৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
মার্চ ০১২০১৭
 
 ০১/০৩/২০১৭  Posted by

পাবলো শাহি’র ২০টি কবিতা
“পরাবাস্তব জামার বোতাম” কাব্যগ্রন্থ থেকে

এক

কাল রাতে ইঁদুরের মতো আমি স্বপ্নে আদিবাসী মানুষের গুহার ভেতরে ঢুকে পড়ি। সেখানে দেখি, ঘুমন্ত পৃথিবীর দরোজায় সেঁটে দেওয়া আছে হাওয়া বিবির রাশিচক্রের বই। এক মহিলা তার জীবনের খাতা এমন ভাবে উল্টিয়ে যাচ্ছেন যেন তিনি ইতিহাসের গভীর পাতা থেকে গ্রন্থ পাঠ করছেন। আর গুহার ভুতুড়ে স্কুলে পাঠ দেওয়া হচ্ছে আদমের পাঁজড়ের কাহিনী। আদি যুগের মানুষ গুলি পাখির পালকের মত হালকা, তারা মধ্যাকর্ষণের শূন্য স্টেশনে ভরহীন অবস্থায় উড়ে চলেছে। ভাষার, ধ্বনির পশম খুঁটে নিয়ে আমি গুহার ভেতরে হেঁটে দেখলাম ক্রিয়াপদ গুলি এখানে পরাবাস্তব। ভাবলাম, ইতিহাস যদি স্বব্ধতার পিয়ানো বাজায় আর আমরা যদি আবার আদি পৃথিবীর গানে মুহূর্তে মানব অন্তর দর্শন করে আসতে পারি ক্ষতি কি? সেই ভাবনা থেকে মর্গের বেড়াল সেজে খুঁজি অলৌকিক ভাবে হারিয়ে যাওয়া আমাদের হারানো লাটিমের কাহিনী।

১১ই কার্তিক ১৪১৫

দুই

ক্ষুদ্র চোখের নিয়াণ্ডারথাল নারী যে চাঁদ দেখেছিল চতুর্থ হিমযুগে তাতে আজ মরচে ধরে গেছে। ফলে, শোকার্ত ফুলের বদলে সে একটা উপলখণ্ড নিয়ে অপেক্ষা করছে আমার জন্য, কেননা একদিন হয়তো আমি গোষ্ঠী অগ্নিকুরে গল্প শোনাব, এই ভেবে মূলত নারীটি আয়না কাহিনী লিখে রাখছে তার অফিসের সাইন বোর্ডে। তার এই প্রেম এক দেহহীন আত্মার মৃতদেহ, তাকে আমরা গুহা মানবের মতো বক্ষে এঁকে শোকার্ত ফুল দেই। হাতে, জিভে, আঙুলের ডগাই অলৌকিক করে তুলি…

যেদিন প্রথম নারী হয়ে গন্ধম ফলের নামে আমাকে সে দিয়েছিল ইতিহাসের উৎপাদন। সেই দিন থেকে অদ্বৈত আমার দেহ আর আত্মা দিয়ে অগ্নিকুণ্ডের মুখোমুখি হই। ফলত মানুষের জীবন নামে আমি এক সন্ধ্যার সার্কাসে ক্রীড়ারত জোকারের মতো। যে নিজেকে নিজেই খেলা দেখায় আর খেলোয়ার হয়ে ওঠে। একদিন হয়তো নিজেই এই সম্পর্কের ধুলিকণা থেকে বের করে আনবো আদমের ইতিহাস।

১৩ই কার্তিক ১৪১৫

তিন

তারপর দেখি, মাথায় বসিয়ে  হাসপাতালের পৃথিবী। বহুযুগ আগে থেকে দীর্ঘনিঃশ্বাসের ছাপ নিযে দাঁড়িয়ে আছে যে নারী। তার চারিদিকে বেদনার শালবন। হরপ্পা নগরীতে একদিন যে যুবক ফেলে এসেছিল ইন্দ্রিয় তাড়িত বক্ষ আর পোষা কালোমেঘ। তার কোন অন্তিম দুঃস্বপ্ন নেই, নেই লুপ্ত হয়ে যাওয়া গোলাপীমুদ্রা। বরং রাতের অশ্বত্থ থেকে যখন পৃথিবীর নাভিতে নামে চাঁদের ফোটা। তখন এই হারানো স্মৃতির দীর্ঘ মহাশূন্যতার কথা আমরা ভুলে যায়। তার থেকে ভলো তুমি যদি গ্রামোফোন শোনাও, ধরো তানপুরাটা। তখন আমাদের গুপ্ত ঘরের দরোজা খুলে যাবে। এভাবেই পৃথিবীকে তোমার মাথায় বসাই, মেঘবজ্রঘেরা রমণীদের ডেকে আনি আর বলি, এই মুণ্ডুকাটা মহাকাল বহুযুগ আগে থেকে কেমন রাস্তার পাগল সেজে আছে?

১৪ই কার্তিক ১৪১৫

চার

মানুষের জৈব জন্মের ইতিহাস যেন বৃষ্টিতে ভেজা নিঃশব্দ খরগোস, এরমধ্যে ‘পুরুষ’ অজানা শব্দের বালিয়াড়ি। আর ‘নারী’ প্রাপ্ত বয়স্ক রাত। পৃথিবীর প্রতিটি প্রেমের দোকানে সাজানো থাকে মৃত্যুনগদ কারবার। মানুষের দেহে থাকে আত্মা ও দেহের বন্য হাসি। এরই মধ্যে আমরা সূর্যের হেলমেটে মাথা ঢুকিয়ে প্রতিদিন কফি খাই। কথা বলি, জৈব জগতে ভাসমান লক্ষ লক্ষ গ্যাসীয় পদার্থের সঙ্গে। তুমি বলবে, পৃথিবীতে যখন কম্পিউটারের ক্লাস শুরু হবে তখন কবিতার টেবিলে কী সাজানো থাকবে বজ্রগর্ভ গোলাপের কুঁড়ি। মূলত পৃথিবী একটা কপির পেয়ালা মাত্র আর আমরা তার শরীরের জঙ্গলে জিপ গাড়ি চালায় তারপর অধিক বছর দিন কেটে গেলে হিশাবের খাতা, বউ-বাচ্চা ও ধারাপাত নিয়ে বসে থাকি।

১৫ই কার্তিক ১৪১৫

পাঁচ

আমাদের জীবনের পৃষ্ঠাগুলি স্নায়ু কীটের নিঃসঙ্গকবর, তাকে যদি চাঁদ জাগাতে চাই ধ্যানে- যদি ঘুণপোকা হয়ে শরীরের ভেতরে ঢোকে, ব্রহ্মাণ্ডের শঙ্খবাদক হয়ে গান শোনায়। তারপরও বনমানুষের বীজের ভেতর থাকবে তার তমসামুণ্ডু। রাতের অক্ষরে সে লিখবে সাইন বোর্ড, ডরমেটরি ও রূপকথার গল্প। কেননা মানুষতো মধ্যাকর্ষণ দ্বারা চালিত, তারও ঝুলেথাকা আছে বোটা ছেড়ে পড়া- পতন আছে, আছে নির্জন নারীদের বক্ষ ছিঁড়ে নিয়ে এই মহাকালে প্রেমিকের ইতিহাস হবার কাহিনী। তারপরও যারা জানেনা একথা তারা বলবে, জ্যোতিষীর দণ্ড বিধিতে হয়তো একথা লেখা ছিল? নতুবা কী করে জানা গেল, পৃথিবীতে একমাত্র পাগলই সুস্থ মানুষ।

১৬ই কার্তিক ১৪১৫

ছয়

অগ্নিদগ্ধ এই পথ আমাদের জন্য বিছিয়ে দেয় কাঁটার সু-সাদু আস্বাদ। যখন মানুষ্য ঘাতক কুঠারের আঘাতে ফুলের আগুন ছুড়ে মারে। আর তখন মানুষ প্রেমে পড়ে- খর ঋতুতে উলঙ্গ হাতিয়ার বিহীন ভাবে হেঁটে আসে অশ্রুধারার পৃথিবী। তখন তুমি বল, এই অবাক নগরে ঢুকে আমি বাইবেলের সাধু হয়ে উঠি। তারপরও একজন সন্ন্যাসীর ধ্যানরত মুখমণ্ডলে লেখা থাকে চুমুর সংকলন। আর সবাই জানে কাঁটার আঘাত পেতে কোন সাধু না মন্দিরে প্রার্থনা করে। এভাবে ছোটবেলায় এক স্কুল বালকের ডাইরির পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে তৈরি হয় দুঃখের নদী। সে কাউকে ভুলতে পারে না। তার দুঃখের নদীর একপিঠে রাজহাঁস অন্যপিঠে এজলাসের স্তব্ধ বিচারকের বক্ষভারি বেদনা। তারপরও যে পথে মানুষ হাঁটে, সে পথ মৃত্যুদণ্ডের। সে কথা জেনেও সে পেতে চাই গান আর নারী আর সুগন্ধী কাঁটার আঘাত।

১৭ই কার্তিক ১৪১৫

সাত

আদি পাপের যে কাচঘর তার নাম তুমি দিয়েছো আমাদের পৃথিবী। এখানে গাছের পাতায় মুড়ে আর মাছের কাঁটায় সেলাই করে চাঁদ টাকে রেখে দেই আমরা বুকের মধ্যে। তারপরও তুমি মাথায় পরো মেঘবজ্রের পালক আর পাতায় আগুন শঙ্খ-নুড়িতে করে নিজেকে সাজাও। তোমার বুকে থাকে বিচিত্র রঙের এ্যান্টেনা, আমি হাত দিয়ে দেখি তোমার ভালোবাসার তীর ধনুক, ঘুঘুর মতো আর্তনাদময়- পাগলের মত ছিটগ্রস্থ। মানুষের বুকের ওপর মাথা রেখে সে অর্ধোন্মাদ গান  শোনায়। এখন বল, কি তোমারা আদিপাপ, কি তোমার বুকের আড়িপাতা আর্তি। আর কাকেই বা আমরা বলছি বনমানুষের হাজারো  ভ্রান্তি। তার থেকে চলো আজ কাশবনের মাথার উপর দুঃখের কুড়েঘর তুলি। সেখানে থাকবে ভালোবাসার নামে পৃথিবীর সমস্ত ব্যক্তি মন্দিরের অপরাধ বিজ্ঞান?

১৮ই কার্তিক ১৪১৫

আট

পৃথিবীতে যতো আধক্ষ্যাপা প্রেমিক আছে, যতো মৃগ রোগী আছে, তাদের সঙ্গে আমাদের দেখা হল মহাকাশে ফুলের আশ্রমে। এখানে ফুল মানে কাঁটা আর মালিগুলি থানার কর্মকর্তা। তাদের হাতে ভালোবাসার রাইফেল, তাদের বক্ষে সেঁটে দেওয়া পাগলামির সাইনবোর্ড। তুমি বললে, আমরা চুমু খেলে উল্কাপাত হবে। আমরা ভালোবাসার কথা বললে সপ্তর্ষীমণ্ডল থেকে তারা খসে পড়বে। আর মহাকাশের শূন্যস্টেশন হবে আমাদের ভুলের কাঁটা বিছানো বাসর। আমাদের ছেলের নাম হবে মেঘবজ্র আর মেয়ের বিজলি আলো। আসলে যারা ভালোবাসে তারা সত্যিকার আধক্ষ্যাপা, তারা মূলত মৃগরোগী পৃথিবীর স্টেশনে নয় তারা থাকবে ফুলের হাসপাতালে। মূলত ভালোবাসা মর্গে শুয়ে থাকা লাশের হাতে তুলে দেয়, যৌন ডাকঘরে আসা চিঠির পাণ্ডুলিপি।

১৯শে কার্তিক ১৪১৫

নয়

মাঝে মধ্যে আমাদের ধড় ও মুণ্ডুআলাদা  হয়ে ওঠে; ধড়ের যেখানে হাত রাখি দেখি, সে যেন এক রহস্যময় নাভি আর মুণ্ডু যেন গোলক ধাঁধার কুয়ো। এখন মানুষ যে অর্ধনগ্ন ছাপাখানা বানিয়েছে, তার মধ্যে লুকানো আছে হিজড়াদের শিশু, ঈড়া পিঙ্গলা সুষুম্নার খড়কুটো। আমাদের মনের মধ্যে এক ভালুক বাচ্চা আর এক তীরন্দাজ ঘুরে বেড়ায়, যেটা তার ভালোবাসা। ঈশ্বরের গোপননিঃশ্বাস, ধড়, সেতো চিৎ ও উপুড় হয়ে থাকা পৃথিবীর সমস্ত প্রেমিকের দেহ। আর ভালোবাসা মূলত আলাদা এক গোলকধাঁধা, আলাদা এক নিঃস্বাসের কন্টকিত মৌচাক। যখন তুমি সে প্রকাণ্ড কুয়োর ঢিল ছুড়বে, সেখানে শুনতে পাবে বক্ষ খোলা প্রেমিকার হিব্রু ভাষায় গাওয়া গান…

২০শে কার্তিক ১৪১৫

দশ

পৃথিবীর আদি মানুষের রক্তে লেখা আছে সবুজ এক ইন্দ্রিয় বেদনা। তোমরা যাকে ভালোবাসা বলো- কিন্তু আমি জানি সে ভালোবাসায় অধিক- হিজল গাছে বসা ডুমো মাছি। অথচ মানুষ প্রেমকে মুণ্ডুুহীন গাছ ভেবে, আগুনের পাখি ভেবে- শুয়োপোকার গুটি দিয়ে টুপি বানায়। তার গায়ে থাকে আয়নার দংশন, রাজহাঁসের পাখনা আর হৃদপিণ্ডের নামে ছড়ানো কথা কেনা বেচার হাট। পৃথিবীর আদি মানুষের রক্তে লেখা আছে কবিতা, চাঁদের অমাবশ্যা। যখন মানুষ বোঝে, ভালোবাসা তার কাছে এসেছে- তখনই সে বোকা আর নির্বোধ হয়ে ওঠে। অথচ বোকা হলেই মানুষের পুনর্জন্ম হয়, মানুষ জলের গভীরে গিয়ে দেখে, আছে আকাশের ঠিকানা। মানুষ হৃদয় খুঁড়ে তুলে আনে মানুষের দীর্ঘতম ইতিহাসে বিষণœ বুকের ছাতা। পৃথিবীর আদি মানুষের রক্তে কি খেলা আছে তা জানার জন্য আমি ইতিহাসের খাতায় তোমার বুক চিরে গুণ্ডুুষে লিখি কাম, আগুন আর নক্ষত্রের আর্তনাদ।

১২ই অগ্রহায়ণ ১৪১৫

এগারো

মৃত্যুকে পাঁজাকোলা করে ভীড় ও সভ্যতার মধ্যে ছুঁড়ে দেবো আমি। দেখবো জীবাশ্ম থেকে, জীবনের ধোঁয়া তেকে করোটির ব্যাকরণ থেকে কীভাবে বুড়ো সূর্যটা ভালোবাসার নামে মৃত্যুকে ভয় দেখায়। তখন দেখবো, আমার গায়ের নশ্বর গন্ধ কীভাবে অদ্ভুত গলায় ভয়ের কথা বলে। আজ যারা পৃথিবী নামক গোলাপ কুড়ানো রাক্ষসীর কাছে জমা দেয় ফিঙে ও পতঙ্গের লীলা, তাদেরকে আমি বলি- আমি রাধা ও কৃষ্ণের যুগলবন্দি। কেননা আমি কাশবনে কুড়িয়ে পাই- মেঘের ডাক, সবুজ বেড়ালের চোখ ও হারিয়ে যাওয়া মরালগ্রীবা আর জানি এ পৃথিবীতে মৃত্যু মানে দুই চোখে ফোটা লক্ষ বছর, টবে ঝরে যাওয়া ফুল অথবা ভালোবাসা। আমি তাই মৃত্যুকে পাঁজাকোলা করে ছুঁড়ে দেই ফুল ও পতঙ্গের মাঝে, সরোদ বাদকের আঙুলের ডগায়।

১৩ই অগ্রহায়ণ ১৪১৫

বারো

মানুষের অপরিচয়ের চিহ্ন মুছে যায়। যখন দেখি তার নাভি বিন্দুতে ঢুকে গেছে চাঁদ, শরীরের রুদ্ধশ্বাস, কঙ্কালের স্মৃতি; শুয়োপোকার মতো গুটিগুটি অথচ অবিশ্বাস্য রূপান্তর এই তো প্রাণীজগতের ইতিহাস। আদিম মানুষের বুকে যদি তুমি দেখো মমির ম্লান দীর্ঘশ্বাস আর যে সব গাছেদের প্রাণ আছে- তারা যদি তোমাকে জিজ্ঞাসা করে- ‘কেমন আছেন’? তখন মাটি ও সূর্যের মধ্যে তুমি খুঁজে পাবে আমাদের হিশাব না মেলা অঙ্ক। মানুষের রক্ত মাংসের শরীরে দেখো কেমন ফুলের বদলে কাঁটা ধরে আর বৃক্ষের সবুজ অভিব্যক্তি লৌকিক গাছের মতো আমাদের বক্ষে বেজে চলে অলিখিত বিদ্যার সংবিধান। মানুষের অপরিচয়ের চিহ্ন বক্ষ জুড়ে ভেঙে পড়া মেঘের মতো যার মধ্যে আছে মানুষের মুণ্ডু ও মুণ্ডুুহীন জড় জগতের ইতিহাস।

১৪ই অগ্রহায়ণ ১৪১৫

তের

পৃথিবীর একটা আবেদন আছে মানুষের কাছে, হয়তো আমার কাছে তোমার- তাই তোমার নাম দিয়েছি ‘আমাদের ম্যাজিক পৃথিবী’। মূলত মানুসের প্রস্তর যুগের হাড়ে লেখা আছে দুখী পৃথিবীর ইতিহাস। মানুষ মানে বক্ষের বেদনা, পৃথিবীর সার্কাস তাঁবুতে দাঁড়িয়ে থাকা জোকারের আর্তনাদ। আসলে পৃথিবী সেতো শালজঙ্গল, মানুষ সেতো বাঘ, সরীসৃপ হিংস্র প্রাণী। এখন ভাবো কোন ভূতগ্রস্থ এ জগতে ছড়িয়েছে ভালোবাসার বাণী তা নাহলে, এই মৃত্যুর উপত্যাকা জুড়ে কেমন সবুজ প্রসূতিসদন। ভয়ঙ্কর দুঃসময়ের মাথার খুলিতে পুঁতা রয়েছে কর্পূরগন্ধ নারীর শরীর। এখন থেকে পৃথিবীর প্রতি যা কিছু সুন্দরের ভায়োলেন্স তার জন্য আমাদের নখ, আমাদের থাবা আমরা লুকিয়ে রাখতে চাই প্রাগৈতিহাসিক যুগের ভেতর।

১৫ই অগ্রহায়ণ ১৪১৫

চৌদ্দ

আমার মনের মধ্যে যে পাগলামী বাস করে আমি তার মাথা চাবিয়ে খেতে চাই। কতদিন এ শহরে সত্যিকার পাগল দেখিনি, সত্যিকার প্রতিভা দেখিনি। পাগল না থাকলে প্রতিভা থাকে না, পাগল না থাকলে রমণীরা ঘোড়ার গ্রীবায় হাত রাখে না। ধরো, মাথার মধ্যে পাগলামীর পোকাচক্র কেমন আমাদেরকে নীল ডুবুরির সন্ধান দেয়। কেমন দলছুট পরীর দেশে নিয়ে যায়। এখন আমরা হাটছি পাগলামির রৌদ্রে, মাথায় নিয়ে এক বাক্স সমুদ্র। মানুষ সত্যি কারের পাগল আর প্রেমিক দেখলে ভয়ে দূর সরে যায়। কেননা পাগলের মাথায় থাকে ডুবুরি পোশাক। হাতে থাকে উগ্র এক ঋতুগন্ধ আর প্রেমিক সে তো পাগলই হতে চায়। পাগলামীর ভাষা ও বিচ্ছেদে তার প্রেম প্রকাশিত হয়। এখন থেকে সে কারণে  আমরা পাগলকে প্রতিভা ভাববো, প্রেমিককে পাগল ভাববো আর মানুষকে পাগল হতে শিক্ষার ইস্কুলে ভর্তি করে দেবো।

১৬ই অগ্রহায়ণ ১৪১৫

পনেরো

এই পৃথিবীর মানুষ খুব সৌখিন তারা আয়না ঘরে ফুল কুড়াই। মানুষের মুণ্ডুদিয়ে তৈরি ফুল, সূর্যের সাতরং দিয়ে তৈরি ফুল কিংবা হৃদয়ের শেষ উত্তাপ টুকু ঢেলে দেওয়া শুকনো মায়াবী ফুল। সব কিছুই পৃথিবীর মানুসের কাছে বাহারী উপহার। একদিন তারা এই উপহার পেয়েছিল ধুলো ও ঘাসের ঘটনা থেকে; দু’লক্ষ বছর আগের কালো মেঘের প্রেমের লিরিক। প্রাগৈতিহাসিক যুগে যে প্রেম লোমে ঢাকা পড়েছিল। মেয়েটি সেই শিকারী নর্তক সঙ্গী ও বক্ষের নগ্নশ্বাস নিয়ে আজও পৃথিবীর মানুষকে প্রেমের গণ্ডুসে মুগ্ধ রাখে। যখন স্বপ্নহীনতার বিষক্রিয়ায় আমরা স্ল­েজ কুকুরের মতো বরফে ঢাকা পড়ি, তখন আয়না ঘরে আলাদিনের সাফারী থেকে বেরিয়ে আসে মায়াবী চাঁদ। দু’লক্ষ বছর ধরে মানুষের ভালোবাসার চোরাপথগুলি রমণীদের চুলের কাঁটায় আর পুরুষের হাত ঘড়িতে ঝুলে থাকে। তারপর পৃথিবীর মানুষ আয়না ঘরে ফুলের বদলে মানুষের মুণ্ডু দিয়ে বাহারি মালা গাঁথে।

১৭ই অগ্রহায়ণ ১৪১৫

ষোল

উনুনের আগুনে হাতের পাঞ্জা এঁকে আমাদের শুরু  এই পৃথিবীতে। তারপর থেকে এই পৃথিবীর দিবস রজনীতে আমরা আগুন খাই, আগুনের ভর্তা, আগুনের ভাজি, আগুনের ভিতর বাহির কারসাজি সবকিছু পুড়িয়ে ঝলসে ছোলাহোড়া করে খাই। আমাদের হৃদযন্ত্রটা মহীয়সী স্টোপ, আমাদের বক্ষটা হা-হা করে জ্বলে ওঠা চুল্লি। আমাদের মনবেদনা দাউ দাউ করে পুড়ে যাওয়া প্রার্থনা মন্দির। আমাদের অন্তঃসত্ত্বা-মন যখন পোড়ে তখন তাকে আমরা বলি শক থেরাপী। এভাবে পোড়ে সূর্যলিঙ্গ ও রাত্রিযোনি, পোড়ে আর্ত-চিতাগ্নি অথচ সমান্য উনুনের আগুন দিয়ে আমাদের পোড়ানো ইতিহাসের সেই আদিম যুগে, লঘু শোককে পোড়াবার জন্য আমরা আগুন জ্বেলেছিলাম বুকে। তারপর থেকে শুরু খুলির ভেতর আগুনের মশারী টাঙিয়ে আমরা হেঁটে এসেছি এই দীর্ঘ পথ।

১৮ই অগ্রহায়ণ ১৪১৫

সতেরো

তোমার জন্য ম্যাজিক লন্ঠন হাতে প্রতীক্ষা করছে সমস্ত পৃথিবী। ফুল গাছটার  স্তব্ধতার মধ্যে যেমন সৌম ও ধ্বংসের সৌন্দর্য থাকে তুমি তেমনি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো উনুনের আগুন। এই দৃশ্য দেখে আমাদের উৎসবের রাত্রি কেমন জিবের উপর গড়িয়ে পড়ে আর স্বপ্নকে- মোহর, বারুদ ও ব্যাণ্ডেজ হাতে নার্সের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। আগুনের উনুনকে মহাজাগতিক রশ্মিতে আমরা ভাতের মতো রান্না করি। শালগাছের আড়ালে কুড়িয়ে পাওয়া চাকু দিয়ে কাটি। তারপর জিবের মধ্যে পুরার আগে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপিত নারীর তিরস্কৃত স্তনের উষ্ণতায় ছেঁকে তুলি। আগুনে পোড়ার এই তো নিয়ম- গেরিলাদের মতো খুনির রক্ত চিহ্ন নিয়ে, তারপরও আমরা বেঁচে থাকি।

১৯শে অগ্রহায়ণ ১৪১৫

আঠারো

মানুষের শরীর কখনো কখনো বৃষ্টির দলার মতো অলৌকিক হাত নিয়ে ঝরতে থাকে পৃথিবীতে। পৃথিবী মানে আরেক শরীরে। চুম্বনে, লাভামুখ বিস্ফোরণে কিংবা প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাসে মানুষ এক ভয়ঙ্কর আমিষ। তাকে খেতে চাই মানুষের ফুল, জ্বালা, মনখারাপের দিন আর প্রেমিকের চুলের কাঁটায় জড়িয়ে থাকে সমুদ্র-গর্জন। হাজার বছরের পুরানো বাংলা কবিতার মধ্যে পাওয়া যাবে সেই সুক্ত কথা। মানুষের মন কখনো কখনো ভীত জানালা গড়িয়ে মেঘবজ্র বিদ্যুতের কাহিনী হয়ে ওঠে। একটা চিনামাটির  কাকাতুয়া যেমন ডুবুরির পোশাক প’রে মানুষের প্রতিমূর্তি সেজে প্রতিদিন হেঁটে বেড়ায় পাহাড়ি নির্জন গির্জায়। আর সপ্তর্ষীমণ্ডলে যত সৃষ্টি, প্রলয়, দেহমিলনের আবর্তন সবকিছু কেমন উদাসীন আত্মহুতি, কেমন ঋতুগন্ধ কেমন উপলক্ষবিনা ভালোবাসা। এভাবে হয়তো পৃথিবী শরীরের অক্টোপাসে লুকিয়ে রাখে প্রেমিকের ডুবুরি বৃষ্টির ফোটা।

২০শে অগ্রহায়ণ ১৪১৫

ঊনিশ

মানুষের শরীর কখনো কখনো হয় গ্রামোফোন পাখি। সমুদ্রের তলদেশে সুর ও ধ্বনির জলপরি, তার খোপার ভেতরে থাকে ড্রাগনমালা, মনের মধ্যে থাকে চিনামাটির কাকাতুয়া। মানুষের ভেতরে যত ঢুকি, তত অক্টোপাসের গন্ধ পাই। আকঁড়ে ধরে জীব ও আগ্নেয় গহ্বর। যেন সে ডুবুরি পোশাক, শরীর মনের শাখা প্রশাখা কিংবা অন্তর্বেদনা। অবাক নগরে এরকম ভাষা ও বিচ্ছেদ ভেঙে মানুষ আনে পৃথিবীর উপহার। তারপরও জীবসত্ত্বার ব্লাকবোর্ডে সারারাত ধরে চলে রঙিন কাঁচের চক দিয়ে লেখালেখি। বৃষ্টির দলা এসে জমে, দুর্গ পাহারাদেয় নীরব সংকেত মালা। প্রাগৈতিহাসিক যুগের ভ্রুণ, নিতম্ব, পরিখা রক্তবীজ হয়ে আমরা আবার ফিরে যায়। দেহমিলনের আবর্তনে ফিরে আসি, গ্রামোফোন পাখি হয়ে ডাকি। মূলত সময় ও কূট অঙ্কগুলি ভুলে গেলে মানুষ যেতে পারে- নগ্ন সৌন্দর্যের ফুল ও মৃত্যুর মুখোমুখি।

২১শে অগ্রহায়ণ ১৪১৫

কুড়ি

তেইশ বছর মরুশৃগালের মতো আমি ইন্দ্রিয় বেদনার মধ্যে আছি। হয়তো দিলাম আরো দু’লক্ষ বছর আগে থেকে- যেমন গড়ে ওঠে খোদার মুণ্ডুুহীন রক্তাক্ত দেহ, গীর্জার অর্গানের করুণ সুর, শরীর নিশ্চিহ্ন ডুবুবির নির্জন প্রার্থনা কিংবা তোমার জন্য জমে থাকা অন্তর্দাহ, হিমঠাণ্ডা হাত, ভালোবাসার ঘুমন্ত শরীর। এখন বলো জুঁইফুলমালা গেঁথে আমি যদি চৌরাস্তার ট্রাফিক আইল্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে থাকি; যদি পরিত্যক্ত পাগলের গান ভেবে তুমি তাকে বুকে আশ্রয় দাও, ভালোবাসা দাও। সেইকথা ভেবে আজও পৃথিবী কেমন থমকে স্থির হয়ে আছে তরমুজের ছিন্ন মুণ্ডে রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে ইতিহাস থেকে ইতিহাসে, ভালোসাবা থেকে নারীর কালো চুলের কাঁটায়। হয়তো কোন ইন্দ্রিয় বেদনা হয়তো কোনো প্রাচ্যের ভাব, অন্তর্দাহ আমাদের মন আরো পোড়াবে, বলবে এই নারীকে চেনো দেখো সে কেমন আহবান, কেমন জঙ্ঘা ও টোটেম অথবা মনের মধ্যে গড়ে ওঠা এক ঝড়ের দেবী।

২৪শে অগ্রহায়ণ ১৪১৫

————

পাবলো শাহি

পাবলো শাহি

পাবলো শাহি
আশরি দশকরে কবি
জন্ম: ১৩৭২, ভাদ্র ২
যশোর

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E