটি নামে ঢেকে রাখি অনন্ত দাহস্মৃতি।

কুয়াশা কিংবা ব্রিজ

কুয়াশা কিংবা ব্রিজ আমাকে বিভ্রান্ত করে রাখে। কৃষ্ণচূড়া ফল চিরন্তন পথের পরিচায়ক হতে পারে না জেনেও আমার রেটিনা গ্রহণ করতে পারেনি ভিন্ন কোনো দৃশ্যসংবাদ। যে পথ গ্রহণকামী তা দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে ওঠে। অস্পষ্টতার ভেতর কখনো জলবিভাজনের শব্দ শোনা যায়। সাদা ও কালো ডানার পাখি শাসন করে খণ্ডিত আকাশ। আকাশের অপূর্ণতার দিনে বুদ্ধিশূন্যতা তীব্রতা ধারণ করে। অবরুদ্ধ আলোর ভেতর প্রত্যেকটি ব্রিজ নির্দিষ্ট মলুহা রাগ অনুশীলন করে। নির্দিষ্টতাও ডেকে আনে বিপন্নতা। নদী পেরিয়ে গেলে কি স্পষ্ট হয় রুপালি নদীরেখা? মাছের নীরব আনন্দ অদৃষ্ট জলধারাকে পরিশ্রুত করে কিনা, আমি জানি না।

শূন্য বাড়ি

পড়ে আছে শূন্য বাড়ি। সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাই দোতলার কবিতাকক্ষে। রবীন্দ্রনাথের হৃদয়¯্রােতে একদিন আমরা রংধনু ডুবিয়ে দিয়েছিলাম। ভেজা রংধনুর চাপগুলোকে আলাদা করতে আমাদের সময় লেগেছিলো। আজ আলমিরার গায়ে লেগে আছে মলিন ধুলো। বাংলা অভিধান কিংবা মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা ভুলে গেছে সূর্য ও শ্বেতপদ্মের সাহচর্য। নিচতলায় বন্দি রবীন্দ্র-রচনাবলি — স্বচ্ছ কাচের আড়ালে তরঙ্গের স্থিরতা! অন্ধকারে অন্দর দরজা খুলে মোবাইল-আলোয় দেখি গহন বাগান — প্রাচীরে শিমের রাজত্ব, সবুজের আহ্বান।

কম্পন

কতোভাবেই তো প্রস্তুত হওয়া যায়! আমার প্রস্তুতিপথে মেঘ-নক্ষত্র-আকাশ ক্রোটনপত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমার চোখে পাতার ত্রিমাত্রিক নৃত্য দেখে বলেছিলে কিছু কম্পন শাশ্বত হয়ে ওঠে। প্লেনের ক্ষণস্থায়ী কম্পন তোমার স্বরসত্তাকে প্রবল করে তুলছে। এবার শূন্যতা কুণ্ডলিত হলে তুমি আমার ক্ষয়িষ্ণু ত্বক আর পেশির ভেতর দেখবে যতিহীন শব্দের প্রসারতা। যন্ত্র আর বাতাস যে নিরবচ্ছিন্ন শব্দ তৈরি করে তার প্রভাব-সূত্র নিউরনে রেখে যায় অম্লান বিশ্বাস। পরিবর্তনের ভেতর যা অপরিবর্তিত থেকে যায় তাকে জেনেছি নৃত্য। ক্ষয়ের কেন্দ্রে যা অক্ষয় থেকে যায় তাকে জেনেছি কম্পন। আমি আসছি, তুমি আমার কম্পন দেখে নিয়ো।

পাখিসত্তার ক্রন্দন

পাখিসত্তার ক্রন্দন নিয়ে জেগে থাকি। ওয়েস্টবেরির গৃহদৃশ্য থরথরিয়ে ওঠে, অনতিদূর পার্ক থেকে ভেসে আসে নিশ্বাসের উত্তাপ। বাস্তবতা দৃশ্যকে প্রসারিত করে; কিছু দৃশ্য অধিবিদ্যক অর্বিট রচনা করে — সেখানে পাখিসত্তা ঘুরে চলে, ডানাকেন্দ্রে কম্পন জাগিয়ে রাখে, গভীর চুমুকে তুলে নেয় অনিঃশেষ স্মুদি। তার চোখের ভেতর অর্থময় হতে থাকে রাত্রির কথকতা — আকস্মিকভাবে সে হয়ে পড়ে চেতানহীন। রাতশেফালি ফুটে ওঠে, রাতের উদ্ভাসন পাখিসত্তার দৃষ্টিতে রেখে যেতে পারে না কোনো গূঢ় প্রহর।

ভাষা, দৃশ্যের বিকৃত প্রচ্ছায়া

শুভ্র মেঘের ঊর্ধ্বগামী তরঙ্গে লেগে আছে ধূসর ছোপ। উজ্জ্বলতার অনির্ভর বিকাশ নেই। ধূসরতার শক্তি দৃশ্যকে পূর্ণ করে। বস্তুত দৃশ্যকে ভাষান্তরিত করা যায় না।  ভাষা, দৃশ্যের দূর  বিকৃত প্রচ্ছায়া। জীবনের উজ্জ্বল-ধূসর রহস্যের সত্য কোনো প্রতিরূপ নেই। নিরন্তর ব্যর্থ বর্ণে এঁকে যাই অতি ক্ষুদ্র আকাশ। আকাশকে চিনিয়ে রাখি প্রতীক বলে। আমাদের জীবনকে ঘিরে থাকে অজস্র দুর্বল আকাশ। আকাশগুলো আমাদের চরিত্রের স্মারক হয়ে ওঠে। আকাশে ভেসে ওঠে প্রেমের দুর্বোধ্য পারিজাত, হৃদয়ের বিপ্রতীপ পল্লব। ব্রহ্মাণ্ডের ধুলোকণার কাছে আকাশ মূল্যহীন; এ আকাশের জন্য আমাদের যুদ্ধ, বিজয়োল্লাস। আকাশের মনস্তাত্বিক ইতিহাসের মূল্য হয়তো এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।

………………………………………………………………….
প্রকাশক
শিরিন আক্তার
ছোট কবিতা
৮৫ কনকর্ড এম্পোরিয়াম মার্কেট, ২৫৩-২৫৪ এলিফ্যান্ট রোড,
কাঁটাবন, ঢাকা-১২০৫, বাংলাদেশ।
মোবাইল: +৮৮০১৭৭৭৪৭৭৭৪৪

পরিবেশক
বাংলাদেশ : কবি, বেহুলাবাংলা; পাঠক সমাবেশ; কাগজ প্রকাশন (ঢাকা); বাতিঘর (চট্টগ্রাম)। ভারত : পাঠক সমাবেশ; অভিযান পাবলিশার্স (কলকাতা)।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E