৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৪
অক্টো ২৪২০১৬
 
 ২৪/১০/২০১৬  Posted by
কবি কুমার চক্রবর্তীর কবিতাভাবনা ও একগুচ্ছ কবিতা

কবি কুমার চক্রবর্তী

কবি কুমার চক্রবর্তী’র ৮টি কবিতা


আমাকে বলেছো তুমি

আমাকে বলেছো তুমি, এই জল অপসৃত
গভীরে রয়েছে ছায়া তার, অশ্রুপতনের দাগ
আমি ভেবে উদাসীন, তোমারই দিকে আজ
ঘুরিয়ে নিয়েছি ডানা, এইদিকে দীর্ঘ রেলপথ
অতীত মুগ্ধতা নিয়ে সরে যায়, যায় সে তো যায়
অন্তহীন বাদুড়ের গান, চলে যায় জীবনের দল
স্তরভেদে এখানে এসেছে গুল্ম, কালস্রোতে
আমি তার ক্লোরোফিলে ধুয়ে নিই দেহ
নার্সিসাস বৃক্ষগুলো ঢুকে যায় মাথার কোটরে
আমাকে বলেছো তুমি— এইদিকে যাও  কোনো
অনন্ততৃষ্ণায়… তোমার ঋতুর কাছে
…স্মৃতিহীনতায়,  মৃত্যুফাঁদ রয়েছে বিছায়ে


কিছু পাপ ছিল

কিছু পাপ ছিল, কিছু অজাচার
তাকেই বেসেছি ভালো এ জীবনে
এইপথে যে এসেছে সিঁড়ি ধরে, বেয়ে,
ভেতরে আগুন ছিল তাকে নিয়ে
যে নদী গিয়েছে চলে জরায়ুগভীরে
তার ফুৎকার আজ আমাকে
অস্থির করে রাখে।
শুনেছি রাতের গান, ছায়াপথ
ধরে হাঁটি তিমিরসন্ধানি আমি
দেখে রাখি জীবনের ছায়া
যা এখনো অস্পষ্টতাগামী
আর তার কঙ্কালরহস্য
আমাকে মৃত্যুর স্পর্শ দিয়ে যায়।

কিছু পাপ ছিল কিছু অজাচার
তা-ই আজ স্বর্গে নিয়ে যায়
আমার পায়ের ছাপ আজ
আমাকেই এখন মাড়ায়


আমি

এই আমি, মূলত অন্ধকার, কিছুটা আলোয় মেশানো
প্রতিভাত করে না কিছুই, শুধু তার বিস্মৃত বিস্ময়
ছায়াসহ পড়ে আছে নির্জ্ঞানভূমিতে, অথবা সে নাই,
চাকার মতন ঘোরে শূন্যতায়, মিশে যায় হাওয়ায় হাওয়ায়।

জীবনের পথে গেছো তুমি, দেখেছো তো,
দেখেছো কি সংকেতের ভিন্নতা, থেমে থাকা চোখ
শরীররেখায় আজ জমে থাকা বিন্দু বিন্দু বোধ
এই দিকে হেসে যায় স্থিরতার হাসি, অলক্ষ্যে, ও বিপ্রতীপে,
অকালস্মরণে যারা নিদ্রা নিয়ে জেগে উঠেছিল
তাদের  হৃদয় আজ মদ হয়ে রয়ে যায়
মাটির গভীরে, অথবা কি আগুনের মতো
দাহ ও দেহের সমাধিতে বুদ্বুদের ছায়া হয়ে ভাসে!

এই আমি, মূলত আলোর ছাঁট, কিছু অন্ধকার ছিল
প্রত্যাহৃত বোধ ছিল কিছু, কিছু ছিল আহত বিস্ময়!


হায় ওদুসসেউস

ফেরা মানে হারিয়ে হওয়াও। হায় ওদুসসেউস
তুমি জানতে তার সৌন্দর্য।
যুদ্ধ শেষ হলে ট্রয়ের ঘোড়াগুলো মিশে গেল
বহিস্তরে,–বাতুল হাওয়ায়, তার সম্পর্কের  প্রতীকতা
হায় ওদুসসেউস, বৈচিত্র্যভীতিকে নিয়ে তুমি
ফের পারি দিতে গেলে সমুদ্রের ভয়াবহ মরুভূমিগুলো
স্নায়ুকোষ অপস্বপ্নে ছিল, ঢাকা, ছিল উৎকণ্ঠিত
তুমি তার প্রবৃত্তির গিরিপথে ছোটালে যে অশ্বখুরধ্বনি
সমুদ্রও জানত, তোমাকে ডাকছে তার শব্দান্ধতা
যা তাকে করেছে—এই স্পর্শসঞ্চালক
আর তুমি প্রতিভাকৌশলে জলকে করলে অন্তর্বাহী
জীবনের অনুকূলে, অনাবশ্যকতায়।

যুদ্ধ শেষ হলে কী থাকে আর? কী আর থাকে—
হারানো শিশ্নের গান, আর তার উদ্বিগ্ন সন্ত্রাস
অতীতের প্রকাশ্য আচরণ যা তাকে স্মৃত্যাভাসে
মানবনির্জন দ্বীপে নিয়ে যায়
যৌনঘর ভেসে আসে অর্বুদ অর্বুদ
অনুস্মরণের সুর যা একদিন বেজেছিল
মিথোজীবী  ঋতুসংহারে।
আর হে পেনিলোপে, নিসর্গবাদের কাছে দীক্ষা নিয়ে
তুমি আর কতকাল উপস্থকে গোপন করবে?
গতিভঙ্গি জানতে তুমিও
জানতে, শূন্যতাকে মনোবৃত্তি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়
ঢেকে দিতে হয়  বিকারগ্রস্ততায়
যখন হেমন্তের পাতায় ঢেকে যায়
অন্তরিত যোনিচিত্র– গোধূলিসন্ধির ঈর্ষায়,
আমরা বুঝেছি অথবা কি বুঝিনি তা
অনুভূতি করোটিবিদ্যার থেকে ধার করে এনেছিল
মনোবিকাশের গ্রন্থি, স্তন, হর্য, ক্রোধ, উত্তেজনা
আর অসম্বন্ধ যৌনবিপর্যাস।
হায় ওদুসসেউস, তুমি তো জানতে
ফেরা মানে আরম্ভের কাছে যাওয়া,
যা  জন্যে তুমি আজ নিজেই  করো পান নিজের নির্যাস।


কঙ্কাল নিশ্চিন্তে চলো

কঙ্কাল নিশ্চিন্তে চলো, ওঠো, বসো
আপন স্নায়ুতে, আমাকে চালাও আজ
মুদ্রাহীন, তোমার ঘামের গন্ধে
আমিও যে নিদ্রাহীন, দৈবনির্দেশিত।

দেহের ভেতরে থাকো, থেকে যাও
আমৃত্যু—আজীবন, তারপর একদিন
স্বাধীনতা চাও, পার্থিব বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে,
বলো, স্ত্রোত্রবই এখনো রয়েছে খোলা হাতে,
অস্বীকার করো তাকে রেখে দিয়ে
কবরের ভাঁজে, যেন তুমি একাই চালাবে
এই অন্ধকার, রাজ্যভারে যা এখনো স্ফীত।
মানুষ অনন্তমুখী তবে তার জীবন সীমিত
তুমি তাকে মর্ত্যরে সীমানা দাও, একাএকা
যখন তোমার ছন্দ মাটিকেও নাড়াবে আবার
আপন খেয়ালে এসে, হে কঙ্কাল
অন্ধকারে আবার দাঁড়াবে পুনর্বার।


তোমার নিকটে এলে

তোমার নিকটে এলে
বাজে অনুস্মরণের সুর
আমার ভেতরে আমি
রাত দিন, কোনো এক
নিখিল কারণে

পাতা ঝরে পাতা ঝরে যায়
দর্শনরহস্য নিয়ে
ঝরে পাতা একা অসহায়
ঝরাধ্বনি করে হাহাকার
ভেতরে বৃক্ষের গান
চিহ্নহীন, নামহীন
আমি যাই আমি আসি
কোথাও রয়েছে বাতুলতা
শব্দলীন, ঘুমমুখরিত
থাকে তার নিস্তব্ধবারতা


নিদ্রাহীনতা

ঘুম জীবিতের
মৃতরা তো নিদ্রাহীন
তরঙ্গের
চোখ খুলি, বুঝি
দূরত্বের রয়েছে  যে দায়
মরুভূমি উটের আয়না
জিরাফ তো দাঁড়িয়ে ঘুমায়।


দ্বিত্ব

নদীগুলো হলো রেখা
যা রচনা করে বৃত্ত—সমুদ্রের,
পাথর জানে এই ইতিহাস,
কেননা তাদের রয়েছে স্তব্ধতা
যা একাকার করে  হ্রস্ব আর দীর্ঘতার
গূঢ়ৈষা

আমরা  আসলে দুটোই,
এক  ও অন্যভাবে:
জীবন ও মৃত্যুর।

Loadingপ্রিয় তালিকায় রাখুন!
E