৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
জানু ১০২০১৭
 
 ১০/০১/২০১৭  Posted by

পরিতোষ হালদার -এর ১০টি কবিতা


প্রতিবিম্ব

রক্তদ্রোণ পার হয়ে তোমার বাগান। জন্ম নেবে বলে ফুটে আছে অজস্র পারুল।
ঘুম ও গণিতের মাঝে ওতপাতা ছুরি; কিছুটা রূপার মতো চকচক করে প্রেম।

প্রলম্বিত চুম্বনের পর সহমরণই প্রকৃত গঙ্গাজল।

ছলনাবিজ্ঞান জানি- বৃষ্টি আঁকতে গিয়ে এঁকে ফেলি পানিপথ, তোমার পুরানো সংসার।
ছদ্মনামের পাশে প্রতিদিন বড় হয় রোদ।
একবার ভাঁজ খোলো, প্রগাঢ় দিগন্ত তোমার তিতির।

আঁচলে ব্যতিক্রম বোনো, হাওয়ায় উড়িয়ে দাও ফুলতোলা মোহ।
ঘরের ভেতর হাজার দুয়ার। কী অদ্ভূত পুষে রাখো গোপন সিন্দুকে।

রূপ খুঁজে দেখো, আয়নার সামনে তুমি ও প্রতিবিম্ব সমানসমান।


জলঘড়ি

তোমার কুসুমে ফুটে আছে হেমন্তঋতু, আমাকে মৃত্যুর মতো ভালোবাসো।

 চাঁদের ওপার থেকে যে আলো আসে, তুমি তার প্রথম উড্ডিন।
 তোমার ছায়ায় বড় হয় প্রতিবিম্ব ও জলপাই গাছ।
 কপালে এঁকে নেও সকালের টিপ।

দেখো- সাতরঙের কোন কোন বিষাদও একা। ডাকনামের সাথে ঝুলে আছে  বৈজয়ন্তী।
গোটা আকাশ তার স্মৃতির বাগান।

উড়ে গেলে রাজহাঁসও একএকটা জলঘড়ি।
আমি সময় গুনতে থাকি……
তুমি অতিক্রম করে যাও তোমার কামরাঙ্গা।


জাদুঘর

পাহাড়কে যদি প্রতিহিংসা বলে ডাকি, তুমি কি তার গায়ে প্রজাাপতি এঁকে দেবে।
না কি চন্দ্রমল্লিকা, যার শাদা পাপড়িতে রোজ ফোটে তোমার শৈশব।

ইতিহাসের তেত্রিশ পৃষ্ঠায় ন্যুনতম যে জয় থাকে-
এসো, তাকে ঝরাপাতা বলে ডাকি।
কারণ, কোনো কোনো সূচনায় আমরাও জোড়া বনস্পতি।

লুকানো তাম্রলিপির সৌন্দর্যে চিৎকার দিতে পারে জাদুঘর,
একটি চলোমান বায়োস্কোপ।
ক্যালে-ারে লুকানো লালশব্দ আর অজস্র পরীর নাম।

তবুও জানিনা তুমি কে? নদী না কি ডুব!
ভরকেন্দ্র খুলে দাও- আমি দূরন্ত রাজহাঁস, সাঁতার শেষে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চাই নিজের পালকে।


তীব্র নৈঋত

নিমবন- আহা নির্জন ও ছায়া।

ইচ্ছা হয় দূরকে কানামাছি বলে ডাকি। কেমন অন্ধ রোদ্দুর, চারপাশ মর্মরধ্বনি
ছুঁয়ে দিলে কোন কোন নদীও সন্ধ্যাতারা।
    এই পথে বেকে গেছে ঘুম- একটু দূরে রাত্রির বাড়ি।

কিছু অভিমান নিয়ে নিমফল ঝুলে আছে শ্রাবনের দিকে।

ঋতু বদলের মতো একা, এই চুম্বনবেলা; অজস্র বিশ্রাম শেষে জলঘুঘুও বেড়াতে আসে
ডানায় সাঁতারচিহ্ন- তীব্র নৈঋত।

এখানে ক্লান্তি নিমিশেই চিল- পাতা ঝরে গেলে আয়ুরেখায় আটকে থাকে শ্বাস।


সূর্যমুখী

রৈাদের পাহাড়ে ডুবে যায় রঙ। কিছুটা শ্রুতি নিয়ে বাড়ি ফিরি, কিছুটা সূর্যমুখী।
এসো- মোহ তুলে যুগল বানাই।

দূরের খুব কাছেই তুমি, চোখের দৃষ্টিতে বেজে ওঠে মেহগনি সুর।
পাতার নূপুরে যাকিছু ধ্বনি তার ভৈরবী শীতকালের মতো একা।

শিশির ফিরে যায় দূপুরজন্মের দিকে।

ঋতু এলে বুনো হাঁসেরাও খোঁজে ঘ্রাণ, পালকে অজস্র পাতন- না ধুসর, না কি বর্ষা।
যে ফিরে যায় তার হাতে ঘুমের মর্মর।

তুমি ডাক দিলে খুলে দেবো জল, তুমি ডাক দিও- খুলে দিয়ে জল।


অহম

পাতার হেমন্ত তুমি- গান গাও আর দুইহাতে অহম ডাকো।

এসো- পাহাড়ের গায়ে নির্জন আঁকি, পেছনে অন্ধকার রেখে বলি-
হে সূর্য্য- তুমি মহান, আমরাও মহান। তুমি মৃত্যুর উর্ধে কিন্তু আমরা নই।
তুমি আমাদের জল দাও, জন্মান্তর দাও।

তাকিয়ে দেখো কোনো কোনো তীরন্দাজ আজ বাঁশিয়ালা।
শিকারের সুর তোলে আর দস্যু নদীর দিকে হেঁটে যায়।
নিশ্চয়ই বনভূমি ভুলে গেছে আর্তনাদের স্মৃতি।

হরিনেরা তবু কাঁদে, বাঁশিও কাঁদে।
মাঝখানে ন্তুতি গায় তোমার হাতের কিছু তীব্র তীর।
ওম শান্তি…. ওম শান্তি….।


দাঁড়িকমা

পতন পর্যন্ত প্রতিটি দাঁড়িকমাই প্রশ্নবোধক।
তাই কোন কোন বিজ্ঞান চাপকলের মতো একা। সুযোগ পেলে ভাসিয়ে দেয় বসন্ত।

একবার রাত, শব্দের স্বপ্ন দেখে আর ফেটে যায়।

সেই থেকে তুমি ভার্সুয়াল- সকল স্পন্দন তোমার অপেক্ষা করে। তুমি ঘুম ও মৃত্যুর মতো আবির্ভূত হও।
এটা বিশাল মায়া; যা আমাদের তোমার তৃষ্ণায় অবগাহন করার প্রতিঈর্ষা দান করে।

তবুও একদল মেষপালক কীসব আনন্দ নিয়ে ফুল চাষ করে,
জন্মদিন সাজায়।
তারা জানে- মাংসের বাজার পড়ে গেলে দামী হয়ে ওঠে দোকানের রজনীগন্ধা।


জুঁইগাছ ঃ এক অসমাপ্ত দূপুর

ফেটেপড়া শব্দেও কোলাহল ছিল, তাই কুয়াশা কাটতে কাটতে এতোটা ভোর হয়ে যায়।
সমুদ্র ছাড়ার আগে বাতাশে যে রুমাল উড়িয়েছি আজ তা রৌদ্র আঁকা নাচের নদী।

কোন কোন দীর্ঘশ্বাসও ঝাউবন, বাতাশ থেকে খসে পড়ে ডাহুকপাতা।
আমি নির্জন পথে হেঁটে যাবো- আমাদের জুঁইগাছ এক অসমাপ্ত দূপুর।

ওই দিকে ঘুঙুরসন্ধ্যা, জ্যোৎস্নায় যা কিছু ভাবি, আঁকা চোখ মিথ্যা ভাবে না। নিঃসঙ্গ পারুল সরে যায় আশ্বিনের দিকে।

অপেক্ষা ফুরিয়ে যায়, রাত্রি যায়- তুমি যেও না; তোমাকে সেতার বলে ডাকি।


রূপান্তর

কোন পাতা মুখন্ত নেই, তবু ঝরে যায় ঋতু।
যেটুকু দিগন্ত নিয়ে ফিরি তার গন্ধ চন্দ্রগ্রস্ত সোমবারের মতো।

তোমার স্নানের কাছে সমর্পিত আমি-
নানারকম নির্জনে মুখোমুখি হই- তুমি মোহের জনন ও বিকাশকারী। আমাকে প্রশাস্ত করো, প্রয়োজনে তোমার আদলে রূপান্তর করো।

কী করুন সুরে পরিবাহী তুমি, জেগে থাকে রূপার মর্মর যেন চারুকলায় আঁকা প্রাচীন পাখি।
উড়ালে বিশ্বাস ছিলো তাই ভুলে গেছি ডানার মহিমা।

মনে আছে, কোনদিন থির হলে ফিরে যাবে তোমার ছায়া।

১০
ধনুক

কোন কোন অক্ষর ধনুকের মতো নির্জন, কেবল লক্ষ্যভেদ। কখনো ক্লান্ত সব্যসাচী।
আমাদের ভুলগুলি প্রলম্বিত রাবার বাগান।

হেমন্ত বিদায় নিলে ঘুরে ফিরে আবার হেমন্ত আসে।

যখন ছায়ারা যুদ্ধবাজ হয়ে ওঠে, সবুজ শষ্যের পাশে মৃত পরে থাকে জোনাকির দল।
তখন  তুমি আসো- তোমার আগমন ভায়োলিন বাজায়।

তুমি নদী ভালোবাসো, নদীর আকাঙ্খায় সমুদ্র প্রেমিক।
তুমি দীর্ঘ বকুলগাছ।

উড়াল বদলিয়ে পাখিরা যায়, ডানায় প্রত্নযুগের হাওয়া। ঘুমের প্রযত্নে রাতগুলি শৈশব।
নৈশভোজনের পর অন্ধকারও পবিত্র রাক্ষস।

 

……………………………………………

কবি পরিচিতিঃ

পরিতোষ হালদার। জন্ম বাগেরহাট জেলার কচুয়া থানার আন্ধারমানিক গ্রামে। পিতা মতিলাল হালদার, মা চারুবালা হালদার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর কলেজে অধ্যাপনারত।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ কবিতা: আগামী যুদ্ধের তারিখ (১৯৯৩); শব্দজলের ছবি (১৯৯৫); উত্তর বয়ান (১৯৯৬)।

উপন্যাসঃ গাঙপরান (২০১২)।

প্রকাশিতব্য কাব্যঃ নৈ:শব্দ্যের জলতৃষ্ণা

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E